Image description

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রস্তুতিকাল আরো তিন বছর বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদন করেছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ। এর ফলে এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের নির্ধারিত সময়সীমা ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের পরিবর্তে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ল। গত বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে এক প্লেনারি মিটিংয়ে এ প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। এর ফলে বাংলাদেশ প্রস্তুতি নেয়ার জন্য অতিরিক্ত সময় পেয়েছে। তবে দেশের বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি, স্থবির বিনিয়োগ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের মন্দা কাটানোর জন্য কেবল সময় বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়; কারণ এর আগেও বাংলাদেশের জন্য এই সুযোগ চলমান ছিল। কিন্তু ওই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ কোন অগ্রগতি করতে পারেনি। বিশেষ করে এলডিসি তালিকা থেকে উত্তরণের পর যে সব সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে তারজন্য যে ধরনের বিনিয়োগ দরকার তা বাংলাদেশ আগেও করতে পারেনি।

এমনকি বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ইতোমধ্যে ৮ মাস অতিবাহিত হলেও কোন বিনিয়োগ টানতে পারেনি। এদিকে আগামী দিনে বাংলাদেশের প্রধান রেমিট্যান্স আহরণকারী দেশগুলো নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং সংস্থা ফিচ রেটিংস সতর্ক করেছে। সংস্থাটির মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, রেমিট্যান্স প্রবাহে ঝুঁকি এবং বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে আরো চাপের মুখে পড়তে পারে বাংলাদেশ। এ ধরনের সংকট মোকাবেলায় দেশের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেই। গতকাল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত বন্ধু জাপান সফর করে এসেছেন। আগামী ৫ বছরে বাংলাদেশে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন (যা প্রায় ৬৩০ থেকে ৬৩৫ কোটি মার্কিন ডলার) বেসরকারি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দেশটি। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রায় ২ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি হবে। 

যা দুই দেশের অর্থনীতিতে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। যদিও জাপান থেকে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ আনাই চ্যালেঞ্জ। এর আগে স্বৈরাচার শেখ হাসিনা ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সময় জাপানের সঙ্গে একাধিক চুক্তি, ঋণচুক্তি ও সমঝোতা হয়েছে। কিন্তু সব ‘উদ্যোগের সুফল একই গতিতে’ বাস্তবায়িত হয়নি। কোথাও প্রকল্পের কাজ দীর্ঘায়িত হয়েছে, কোথাও প্রশাসনিক ও আর্থিক জটিলতা তৈরি হয়েছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকা- ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় বড় ধরনের অনুদান ও সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিলেও তার কাক্সিক্ষত অগ্রগতি নেই বললেই চলে। একইভাবে বাংলাদেশের সাথে দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব গড়তে চায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। 

তবে এই প্রতিশ্রুতির পূর্ণ বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং নীতিগত সংস্কারের ক্ষেত্রে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে বাংলাদেশের। এছাড়া প্রতিবেশী ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক উন্নয়ন প্রকল্পগুলোরও ধীরগতি এবং বাস্তবায়ন স্থবিরতা বিদ্যমান। এদিকে চীন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক অংশীদার এবং শীর্ষ বিনিয়োগকারী দেশ হলেও, সরকারের বর্তমান নীতি ও কিছু কৌশলগত কারণে বিনিয়োগের গতি বা ধরনের ক্ষেত্রে কিছুটা পরিবর্তন ও সতর্কতা দেখা যাচ্ছে। দেশটি বাংলাদেশে বিনিয়োগে উদগ্রীব হলেও সঠিক পদক্ষেপের অভাবে দেশটির বিনিয়োগেরও কোন অগ্রগতি নেই। অথচ বাংলাদেশের ভঙ্গুর অর্থনীতির জন্য বর্তমানে দরকার ব্যাপক বিনিয়োগ। কারণ, বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার চীন। 

দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ছাড়িয়ে গেছে ১৯ বিলিয়ন ডলার। বাণিজ্য ভারসাম্যেও আছে বড় পার্থক্য। অর্থনীতিবিদরা এ ঘাটতি কমাতে চীনা বিনিয়োগের বিকল্প নেই বলে উল্লেখ করেছেন। বিশেষ করে শূন্য শুল্কের সুবিধা কাজে লাগানোর পাশাপাশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অবকাঠামো ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন করতে হবে। চীনের সঙ্গে দীর্ঘ ৫০ বছরেরও বেশি সময়ের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাংলাদেশের। বর্তমানে রফতানিতে শূন্য শুল্কের সুবিধা পাচ্ছে টেক্সটাইল পণ্য। যা ২০২৮ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর গেল পাঁচ অর্থবছরের পরিসংখ্যান বলছে, রফতানির পরিমাণ গড়ে প্রায় ৭০ কোটি ডলার হলেও ১৭ থেকে ১৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ। 

চলতি বছরের প্রথম আট মাসে চীনের পণ্য আমদানি-রফতানির মোট মূল্য দাঁড়িয়েছে ৩৪ দশমিক ৭৮ ট্রিলিয়ন ইউয়ান, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। এ সময়ে দেশটির রফতানি বেড়েছে ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ এবং আমদানি বেড়েছে ২২ শতাংশ। অর্থাৎ, রফতানির চেয়ে আমদানির প্রবৃদ্ধি দ্রুত হয়েছে। এই প্রবণতা চীনের বাজারে বিদেশি পণ্যের চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়, যা বাংলাদেশের রফতানিকারকদের জন্য নতুন সুযোগ। 

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, টেক্সটাইল শিল্পে শূন্য শুল্কে বাজার সুবিধা পেয়েও কাজে লাগাতে পারছে না বাংলাদেশ। ঘাটতি কমাতে যোগাযোগ বাড়াতে হবে চীনা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে। অর্থনীতিবিদ ও গবেষক ড. মাহফুজ কবীর বলেন, যদি বাণিজ্য ঘাটতি নিরসন করতে হয়, তাহলে সে ক্ষেত্রে এই সুযোগটাকে কাজে লাগাতে হবে। তার কারণ এ শূন্য শুল্কের সুবিধা খুব বেশিদিন থাকবে না। আমরা যখন এলডিসি গ্র্যাজুয়েট করব, এর পরে কিন্তু তারা আমাদেরকে শূন্য শুল্কের সুবিধাটা দিবে না। সুতরাং চীনের বায়ারদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগটা বাড়াতে হবে। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনের জন্য স্থাপন করা হয়েছে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল। চীনা বিনিয়োগ বাড়াতে এ ধরনের অবকাঠামোগত সুবিধা বাড়ানোর পরামর্শ অর্থনীতিবিদের।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এলডিসি থেকে উত্তরণ পর্যায়ের সুযোগ আমরা অনেকদিন পাচ্ছি। আরও সময় বেড়েছে এটা সাফল্য। তবে আগের সময়ে কিন্তু কোন অগ্রগতি ছিল না। দেশের অর্থনীতির জন্য কোন সু-খবর ছিল না। একই পর্যায়ে আছে দেশ। বরং বড় মার্কেট (কর্নফুলি) থেকে শুরু করে নীলা মার্কেটের ছোট ছোট দোকান পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেছে। আর্থিকখাতের মন্দায় শিল্প কারখানা থেকে শুরু করে বড়-ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। যদিও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নানমুখী তৎপরতায় বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগের আশ^াস মিলছে। যা ইতিবাচক। তবে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), যুক্তরাজ্য, জাপান, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন সময়ে নানাবিধ চুক্তি, ঋণচুক্তি ও সমঝোতা করেছে বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য যার অধিকাংশই বাস্তবায়িত হয়নি।

অবশ্য এদের মধ্যে চীনই একমাত্র দেশ যারা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আন্তরিক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীন বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং বড় বড় প্রকল্পে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ ও অর্থায়ন করে আসছে। এছাড়া জাতিসংঘে এলডিসি উত্তরণের সময় বাড়ানোর প্রস্তাবে চীন ও জি-৭৭ সক্রিয় সমর্থন দিয়েছে। তাই চীনের বিশেষ বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে অন্যান্য প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) বা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি এবং অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে তিন বছরকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত কিছু কৌশলগত পদক্ষেপ নেয়া জরুরি বলে মত বিশেষজ্ঞদের। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিভাগের প্রফেসর ড. সায়মা হক বিদিশা বলেন, চায়নার সঙ্গে বাংলাদেশের একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার জায়গা রয়েছে। সেই জায়গাটাকে নিয়ে কাজ করা দরকার এবং সে জায়গাগুলোতে কিভাবে চায়নিজ বিনিয়োগকারীদের আমরা এখানে আনতে পারব, সেখানে আমাদের অবকাঠামোগত কিছু সমস্যা রয়েছে এবং আমাদের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রয়েছে। একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সংযুক্তি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়াতে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিতে হবে বাংলাদেশকে। যাতে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি না হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক শিক্ষক প্রফেসর ইমতিয়াজ আহমেদ বলেছেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে দীর্ঘদিন বিনিয়োগ কমেছে। নতুন সরকারের সামনে এখন বিনিয়োগকে আবার জাতীয় অর্থনৈতিক কর্মসূচির কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনা বড় চ্যালেঞ্জ। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চীন ও চীনা বিনিয়োগের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে জোরালো সমর্থন রয়েছে। চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দেশটির বিদেশে বিনিয়োগের সক্ষমতা ও আগ্রহের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। দেশটির আমদানি বাড়তে থাকলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য ও কৃষিপণ্যের জন্য বড় ভোক্তা বাজারে প্রবেশের সুযোগও বাড়তে পারে।

সূত্র মতে, এলডিসি উত্তরণে ৩ বছর সময় বাংলাদেশের জন্য বিশেষ করে দেশের অর্থনীতির সক্ষমতা বাড়ানো, রফতানি বহুমুখীকরণ এবং এলডিসি-সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যসুবিধা ও আন্তর্জাতিক সহায়তা হারানোর সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলার প্রস্তুতিতে বড় একটি সময়। জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্য একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন’। ১৯৭৫ সালে এলডিসি তালিকাভুক্ত হওয়া বাংলাদেশের সঙ্গে নেপালকেও এই সুযোগ দিয়েছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ। পরিষদ সভায় ‘গ্রুপ অব ৭৭’ ও চীনের পক্ষে দক্ষিণ এশিয়ার এ দুদেশের স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ পেছানোর বিষয়ে খসড়া প্রস্তাব উপস্থাপন করেন উরুগুয়ের প্রতিনিধি। 

পরে কণ্ঠভোটে প্রস্তাবটি পাস হয়। ওই সেশনে সভাপতিত্ব করেন জাতিসংঘের একাশিতম অধিবেশনের সভাপতি ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। বাংলাদেশের প্রস্তাবের বিষয়ে কোনো দেশের প্রতিনিধি বক্তব্য রাখেননি বা এর বিরোধিতা করেননি। অপরদিকে ফ্রান্স, কানাডা ও আয়ারল্যান্ডের (ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে) প্রতিনিধিরা বাংলাদেশ ও নেপালের এলডিসি উত্তরণের সময় পেছানোর বিষয়ে সমর্থন দিয়ে বক্তব্য রাখেন। তবে সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেয়ার কথা এসেছে তাদের তরফে। এর আগে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্বগ্রহণের পর এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়ে জাতিসংঘে চিঠি পাঠায় বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। 

এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০১৮ সালে। চূড়ান্তভাবে উত্তরণের জন্য প্রস্তুতির সময়সীমা শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৪ সালে। কিন্তু করোনা মহামারীর কারণে অতিরিক্ত সময় পাওয়া যায় দুই বছর। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর এলডিসি তালিকা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশের। এখন সময় পাওয়ায় ২০২৯ সাল পর্যন্ত এলডিসি হিসেবে আগের মত সুবিধা পাবে বাংলাদেশ। 
স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ইউরোপের রফতানি বাজারে শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়ে এলডিসি থেকে বেরিয়ে গেলে সেই সুবিধা থাকার কথা নয়। এজন্য উত্তরণের পর শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা হারানো, ওষুধ ও তৈরি পোশাক শিল্পের সংকট মোকাবিলা এবং বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে ওঠার প্রস্তুতির জন্য এই অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন বলে ব্যবসায়ীরাও দাবি জানিয়ে আসছিলেন।

গত ১৮ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের অনুরোধের পর ৬ এপ্রিল জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে পাঠানো এক পত্রে এ বিষয়ে তার ব্যক্তিগত সহযোগিতা কামনা করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ বিষয়ে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার কথা ২ জুন সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায় অর্থ মন্ত্রণালয়। এরপর এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর বাংলাদেশের অনুরোধের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের কাছে গত ২১ জুলাই সুপারিশ করে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক)। এই ধারাবাহিকতায় গত বৃহস্পতিবার সাধারণ পরিষদে প্রস্তাব পাস হওয়ার মধ্য দিয়ে ওই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হল। এখন সব কিছু ঠিক থাকলে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর উন্নয়নশীল দেশের কাতারে যাবে বাংলাদেশ ও নেপাল।

জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত আইরিন খান বলেন, বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণ করছে শুধু আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়ার কারণে নয়, বরং উত্তরণ আমাদের জনগণের আকাক্সক্ষা। এটি একটি জাতীয় অপরিহার্যতা এবং আমাদের সরকার এ লক্ষ্য অর্জনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। মিশন থেকে বলা হয়, বর্ধিত এই সময়কে কাজে লাগাতে সরকার তিন বছরের একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। এতে প্রতি বছরের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি ও লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ সময়ে কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা, রফতানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা, অবকাঠামো ও সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হবে। অতিরিক্ত সময় কাজে লাগিয়ে প্রতিযোগিতামূলক, বহুমুখী ও টেকসই অর্থনীতি গড়ে তোলা এবং এলডিসি উত্তরণের পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো এখন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেছেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য প্রস্তুতির সময়সীমা আরো তিন বছর বাড়ানোর প্রস্তাব রফতানি বাণিজ্যের জন্য একটা বড় সাফল্য। যা সম্মিলিত প্রয়াসের ফল। সরকারের পক্ষ থেকে বেশ জোরালো পদক্ষেপ ছিল। উত্তরণ পেছাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে জাতিসংঘের মহাসচিবের ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ চেয়ে চিঠি লিখেছেন।

মাহমুদ হাসান খান বলেন, এখন এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আগামী তিন বছরের মধ্যে সফল এবং টেকসই উত্তরণ নিশ্চিত করতে হবে। এবারও সরকার এবং বেসরকারি খাত ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অংশীজনদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সফল ও টেকসই উত্তরণের জন্য কিছু উদ্যোগ চলমান আছে। এলডিসি তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণকালীন এবং উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখার জন্য প্রণীত জাতীয় কৌশলগত রূপরেখাÑ শতভাগ কাজে লাগাতে হবে। এই কৌশল শতভাগ কার্যকর না গেলে আন্তর্জাতিক যেসব বিশেষ সুবিধা যেমন, পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা বা উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে নমনীয় সুদে ঋণসহায়তা পাওয়া এসব সুযোগ ক্রমে সংকুচিত হবে। একই সঙ্গে তিন বছরের মধ্যে রূপান্তরের প্রক্রিয়াকে মসৃণ করা, সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখা ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারগুলো সুসংহত করা না গেলে সামনে বড় বিপদ অপেক্ষা করছে। তবে আমি মনে করি, সে রকম কিছু হবে না এবং ৩ বছরের প্রস্তুতিকালে মসৃণ ও টেকসই উত্তরণের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত হবে বাংলাদেশ বলে উল্লেখ করেন মাহমুদ হাসান খান।