Image description

রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে সরিয়ে নেওয়া চামড়া শিল্পের জন্য ঢাকার সাভারের হেমায়েতপুরে গড়ে তোলা হয়েছিল পরিকল্পিত শিল্পনগরী। সেখানে ট্যানারির বর্জ্যের দূষণ থেকে ধলেশ্বরী নদীকে বাঁচাতে স্থাপন করা হয় কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার বা সিইটিপি। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, এই সিইটিপিই পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছে। পরিবেশের ক্ষতি করার কারণে ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর এই সিইটিপির বিরুদ্ধে পাঁচ কোটি ১১ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়। অন্যদিকে, মাত্রাতিরিক্ত দূষিত তরল বজ্য নির্গমনের দায়ে গত ৪ অক্টোবর রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালকে ২৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করে পরিবেশ অধিদপ্তর। শুধু এই দুই প্রতিষ্ঠানই নয়, পরিবেশের ক্ষতি করার কারণে ২০২৫-২৬ সালে পরিবেশ অধিদপ্তর দেশজুড়ে ২ হাজার ৬০০টির বেশি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করে। তবে মোটা অঙ্কের জরিমানা ধার্য করা হলেও তা আদায়ের চিত্র এতই করুণ যে, মনে হয় জরিমানা আদায়েই যেন মানা!

তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ সালে দেশজুড়ে ২ হাজার ৬০৯টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মোট ৫১ কোটি ৫৩ লাখ ২১ হাজার ৮৫৫ টাকা ক্ষতিপূরণ বা জরিমানা ধার্য করা হয়। বিপরীতে আদায় করা অর্থের পরিমাণ অর্ধেকের কম, ২১ কোটি ৬৯ লাখ ৬৩ হাজার ৮৭০ টাকা। অর্থাৎ মোট ধার্যকৃত অর্থের মাত্র ৪২ শতাংশ আদায় হয়েছে। বাকি ২৯ কোটি ৮৩ লাখ ৫৭ হাজার ৯৮৫ টাকা এখনো অনাদায়ী।

জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, ‘কোনো প্রতিষ্ঠান জরিমানা না দিলে সরকারি পাওনা আদায় আইন-১৯১৩-এর অধীনে সার্টিফিকেট মামলা করে জরিমানার টাকা আদায় করার সুযোগ আছে। মামলাগুলো দায়ের করতে হবে জেলা প্রশাসকের সার্টিফিকেট অফিসার বরাবর। তবে এই ধরনের মামলা সাধারণত দায়ের করা হয় না।’

জরিমানার অর্থ কীভাবে ধার্য করা হয় সেই বিষয়টি ব্যাখ্যা করে পরিবেশ অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, এটা আসলে অ্যাসেসমেন্ট করে নির্ধারণ করা হয়। যেমন কোনো একটা শিল্পপ্রতিষ্ঠান নদীতে দূষিত পানি ফেলছে—এমন অভিযোগ পেলে পরিবেশ অধিদপ্তর প্রথমে সেই কারখানায় গিয়ে সেখান থেকে পানি সংগ্রহ করে। এরপর সেই পানি ল্যাবে পরীক্ষা করে দেখা হয় সেখানে কী পরিমাণে দূষিত পানি রয়েছে। সেইসঙ্গে কারখানা কতদিন ধরে চলছে, দৈনিক কী পরিমাণ দূষিত পানি পরিবেশে যাচ্ছে; এতে পরিবেশের কী পরিমাণে ক্ষতি হচ্ছে—সব মিলিয়ে একটা জরিমানা ধার্য করা হয়।

পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযানের তথ্য বিশ্লেষণ এবং বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, পরিবেশ দূষণের দায়ে ২০২৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের ভালুকায় এনআরজি কম্পোজিট ইয়ার্ন ডাইং লিমিটেডের বিরুদ্ধে ৮৫ লাখ ৫৩ হাজার ৬০০ টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়, যার পুরো অর্থই অনাদায়ী। ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের গোদনাইলে আর কে গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের বিরুদ্ধে ৭৯ লাখ ৮৭ হাজার ২০০ টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়। এখানেও জরিমানার পুরোটাই অনাদায়ী। ২০২৬ সালের ২৪ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে চৈতি কম্পোজিট লিমিটেডের বিরুদ্ধে ৭৫ লাখ ৪ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হলেও পুরো অর্থই অনাদায়ী। ২০২৫ সালের ২৭ আগস্ট নরসিংদী সদরের দক্ষিণ কান্দাপাড়ায় মেসার্স হাজী আশরাফ হোসেন সরকারের বিরুদ্ধে ৭০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়, যার পুরো অর্থ অনাদায়ী। ২০২৫ সালের ২২ জানুয়ারি গাজীপুরের গাছায় স্মার্ট অ্যাগ্রো খাদ্যে স্বনির্ভর বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ৫১ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়। এর মধ্যে ১২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা আদায় হয়েছে, বাকি ৩৮ লাখ ২৫ হাজার টাকা অনাদায়ী। ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর ঢাকার আশকোনায় আশিয়ান ল্যান্ড ডেভেলপমেন্টস লিমিটেডের বিরুদ্ধে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়, যার মধ্যে ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা আদায় হয়েছে এবং বাকি ৩৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা অনাদায়ী।

নথিতে আপিলের তথ্যও রয়েছে। ২০২৬ সালের ৬ জানুয়ারি ময়মনসিংহের ভালুকায় এক্সপেরিয়েন্স টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের বিরুদ্ধে ৪৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়। এর মধ্যে ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকা আদায় হয়েছে, বাকি ৩৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা অনাদায়ী। ২০২৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জের বন্দরে জাহিন নিটওয়্যার্স লিমিটেডের বিরুদ্ধে ৪১ লাখ ৫৮ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়। এর মধ্যে ১০ লাখ ৩৯ হাজার ৫০০ টাকা আদায় হয়েছে, বাকি ৩১ লাখ ১৮ হাজার ৫০০ টাকা অনাদায়ী। নরসিংদী সদরের দক্ষিণ কান্দাপাড়ায় মেসার্স হাজী আশরাফ হোসেন সরকারের বিরুদ্ধে বালু উত্তোলন বন্ধ রাখার নির্দেশ অমান্য করায় ৭০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়, তবে কোনো টাকাই আদায় হয়নি। সিলিকন রিয়েল এস্টেটকে গত বছরের ২ জুন ৭৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হলেও তার পুরোটাই অনাদায়ী। মিড এশিয়া ফ্যাশনসকে গত বছরের ১৪ জানুয়ারি ২৪ লাখ ৪১ হাজার ৩৪০ টাকা জরিমানা করা হয়, যার মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি মাত্র ১ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে। গ্লোরি টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলসকে গত বছরের ৩ নভেম্বর ২১ লাখ ৬০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়, যার পুরোটাই অনাদায়ী। ব্লু সিল টেক্সটাইলকে গত বছরের ১৯ আগস্ট জরিমানা করা হয় ৩৩ লাখ ২৪ হাজার টাকা, যার মধ্যে অনাদায়ী ২৪ লাখ ৯৩ হাজার টাকা। এ ছাড়া গ্লোবাল আউটারওয়্যারকে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি জরিমানা করা হয় ৩৪ লাখ ৫ হাজার টাকা, যার মধ্যে ৩০ লাখ ৫৫ হাজার টাকা অনাদায়ী। এ ছাড়া আরও শত শত প্রতিষ্ঠানের কাছে কোটি কোটি জরিমানার অর্থ পাবে পরিবেশ অধিদপ্তর।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ কালবেলাকে বলেন, ‘জরিমানার পাশাপাশি তো অলটারনেটিভ শাস্তির নির্দেশ দিতে হবে। কেউ জরিমানা না দিলে তাদের জেল হবে। তাহলে পরিবেশ অধিদপ্তর শুধু ফাইন করবে কেন? সঙ্গে জরিমানা না দিলে কী হবে সেই নির্দেশনাও তো থাকতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, এই ফাইনে এখন আসলে কাজ হয় না। এ ছাড়া আপিলে গিয়ে অনেকক্ষেত্রে ফাইন টেকে না। সরাসরি জেল দিতে হবে। জেল না দিলে এই ফাইন দিয়ে কোনো কাজ হবে না।

ছাড়পত্র নেই, বর্জ্য দূষণেও ক্ষতিপূরণ: পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযান ও জরিমানার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি যে ধরনের লঙ্ঘনের উল্লেখ রয়েছে, তার একটি হলো পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকা। ২ হাজার ৬০৯টি মামলার মধ্যে ১ হাজার ৪৫৭টির কারণ উল্লেখ করা হয়েছে, যা মোট মামলার প্রায় ৫৬ শতাংশ। এতে ক্ষতিপূরণ ধার্য হয়েছে এক কোটি ১৫ লাখ ৮৬ হাজার ৫০০ টাকা। তবে মামলার সংখ্যা বেশি হলেই আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বেশি—এমন নয়। দূষণের ধরন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণের অঙ্ক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নির্ধারিত মানমাত্রার বাইরে দূষিত তরল বর্জ্য নির্গমনের ৩৮০টি মামলায় ধার্য হয়েছে দুই কোটি ৫১ লাখ ৫০ হাজার ৩৪১ টাকা। অর্থাৎ ছাড়পত্র না থাকার মামলার তুলনায় সংখ্যা কম হলেও এই শ্রেণিতে ধার্য করা জরিমানার অর্থের পরিমাণ বেশি। তালিকায় পুকুর ও জমি ভরাটের ঘটনাও রয়েছে। দুটি পুকুর ভরাটের মামলায় ক্ষতিপূরণ ধার্য হয়েছে এক কোটি ৪১ লাখ ১১ হাজার ৪০০ টাকা। আর একটি জমি ভরাটের মামলায় ধার্য হয়েছে ৭৫ লাখ টাকা। এসব হিসাব পরিবেশ অধিদপ্তরের নজরদারিতে বিভিন্ন ধরনের পরিবেশগত লঙ্ঘনের চিত্র তুলে ধরে। কিন্তু ক্ষতিপূরণ ধার্যের পর অর্থ আদায় করা যাচ্ছে না। ফলে যে লক্ষ্য নিয়ে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে তা বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না।

টেক্সটাইল ডাইংয়ে ধার্য ১৮ কোটি, অনাদায়ী ১০ কোটির বেশি: ক্ষতিপূরণের অঙ্কে সবচেয়ে বড় অংশ টেক্সটাইল ডাইং খাতের। ডাইং কারখানাগুলো একত্রে হিসাব করলে ২৮১টি মামলায় ক্ষতিপূরণ ধার্য হয়েছে ১৮ কোটি ৪২ লাখ ৫৭ হাজার ৩১৩ টাকা। তবে আদায় হয়েছে সাত কোটি ৯৪ লাখ ৫৮ হাজার ১৭১ টাকা। ফলে এই খাতেই অনাদায়ী রয়েছে ১০ কোটি ৪৭ লাখ ৯৯ হাজার ১৪২ টাকা। অর্থাৎ, পরিবেশ অধিদপ্তরের জরিমানার মোট অনাদায়ী প্রায় ৩০ কোটি টাকার এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি বকেয়া রয়েছে শুধু টেক্সটাইল ডাইং খাতে।

তথ্য অনুযায়ী, পরিবেশের ক্ষতি করায় ময়মনসিংহ জেলায় ১১৭টি মামলায় মোট ছয় কোটি চার লাখ ৩৫ হাজার ১৬২ টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়, তবে আদায় হয়েছে ৯৭ লাখ ৮৭ হাজার ১৪২ টাকা। আদায়ের হার প্রায় ১৬ শতাংশ। নারায়ণগঞ্জেও একই ধরনের চিত্র রয়েছে। গোদনাইলের আর কে গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের বিরুদ্ধে প্রায় ৮০ লাখ টাকা, সোনারগাঁয়ের চৈতি কম্পোজিট লিমিটেডের বিরুদ্ধে ৭৫ লাখ চার হাজার টাকা এবং বন্দরের জাহিন নিটওয়্যার্স লিমিটেডের বিরুদ্ধে ৪১ লাখ ৫৮ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হলেও অর্থ পুরোপুরি বা আংশিক অনাদায়ী রয়েছে। জেলার সামগ্রিক হিসাবেও বকেয়ার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য। নারায়ণগঞ্জে ১৬১টি মামলায় প্রায় পাঁচ কোটি ৪৭ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়েছে। আদায় হয়েছে প্রায় এক কোটি ৭৫ লাখ টাকা।

ইটভাটায় আদায়ের হার ২৩ শতাংশেরও কম: পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান ও ক্ষতিপূরণ ধার্যের নজিরও রয়েছে। ১২৯টি মামলায় ইটভাটার বিরুদ্ধে মোট চার কোটি ৯৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়েছে। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে প্রায় এক কোটি ১১ লাখ টাকা। আদায়ের হার ২৩ শতাংশেরও কম। পঞ্চগড়ের মেসার্স লাকী এন্টারপ্রাইজ ব্রিকস ও মেসার্স ডি ও বি ব্রিকসের বিরুদ্ধে পৃথক মামলায় প্রায় ১৫ থেকে ১৭ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হলেও কোনো প্রতিষ্ঠানই পুরো অর্থ পরিশোধ করেনি। ইটভাটার ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ আদায়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই শিল্পের অনেক প্রতিষ্ঠান মৌসুমভিত্তিক পরিচালিত হয়। শুষ্ক মৌসুমে উৎপাদন চললেও বর্ষায় অনেক ভাটা বন্ধ থাকে। ফলে কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ ধার্য করার পর সেটি আদায়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানটি পরবর্তী মৌসুমে একই স্থানে কার্যক্রম চালাচ্ছে কি না কিংবা মালিকানা ও ঠিকানার পরিবর্তন ঘটছে কি না—এসব তথ্যও বকেয়া আদায়ের বাস্তব চিত্র বুঝতে প্রাসঙ্গিক।

হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিক সেন্টার প্রায় এক হাজার: জরিমানা করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি রয়েছে ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতাল। ৫৪৪টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং ৪২৩টি হাসপাতালের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়েছে। দুটি খাত মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৯৬৭টি, যা সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৩৭ শতাংশ। কিন্তু ক্ষতিপূরণের অঙ্কে এই দুই খাতের অবস্থান টেক্সটাইল ডাইংয়ের তুলনায় অনেক নিচে। হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার মিলিয়ে মোট ক্ষতিপূরণ ধার্য হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৪৭ লাখ টাকা, যা ২০২৫-২৬ সালে মোট ধার্যকৃত জরিমানার ৭ শতাংশেরও কম।

এই খাতেও বড় অঙ্কের অনাদায়ী ক্ষতিপূরণের নজির রয়েছে। ঢাকা মহানগরের বসুন্ধরা রোডে অবস্থিত এভারকেয়ার হাসপাতালের বিরুদ্ধে ২৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হলেও আদায়ের ঘরে রয়েছে শূন্য টাকা। দোহারের ডি এন মেডিকেল সার্ভিসেসের বিরুদ্ধে আট লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য হয়েছে। রংপুরের প্রাইম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের বিরুদ্ধে ধার্য করা হয়েছে সাড়ে সাত লাখ টাকা। এর মধ্যে আদায় হয়েছে এক লাখ ২৫ হাজার টাকা; বাকি অর্থ অনাদায়ী।

এসব তথ্য নির্দেশ করে, ক্ষতিপূরণ ধার্যের পর অর্থ আদায়ের প্রশ্নটি শুধু একটি শিল্প খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার—বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই বকেয়া রয়েছে।

বালু উত্তোলনে ৭০ লাখ টাকা জরিমানা, আদায় শূন্য: নরসিংদী সদরের দক্ষিণ কান্দাপাড়ায় মেসার্স হাজী আশরাফ হোসেন সরকার নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বালু উত্তোলন সংক্রান্ত ঘটনায় ৭০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়েছে। তবে তথ্য অনুযায়ী, এই অর্থের কোনো অংশই আদায় হয়নি। প্রতিষ্ঠানটির ক্ষেত্রে বালু উত্তোলন বন্ধ রাখার আদেশ অমান্য করার বিষয়টি ক্ষতিপূরণ ধার্যের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু ৭০ লাখ টাকা বকেয়া থাকার পর তা আদায়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তার বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

জেলাভিত্তিক জরিমানার চিত্র: জেলাভিত্তিক হিসাবেও ক্ষতিপূরণ আদায়ের হারে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। গাজীপুরে ৩২৯টি মামলায় প্রায় ৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়েছে। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে প্রায় ছয় কোটি ২৭ লাখ টাকা। আদায়ের হার প্রায় ৬৩ শতাংশ। অন্যদিকে ঢাকা জেলার ২০৮টি মামলায় প্রায় ৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য হলেও আদায় হয়েছে প্রায় তিন কোটি টাকা—হার ৩০ শতাংশেরও কম। ঢাকা মহানগর এলাকায় মামলার সংখ্যা ৩৫৫টি; এখানে তুলনামূলক ছোট অঙ্কের মামলার সংখ্যাও বেশি। বগুড়ায় মাত্র ৩০টি মামলায় এক কোটি ৮৪ লাখ টাকার বেশি ক্ষতিপূরণ ধার্য হয়েছে। এর মধ্যে শেরপুর উপজেলার চালকল-সংক্রান্ত একটি বড় মামলা রয়েছে।

টাঙ্গাইলে ৯৩টি মামলায় প্রায় এক কোটি ৮ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য এবং প্রায় এক কোটি ৪৪ লাখ টাকা আদায়ের তথ্য দেওয়া পাওয়া গেছে। বিপরীতে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩১টি মামলায় ৫৬ লাখ ৮৫ হাজার টাকা ধার্য হলেও আদায় হয়েছে মাত্র এক লাখ ৩৫ হাজার টাকা। আদায়ের হার প্রায় আড়াই শতাংশ।

জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. লুৎফর রহমান কালবেলাকে বলেন, ‘জরিমানার বিষয়টি হলো কী—এটা আপিলে গিয়ে কমে যায় অনেক সময়। এখন সেটার দায় তো আর আমরা নিতে পারব না। জরিমানা ধার্য করলে প্রতিষ্ঠানগুলো ২৫ পার্সেন্ট জমা দিয়ে আপিল করতে পারে। আপিলে গেলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জরিমানা কমে যায়। অনেকে আবার উচ্চ আদালতে রিট করে বসে। তখন তো আর আমাদের করার কিছু থাকে না।’