Image description

ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে বাবা মারা গেছেন বছর তিনেক আগে। এরপর দুই ভাইবোনকে নিয়ে সংসারের হাল ধরেছিলেন মা সালমা আক্তার। বড় মেয়ে মাইশা মুশফিরাত ছিলেন তার একমাত্র ভরসা। উচ্চশিক্ষা শেষ করে পরিবারকে এগিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু সেই স্বপ্নপূরণের আগেই সড়কে ঝরে গেল ২১ বছরের প্রাণ।

মিরসরাইয়ের খৈয়াছড়া ইউনিয়নের বটতকিয়া এলাকায় মাইশাদের বাড়িতে এখন শুধুই শোক। যে মেয়েকে ঘিরে স্বামী হারানোর কষ্ট ভুলে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছিলেন সালমা আক্তার, সেই মেয়েকেও হারাতে হলো তাকে।

নিহত মাইশা মুশফিরাত চট্টগ্রামের আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (আইআইইউসি) ইংরেজি বিভাগের দ্বিতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী ছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর মা ও ছোট ভাইকে নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন ছিল। প্রত্যাশা ছিল পড়াশোনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার।

গতকাল মঙ্গলবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন মাইশা। প্রতিদিনের মতো সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন বাসের অপেক্ষায়। ক্লাস শেষে মায়ের কাছে ফেরা, ছোট ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলা-সবই ছিল তার স্বাভাবিক দিনের পরিকল্পনা। কিন্তু উল্টে যাওয়া একটি বাসের নিচে চাপা পড়ে শেষ হয়ে যায় সেই পথচলা।

সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সীতাকুণ্ডের কুমিরা এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের বিপরীতে ডালাস পেট্রোল পাম্পসংলগ্ন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, সকালে কয়েকজন শিক্ষার্থী সড়কের পাশে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। এ সময় যাত্রী ওঠানোর জন্য ধীরগতিতে চলা চট্টগ্রামমুখী ৮ নম্বর রুটের একটি লোকাল বাসকে পেছন থেকে সজোরে ধাক্কা দেয় একটি ভারী লরি। ধাক্কায় বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের ওপর পড়ে।

বাসের নিচে চাপা পড়ে মাইশাসহ কয়েকজন গুরুতর আহত হন। স্থানীয় লোকজন ও সহপাঠীরা দ্রুত এগিয়ে এসে বাসের নিচ থেকে আহতদের উদ্ধার করেন। তাদের নিয়ে যাওয়া হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে বেলা ১১টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক মাইশাকে মৃত ঘোষণা করেন।

একই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী রাজিয়া আহত হয়ে চিকিৎসাধীন। বহিরাগত আরো এক শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী পরিচালক মোস্তাক খন্দকার বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীসহ তিনজন সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। এ সময় একটি লরি এসে বাসটিকে ধাক্কা দিলে সেটি উল্টে শিক্ষার্থীদের ওপর পড়ে। এতে গুরুতর আহত মাইশা হাসপাতালে মারা যায়।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির এসআই নুরুল আলম আশেক জানান, দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত মাইশাকে বেলা ১১টার দিকে হাসপাতালে আনা হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

মাইশার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও পরিচিতজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মঙ্গলবারের ক্লাস স্থগিত ঘোষণা করে। উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী আজাদী ও উপউপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ হাসমত আলী হাসপাতালে ছুটে যান।

এ দুর্ঘটনা শুধু একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর প্রাণ কেড়ে নেয়নি, কেড়ে নিয়েছে অভিভাবকহারা একটি পরিবারের শেষ ভরসাও। যে মাইশা মুশফিরাত পড়াশোনা শেষ করে মায়ের পাশে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন, ছোট ভাইয়ের ভবিষ্যতের দায়িত্ব নিতে চেয়েছিলেন; সেই মেয়ের লাশ নিয়েই বাড়ি ফিরতে হয়েছে স্বজনদের।