পাহাড়ে শান্তি নেই। চলছে অস্ত্রের দাপট। অত্যাধুনিক সব অস্ত্র নিয়ে নিয়ন্ত্রণ নিতে শক্তির মহড়া দিচ্ছেন পাহাড়ি সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। চাঁদাবাজি, অপহরণ আর সংঘর্ষে অস্থির তিন পার্বত্য জেলা। রাঙামাটির সাজেকে জেএসএস নতুন করে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ শুরু করায় ফুঁসে উঠেছে তিন পার্বত্য জেলার সশস্ত্র সংগঠনগুলো। ১৯৯৭ সালে সরকারের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) শান্তিচুক্তি হলেও অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ হয়নি। বরং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। এতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন। যুগান্তরের দীর্ঘ তথ্যানুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।
জানতে চাইলে পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, জেএসএস নতুন করে সাজেকে উত্তেজনা ছড়িয়েছে বলে তথ্য আসছে। সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজির এই আধিপত্য দমনে সেখানে সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কাজ করছেন। আমরা সেখানে শান্তির পরিবেশ বজায় রাখার চেষ্টা করছি।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই চাঁদাবাজি বন্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান তিনি।
সরেজমিন অনুসন্ধানে নেমে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। জেএসএস (সন্তু), ইউপিডিএফ (প্রসীত) এবং কেএনএফ-এর বিরুদ্ধে বছরে হাজার কোটি টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। চাকমা সার্কেল চিফ ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়সহ কয়েকজন নেতার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির লক্ষ্য ছিল পাহাড়ে দীর্ঘদিনের সংঘাতের অবসান, স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা এবং পার্বত্য এলাকার মানুষের অধিকার ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা। চুক্তিতে ৭২টি ধারা রয়েছে। এর মধ্যে ৬৫টি পূর্ণ বাস্তবায়িত, ৩টি আংশিক এবং ৪টির বাস্তবায়ন কার্যক্রম চলমান। ২০২২ সালে বিভিন্ন গোয়েন্দা প্রতিবেদনেও চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরা হয়।
চুক্তির আংশিক বাস্তবায়িত তিনটি ধারার মধ্যে রয়েছে জেলা পরিষদের মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি এবং অস্থায়ী সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার। জেলা পরিষদ সরকার থেকে পাওয়া অর্থে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। জাতীয় পর্যায়ের উন্নয়ন কার্যক্রমও ৩৩টি হস্তান্তরিত বিষয়ের মাধ্যমে পরিষদের আওতায় চলছে। এ কারণে খণ্ড ‘খ’-এর ১৯ নম্বর ধারাকে আংশিক বাস্তবায়িত হিসাবে দেখানো হয়েছে। ঘ-৪ ধারায় পার্বত্য অঞ্চলের ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ভূমি কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছে। কমিশন গঠিত হলেও ভূমি জরিপ শেষ করা যায়নি। ফলে প্রকৃত জমির মালিক শনাক্ত করা এবং বিরোধ নিষ্পত্তির কাজ এগোচ্ছে না। তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৮৬ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রথম ভূমি জরিপ শুরু হয়। ওই সময় রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার বেতবুনিয়া থেকে দুই কর্মচারীকে অপহরণের অভিযোগ ওঠে। এতে জরিপ বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৯২ সালে আবার জরিপ শুরু হলে জনৈক কানুলালসহ তিন সরকারি কর্মচারী অপহৃত হন। এরপর দ্বিতীয় দফায়ও জরিপ স্থগিত হয়। ২০১৭ সালের ১১ ডিসেম্বর ভূমি জরিপ শুরুর উদ্যোগ নেন সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি খালেমুল ইসলাম। কিন্তু জেএসএস সভাপতি সন্তু লারমাসহ কয়েকজন পাহাড়ি নেতার তীব্র বিরোধিতার মুখে তিনি উদ্যোগ থেকে সরে আসেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভূমি কমিশনে প্রথম দফায় যেসব আবেদন জমা পড়েছিল, পরে আবেদন সংশোধনের সুযোগ পেয়ে অনেক আবেদনকারী জমির পরিমাণ বাড়িয়ে নতুন আবেদন করেন। এতে প্রকৃত মালিক ও জমির পরিমাণ নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়ে। প্রথম দফার আবেদন অনুযায়ী কাজ শুরু করা গেলে বিরোধ নিষ্পত্তির পথ তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে বলে অনেকেই মনে করেন।
অস্ত্র জমা না দেওয়ায় বিপত্তি : চুক্তির ঘ-১৭ ধারায় জেএসএস সদস্যদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার পর অস্থায়ী সেনা, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ক্যাম্প পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহারের কথা রয়েছে। পাশাপাশি পরিত্যক্ত ক্যাম্প ও সেনানিবাসের জমি প্রকৃত মালিক বা পার্বত্য জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তরের বিধান রয়েছে। এ ধারাবাহিকতায় জেএসএস-এর একাংশ স্বাভাবিক জীবনে ফিরলেও সংগঠনটির সশস্ত্র তৎপরতা বন্ধ হয়নি। কিছু পুরোনো অস্ত্র জমা দেওয়া হলেও তাদের কাছে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র রয়ে গেছে। পাশাপাশি ইউপিডিএফ (প্রসীত), কেএনএফসহ অন্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এসব কারণে ধারাটির পূর্ণ বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না বলে জানা যায়।
হাজার কোটি টাকার চাঁদাবাজি : তথ্য তালাশে পার্বত্য অঞ্চলের ৪১টি খাত থেকে তিনটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর বছরে প্রায় হাজার কোটি টাকা চাঁদা তোলার হিসাব সামনে এসেছে। এর মধ্যে জেএসএস (সন্তু) চাঁদা তুলে অন্তত ৩০০ কোটি টাকা। ইউপিডিএফ (প্রসীত) ২৮০ কোটি এবং কেএনএফ শতকোটি টাকা আদায় করে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রকৃত চাঁদাবাজির পরিমাণ বছরে ১ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। কারণ, পাহাড়ি একজন কলা ব্যবসায়ীর কাছ থেকেও চাঁদা নেয় এই সশস্ত্র গোষ্ঠী।
একাধিক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে গত এক বছরের সংঘাত ও অপরাধের একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, জেএসএস ও ইউপিডিএফ-এর মধ্যে ৯৬টি বন্দুকযুদ্ধ হয়েছে। এসব সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন ৫২ জন। একই সময়ে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ১০৩ জনকে অপহরণ এবং ১৮৩টি চাঁদাবাজির ঘটনার অভিযোগ আনা হয়েছে।
ইউপিডিএফ-এর বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য করার অভিযোগও রয়েছে। গত এক বছরে ৩২টি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীকে ইউনিফর্ম পরা অবস্থায় সংগঠনটির বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়েছে। ২১টি র্যালি ও বিক্ষোভে নারী ও শিশুদের মানব ঢাল হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
চার ধারার বাস্তবায়ন ঝুলে আছে : চুক্তির খণ্ড ‘খ’-এর ২৪ নম্বর ধারায় পার্বত্য জেলা পুলিশের সাব-ইনস্পেকটর ও তার নিচের পদে নিয়োগের দায়িত্ব জেলা পরিষদের হাতে দেওয়ার কথা রয়েছে। এসব নিয়োগে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিধানও রয়েছে। কিন্তু সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতার কারণে স্থানীয় পুলিশ বাহিনীর ওপর তাদের প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে ধারাটির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া চলমান। তবে জেলা পরিষদগুলোর তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ৭০ শতাংশ পাহাড়ি জনগোষ্ঠী থেকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ২৬ নম্বর ধারায় পার্বত্য এলাকায় বন্দোবস্তযোগ্য খাসজমি ও অন্যান্য জমি পরিষদের অনুমতি ছাড়া কেনাবেচা বা হস্তান্তর না করার বিধান রয়েছে। কাপ্তাই হ্রদের বিশেষ এলাকা ‘ফ্রিঞ্জল্যান্ড’ প্রকৃত মালিকদের কাছে ফেরত দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু জমির মালিক শনাক্ত এবং জমির পরিমাণ নির্ধারণে সরকারি ভূমি জরিপ প্রয়োজন। জরিপ শেষ না হওয়ায় এ ধারার বাস্তবায়নও আটকে আছে বলে জানা যায়।
ঘ-২ ধারায় পাহাড়ি শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের যাচাই-বাছাই করে পুনর্বাসনের কথা রয়েছে। এজন্য সরকার ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের পাশাপাশি একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে। নথির বক্তব্য, পাহাড়ি ও ক্ষতিগ্রস্ত বাঙালি-উভয় জনগোষ্ঠীকে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু হিসাবে শনাক্ত করে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা থাকলেও এ নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে।
এদিকে ২০২৩ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর টাস্কফোর্সের ১১তম সভায় চাকমা সার্কেল চিফ ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় শুধু পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে শরণার্থী এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু হিসাবে গণ্য করার পক্ষে বক্তব্য দেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। বাঙালিদের এ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না বলেও তিনি মত দেন। অন্যদিকে সরকারের মনোনীত সদস্যরা পাহাড়ি ও ক্ষতিগ্রস্ত বাঙালিসহ উভয় জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে ছিলেন। এ মতবিরোধে টাস্কফোর্সের কাজ ব্যাহত হয়েছে বলে জানিয়েছেন অনেকে।
ঘ-৩ ধারায় ভূমিহীন অথবা দুই একরের কম জমির মালিক পাহাড়ি পরিবারকে স্থানীয়ভাবে জমির প্রাপ্যতা সাপেক্ষে দুই একর পর্যন্ত জমি বন্দোবস্ত দেওয়ার কথা রয়েছে। এ ক্ষেত্রেও প্রকৃত ভূমিহীন পরিবার শনাক্ত করতে ভূমি জরিপ প্রয়োজন। জরিপ শেষ না হওয়ায় ধারাটির বাস্তবায়ন কার্যক্রম চলছে।
দেবাশীষ রায় ও ইয়েনকে ঘিরে অভিযোগ : নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জানান, শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে বাধার পেছনে চাকমা সার্কেল চিফ ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়, তার দ্বিতীয় স্ত্রী ইয়েন ইয়েন এবং কয়েকজন বুদ্ধিদাতা ও স্বার্থান্বেষী মহলের ভূমিকা রয়েছে। তারা দাবি করেন-চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে সার্কেল চিফদের প্রভাবপ্রতিপত্তি কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে দেশি-বিদেশি এনজিওর অর্থায়ন ও বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ কমার আশঙ্কাও রয়েছে বলে মনে করেন তারা। উদাহরণ হিসাবে ইয়েন ইয়েনের বিদেশ সফরের তথ্য তুলে ধরেন তারা। ২০২৪ সাল থেকে তিনি ৯ বারের বেশি বিদেশে গেছেন।
অস্ত্র ও চোরাচালানের অভিযোগ : পাহাড়ের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির পাশাপাশি অস্ত্র, মাদক, গরু, প্রসাধনী, বার্মিজ সিগারেট ও অ্যালকোহল চোরাচালানে জড়িত থাকার অভিযোগ করা হয়েছে। ইউপিডিএফ (প্রসীত) কেএনএফকে অস্ত্র কেনার জন্য ১ কোটি টাকা দিয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে অর্থের উৎস ও লেনদেনের বিস্তারিত প্রমাণ নথিতে দেওয়া হয়নি।
পার্বত্য চট্টগ্রামে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের ক্ষেত্র তৈরির উদ্দেশ্যে শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি স্বার্থান্বেষী মহলের সমর্থন রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন অনেকেই।