Image description

দেশের সবচেয়ে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী যুবসমাজ। অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হওয়ার কথা তাদের। সেই তারুণ্যের বিপুল অংশ আজ বেকারত্ব ও নিষ্ক্রিয়তার বেড়াজালে আটকে আছে। এদের কারও হাতে কাজ নেই, কেউ আবার শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ-কোনোটির সঙ্গেই যুক্ত নন। সব মিলিয়ে ১ কোটি ৫ লাখ ৬০ হাজার তরুণ-তরুণীর ২ কোটি ১১ লাখ ২০ হাজার কর্মক্ষম যুব হাত অলস বসে আছে। তারা দেশের অর্থনীতিতে কোনো অবদানই রাখতে পারছেন না। উল্টো তাদের ভরণপোষণে প্রতি বছর শুধু চালই খরচ হচ্ছে (জনপ্রতি দৈনিক ৩৩০ গ্রাম) প্রায় ১২ লাখ ৭২ হাজার টন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ-২০২৪ অনুযায়ী, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সি বেকার যুবকের সংখ্যা ২০ লাখ। এর বাইরে শিক্ষা, কর্ম ও প্রশিক্ষণের বাইরে রয়েছেন আরও ৮৫ লাখ ৬০ হাজার তরুণ-তরুণী, যাদের কাজও নেই, কাজ খুঁজছেনও না।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, বেকারত্বের বোঝা সবচেয়ে বেশি উচ্চশিক্ষিতদের ওপর। দেশের মোট বেকারের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ৮ লাখ ৮৫ হাজার। কর্মমুখী শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় দক্ষতার ঘাটতি, শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে পাঠ্যক্রমের অসামঞ্জস্য এবং পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

এমন বাস্তবতায় আজ সারা দেশে পালিত হচ্ছে জাতীয় যুব দিবস-২০২৬। এবারের প্রতিপাদ্য-‘দক্ষ যুব গড়বে দেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’। দিবসটি উপলক্ষে শোভাযাত্রা, যুব মেলা, চাকরি মেলা ও যুব ঋণ বিতরণসহ বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে মূল অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

২০ লাখের কাজ নেই : বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১৫ বছর ও তদূর্ধ্ব কর্মক্ষম জনসংখ্যা ১২ কোটি ১৮ লাখ ২০ হাজার। এর মধ্যে শ্রমশক্তিতে রয়েছেন ৭ কোটি ১৭ লাখ ১০ হাজার ব্যক্তি। কর্মে নিয়োজিত ৬ কোটি ৯০ লাখ ৯০ হাজার এবং বেকার ২৬ লাখ ২০ হাজার। এর মধ্যে ২০ লাখেরই বয়স ১৫ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে। মোট শ্রমশক্তির ৩৪ দশমিক ৬২ শতাংশ বা ২ কোটি ৪৮ লাখ ৩০ হাজারের বয়স ১৫ থেকে ২৯ বছর। তাঁদের মধ্যে কর্মে নিয়োজিত ২ কোটি ২৮ লাখ ৩০ হাজার। জরিপের সংজ্ঞা অনুযায়ী, সপ্তাহে অন্তত এক ঘণ্টা মজুরি, বেতন, মুনাফা কিংবা পরিবারের নিজস্ব ভোগের জন্য পণ্য বা সেবা উৎপাদনের কাজে যুক্ত থাকলেই তাকে আর বেকার বলা যায় না। অথচ ২০ লাখ যুবক সেই ন্যূনতম কাজের সুযোগও পাচ্ছেন না।

আরও ৮৫ লাখ নিষ্ক্রিয় : শিক্ষা, কর্মসংস্থান কিংবা প্রশিক্ষণ-কোনোটির সঙ্গেই যুক্ত নন এমন তরুণ-তরুণীর সংখ্যা প্রায় ৮৫ লাখ ৬০ হাজার। তাঁদের কাজ নেই, আবার কাজের আগ্রহ বা চেষ্টাও নেই। কাজ না খোঁজায় জরিপের সংজ্ঞায় তাঁরা বেকারও নন। ২০২৩ সালের তুলনায় এ সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ বেড়েছে। এদের প্রায় ৫৮ শতাংশ শহরাঞ্চলে বাস করেন এবং এই জনগোষ্ঠীতে নারীর সংখ্যা পুরুষের প্রায় দ্বিগুণ। বেকার ২০ লাখ এবং এই ৮৫ লাখ ৬০ হাজার নিষ্ক্রিয় তরুণ-তরুণী মিলিয়েই ১ কোটি ৫ লাখ ৬০ হাজার মানুষের বিশাল একটি কর্মক্ষম শক্তি উৎপাদন প্রক্রিয়ার বাইরে রয়েছে।

উচ্চশিক্ষিতরাই বেশি বেকার : বিবিএসের হিসাবে, মোট বেকারদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ৮ লাখ ৮৫ হাজার। মাধ্যমিক উত্তীর্ণ বেকার ৭ লাখ ৪৯ হাজার এবং উচ্চমাধ্যমিক উত্তীর্ণ ৪ লাখ ৭ হাজার। প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেছেন ৩ লাখ ৭২ হাজার বেকার। আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নেই এমন বেকারের সংখ্যা ১ লাখ ৭৩ হাজার।

বেকার বেশি শহরে : ভৌগোলিক বিন্যাসে দেখা যায়, দেশের ৭০.২৮ ভাগ মানুষ গ্রামে বাস করলেও বেকারত্বের হার শহরেই বেশি। জাতীয় পর্যায়ে বেকারত্বের হার ৩.৬৬ শতাংশ হলেও গ্রামে এই হার ৩.৪ শতাংশ এবং শহরে ৪.৪ শতাংশ। যুব শ্রমশক্তির ক্ষেত্রে শহরাঞ্চলে বেকারত্বের হার ১১.৬ শতাংশ, যা গ্রামাঞ্চলে ৭.১২ শতাংশ। শহরে যুব বেকারদের মধ্যে নারী বেশি, গ্রামে পুরুষ। বিভাগভিত্তিক বেকারত্বে প্রথমে রয়েছে ঢাকা (প্রায় ৭ লাখ) এবং সর্বনিম্নে রয়েছে সিলেট (১ লাখ ১৪ হাজার)। দ্বিতীয় থেকে সপ্তম অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, বরিশাল ও ময়মনসিংহ।

প্রশিক্ষণও সীমিত : যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) এবং বিভিন্ন সংস্থা প্রশিক্ষণ দিলেও এর আওতা সীমিত। আবার প্রশিক্ষণের মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। জরিপ অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১২ মাসে দেশের মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ পুরুষ এবং শূন্য দশমিক ১৮ শতাংশ নারী বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ পেয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মমুখী শিক্ষা ও শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে দক্ষতার সমন্বয় না থাকায় উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যেও বেকারত্ব বাড়ছে। দেশের সবচেয়ে বড় কর্মক্ষম শক্তি যদি উৎপাদনে যুক্ত না হয়, তবে তারুণ্যের জনমিতিক সম্ভাবনাই একসময় অর্থনীতির জন্য বড় বোঝায় পরিণত হতে পারে। প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রশিক্ষণ-পরবর্তী কর্মসংস্থান নিশ্চিত করাও জরুরি।

সরকারের উদ্যোগ : যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার পর ৮০ লাখের বেশি যুবক-যুব নারীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। বর্তমান সরকারের মেয়াদে প্রশিক্ষণ পেয়েছেন ১ লাখ ২৬ হাজার ২৮০ জন। সম্প্রতি চালু হওয়া এআই প্রশিক্ষণে ১ হাজার ৬০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৭২২ জন সরাসরি কাজে যুক্ত হয়েছেন। ৬৪ জেলায় ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তরুণরা ৬২ কোটি টাকার বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেছেন। প্রশিক্ষিত যুবকদের বিনা জামানতে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়া হচ্ছে। এ পর্যন্ত ১১ লাখ ১৪ হাজার ৬৪৪ জনের মধ্যে ২ হাজার ৮৬১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে প্রায় ২৫ লাখ যুবক স্বাবলম্বী হয়েছেন।

যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকারে রয়েছে কর্মসংস্থান। এ লক্ষ্যে ফ্রিল্যান্সিং, এআই প্রযুক্তি, কেয়ারগিভার প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জাতীয় যুব দিবসে চাকরি মেলার মাধ্যমে ৩ থেকে ৫ হাজার মানুষের চাকরির সুযোগ সৃষ্টি এবং কমপক্ষে ১০০ জনকে তাৎক্ষণিক চাকরি দেওয়া হবে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ শ্রমশক্তি বিদেশে পাঠাতে বিভিন্ন রিক্রুটিং এজেন্সি ও দেশিবিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। ভাষা প্রশিক্ষণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যুবকদের কর্মসংস্থান ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে ৬৪ জেলায় প্রশিক্ষণ প্রকল্পসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চলমান।