পোশাকশ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবি দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি এ আন্দোলন কেন্দ্র করে দেশে অস্থিতিশীলতা ঠেকাতেও হার্ডলাইনে আছে প্রশাসন। ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন জায়গায় নৈরাজ্যকর পরিবেশ সৃষ্টির অপচেষ্টা রুখে দিতে কঠোর অবস্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে সরাসরি এর তদারকি করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, অতিরিক্ত পুলিশ ফোর্সের পাশাপাশি মোতায়েন করা হয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। সেই সঙ্গে আন্দোলন ঘিরে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড, অর্থায়ন, নাশকতা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে শিল্প খাতে অস্থিতিশীলতা তৈরির নেপথ্যে থাকা হোতাদের চিহ্নিত করেছেন গোয়েন্দারা। সূত্রমতে, যেকোনো সময় গ্রেপ্তার হতে পারেন নজরদারিতে থাকা কয়েকজন গার্মেন্ট মালিক ও শ্রমিকনেতা।
এ বিষয়ে গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘রাজনৈতিক হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে পরাজিত ফ্যাসিবাদী শক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো কোনো মহল অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে; যা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। আমরা এটা কঠোর হস্তে দমন করব।’ কারখানা বন্ধ রেখে শ্রমিকদের সড়কে অবস্থানের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এসব কারখানা খুব শিগগিরই খোলার ব্যবস্থা করা হবে। কিছু দুষ্কৃতকারী হামলা করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
শ্রমিকদের যেসব দাবিদাওয়া ছিল, সেগুলো পূরণ করা হয়েছে, মজুরি বোর্ড গঠিত হয়েছে এবং শ্রমিকরাও সন্তুষ্ট হয়েছেন।’ সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে সহায়ক হয় এমন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের জন্য সরকারও বোর্ডের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে। এ বিষয়ে বোর্ডেই আলাপ-আলোচনা হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টির সুযোগ নেই।’ প্রসঙ্গত, এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংশ্লিষ্টদের কারখানার কার্যক্রম সচল রাখা এবং শ্রমিকদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দিয়েছেন।
গতকাল শিল্পাঞ্চল পুলিশের প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি গাজী জসিম উদ্দিন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘উত্তরায় শ্রমিকদের আন্দোলন শুরু হওয়ার সময় থেকেই আমাদের যথেষ্ট প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু আমরা শ্রমিকদের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে যেতে চাইনি। কিন্তু আমরা দেখছি সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করার পরেও তাঁরা আন্দোলন থামাচ্ছেন না। নিষিদ্ধ দলের নেতা-কর্মী, শ্রমিকনেতাদের একটি পক্ষ ও নিষিদ্ধ দলের অনুসারী মালিকদের একটি পক্ষ এক হয়ে শ্রমিকদের নাশকতার দিকে নিয়ে গেছেন। পুলিশ আজ (মঙ্গলবার) থেকেই হার্ডলাইনে রয়েছে।
যদি কেউ আন্দোলনের নামে নাশকতার চেষ্টা অব্যাহত রাখে, তাহলে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ষড়যন্ত্র না থামালে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ইন্ধনদাতা শ্রমিক ও মালিকদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হবে।’ মিরপুরে চলমান আন্দোলন নিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘কোনো ধরনের অরাজকতা করতে আমরা দেব না। বিশেষ মহল, একটি দল আন্দোলনের নামে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে।’ তিনি প্রশ্ন করে বলেন, ‘আন্দোলনে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের সদস্যরা কেন? যারা এ কাজ করছে তাদের চিহ্নিত করা আছে। তাদের অনেকে রাজনৈতিক দলের পোস্টধারী নেতা।
তাদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যবস্থা নেবে।’ শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করে ডিসেম্বরে শেখ হাসিনাকে নিয়ে আসার চেষ্টা যারা করবে, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করবে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। কোনো ধরনের অরাজকতা করতে আমরা দেব না।’ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্র জানিয়েছে, গতকাল পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর আন্দোলন কেন্দ্র করে ঢাকা, সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর এবং সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটেছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিতে শিল্পাঞ্চলে ১২ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিজিবি সদর দপ্তরে কেন্দ্রীয় মনিটরিং সেল থেকে ড্রোন ও বডি-ওর্ন ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক লাইভ নজরদারি চালানো হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শ্রমিক আন্দোলনের ছদ্মবেশে নাশকতায় যুক্ত থাকার অভিযোগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন ও বহিরাগতদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। এরই মধ্যে শ্রমিক ছদ্মবেশে নাশকতায় জড়িত থাকার অভিযোগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ৩৩ নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে ডিএমপি।
নজরদারিতে ষড়যন্ত্রকারী শ্রমিকনেতা ও মালিকরা : আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্র জানিয়েছে, ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে প্রায় অর্ধশত মালিক ও শ্রমিকনেতাকে চিহ্নিত করেছেন গোয়েন্দারা। আওয়ামী লীগের পলাতক কয়েকজন সাবেক এমপি, মেয়র ও নেতা এবং আওয়ামীঘনিষ্ঠ কয়েকজন গার্মেন্ট ব্যবসায়ী পেছন থেকে ইন্ধন দিচ্ছেন। তাঁদের নির্দেশনা ও অর্থায়নে সড়কে অরাজকতা, পুলিশের ওপর হামলা ও থানা ঘেরাওয়ের চেষ্টার মতো নাশকতা তদারকি করছেন প্রায় ১০০ স্থানীয় নেতা। তাঁদের বিষয়ে এরই মধ্যে তালিকা করা হয়েছে। এ তালিকায় বেশ কয়েকজন গার্মেন্ট মালিকও আছেন। আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে না এলে যেকোনো মুহূর্তে তাঁদের গ্রেপ্তার করবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
শিল্পাঞ্চলে ১২ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন : শ্রমিক অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ আশপাশের শিল্পাঞ্চলে ১২ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। একই সঙ্গে ড্রোন ও বডি-ওর্ন ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। এ বিষয়ে বিজিবি সদর দপ্তর থেকে জনসংযোগ কর্মকর্তা শরীফুল ইসলাম জানান, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শিল্পকারখানার কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে মোতায়েন করা বিজিবি সদস্যরা স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমানে গাজীপুরের সফিপুর, কালিয়াকৈর ও কোনাবাড়ী এলাকায় ১০ প্লাটুন এবং নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ায় ২ প্লাটুন বিজিবি সদস্য মোতায়েন রয়েছেন। পাশাপাশি আশুলিয়া, মিরপুরসহ সংশ্লিষ্ট এলাকার পরিস্থিতিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
আজ নামতে দেওয়া হবে না সড়ক-মহাসড়কে : পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, রাস্তা অবরোধ করে জনভোগান্তি সৃষ্টি করতে দেওয়া হবে না। এজন্য পুলিশের সব ইউনিট ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। সকাল থেকেই শ্রমিকরা অবরোধ করতে পারেন-এমন সড়কগুলোয় কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে শ্রমিকরা সড়কে নামলে বল প্রয়োগ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হবে। আর শ্রমিক ছদ্মবেশে নিষিদ্ধ সংগঠনের কোনো নেতা-কর্মী নাশকতার চেষ্টা করলে সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে রাজধানীর মিরপুরে আন্দোলন কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলাকারীদের কঠোর হস্তে দমন করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ডিএমপি। সংস্থাটি জানিয়েছে, বর্তমানে সাধারণ শ্রমিকরা মাঠে নেই, বরং বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে কিছু দুষ্কৃতকারী রাস্তায় নেমে সমস্যা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। ডিএমপির পিওএম দক্ষিণ বিভাগের ডিসি মো. তৌহিদুল আরিফ জানান, মিরপুর-১০ গোলচত্বরসহ প্রধান সড়কগুলোয় যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে অলিগলিতেও পুলিশের বিশেষ নজরদারি ও তল্লাশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আন্দোলনে বন্ধ ৩০৬ পোশাক কারখানা : শ্রমিকরা কর্মস্থল থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় ৩০৬টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন পোশাকশিল্প মালিকেরা।
এসব কারখানায় প্রায় ৭ লাখ শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন। গতকাল বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এ তথ্য জানায়। বিজিএমইএর তথ্যানুসারে, সবচেয়ে বেশি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল গাজীপুর ও ময়মনসিংহে। এ দুই এলাকায় ১৬১ কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়, যেখানে প্রায় ৪ লাখ ২৯ হাজার শ্রমিক কর্মরত। এ ছাড়া সাভারের আশুলিয়া ও জিরানী এলাকায় ৯৩ এবং রাজধানীর মিরপুরে ৫২ কারখানায় উৎপাদন গতকাল বন্ধ ছিল।