Image description

কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়লেও তাদের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারছে না বাংলাদেশ। ফলে প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ মানুষ কাজ করছে অনানুষ্ঠানিক খাতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নিয়েও ৪৪ শতাংশ স্নাতকধারীকে যুক্ত থাকতে হচ্ছে এ ধরনের কাজে। অথচ এই জনসংখ্যাগত সুবিধা বেশি দিন থাকবে না। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস বলছে, ২০৪৫ সালে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত সর্বোচ্চ হবে। এরপর ধারাবাহিকভাবে কমে ২০৫১ সালে প্রবীণপ্রধান দেশে পরিণত হবে বাংলাদেশ। তাই হাতে থাকা সময়ের মধ্যেই কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি। মঙ্গলবার রাজধানীর একটি হোটেলে ‘ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ ইন সাউথ এশিয়া : ফ্রম টেলউইন্ডস টু হেডউইন্ডস ফর ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিশ্বব্যাংক। সেখানে এসব বিষয় উঠে আসে। এ সময় প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি, পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক নাজনীন আহমেদ এবং বিশ্বব্যাংকের রিজিওনাল প্র্যাকটিস ডিরেক্টর জেম মেতে। আলোচনা সঞ্চালনা করেন বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের ডিভিশন ডিরেক্টর জ্যঁ পেসমে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, বাংলাদেশে প্রায় ৮৪ শতাংশ কর্মী অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। সংখ্যার হিসাবে এই কর্মীর পরিমাণ প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ। শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যেও এ প্রবণতা প্রকট। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারীদের প্রায় ৪৪ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক কাজে যুক্ত। অন্যদিকে আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় কর্মসংস্থান সম্প্রসারণের গতি ধীর। ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো সাম্প্রতিক সময়ে গড়ে কর্মীর সংখ্যা কমিয়েছে। জ্যঁ পেসমে বলেন, জনসংখ্যাগত সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বাংলাদেশ এখন কী ধরনের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা, শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী তরুণদের দক্ষ করে তোলা এবং নারীর কাজের পথে বাধা দূর করতে হবে। একই সঙ্গে প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রস্তুতি নিতে হবে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বাড়ানোও জরুরি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০০ সাল থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় কর্মক্ষম বয়সি মানুষের অনুপাত বৃদ্ধির ফলে এ অঞ্চলের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) বছরে অতিরিক্ত ০.৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। একই সময়ে শ্রম উৎপাদনশীলতা বেড়েছে বছরে ১.১ শতাংশ। তবে এই জনসংখ্যাগত সুবিধার অবদান ধীরে ধীরে কমে আসবে। ২০২৪ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে এর অবদান বছরে ০.৪ শতাংশ থেকে কমে ০.১ শতাংশে দাঁড়াবে।

বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জাট বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো তুলনামূলক কম মাথাপিছু আয় নিয়েই দ্রুত প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সমাজে পরিণত হচ্ছে। তাই এখনই বেশি ও উন্নত কর্মসংস্থান সৃষ্টির নীতি গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি সুস্থ প্রবীণদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত রাখার সুযোগ তৈরি করতে হবে। এতে বর্তমান জনসংখ্যাগত সুবিধা কাজে লাগানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির আরেকটি সম্ভাবনাও তৈরি হবে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, দক্ষিণ এশিয়ায় বর্তমানে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ১১৭ কোটি। তবে এক দশকেরও কম সময়ের মধ্যে এ অঞ্চলে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে কমতে শুরু করবে। ২০৪৯ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়া প্রবীণপ্রধান অঞ্চলে পরিণত হবে। তখন এ অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার ১৪ শতাংশের বয়স হবে ৬৫ বছর বা এর বেশি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন ঘটবে ২০৫১ সালে।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দুটি ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। প্রথমত, তরুণ জনগোষ্ঠীর কর্মক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। এজন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন সহজ করা, ব্যবসায়িক বিধিবিধান সরল করা এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দক্ষতার উন্নয়ন প্রয়োজন। নারীদের শ্রমবাজারে প্রবেশের প্রতিবন্ধকতাও দূর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বাড়তে থাকা প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা ও পেনশন ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি সঞ্চয় ও বিনিয়োগ উৎসাহিত করে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে। বিশ্বব্যাংকের সতর্কতা, জনসংখ্যাগত সুবিধার সময় থাকতে প্রয়োজনীয় সংস্কার না হলে ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

চাকরি ও দক্ষতায় চ্যালেঞ্জ : শ্রমবাজারে পরিবর্তনের সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থা ও দক্ষতার সামঞ্জস্য নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষাসংশ্লিষ্ট চাকরির বিজ্ঞপ্তি ২৪ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রভাবে চাকরির ধরন বদলালেও এ প্রযুক্তির সংস্পর্শে থাকা প্রায় ৭০ শতাংশ চাকরি পুরোপুরি বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা নেই।

বরং এসব ক্ষেত্রে এআই মানুষের কাজের পরিপূরক হিসাবে ভূমিকা রাখতে পারে। এ কারণে প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা অর্জন এবং কর্মীদের পুনঃপ্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।

গ্রামে স্বাস্থ্যকর্মী মাত্র ২০ শতাংশ : জনসংখ্যার বয়স কাঠামো বদলানোর সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবার চাহিদাও বাড়বে। কিন্তু বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার জনবল বণ্টনে বড় ধরনের বৈষম্য রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করলেও স্বাস্থ্যকর্মীদের মাত্র ২০ শতাংশ সেখানে কর্মরত। বিপরীতে শহরে চিকিৎসকের ঘনত্ব গ্রামের তুলনায় ১৮ গুণ বেশি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দীর্ঘস্থায়ী রোগের প্রকোপও বাড়ছে। বাংলাদেশ ও নেপালে বয়সজনিত দীর্ঘস্থায়ী রোগের চাপ বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় দুই থেকে পাঁচ বছর আগেই দেখা দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ৬০ বছরের বেশি বয়সিদের ৮ শতাংশ ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত। আর ৫০ বছরের বেশি বয়সিদের ৪৮ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগার কথা জানিয়েছেন।

প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়ে সমাজকল্যাণমন্ত্রী এজেডএম জাহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশ এখন জনমিতিক সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও আগামী কয়েক বছরে পরিস্থিতি পালটে যেতে পারে। এ কারণে সরকার পুরো জীবনচক্রভিত্তিক কর্মসূচির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। শিশু থেকে প্রবীণ-সব বয়সের মানুষের জন্য কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এর লক্ষ্য, তরুণ প্রজন্মকে সুস্বাস্থ্য ও দক্ষতার মাধ্যমে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত করা।

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি বলেন, ২০৫০ সালের মধ্যে দেশে প্রবীণদের সংখ্যা ৪ কোটিতে পৌঁছাবে। এত বিপুলসংখ্যক প্রবীণের জন্য আলাদা পরিকল্পনা ও বার্ধক্যকালীন স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তরুণদের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। তা না হলে জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগানো সম্ভব হবে না। তিনি জানান, সরকার ২০২৮ সালের মধ্যে ৫০ লাখ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে দেড় কোটি মানুষকে সর্বজনীন পেনশন কার্যক্রমের আওতায় আনার লক্ষ্য নিয়েছে। পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। সরকার শিক্ষায় অর্থ ব্যয় করছে এবং অবকাঠামো সম্প্রসারণ করছে। কিন্তু সেই বিনিয়োগের বিপরীতে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুবসমাজের শিক্ষার প্রতি অনীহা। কারণ, শিক্ষিত হয়েও চাকরি না পাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। অনানুষ্ঠানিক খাতে নতুন কর্মসংস্থানের অনেক সুযোগ তৈরি হচ্ছে। সেগুলো চিহ্নিত করে কীভাবে সম্প্রসারণ করা যায়, তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।