Image description

২০২৬ সালের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফল বিপর্যয়ের নেপথ্যে কারণ কী এবং এর দায় কার? গতকাল এইচএসসির ফল প্রকাশে দেখা গেছে, প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য। এরপর এ প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে সবার মনে। যদিও বলা হচ্ছে ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়ে বেশি ফেল করার কারণে পাসের হারে চরম ধস নেমেছে। তবে শিক্ষাবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, এ বিপর্যয়ের পেছনে অনেক কারণ রয়েছে- এখানে সম্মিলিত ব্যর্থতা রয়েছে। এর পেছনে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক এবং পুরো শিক্ষাব্যবস্থার কমবেশি দায় রয়েছে। খারাপ ফলাফলের দায় একক কোনো পক্ষকে দেওয়ার সুযোগ নেই। বিশেষ করে করোনা পরিস্থিতির সময়ে শিক্ষাব্যবস্থায় চরম বিঘ্ন ঘটেছে। এরপর জুলাই অভ্যুত্থানেও অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে শিক্ষার্থীদের ওপর। বিগত আওয়ামী লীগ আমলে পরীক্ষার খাতায় উদারভাবে নম্বর দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক পটপরির্বতনের পর থেকে লেখাপড়ার মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার এবং বর্তমান বিএনপি সরকার উত্তরপত্র মূল্যায়নেও কঠোরতা অবলম্বন করছে। এটিও পাসের হার কমার ক্ষেত্রে অন্যতম কারণ।

একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমা এবং অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহার, সোশ্যাল মিডিয়া ও গেমের প্রতি আসক্তি পড়াশোনায় বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। ক্লাসে পাঠদানে শিক্ষকদের যথাযথ মনোযোগের অভাব এবং গাইডনির্ভর ও প্রাইভেটমুখী শিক্ষা-বাণিজ্য পরিস্থিতিকে জটিল করছে। অভিভাবকদের তদারকির অভাব এবং সন্তানের হাতে আধুনিক ডিভাইস তুলে দেওয়ার কারণে তাদের পড়ালেখা থেকে দূরে সরে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। পাঠ্যক্রমে অসংগতি এবং কঠোর ও বাস্তবভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর ফলে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা পাসের কৃত্রিম ধারা ভেঙে এই প্রকৃত চিত্র সামনে চলে এসেছে।

এদিকে গত ২২ বছরের ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীন এইচএসসি পরীক্ষায় এবারই পাসের হার সবচেয়ে কম, মাত্র ৫১.৬২ শতাংশ। গত বছর এ হার ছিল ৫৭.১২ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার সাড়ে ৫ পয়েন্ট কমেছে। আর মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ড মিলিয়ে ১১ শিক্ষা বোর্ডে সার্বিক পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫২.১২ শতাংশে; যা আগের বছরের (৫৮.৮৩%) চেয়ে ৬.৭১ পয়েন্ট কম। একই সঙ্গে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা এক বছরের ব্যবধানে কমেছে ২৯ হাজার ১৩। ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়ে বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে ‘কাঠামোগত দুর্বলতার’ কথা বলছেন বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, ‘ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়গুলো মূলত দক্ষতানির্ভর, যেখানে আমাদের মূল কাঠামোগত দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মাধ্যমিক পর্যায়ে বিষয়ভিত্তিক পর্যাপ্ত ও মানসম্মত শিক্ষক না থাকায় অন্য বিষয়ের শিক্ষকদের স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ দিয়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠানো হচ্ছে।’

এদিকে মানবিক বিভাগেও সর্বনিম্ন পাসের হার ফল বিপর্যয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। তথ্যানুযায়ী, এবার ১১ শিক্ষা বোর্ডে ফলপ্রার্থী ছিলেন ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন। তাদের মধ্যে পাস করেছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। ফেল করেছেন ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন। তাদের মধ্যে ইংরেজিতে ফেল করেছেন ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ এবং আইসিটিতে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন। শুধু এ দুই বিষয়ে ফেল করেছেন ৩ লাখ ৮২ হাজার ২১ শিক্ষার্থী। এ দুই বিষয়ে কেউ ফেল না করলে পাসের হার বেড়ে দাঁড়াত প্রায় ৮৩ শতাংশে। এর আগে ২০২৫ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায়ও তিন বিষয়ের কারণে ফলে ধস এসেছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ফেল করেছিল হিসাববিজ্ঞানে ৪১.৪৬ শতাংশ, দ্বিতীয় ইংরেজিতে ৩৮.৮০ শতাংশ এবং তৃতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে (আইসিটি) ২৭.২৮ শতাংশ। ২০২৬ সালে সর্বাধিক ফেল করেছে ইংরেজি ও আইসিটিতে। প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে ইংরেজিতে ফেল করেছেন ৩৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ শিক্ষার্থী। আর আইসিটিতে অকৃতকার্য হয়েছেন ২৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ। তিন বছর ধরেই এইচএসসিতে পাসের হারে বড় ধরনের পতন ঘটছে। ২০২৪ সালে ৯টি সাধারণ বোর্ডে পাসের হার ছিল ৭৫.৫৬ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে কমে দাঁড়িয়েছিল ৫৭.১২ শতাংশে। এবার তা আরও কমে ৫১-এর ঘরে এসে ঠেকেছে।

বিভাগভিত্তিক ফল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এবার সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন মানবিক বিভাগে। এ বিভাগে পাসের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪২.১৭ শতাংশ। যেখানে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে পাসের হার ৫০.৭৭ এবং বিজ্ঞান বিভাগে ৭৩.১২ শতাংশ। বিষয়ভিত্তিক ফলের সারণি বলছে, ইংরেজি বিষয়ে একমাত্র ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ৭০ শতাংশের ওপরে (৭৩.৬২%)। বাকি আট বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ৫৪ থেকে ৬৬ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ইংরেজিতে সবচেয়ে বেশি ফেল করেছে বরিশাল বোর্ড (৪৫.৯২%) এবং যশোর বোর্ডে (৪৫.০৫%)। একইভাবে আইসিটিতেও সর্বোচ্চ ৩৩.৫৮% ফেল করেছে বরিশাল বোর্ডে আর সর্বনিম্ন ২৩.৮১% ফেল ঢাকা বোর্ডে।

দুই বিষয়ের ফল বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে ‘কাঠামোগত দুর্বলতার’ কথা বলছেন বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, ‘ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়গুলো মূলত দক্ষতানির্ভর, যেখানে আমাদের মূল কাঠামোগত দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মাধ্যমিক পর্যায়ে বিষয়ভিত্তিক পর্যাপ্ত ও মানসম্মত শিক্ষক না থাকায় অন্য বিষয়ের শিক্ষকদের স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ দিয়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠানো হচ্ছে। ফলে ১০ বছরের শিক্ষার দূরত্ব নিয়ে শিক্ষার্থীরা উচ্চমাধ্যমিকে আসছে। তা মাত্র দুই বছরের সীমিত সময়ে পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। শিক্ষকসংকট, অতিরিক্ত ক্লাসের চাপ এবং প্রয়োজনীয় ল্যাব ও সরঞ্জামের অভাব শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক ভিত্তি তৈরিতে বাধা সৃষ্টি করছে।’ ভাষা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা না কাটিয়ে নতুন বিষয়ে ঝুঁকে পড়ার চেয়ে মাতৃভাষা বাংলা ও মৌলিক ইংরেজি শিক্ষার মান বাড়ানোই এখন সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করেন তাঁরা।

শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ এখনো ইংরেজি ও আইসিটি বিষয় দুটিকে শুধু মুখস্থ করে পার পাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু এবার প্রশ্নপদ্ধতির ধরন এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নে কঠোরতা অবলম্বন করার কারণে যারা কেবল মুখস্থের ওপর ভরসা করেছিলেন, তারা পরীক্ষায় পাস নম্বর তুলতে ব্যর্থ হয়েছেন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে যে অতীতে রাজনৈতিক বা বোর্ডের সুনাম রক্ষার খাতিরে খাতা মূল্যায়নে যে ‘গ্রেস মার্কস’ বা কৃত্রিমভাবে নম্বর বাড়িয়ে পাসের হার ও জিপিএ-৫ বাড়িয়ে রাখার চল ছিল, তা এবার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মেধার প্রতিফলন ঘটেছে, যা সংখ্যার বিচারে রূঢ় হলেও বাস্তব চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘এটাকে ফলবিপর্যয় না বলে বলতে হবে শিক্ষার প্রকৃত চিত্র সামনে এসেছে। এতদিন গ্রেস দিয়ে বা খাতা ভরলেই পাস করিয়ে দেওয়া হয়েছে, ফলে শিক্ষার মান তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল। প্রতিষ্ঠান বেড়েছে, শিক্ষার্থী বেড়েছে, লেখাপড়ার মান কমেছে। ফল খারাপের পেছনে অনেক কারণ আছে। করোনার সময় শিক্ষায় যে ধাক্কা লেগেছিল সেটা কাটিয়ে উঠতে পারিনি। জুলাই অভ্যুত্থানে আরেকটা ধাক্কা লাগে। এর প্রভাব এসএসসি-এইচএসসি উভয় পরীক্ষাতে পড়েছে। শিক্ষায় যে শূন্যতা আজ সামনে এসেছে, সেটার কারণ বের করে এ শূন্যতা পূরণ করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের ভালো মানের বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নেই। ইসলামের ইতিহাসের শিক্ষক পড়াচ্ছেন ইংরেজি। বাংলার শিক্ষক পড়াচ্ছেন আইসিটি। আবার বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক থাকলেও যোগ্যতার ঘাটতি আছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আইসিটি ল্যাব আছে কি না, থাকলেও সেটি চালু কি না বা আইসিটি শিক্ষক আছেন কি না এগুলো খতিয়ে দেখা দরকার। শতভাগ ফেল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে স্বতন্ত্র গবেষণা প্রয়োজন।’ তিনি বলেন, ‘শতভাগ ফেল প্রতিষ্ঠানগুলো সব গ্রামে বা মফস্বলে। এটা শহর ও গ্রামের বৈষম্যের কারণে। ধনী-গরিব বৈষম্যের কারণে। গ্রামে ভালো শিক্ষক থাকে না। দরিদ্র শিক্ষার্থীরা ভালো প্রতিষ্ঠানে পড়তে পারে না। এ বৈষম্য দূর না করলে সার্বিকভাবে শিক্ষার উন্নতি হবে না।’ একটি-দুটি বিষয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীদের এক মাসের মধ্যে পুনরায় ওই বিষয়ে পরীক্ষার সুযোগ দেওয়ায় সরকারকে ধন্যবাদ জানান তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুনের মতে, ইংরেজি এবং আইসিটিতে প্রায় ৪ লাখ শিক্ষার্থীর ফেল করার পেছনে পুরো জাতির ব্যর্থতা রয়েছে। এ বিপর্যয়ের পেছনে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের চরম সংকট এবং শিক্ষকদের অপ্রতুল বেতন-ভাতা অন্যতম প্রধান সমস্যা।

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে এইচএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে। প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের ফল খারাপ হওয়ার পেছনে ব্যক্তিভেদে আলাদা কারণ রয়েছে। কারও নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিতি কম ছিল, কারও নির্দিষ্ট বিষয়ে ঘাটতি রয়েছে, আবার কারও ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সমস্যা থাকতে পারে। এমনকি কিছু শিক্ষার্থী অনিয়মিত ছিল, কেউ কেউ নির্দিষ্ট বিষয়ে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। যে শিক্ষার্থী খারাপ করেছে, তার পেছনে কোনো না কোনো দুর্বলতা রয়েছে। সেই দুর্বলতাগুলো আমাদের খুঁজে বের করতে হবে।’

রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক লাল মোহাম্মদ বলেছেন, তাঁর কাছে এবারের প্রশ্নপত্র, বিশেষ করে পদার্থবিজ্ঞান, বাংলা ও ইংরেজির প্রশ্ন কিছুটা এলোমেলো মনে হয়েছে।

শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মতে, শতভাগ অকৃতকার্য প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত গ্রাম বা মফস্বলে অবস্থিত, যা ধনী-দরিদ্র ও শহর-গ্রাম শিক্ষার কাঠামোগত বৈষম্য ফুটিয়ে তোলে। ২০২৫ সালে হিসাববিজ্ঞান, ইংরেজি, আইসিটি-এ তিন বিষয়ের ফলে ধস নামলেও ২০২৬ সালে কেবল ইংরেজি ও আইসিটি পুরো চিত্র বদলে দিয়েছে। শিক্ষার এই ধারাবাহিক অবনতি রুখতে হলে কেবল পরীক্ষার প্রশ্ন বা মূল্যায়নে পরিবর্তন আনলেই চলবে না। গ্রামীণ পর্যায়ে বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আইসিটি ল্যাব সচল এবং শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।