কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (আরটিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স) বদলে দিচ্ছে মানুষের কাজের ধরন, তথ্য সংগ্রহ, শিক্ষা, চিকিৎসা, সংবাদমাধ্যম ও যোগাযোগব্যবস্থা। কয়েক সেকেন্ডেই তৈরি হচ্ছে ছবি, লেখা, ভিডিও, গবেষণার খসড়া ও নানা জটিল সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান। যে কাজে আগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগত, এআইয়ের সহায়তায় তা করা যাচ্ছে অল্প সময়ে। তবে প্রযুক্তির এই বিস্ময়কর অগ্রগতির আড়ালে জমছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভাবনা। এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কি মানুষের নিজস্ব চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতাকে দুর্বল করছে, এর পেছনে বিদ্যুৎ ও পানি ব্যয় হচ্ছে! পরিবেশের ওপর কতটা প্রভাব পড়ছে, আর কোনো কারণে এআইয়ের সেবা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে কতটা বিপাকে পড়বে ১৫০ থেকে প্রায় ২০০ কোটির বেশি মানুষ।
বিশেষজ্ঞরা বলছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সহায়তায় এখন সময় সাপেক্ষ অনেক কাজ মুহূর্তেই করা সম্ভব হচ্ছে। শিক্ষার্থীর অ্যাসাইনমেন্ট, সাংবাদিকের প্রতিবেদনের খসড়া, কর্মীর দাফতরিক কাজ কিংবা ব্যবসায়ীর পরিকল্পনাÑসবখানেই বাড়ছে এআইয়ের ব্যবহার। মানুষের সময় বাঁচছে, শ্রম কমছে, খুলছে নতুন সম্ভাবনার দরজা। কিন্তু এই স্বস্তির আড়ালে ধীরে ধীরে জমছে সংকটের সম্ভাবনা। মানুষ যদি চিন্তা, বিশ্লেষণ ও সৃজনশীলতার বড় অংশই যন্ত্রের হাতে ছেড়ে দেয়, তবে নিজের মেধার চর্চা কতটা থাকবে? কোনো কারণে এআই সেবা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে কতটা প্রস্তুত থাকবে মানুষ? আর কয়েক সেকেন্ডে উত্তর পাওয়া এই প্রযুক্তির পেছনে যে বিপুল বিদ্যুৎ ও পানির প্রয়োজন হয়, তার দীর্ঘমেয়াদি মূল্যই-বা কে দেবে? এআইয়ের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো দ্রুত তথ্য বিশ্লেষণ, জটিল বিষয় সহজভাবে উপস্থাপন এবং পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করার সক্ষমতা। চিকিৎসায় রোগ শনাক্তকরণে সহায়তা, কৃষিতে আবহাওয়া ও ফসলের তথ্য বিশ্লেষণ, শিক্ষায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক পাঠদান এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় পূর্বাভাস বিশ্লেষণের মতো ক্ষেত্রেও এর সম্ভাবনা রয়েছে। সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে সীমিত সময় ও সম্পদ দিয়ে বেশি কাজ করা সম্ভব।
এবিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর মো. মোসাদ্দেক হোসেন কামাল ইনকিলাবকে বলেন, এআই প্রযুক্তিতে সার্ভার তুলনামূলক বেশি হিট হয় এবং এর মাত্রা কমানোর জন্য পানি বা তরল জাতীয় পদার্থের প্রয়োজন হয়। যার বিকল্প তৈরি না করতে পারলে পরিবেশের উপর স্থায়ী ক্ষতিকর ইফেক্ট পড়বে। এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একেবারে চলে যাবে একথা আমরা বিশ্বাস করিনা। তবে সংকট তৈরি হবে না একথাও বলা যাবে না। সহজ, দ্রুত ও স্বাচ্ছন্দে কাজ করার জন্য যন্ত্রাংশ হিসাবে এআই ব্যবহার করতে হবে। কখনোই প্রযুক্তির উপর শতভাগ নির্ভর করা ঠিক নয়। প্রত্যেক জিনিসের ভালো এবং খারাপ উভয় দিক থাকে।
তবে খারাপের উপর নির্ভর না করে আমরা যদি এর ভালো দিকগুলো ব্যবহার করতে পারি তাহলে তা নিঃসন্দেহে সকলের জন্য ফলপ্রদর্শক। তবে প্রযুক্তিটি কোন খারাপ লোক নিশ্চয়ই ভালো ব্যবহার করবে না। এআই মেধাবিকাশের সীমাবদ্ধতা নয় বরং সঠিক ব্যবহারে মেধাকে আরো প্রগতিশীল করা সম্ভব। আমরা যদি সঠিক পরিকল্পনা এবং লম্বা সময় ব্যবহার উপযোগী করে পলিসি মেকিং করি, তাহলে তা ইভ্যালুয়েশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স আমাদের জীবনের সাথে অতপ্রতভাবে জড়িয়ে পড়েছে। ফলে তার খারাপ দিক থাকলেও তা কোনভাবেই পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করার সুযোগ নেই। প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণে রেখে ব্যবহার করলে অবশ্যই সবার জন্য কল্যাণকর। তবে অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার মানুষের জন্য ক্ষতির কারণ। এআই এর ব্যবহারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্যক্তির কমান্ড।
এআই এর জনক মার্কিন কম্পিউটার বিজ্ঞানী জন ম্যাকার্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্থি তার একাধিক বক্তব্যে বলেছেন, এআই যখন মরণাস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তখন তা মানবজাতির জন্য চরম ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রযুক্তির ভালো এবং খারাপ উভয় দিক সকলের সামনে উন্মোচন করা উচিত এবং আগে বিষয় সম্পর্কে জেনে তারপর সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এআই তখনই মানুষের জন্য বেশি বিপদজনক হবে যখন সে নিজেই তার চেয়ে শক্তিশালী এআই তৈরি করতে পারবে। কিছু খারাপের জন্য সম্ভাবনাময়ী কোন প্রযুক্তি বা উদ্ভাবনী বন্ধ রাখা উচিত নয়।
আবার পরিবেশগত প্রভাব এবং অনির্দিষ্টমাত্রায় বিদ্যুতেরও ব্যবহার রয়েছে এই প্রযুক্তিতে। প্রতি ছবিতে ৩ ওয়াট ধরে গড়ে ১০ লক্ষ্য ছবির জন্য মোট বিদ্যুৎ লাগবে প্রায় ৩,০০০ কিলোওয়াট। প্রতি ছবিতে পানির ব্যবহার ৩-৩০ মিলিলিটার ধরে হিসাব করলে মোট হবে প্রায় ৩,০০০-৩০,০০০ লিটার বা তার বেশি হতে পারে। এআইয়ের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে এর পেছনের অবকাঠামোর ওপরও চাপ বাড়ছে। পরিচালনা ও প্রশিক্ষণের জন্য বড় ডেটা সেন্টার প্রয়োজন, যেখানে অসংখ্য সার্ভার চালু রাখতে বিপুল বিদ্যুৎ লাগে। সার্ভার থেকে উৎপন্ন তাপ নিয়ন্ত্রণেও প্রয়োজন হয় শীতলীকরণব্যবস্থা। কিছু ক্ষেত্রে এতে সরাসরি পানি ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চিপ তৈরির মতো পরোক্ষ প্রক্রিয়াতেও পানির প্রয়োজন রয়েছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) ২০২৫ সালের ‘এনার্জি এ্যান্ড এআই’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে ডেটা সেন্টারগুলোর বিদ্যুৎ ব্যবহার ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে বছরে ৯৪৫ টেরাওয়াট-ঘণ্টায় পৌঁছাতে পারে। একই প্রতিবেদনে ডেটা সেন্টারগুলোর পানির ব্যবহার বৃদ্ধির সম্ভাবনাও তুলে ধরা হয়েছে। একই বছর একটি গবেষণায় ১৭টি ইমেজ জেনারেশন মডেল পরীক্ষা করে দেখা গেছে, মডেলভেদে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সর্বোচ্চ ৪৬ গুণ পার্থক্য থাকতে পারে। অন্যদিকে, একটি ছবির জন্য ঠিক কতটুকু পানি লাগে, তার সর্বজনীন ও সরাসরি পরিমাপ এখনো নেই। ডেটা সেন্টারের শীতলীকরণ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত পানি বিবেচনায় নিলে ছবি প্রতি পানির ব্যবহার কয়েক মিলিলিটার হতে পারে।
পানি বা বিদ্যুতের ব্যবহার ব্যতি রেখেই এই প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে প্রফেসর মো. মোসাদ্দেক হোসেন কামাল বলেন, অবশ্যই এ বিষয়ে পরিকল্পনা করা উচিত যা আমরা ইতোমধ্যে শুরু করেছি এর প্রযুক্তির পাওয়ার কনজিউম গ্রীন করার জন্য একাধিক পরিকল্পনা চলমান রয়েছে। ইহা এ ব্যবহৃত টিপগুলো শুধুমাত্র কুলিং ফ্যান ব্যবহার করে শীতল রাখা সম্ভব নয় তার জন্য তরল কোন পদার্থ ব্যবহার করতে হয়। এআই এর মত এত শক্তিশালী এবং অধিক ব্যবহৃত একটা প্রযুক্তিকে চাইলেই পরিবর্তন করা সম্ভব হয় না আমরাইতোমধ্যে এ আই চিপ কে ডেভেলপ করে গ্রিন করার পরিকল্পনা করেছি। যেহেতু আমাদের দেশে বিদ্যুতের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে আমরা চাইলেও ২৪/৭ বিদ্যুৎ ব্যবহার করে তার সচল রাখতে পারব না ফলে আমরা উদ্যোগ নিয়েছি কিভাবে সৌর বিদ্যুৎ এবং সংশ্লিষ্ট পাওয়ার ব্যবহার করে এ ব্যবহার করা যায় তা তৈরি করতে।
আবার, ধরা যাক কোনো কারণে হঠাৎ এআই সেবা বন্ধ হয়ে গেল, ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলো কিংবা সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিতে বড় ধরনের ত্রুটি দেখা দিল। তখন কী হবে? যারা এআইয়ের সাহায্যে কাজ করলেও নিজেরা বিষয়টি বোঝেন, তারা বিকল্প পদ্ধতিতে কাজ চালিয়ে নিতে পারবেন। কিন্তু যারা তথ্য যাচাই, লেখা, হিসাব কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রায় সব দায়িত্ব প্রযুক্তির হাতে ছেড়ে দিয়েছেন, তাঁদের অনেকেই সমস্যায় পড়তে পারেন। এআই বন্ধ হলেই সব কার্যক্রম থেমে যাবে, এমন নয়। তবে প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানে কাজের গতি কমতে পারে, কিছু সেবা ব্যাহত হতে পারে এবং বিকল্প ব্যবস্থা না থাকলে গুরুত্বপূর্ণ কাজে জটিলতা তৈরি হতে পারে। এ কারণে এআইয়ের পাশাপাশি মৌলিক দক্ষতা, নিজস্ব চিন্তাশক্তি এবং প্রযুক্তি ছাড়াও কাজ করার সক্ষমতা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা বলছে, এআইকে পুরোপুরি এড়িয়ে চলা যেমন বাস্তবসম্মত নয়, তেমনি এর ওপর অন্ধ নির্ভরতাও নিরাপদ নয়। শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে এআইকে সহায়ক হিসেবে ব্যবহার, তথ্য যাচাই, মৌলিক দক্ষতার অনুশীলন এবং ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জ্বালানি ও পানির ব্যবহার সম্পর্কে স্বচ্ছতা এবং পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলার দায় রয়েছে। একজন লেখক যখন নিজে বিষয় নির্বাচন, তথ্য সংগ্রহ, ভাষা নির্মাণ ও সম্পাদনার মধ্য দিয়ে একটি লেখা তৈরি করেন, তখন তাঁর অভিজ্ঞতা ও চিন্তার বিকাশ ঘটে। বিপরীতে, এআইয়ের তৈরি লেখা সামান্য পরিবর্তন করে ব্যবহার করলে সেই অনুশীলনের সুযোগ কমে যায়। এআই দিয়ে করালে তাৎক্ষণিক ফল মিললেও দীর্ঘমেয়াদে দক্ষতা অর্জন বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
সব মিলিয়ে, এআই মানুষের সময় বাঁচাচ্ছে, উৎপাদনশীলতা বাড়াচ্ছে এবং নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। কিন্তু সেই স্বস্তির মূল্য যদি হয় চিন্তার চর্চা কমে যাওয়া, সৃজনশীলতার সংকোচন, প্রযুক্তির ওপর অতিনির্ভরতা কিংবা প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর বাড়তি চাপ, তাহলে অগ্রগতির হিসাব নতুন করে ভাবতে হবে। প্রযুক্তি মানুষের কাজ সহজ করবে, কিন্তু মানুষের চিন্তা, দক্ষতা ও ভবিষ্যৎকে তার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল করে তুলবে না। এ ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।