Image description

চট্টগ্রামের নদীতীর ঘেঁষে আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং নগরবাসীকে জলাবদ্ধতা ও নদীর ভাঙন থেকে রক্ষা করার প্রত্যাশা নিয়ে শুরু হয়েছিল ‘কালুরঘাট-চাক্তাই সড়ক ও বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প’। কিন্তু দীর্ঘ আট বছরের দীর্ঘসূত্রতা, কয়েক দফায় ব্যয় বৃদ্ধি এবং নানা অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে মেগা এই প্রকল্পটি এখন প্রতিশ্রুতির বদলে চরম প্রশ্নবিদ্ধ এক অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে। ২০১৮ সালে কাজ শুরু হওয়া এই প্রকল্পে সরকারি হিসাবে ভৌত অগ্রগতি ৮৪ শতাংশের বেশি দেখানো হলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের পরও বিভিন্ন স্থানে অসমাপ্ত কাজ, ভাঙা ব্লক এবং নির্মাণসামগ্রীর স্তূপ পড়ে থাকার পাশাপাশি ভূমি অধিগ্রহণ—প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি পদক্ষেপ ঘিরে উঠেছে অনিয়ম ও দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ।

২ হাজার ৩১০ কোটি থেকে ২ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকা ব্যয় বৃদ্ধি ও দীর্ঘসূত্রতা: ২০১৭ সালের ২৫ এপ্রিল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ছিল ২ হাজার ৩১০ কোটি ২৪ লাখ ২০ হাজার টাকা। ২০২০ সালের জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে তা বাস্তবায়ন হয়নি। পরে দুই দফা সংশোধনে প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে করা হয় ২ হাজার ৭৭৯ কোটি ৩৯ লাখ ৪৭ হাজার টাকা। অর্থাৎ মূল বরাদ্দের তুলনায় বেড়েছে প্রায় ৪৬৯ কোটি ১৫ লাখ টাকা। প্রকল্প বাস্তবায়নের সর্বশেষ সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২৬ সালের জুন। সেই সময়ও পেরিয়ে গেছে। এখন ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে তড়িঘড়ি নির্মাণকাজ চালানো হচ্ছে।

সরকারি হিসাবে প্রকল্পটির ক্রমপুঞ্জিত ভৌত অগ্রগতি ৮৪ দশমিক ৮০ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৮৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ। তবে সরেজমিন চাক্তাই, কল্পলোক, বলিরহাট, বাস্তুহারা, খেতচর ও নোমান কলেজসংলগ্ন নদীতীর থেকে কালুরঘাট পর্যন্ত বিভিন্ন অংশে অসমাপ্ত কাজ দেখা গেছে। সরকারি অগ্রগতির হিসাবের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার এই ব্যবধানও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও নির্ধারিত অবকাঠামো পুরোপুরি দৃশ্যমান না হওয়ায় প্রকল্পের তদারকি, কাজের গুণগত মান এবং অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে নগরবাসীর মধ্যে।

প্রকল্পের আওতায় ২৪ দশমিক ৫০ মিটার প্রশস্ত ও ৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ শহর রক্ষাকারী বাঁধ কাম সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ১২টি রেগুলেটর, ১২টি পাম্পহাউস, ১২টি পানির পাম্প ও ১২টি জেনারেটর স্থাপনের কথা রয়েছে। নদীতীর সংরক্ষণে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে প্রায় ২ লাখ ১২ হাজার ৫০০ বর্গমিটার সিসি ব্লক। এসব অবকাঠামো নির্মাণের জন্য অধিগ্রহণের আওতায় নেওয়া হয়েছে ৬৯ দশমিক ৫০ হেক্টর জমি।

বরাদ্দ নতুন পাথরের জন্য, কাজে পুরোনো ভবনের ভাঙা পাথর: প্রকল্পে নতুন ও উন্নতমানের পাথর কেনার বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে সড়ক ও বাঁধ নির্মাণে ব্যবহার করা হচ্ছে পুরোনো ভবন ভেঙে পাওয়া পাথর, ইটের খোয়া, রাবিশ ও পলেস্তারা মিশ্রিত নির্মাণবর্জ্য। নগরের বিভিন্ন স্থানে ভবন ভাঙার পর সেখান থেকে এসব সামগ্রী সংগ্রহ করে প্রকল্প এলাকায় আনা হচ্ছে। পরে পুরোনো পাথর গুঁড়া করে নতুন পাথরের সঙ্গে মিশিয়ে নির্মাণকাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শ্রমিক বলেন, ‘এগুলো বিভিন্ন ভবন ভাঙার পাথর। এর সঙ্গে কিছু নতুন পাথরও আছে। আগে কল্পলোক এলাকায় এসব পাথর ভাঙা হতো। মানুষের নজরে আসার পর এখন বিভিন্ন জায়গা থেকে বড় বড় ভবন ভাঙার পাথর এনে গুঁড়া করে নতুন পাথরের সঙ্গে মিশিয়ে কাজ হচ্ছে।’

সরেজমিন প্রকল্পের বিভিন্ন অংশে পুরোনো পাথর, ভাঙা ইট ও নির্মাণবর্জ্য পড়ে থাকতে দেখা গেছে। বেড়িবাঁধের কোথাও কাজ শেষ হওয়ার আগেই মাটি সরে যাওয়া, ভাঙন ও ফাটল দেখা দিয়েছে। সড়কে কার্পেটিংয়ের আগের স্তরেও মিলেছে অনিয়মের চিত্র। বিভিন্ন স্থানের ভাঙা পাথরের নিচে দেওয়া হচ্ছে ইটের খোয়া ও রাবিশ। তারও নিচে রয়েছে পলিথিনযুক্ত মাটি ও বালু। অর্থাৎ নতুন উপকরণের বরাদ্দ থাকলেও মাঠপর্যায়ে ব্যবহার করা হচ্ছে পুরোনো ও পরিত্যক্ত নির্মাণসামগ্রী। এভাবে প্রকৃত উপকরণ সরবরাহ না করে সরকারি বরাদ্দের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। জনগণের টাকায় উন্নয়নের নামে চলছে নিম্নমানের কাজ ও সরকারি অর্থ লুটপাট।

নদীর ড্রেজিংয়ের বালুতে বাঁধ নির্মাণ: বাঁধের মাটি ভরাটেও চলছে ব্যাপক অনিয়ম। কেনা মাটি ব্যবহারের পরিবর্তে কর্ণফুলী নদীর ড্রেজিং ও খননকাজ থেকে তোলা বালু-কাদামাটি কম দামে সংগ্রহ করে ব্যবহার করা হচ্ছে। সরেজমিন বিভিন্ন স্থানে বালুর সঙ্গে কাদা ও পলিথিন মিশে থাকতে দেখা গেছে। কোথাও নিচের স্তরে পলিথিনযুক্ত মাটি রেখে তার ওপর লাল বালু দেওয়া হচ্ছে। এরপর ইটের স্তর এবং সবশেষে পাথর বসানো হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শ্রমিক বলেন, ‘এখানে কয়েক ফুট উঁচু করতে হচ্ছে। নিচের স্তরে পলিথিন ও কাদামাটি আছে। এর ওপর লাল বালু দেওয়া হচ্ছে। এরপর ইট, তারপর পাথর।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, কেনা মাটি দিয়ে ভরাটের কথা থাকলেও নদী ড্রেজিংয়ের মাটি ব্যবহার করে বাঁধ তৈরি করা হয়েছে। ইটের খোয়ার পরিবর্তে দেওয়া হচ্ছে রাবিশ। এ ছাড়া অখ্যাত কোম্পানির সিমেন্ট, মরিচা ধরা রড এবং সিলেটি বালু ও পাথরের পরিবর্তে স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছে। অর্থাৎ প্রকল্পের বরাদ্দ ও পরিকল্পনায় যে মানের উপকরণ ব্যবহারের কথা, বাস্তবে তার পরিবর্তে কম দামের সামগ্রী দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। উপকরণ কেনার বরাদ্দ এবং বাস্তবে ব্যবহৃত সামগ্রীর মধ্যে এমন ফারাক রেখে সরকারি অর্থের অপচয় ও লুটপাটের অভিযোগ আরও স্পষ্ট হয়েছে।

নালার রডেও নয়ছয়: নালা নির্মাণে রড ব্যবহারের ক্ষেত্রেও মান বজায় রাখা হচ্ছে না। সরেজমিন বাস্তুহারা, বলিরহাট ও কল্পলোক এলাকায় বিভিন্ন পুরুত্বের রড ব্যবহারের চিত্র দেখা গেছে। কোথাও ২০, কোথাও ১২ ও ১৪ সুতার রড ব্যবহার করা হচ্ছে। কোনো কোনো স্থানে এর চেয়েও চিকন রড চোখে পড়েছে। বিশেষ করে বাস্তুহারা এলাকায় নালা নির্মাণে বেশ চিকন রড ব্যবহার করতে দেখা গেছে।

বলিরহাট ও কল্পলোক এলাকায়ও একই ধরনের কাঠামো নির্মাণে রডের পুরুত্বে পার্থক্য রয়েছে। অর্থাৎ একই প্রকল্পের কাজে সর্বত্র একই মান বজায় রাখা হচ্ছে না। এভাবে উপকরণের মান কমিয়ে কাজ শেষ দেখিয়ে বিল উত্তোলন করা হলে তা সরকারি অর্থ আত্মসাতেরই পথ তৈরি করে বলে মত সংশ্লিষ্টদের।

নতুন ব্রিজ চত্বরে নকশা বদলে আঁকাবাঁকা সড়ক: প্রকল্পের নির্ধারিত গতিপথের একটি অংশে বিএনপির চট্টগ্রাম-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আসলাম চৌধুরীর ব্রিকস ফিল্ডের জমি রয়েছে। ওই জমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ নিয়ে জটিলতা দেখা দিলে সড়কের গতিপথ পরিবর্তন করা হয় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। সরেজমিন নতুন ব্রিজ চত্বরে দেখা গেছে, অনুমোদিত পরিকল্পনা অনুযায়ী কর্ণফুলী নদীর পাশ দিয়ে সড়ক নির্মাণ না করে কলেজের পাশ ঘুরিয়ে আঁকাবাঁকা পথে নতুন ব্রিজ চত্বরে সড়ক নির্মাণ হয়েছে। নির্ধারিত সরল পথের পরিবর্তে এভাবে ঘুরিয়ে সড়ক নির্মাণে মূল নকশার সঙ্গে বাস্তব কাজের বড় ধরনের অমিল তৈরি হয়েছে।

নোমান কলেজের পেছনে পুকুরের জমিতে আটকে কাজ: বাকলিয়া শহীদ এনএমএমজে নোমান কলেজের পেছনে একটি পুকুরের জমি অধিগ্রহণ নিয়ে জটিলতায় আটকে আছে প্রকল্পের কাজ। ওই অংশে পুকুরের জমি ভরাট করে সড়ক ও বাঁধের নির্মাণকাজ চালানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু জমি অধিগ্রহণ এবং পরিবেশগত অনুমতির জটিলতায় কাজ এগোয়নি। পুকুরের অংশে নকশা পরিবর্তন করে নির্মাণকাজ চালানোর চেষ্টাও করা হয়েছে বলে জানা গেছে। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত ওই অংশের কাজ থমকে রয়েছে।

একই এলাকায় ক্ষতিপূরণে লাখ টাকার ব্যবধান: জমি ও স্থাপনার ক্ষতিপূরণ নির্ধারণে বড় ধরনের বৈষম্যের অভিযোগ করেছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। তাদের দাবি, একই এলাকার কাছাকাছি স্থাপনার ক্ষেত্রে কোথাও ১২ থেকে ১৪ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে, আবার দরিদ্র ক্ষতিগ্রস্তদের দুই থেকে তিন লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। কোনো কোনো মালিকের ক্ষতিপূরণের টাকা এখনো আটকে রয়েছে। এ ছাড়া অনুমোদিত ক্ষতিপূরণের ১০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ দাবি কিংবা টাকা দিতে চাপ সৃষ্টি করার অভিযোগও করেছেন তারা। কিছু ক্ষেত্রে লিখিত রসিদ বা যথাযথ কাগজপত্র ছাড়াও অর্থ লেনদেনের চেষ্টা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বাস্তুহারা এলাকার বাসিন্দা বাবু বলেন, ‘আমাদের প্রথমে সমিতির মাধ্যমে ডাকছে। তখন বলা হয়েছিল, তিন লাখ টাকা দেওয়া হবে। অথচ একই ঘরের সামনে সমিতির লোকজন মিলে কাজ করে ১২ লাখ টাকা পেয়েছে। আমরা গরিব বলে আমাদের সঙ্গে বৈষম্য করা হচ্ছে। এখনো ক্ষতিপূরণ পাইনি, তাই জায়গাও ছাড়িনি।’

ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, সরকারি ক্ষতিপূরণের অর্থ প্রকৃত মালিকদের হাতে পৌঁছানোর পরিবর্তে কোথাও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে লেনদেনের চেষ্টা হয়েছে, আবার কোথাও পাওনা আটকে রেখে জমি ছাড়তে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে।

এ ছাড়া সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত জমি স্ট্যাম্প বা সমিতির কাগজ ব্যবহার করে ব্যক্তিমালিকানা দেখিয়ে ক্ষতিপূরণ হাতিয়ে নেওয়ার এবং একই নথির ভিত্তিতে অতিরিক্ত জমি বা স্থাপনার হিসাব দেখানোর মতো জালিয়াতির অভিযোগও পাওয়া গেছে।

কালভার্ট বাদ, বদলে গেছে পানি নিষ্কাশনের পথ: প্রকল্পের অনুমোদিত নকশায় থাকা বেশ কিছু কালভার্ট বাদ দিয়ে সেখানে সরাসরি ড্রেনেজ পাইপ বসানো হয়েছে কিংবা পানি প্রবাহের পথ পরিবর্তন করা হয়েছে। বাস্তুহারা, খেতচর ও নোমান কলেজসংলগ্ন এলাকায় এই পরিবর্তনের ফলে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, চলতি বর্ষায় এই অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ চরম পানিবন্দি হয়ে পড়েছিল, যা পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে নিষ্কাশন করতে হয়। নদীতীর রক্ষা ও জলাবদ্ধতা কমানোর প্রকল্পের উল্টো এই রূপ নগরবাসীর জন্য ভোগান্তির বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কবরস্থানের পবিত্রতা লঙ্ঘন এবং জমির বিরোধে কল্পলোকে বন্ধ কাজ: মসজিদ গলির একটি পুরোনো কবরস্থান প্রকল্পের সড়কের মধ্যে পড়ায় ২০২৫ সালে সেখান থেকে মরদেহ অন্যত্র সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এ সময় কোনো আলেম বা ধর্মীয় প্রতিনিধি উপস্থিত না রেখে ধর্মীয় বিধিমালা লঙ্ঘন করা হয়েছে, যা স্থানীয়দের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনেছে। এলাকাবাসীর বাধার মুখে কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর কল্পলোকের সাইট অফিসে ধর্মীয় বিধি মেনে কবরস্থান সংরক্ষণ ও সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের সিদ্ধান্ত হলেও দীর্ঘ সময়েও তা বাস্তবায়িত হয়নি। অন্যদিকে, কল্পলোক আবাসিক এলাকার পাশের নদীতীরে সিসি ব্লক বসানোর পর এক ব্যবসায়ী জমির মালিকানা দাবি করায় ভূমি বিরোধের কারণে নালা নির্মাণ ও সিসি ব্লক বসানোর কাজ বর্তমানে সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।

ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশে অনিয়মের অভিযোগ প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে: নকশা পরিবর্তন, নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার এবং ঠিকাদারি বিল ও ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের নেপথ্যে প্রকল্প পরিচালক ও সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী রাজীবের বিরুদ্ধে যোগসাজশের গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান স্পেক্ট্রা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডের মালিক দিদার (যিনি আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং বর্তমানে পলাতক), ইনচার্জ অসীম বাবু এবং তাদের সহযোগীদের মাধ্যমে ল্যাব টেস্ট ও উপকরণের মান যাচাই পুরোপুরি এড়িয়ে গিয়ে নামমাত্র কাজের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবাদ করলে স্থানীয়দের মিথ্যা মামলা বা চাঁদাবাজির ভয় দেখানো হয়।

এ বিষয়ে কথা বলতে প্রকল্প পরিচালক রাজীবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঢাকায় মন্ত্রণালয়ের কাজে ব্যস্ত থাকার কথা জানিয়ে ফোন কেটে দেন। পরে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও তার সাড়া মেলেনি।

আগের অনিয়মের কথা স্বীকার সিডিএ চেয়ারম্যানের: সিডিএর বর্তমান চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন দায়িত্ব নেওয়ার পর নগরের উন্নয়নকাজে শৃঙ্খলা ফেরাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছেন। অবৈধ পার্কিং ও ভবনসংক্রান্ত অনিয়মে অভিযান চালিয়ে জরিমানাও করেছেন। চাক্তাই-কালুরঘাট প্রকল্পের কাজের মান ও অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিগত ১০ থেকে ১২ বছর, এমনকি সাড়ে ১৩ থেকে ১৫ বছর ধরে বিভিন্ন উন্নয়নকাজে অনিয়ম যেন নিয়মে পরিণত হয়েছিল। বাইরে থেকে উন্নয়ন দৃশ্যমান হলেও ভেতরের কাজে নানা ঘাটতি ছিল। অনেক কাজ হয়েছে দায়সারাভাবে।

তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে রাস্তার ওপরের অংশ সুন্দরভাবে নির্মাণ করা হলেও নিচের সাব-বেস, কার্পেটিং ও সিলকোটের কাজ যথাযথভাবে হয়নি। ফলে নির্মাণকাজের প্রকৃত মান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বর্তমান সরকারের সময়ে শুরু হওয়া উন্নয়নকাজে গুণগত মান নিশ্চিত করতে নকশা, দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, পুরুত্ব ও উপকরণের অনুপাত নির্ধারণ করে দেওয়া হচ্ছে। এসব তথ্য সংশ্লিষ্ট সমিতি, নাগরিক ও সাইনবোর্ডের মাধ্যমে প্রকাশ করা হচ্ছে, যাতে কাজের মান নিয়ে জবাবদিহি থাকে।

তিনি জানান, আউটার রিং রোড-১ ও আউটার রিং রোড-২সহ বিভিন্ন সড়কের কাজ তিনি নিয়মিত পরিদর্শন করেন। নির্মাণের মান যাচাইয়ে প্রতিদিন একাধিকবার সরেজমিন যান। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নগরের বিভিন্ন এলাকা নান্দনিক রূপ পাবে বলে আশা করেন তিনি।

নদীতীর রক্ষার প্রকল্পেই দখলের আশঙ্কা: বাস্তুহারা ও খেতচর এলাকায় কোথাও বসতির ভেতর দিয়ে সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। এতে এক পাশে বসতি, মাঝখানে সড়ক এবং নদীর দিকে সিসি ব্লকের কাঠামো রয়েছে। এ বিন্যাস ভবিষ্যতে নদীতীর দখলের সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবেশ ও নদী গবেষক মুজিবুল্লাহ তুষার।

সন্ধ্যা নামলেই ছিনতাইয়ের আতঙ্ক: পর্যটন সম্ভাবনাময় এই এলাকায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, সড়কবাতি ও চলাচলের উপযুক্ত ব্যবস্থা নেই। সন্ধ্যার পর জনশূন্য হয়ে পড়ে সড়কটি। স্থানীয়দের অভিযোগ, চট্টগ্রামের ‘মেরিন ড্রাইভ’ হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকলেও এটি এখন অপরিকল্পিত ব্যয় ও অব্যবস্থাপনার দৃষ্টান্ত। সম্প্রতি এভারেস্টজয়ী বাবর আলীও ওই এলাকায় ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে হয়রানির শিকার হন বলে জানা গেছে।