স্বাধীনতার পর জনগণের সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের সংবিধানের। ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদে গৃহীত স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান কার্যকর হয় একই বছরের ১৬ ডিসেম্বর। দেখতে দেখতে পেরিয়েছে ৫৪ বছর। এই সময়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইনটি ১৭ বার সংশোধন করা হয়েছে। সরকারব্যবস্থা, নির্বাচন, বিচার বিভাগ, রাষ্ট্রীয় মূলনীতি থেকে শুরু করে নাগরিক অধিকারের নানা বিষয়ে এসেছে পরিবর্তন। কোনো সংশোধনীতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে, আবার কোনোটি নিয়ে তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক। কয়েকটি সংশোধনীর গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাতিল হয়েছে আদালতের রায়ে। এরপরও সংবিধান নিয়ে বিতর্ক থামেনি। বরং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কার, জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের মধ্য দিয়ে সংবিধান আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
আজ ৪ নভেম্বর জাতীয় সংবিধান দিবস। এবারের দিবসটি এমন একসময়ে পালিত হচ্ছে, যখন সংবিধানের নতুন কাঠামো নির্ধারণে চলছে রাজনৈতিক ও আইনি আলোচনা। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলেও সংস্কার বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে সরকার ও বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। সংসদের সংবিধান সংশোধনবিষয়ক বিশেষ কমিটি ১৮তম সংশোধনীর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ নিয়ে নতুন করে তৈরি হয়েছে বিতর্ক।
আইনজ্ঞদের মতে, সংবিধান সংশোধন বা সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করা। সংবিধান যেন কোনো ব্যক্তি, দল বা সরকারের স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার না হয়ে মানুষের কল্যাণের দলিল হয়ে ওঠে। সংবিধান যথাযথ অনুসরণ করলে স্বৈরাচার হওয়ার সুযোগ নেই।
১৯৭২ সালের সংবিধানে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। কিন্তু ১৯৭৫ সালের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় সরকারব্যবস্থার পরিবর্তে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা চালু হয়। পরবর্তী সময়ে পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনীর মাধ্যমে সামরিক শাসনামলের কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ১৯৯১ সালে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯৬ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে চালু হয় নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা। ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তা বিলুপ্ত করা হয়। ষোড়শ সংশোধনীতে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে দেওয়া হলেও আদালতের রায়ে তা বাতিল হয়। সর্বশেষ ২০১৮ সালে সপ্তদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদে নারীদের সংরক্ষিত আসনের মেয়াদ বাড়ানো হয়।
সংবিধানের এসব পরিবর্তনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি করেছে রাষ্ট্রক্ষমতার ভারসাম্য, নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা। ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট পঞ্চদশ সংশোধনীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান বাতিল করেন। ২০২৬ সালের ৯ জুলাই আপিল বিভাগও সেই রায় বহাল রাখেন। এর ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও গণভোটের বিধান পুনর্বহালের সাংবিধানিক পথ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে সংবিধানের ৭ক ও ৭খ অনুচ্ছেদ বাতিল হওয়ায় সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা ও সীমা নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।
গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে গঠিত সংবিধান সংস্কার কমিশন রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্য, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সীমিত করা, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর স্বাক্ষরিত হয় জুলাই জাতীয় সনদ। ২০২৬ সালের গণভোটে সনদ বাস্তবায়নের প্রস্তাব অনুমোদিত হলেও তা কীভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সংবিধান ভালো হলেই হবে না, এর যথাযথ চর্চাও করতে হবে। সংবিধানের চর্চা না হলে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। আমরা চাই, সংবিধান একটি জীবন্ত ও কার্যকর দলিল হিসেবে মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করুক।
তিনি বলেন, সংসদ যেহেতু সংবিধান সংশোধনের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান, তাই সংসদে ক্রিয়াশীল সব পক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগে একটি যুগোপযোগী সংবিধান প্রণয়ন করা প্রয়োজন। পরিবর্তিত বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা ও আকাক্সক্ষা যেন সংবিধানে প্রতিফলিত হয় এবং এই সংবিধান যেন মানুষের অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে পারে, সেটিই আমাদের চাওয়া।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমাদের সমস্যা সংবিধানে নয়, সমস্যা হলো আমরা সংবিধান মানি না। তিনি বলেন, সময়ের প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধন হতে পারে। তবে সংস্কারের নামে সংবিধান পরিবর্তনই যেন প্রধান উদ্দেশ্য না হয়।