দুই মাসের মধ্যে অভিযোগপত্র দেওয়ার ঘোষণা এসেছিল দুই বছর আগে। এরপর কখনো বিদেশি সংস্থার তথ্যের অপেক্ষা, কখনো ফরেনসিক প্রতিবেদনের ঘাটতি, আবার কখনো তদন্ত প্রায় শেষ হওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সর্বশেষ খসড়া অভিযোগপত্র প্রস্তুত করে আইনি মতামতের জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে পাঠানোর খবরও প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু অ্যাটর্নি জেনারেল নিজেই জানিয়েছেন, তার কার্যালয়ে এমন কোনো খসড়া পাঠানো হয়নি। এভাবে একের পর এক প্রতিশ্রুতি, পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ও নতুন জটিলতার মধ্য দিয়ে এক দশক পেরিয়ে গেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মামলার। সরকার বদলেছে, পরিবর্তন এসেছে সিআইডির নেতৃত্বে, বদলেছেন একাধিক তদন্ত কর্মকর্তা। কিন্তু আদালতে অভিযোগপত্র জমা পড়েনি। তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ পেছানো হয়েছে ৯৯ বার। আগামী ২৫ নভেম্বরও প্রতিবেদন জমা না পড়লে সময় পেছানোর সংখ্যা একশতে পৌঁছাবে।
তথ্য বলছে, ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থা সুইফটে অনুপ্রবেশ করে আন্তর্জাতিক হ্যাকাররা বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। এর মধ্যে শ্রীলঙ্কায় পাঠানো দুই কোটি ডলারের লেনদেন আটকে দেওয়া সম্ভব হলেও বাকি ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের (আরসিবিসি) মাধ্যমে বিভিন্ন হিসাবে স্থানান্তরিত হয়। পরে ওই অর্থের একটি বড় অংশ চলে যায় দেশটির ক্যাসিনোতে।
বিশ্বজুড়ে আলোচিত ওই সাইবার অপরাধের তদন্তে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো উত্তর কোরিয়াসংশ্লিষ্ট হ্যাকিং গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার তথ্য পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয়েছে। ফিলিপাইনেও অর্থ পাচারের ঘটনায় বিচারিক কার্যক্রম চলেছে। অথচ যে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে রিজার্ভের অর্থ চুরি হয়েছিল, সেই বাংলাদেশে মূল মামলার তদন্তই শেষ হয়নি দীর্ঘ ১০ বছরে।
কালবেলার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই দীর্ঘসূত্রতার পেছনে শুধু বিদেশি তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহের জটিলতাই নয়, দেশীয় সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে প্রমাণের পর্যাপ্ততা, তদন্ত পরিচালনার পদ্ধতি, কর্মকর্তাদের মধ্যে মতবিরোধ এবং তদন্তের এখতিয়ার নিয়ে দুই সংস্থার বিরোধও সামনে এসেছে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার কথা বলেছেন দীর্ঘদিনের তদন্ত কর্মকর্তা। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আবার মামলাটির তদারকিতে ফিরেও তিনি তদন্তের নিষ্পত্তি করতে পারেননি। এর মধ্যেই আগের তদন্তের কেস ডায়েরি ও নথিপত্রে গুরুতর ঘাটতির অভিযোগ উঠেছে। সেসব সংশোধনে নতুন করে পাঁচ সদস্যের একটি দলও গঠন করা হয়েছে।
অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে যায়নি খসড়া অভিযোগপত্র তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে অসংগতির সর্বশেষ বড় উদাহরণ সামনে আসে গত ১৮ জুন। সেদিন দেশের একাধিক সংবাদমাধ্যমে প্রায় একই সময়ে খবর প্রকাশিত হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আতিউর রহমানসহ দেশি-বিদেশি ৬৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রায় ১৫০ পৃষ্ঠার খসড়া অভিযোগপত্র প্রস্তুত করেছে সিআইডি।
প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, অভিযুক্তদের তালিকায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাসহ ১০ বাংলাদেশির নাম রয়েছে। খসড়া অভিযোগপত্রটি আইনি মতামতের জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আল মামুনকে উদ্ধৃত করে প্রকাশিত কয়েকটি প্রতিবেদনে বলা হয়, আইনি মতামত পেলেই আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হবে।
কিন্তু পরদিনই সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানান, প্রকাশিত তথ্য সংস্থাটির কোনো কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে সরবরাহ করেননি। এসব খবরকে সিআইডির আনুষ্ঠানিক অবস্থান হিসেবে বিবেচনা না করার অনুরোধও জানানো হয়। ফলে প্রশ্ন ওঠে, তদন্ত কর্মকর্তার নামে প্রকাশিত এত বিস্তারিত তথ্যের উৎস কী? খসড়া অভিযোগপত্র আদৌ প্রস্তুত হয়েছিল কি না এবং সেটি কোথায় পাঠানো হয়েছিল? এর চার মাস পরও সেই প্রশ্নের নিষ্পত্তি হয়নি। গত ১৯ অক্টোবর আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে না পেরে আবার সময় চায় সিআইডি। পরবর্তী দিন ধার্য হয় ২৫ নভেম্বর।
এদিকে, গত ২৭ অক্টোবর কালবেলাকে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল নিশ্চিত করেন, আইনি মতামতের জন্য তার কার্যালয়ে সিআইডি কোনো খসড়া অভিযোগপত্র পাঠায়নি। খসড়া অভিযোগপত্র প্রস্তুত করে তার কার্যালয়ে পাঠানোর খবরটি সঠিক কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না, এই তথ্যটি সঠিক নয়। এটি ভুয়া।’
অ্যাটর্নি জেনারেলের এই বক্তব্যে অন্তত খসড়া অভিযোগপত্র তার কার্যালয়ে পাঠানোর দাবিটি অসত্য বলে প্রতীয়মান হয়। তবে কারা এবং কী উদ্দেশ্যে এসব তথ্য সরবরাহ করেছেন, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
দুই মাসের প্রতিশ্রুতি, দুই বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি: খসড়া অভিযোগপত্রের খবরই প্রথম নয়। এর আগেও একাধিকবার তদন্ত শেষ হওয়ার ঘোষণা বা আশ্বাস দিয়েছে সিআইডি।
২০২৪ সালের ২ জুন রাজধানীর মালিবাগে সিআইডি সদর দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে সংস্থাটির তৎকালীন প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি মোহাম্মদ আলী মিয়া জানিয়েছিলেন, আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যেই বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হবে। দুই বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হয়নি।
এরও আগে, ২০২২ সালের ডিসেম্বরে সিআইডির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, দেশের ভেতরে তদন্তের অধিকাংশ কাজ শেষ হয়েছে। কয়েকটি দেশের কাছে চাওয়া তথ্য পাওয়া গেলেই অভিযোগপত্র জমা দেওয়া সম্ভব হবে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে পাওয়া তথ্য ও কর্মকর্তাদের বক্তব্যে নতুন অসংগতি সামনে এসেছে। কখনো বিদেশি সংস্থার প্রতিবেদন, কখনো ফরেনসিক পরীক্ষা, আবার কখনো আদালতে অভিযোগ প্রতিষ্ঠার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
ফরেনসিক প্রতিবেদন নিয়ে তিন সময়ের তিন তথ্য : মামলার তদন্তে ফরেনসিক প্রতিবেদন সংগ্রহের অগ্রগতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ২০১৬ সালের মার্চে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জব্দ করা কম্পিউটারের হার্ডডিস্কে ফরেনসিক পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়। একই বছরের মে মাসে ইন্টারপোলের বিশেষজ্ঞরা ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণে সহায়তা করেন। এরপর ২০১৮ সালের ৫ জুলাই তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা রায়হান উদ্দিন খানের নেতৃত্বে সিআইডির একটি প্রতিনিধিদল ফিলিপাইনের আদালতে ফরেনসিক প্রতিবেদন জমা দেয়। কিন্তু চার বছর পর, ২০২২ সালের ডিসেম্বরে আদালতের নথির বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়, সিআইডির নিজস্ব ফরেনসিক ল্যাবরেটরির প্রতিবেদন তখনো পাওয়া যায়নি। তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা রায়হান উদ্দিন খান আদালতকে জানিয়েছিলেন, শ্রীলঙ্কা, চীন, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য না পাওয়ার পাশাপাশি ফরেনসিক প্রতিবেদনের অপেক্ষাও তদন্ত শেষ করার পথে বাধা হয়ে রয়েছে।
অথচ চলতি বছরের জুনে গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রায়হান দাবি করেন, ২০২৩ সালের ৮ এপ্রিল ফরেনসিক প্রতিবেদন সরবরাহ করা হয়েছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ফিলিপাইন থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার পৃষ্ঠার নথি এবং ভারত ও জাপান থেকেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা হয়। এই তিন সময়ের প্রতিবেদনের মধ্যে সম্পর্ক কী, তা স্পষ্ট নয়। ২০১৮ সালে ফিলিপাইনের আদালতে জমা দেওয়া ফরেনসিক প্রতিবেদন এবং ২০২৩ সালে সরবরাহের দাবি করা প্রতিবেদন একই পরীক্ষার অংশ কি না, সেটিও অস্পষ্ট।
বিদেশি সংস্থার তথ্য সংগ্রহ নিয়েও প্রশ্ন : ২০২৫ সালের ১৭ আগস্ট সংবাদ সংস্থার বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (এফবিআই) বিস্তারিত প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে পাওয়া বাকি। সেটি পেলেই অভিযোগপত্র জমা দেওয়া সম্ভব হবে বলে সিআইডির বরাতে জানানো হয়। এর প্রায় দশ মাস পর, চলতি বছরের জুনে বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা আল মামুনকে উদ্ধৃত করে প্রকাশিত খবরে দাবি করা হয়, এফবিআইয়ের বিশেষ এজেন্টের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় প্রতিবেদন সংগ্রহ করা হয়েছে। তদন্তের আর কোনো কাজ বাকি নেই। তাহলে বিদেশি সংস্থার তথ্যপ্রমাণ ও ফরেনসিক প্রতিবেদন সংগ্রহের পরও তদন্ত শেষ হচ্ছে না কেন? কী নতুন বাধা তৈরি হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা মেলেনি।
বিদেশি প্রমাণের পরও দেশীয় সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে ঘাটতি? : তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের অভিযোগ, মামলার দীর্ঘসূত্রতার অন্যতম কারণ বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা প্রতিষ্ঠার মতো পর্যাপ্ত সাক্ষ্য ও ডিজিটাল আলামত সংগ্রহ নিয়ে অনিশ্চয়তা। বিশেষ করে সুইফট সিস্টেমে অনুপ্রবেশের পথ, সংশ্লিষ্ট কম্পিউটারের নিয়ন্ত্রণ, অননুমোদিত ইন্টারনেট সংযোগ এবং গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল তথ্য মুছে ফেলার অভিযোগ আদালতে ব্যবহারযোগ্য প্রমাণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
ভারতীয় নাগরিক রাকেশ আস্থানার বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মুছে ফেলার যে অভিযোগ সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা রায়হান তুলেছেন বলে জানা যায়, তার সমর্থনে মূল লগ, ফরেনসিক ইমেজ এবং আলামত সংরক্ষণের ধারাবাহিকতার নথি কী অবস্থায় রয়েছে, সেটিও জানা যায়নি। একইভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থের প্রকৃত সুবিধাভোগীদের শনাক্তকরণে তদন্ত কতটা এগিয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ পাওয়া যায়নি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, অভিযোগ প্রতিষ্ঠার জন্য সংগৃহীত প্রমাণের পর্যাপ্ততা নিয়েই একপর্যায়ে তদন্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল। এমনকি একজন তদন্ত কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং আরেক কর্মকর্তার স্বেচ্ছায় সরে যাওয়ার নেপথ্যেও এই বিরোধের ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তাদের মতবিরোধ, সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ মামলার শুরু থেকে দীর্ঘ সময় তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন রায়হান উদ্দিন খান। পরে পর্যায়ক্রমে আবদুল্লাহ ইয়াসিন, মং থোয়াই মারমা, ফরহাদ কবির এবং সর্বশেষ আল মামুন দায়িত্ব পান। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, মং থোয়াই মারমার দায়িত্বকালে মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকার বিষয়টি সামনে আসে।
সূত্রের দাবি, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্রবিষয়ক বিশেষ সহকারী খোদা বক্স চৌধুরীর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে মং থোয়াই জানান, মামলায় চার্জশিট দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত তদন্ত হয়নি। এ নিয়ে সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা রায়হান উদ্দিন খানের সঙ্গে তার মতবিরোধ হয়। ওই বৈঠকের কয়েকদিনের মধ্যেই মং থোয়াইকে তদন্ত থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে মং থোয়াই মারমার সঙ্গে যোগাযোগ করে কালবেলা। প্রথমে তিনি বক্তব্য দিতে অস্বস্তি প্রকাশ করেন। এড়িয়ে যেতে চান। পরে একপর্যায়ে বলেন, ‘সবারই তদন্তের একটা নিজস্ব স্টাইল আছে। হয়তো আমার স্টাইল তাদের পছন্দ হয়নি। আমার চেয়ে ভালো তদন্ত কর্মকর্তা পেয়েছে বলেই তাকে মামলাটা দেওয়া হয়েছে।’
তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘সেসময় অনেক তথ্যই ছিল না। তবে এতদিনে তো ভালো অগ্রগতি হওয়ার কথা। অনেক জায়গা থেকে তথ্যপ্রমাণ আসার কথা। আপনি বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেন, তিনি সার্বিক পরিস্থিতি বলতে পারবেন।’
অন্যদিকে গত জুনে বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা আল মামুনকে উদ্ধৃত করে একাধিক গণমাধ্যমে দাবি করা হয়, আগের তদন্ত কর্মকর্তা প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ করেছিলেন। পরবর্তী কর্মকর্তারা আরও তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করে অভিযোগপত্র প্রস্তুত করেছেন। অ্যাটর্নি জেনারেলের আইনি মতামত পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তাহলে মং থোয়াইয়ের দায়িত্বকালে যে প্রমাণের ঘাটতির কথা উঠেছিল, তা কীভাবে পূরণ করা হয়েছে? আদৌ তা পূরণ, নতুন কী সাক্ষ্য ও আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে—সেসবের বিস্তারিত প্রকাশ্যে আসেনি।
রায়হানের দীর্ঘ তদন্ত, আবার তদারকিতে ফিরেও কেন শেষ হয়নি মামলার দীর্ঘসূত্রতার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা রায়হান উদ্দিন খানের ভূমিকা। ২০১৬ সালে মামলার তদন্ত শুরু হওয়ার পর দীর্ঘ সময় তিনি তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি অভিযোগ করেন, আগের সরকারের আমলে মামলার তদন্তে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করা হয়েছিল। তার দাবি, ২০২০ সালের একটি বৈঠকে তদন্তে উঠে আসা বাংলাদেশি সন্দেহভাজনদের নাম বাদ দিতে চাপ দেওয়া হয়। তিনি ও তদারক কর্মকর্তা তাতে রাজি না হওয়ায় তাদের বৈঠক থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরে ২০২৩ সালের আগস্টে সাত বছরেরও বেশি সময় দায়িত্ব পালনের পর তাকে তদন্ত থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রায়হান আবার সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটে ফিরে আসেন। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার থেকে পর্যায়ক্রমে পুলিশ সুপার ও অতিরিক্ত ডিআইজি পদে পদোন্নতি পাওয়া এই কর্মকর্তা এবার মামলাটির তদন্ত তদারকির দায়িত্ব নেন।
তার প্রকাশিত বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৫-এর মার্চ থেকে ২০২৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি মামলাটির তদারক কর্মকর্তা ছিলেন। অর্থাৎ দ্বিতীয় দফায় প্রায় এক বছর দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রায়হান তার পছন্দের অন্তত দুজন কর্মকর্তাকে দিয়ে মামলাটির ত্রুটি-বিচ্যুতি সংশোধন করে অভিযোগপত্র দেওয়ার উদ্যোগ নেন। তাদের মধ্যে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফরহাদ কবির মামলাটি থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতির আবেদন করেন বলে জানা যায়। শেষ পর্যন্ত তদন্তের দায়িত্ব পান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আল মামুন।
সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আল মামুন সিআইডিতে এসেছেন রায়হানের সুপারিশে। পরিচিত মহলে তিনি রায়হানের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবেও পরিচিত।
আগের সরকারের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ তদন্ত শেষ করার অন্যতম বাধা হয়ে থাকলে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও কেন অভিযোগপত্র জমা দেওয়া গেল না, তা নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে। তদারকির দায়িত্বে ফিরে রায়হান কোন অসমাপ্ত কাজগুলো শনাক্ত করেছিলেন এবং সেগুলো শেষ করতে কী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, তারও স্পষ্ট উত্তর মেলেনি। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ সত্য হলে তার দায় সংশ্লিষ্টদের। তবে দীর্ঘ সময় তদন্ত পরিচালনা এবং পরে তদারকিতে ফিরেও মামলার নিষ্পত্তি না হওয়ার ক্ষেত্রে রায়হানের নিজের ভূমিকা ও দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত ডিআইজি রায়হান উদ্দিন খান তার সঙ্গে দেখা করে কথা বলতে বলেন। আজকেই (সোমবার) প্রতিবেদনটি প্রকাশ হচ্ছে জানিয়ে তার বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা আল মামুনের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। পরে যোগাযোগ করা হয় বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আল-মামুনের সঙ্গে। তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘আগে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে যে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল, সেখানে আমাদের দেওয়া তথ্য ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। এরপর থেকে এ বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমকে কথা বলা নিষেধ। আপনি সিআইডির মিডিয়া সেলে কথা বলেন।’ পরবর্তী সময়ে সুনির্দিষ্ট কয়েকটি প্রশ্ন পাঠিয়ে লিখিতভাবে রায়হান উদ্দিন খানের বক্তব্য জানতে চাইলে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার জবাব পাওয়া যায়নি।
আগের তদন্তে গুরুতর ঘাটতি, সংশোধনে পাঁচ সদস্যের দল দীর্ঘ তদন্তের পরও মামলার কেস ডায়েরি (সিডি) ও অন্যান্য নথিপত্রে গুরুতর অসংগতি পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সেসব সংশোধনে বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আল মামুন দায়িত্ব নেওয়ার পর পাঁচ উপপরিদর্শক নিয়ে একটি রাইটার টিম গঠন করেছেন। দলে রয়েছেন জহির রায়হান, নাফিজুর রহমান, অমিতাভ সন্ন্যাসী, সজিব হোসেন ও ইকবাল হোসেন। সিআইডির একটি সূত্রের দাবি, বিশেষ করে সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা রায়হান উদ্দিন খানের সময়ে প্রস্তুত করা কেস ডায়েরি ও তদন্ত-সংক্রান্ত নথিতে একাধিক ঘাটতি দীর্ঘ সময় ধরে সংশোধনের চেষ্টা করেছে দলটি।
সূত্রটির আরও অভিযোগ, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন কর্মকর্তাকে নানা সময়ে সিআইডি কার্যালয়ে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও তাদের বক্তব্যের বিবরণ কেস ডায়েরিতে যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়নি।
এতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা যাচাইয়ের পাশাপাশি তাদের কাউকে আড়াল করা বা বিশেষ সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে নথিতে এসব তথ্য না থাকার কারণ এবং এর পেছনে কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এদিকে তদন্তের ঘাটতি সংশোধনে বিশিষ্ট আইনজীবী এহসানুল হক সমাজীর কাছেও একাধিকবার আইনি পরামর্শ নিতে গিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, নথিপত্র পর্যালোচনার সময় রায়হান উদ্দিন খানের পরিচালিত তদন্তে বেশ কিছু দুর্বলতা চিহ্নিত হয়। সেগুলো সংশোধনের পরামর্শ দেন সমাজী।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এহসানুল হক সমাজী কালবেলাকে বলেন, ‘ওরা আমার পরামর্শ চেয়েছিল। মামলাটিতে কিছু ঘাটতি ছিল। সেসব চিহ্নিত করে দিয়েছিলাম। সেটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে। এরপরও কেন চার্জশিট দিতে পারছে না, আমার জানা নেই।’ এ বক্তব্যের পর নতুন প্রশ্ন সামনে আসে। এক দশকের তদন্তে কেস ডায়েরি ও সাক্ষ্য-সংক্রান্ত নথিতে গুরুতর ঘাটতি থেকে থাকলে এতদিন সেগুলো শনাক্ত ও সংশোধন করা হয়নি কেন? তদন্ত তদারকির বিভিন্ন পর্যায়ে এসব ত্রুটি কীভাবে অমীমাংসিত রয়ে গেল?
তদন্তভার নিয়ে দুদক-সিআইডির টানাপোড়েন তদন্তের দীর্ঘসূত্রতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মামলাটির তদন্তের এখতিয়ার নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সিআইডির বিরোধ। ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর দুদক মামলার তদন্তভার, কেস ডায়েরি ও আলামত হস্তান্তর চেয়ে সিআইডিকে চিঠি দেয় বলে জানা যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও যোগসাজশের অভিযোগ থাকায় তদন্তের এখতিয়ার নিয়েও প্রশ্ন তোলে সংস্থাটি; কিন্তু সিআইডি মামলাটি দুদকের কাছে হস্তান্তর করেনি। এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যস্থতায় দুই সংস্থার প্রতিনিধিদের একটি বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সিআইডির কর্মকর্তাদের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইনি পরামর্শক এহসানুল হক সমাজী।
বৈঠকে উপস্থিত দুদকের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা কালবেলাকে জানান, মামলাটির তদন্তভার নিয়ে সিআইডির সঙ্গে তাদের আলোচনা হয়েছিল। সেখানে রায়হান উদ্দিন খান ও আইনজীবী এহসানুল হক সমাজীও উপস্থিত ছিলেন। ওই কর্মকর্তার দাবি, একপর্যায়ে আইনি যুক্তি নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হলে সিআইডির প্রতিনিধিরা পরে আলোচনার কথা বলে বৈঠক থেকে বেরিয়ে যান। এরপর আর বিষয়টি এগোয়নি।
দুদকের আরেক শীর্ষ কর্মকর্তার দাবি, মামলায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা বা অন্যান্য সরকারি কর্মচারীদের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার বিষয় থাকায় এটি কেবল সাধারণ জালিয়াতি বা অর্থ পাচারের তদন্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনি এখতিয়ার এবং প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদনের বিষয়ও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
তার আশঙ্কা, এসব আইনি প্রশ্ন নিষ্পত্তি না করে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হলে আদালতে অভিযোগ গঠনের পর্যায়েই জটিলতা তৈরি হতে পারে। তার মতে, সিআইডি শুধু অর্থ পাচার-সংক্রান্ত আইনের ভিত্তিতে তদন্ত এগিয়ে নিলে সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন থেকে যেতে পারে। ওই কর্মকর্তা আরও অভিযোগ করেন, প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থানগত বিরোধের কারণে মামলাটি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে রয়েছে।
তবে সিআইডি কেন তদন্তভার হস্তান্তর করেনি, তার পূর্ণাঙ্গ আইনি ব্যাখ্যা এবং দুদকের কর্মকর্তাদের উত্থাপিত আপত্তির নিষ্পত্তি হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
এই বিরোধের মধ্যেই ২০২৫ সালের মার্চে তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির দায়িত্ব ছিল তদন্তের অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা। কিন্তু কমিটির পর্যবেক্ষণে কোন বাধাগুলো শনাক্ত হয়েছিল, কী সুপারিশ করা হয়েছিল এবং সেগুলো বাস্তবায়নে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রকাশ্যে আসেনি।
যা বলছেন সিআইডি প্রধান মামলার দীর্ঘসূত্রতা, তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন এবং অভিযোগপত্র নিয়ে প্রকাশিত পরস্পরবিরোধী তথ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে সিআইডি প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মোশাররফ হোছাইন কালবেলাকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মামলাটি শুধু দেশের ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি আন্তর্জাতিক বিষয়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ফিলিপাইনসহ একাধিক রাষ্ট্র জড়িত রয়েছে। আন্তর্জাতিক এসব প্রাসঙ্গিক তথ্য ও তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ সম্পন্ন করেই আমাদের আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে। আমাদের কাজ দ্রুতগতিতে চলছে এবং আশা করছি, খুব শিগগির তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন জমা দিতে পারব।’
বারবার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন ও সমন্বয় প্রসঙ্গে সিআইডি প্রধান বলেন, ‘তদন্তকালে কর্মকর্তা পরিবর্তন (যেমন তদন্ত কর্মকর্তা রায়হান উদ্দিনের বদলি) সরকারি চাকরিবিধির স্বাভাবিক প্রক্রিয়ারই অংশ। এ মামলাটির সার্বিক অগ্রগতির বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব দপ্তর ও কর্তৃপক্ষ পূর্ণাঙ্গভাবে ওয়াকিবহাল রয়েছেন এবং সবাই প্রতিনিয়ত হালনাগাদ তথ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত আছেন।’
অভিযোগপত্র প্রস্তুত ও অভিযুক্তদের সংখ্যা নিয়ে প্রকাশিত খবরের বিষয়ে তিনি আরও বলেন, ‘সংবাদমাধ্যমে অকাল চার্জশিট বা নির্দিষ্টসংখ্যক আসামি করা নিয়ে যেসব গুঞ্জনের কথা বলা হচ্ছে, তা সঠিক নয়। একটি দায়িত্বশীল তদন্ত সংস্থা হিসেবে সিআইডির মূল কাজ হলো কেবল নিরপেক্ষভাবে প্রকৃত তথ্য-প্রমাণ উন্মোচন করা। কোনো বিষয়ে নিজস্ব মতামত প্রকাশ করার সুযোগ তদন্তকারী সংস্থার নেই; মতামত বা রায় দেওয়ার এখতিয়ার কেবল আদালত বা সংশ্লিষ্ট বিচারিক কর্তৃপক্ষের।’
তবে সিআইডি প্রধানের বক্তব্যেও তদন্তের কোন কাজগুলো এখনো অসমাপ্ত, তার সুনির্দিষ্ট বিবরণ পাওয়া যায়নি।
এক দশকের তদন্তেও কোনো ফল নেই বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনা শুধু একটি ব্যাংকের অর্থ হারানোর বিষয় নয়। এটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিরাপত্তাব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেনের সুরক্ষা এবং অপরাধের তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার সক্ষমতার সঙ্গেও জড়িত।
তবে তদন্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সম্ভাব্য গাফিলতি বা যোগসাজশের অভিযোগ থাকলেও নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা কিংবা দায়িত্ব পালনে অবহেলা পাওয়া গেলেই অর্থ চুরিতে সরাসরি অপরাধমূলক সম্পৃক্ততা প্রতিষ্ঠিত হয় না। আদালতে টেকসই অভিযোগপত্র দিতে হলে প্রত্যেক অভিযুক্তের বিরুদ্ধে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন।
কালবেলার অনুসন্ধানে দীর্ঘসূত্রতার পেছনে কয়েকটি বিষয় সামনে এসেছে। বিদেশি তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহে বিলম্ব, ফরেনসিক প্রতিবেদন নিয়ে অসংগতি, দেশীয় সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে প্রমাণের পর্যাপ্ততা নিয়ে প্রশ্ন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ, তদন্ত কর্মকর্তাদের মতবিরোধ এবং তদন্তের এখতিয়ার নিয়ে দুই সংস্থার বিরোধ। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে আগের তদন্তের নথিপত্রে গুরুতর ঘাটতির অভিযোগ এবং খসড়া অভিযোগপত্রের অগ্রগতি নিয়ে অসত্য তথ্য প্রকাশের ঘটনা। একইভাবে তদন্তের কোন কাজগুলো এখনো অসমাপ্ত, সিআইডির পক্ষ থেকেও তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
সংগৃহীত প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগপত্র দাখিল অথবা তদন্তের ফল অনুযায়ী অন্য ধরনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার পথ রয়েছে সিআইডির সামনে। কিন্তু এক দশকেও কেন কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো অমীমাংসিত। সর্বশেষ ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত সময় পেয়েছে সিআইডি। সেদিনও তদন্ত প্রতিবেদন জমা না পড়লে সময় পেছানোর সেঞ্চুরি পূর্ণ হবে।