Image description

৩ হাজার ৮২৫ কোটি টাকায় কেনা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ধ্বংসে সরকারের দিকে তাকিয়ে রয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। রক্ষণাবেক্ষণের ঝামেলায় ইসিতে থাকা প্রায় দেড় লাখ ইভিএমের বড় অংশই অকেজো।

ইভিএম ধ্বংসের বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এ এম এম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন। প্রায় দেড় লাখ ইভিএমের হালনাগাদ তথ্য দিতে এ-সংক্রান্ত কমিটিকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ কারণে কমিটি ইভিএম নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে মহা হিসাব নিরীক্ষকের কার্যালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সম্মতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ইসি সূত্র জানায়, ছোট পরিসরে দেড় দশক আগে ইভিএমে যাত্রা শুরু করেছিল তৎকালীন ইসি। নবম সংসদ নির্বাচনের পরে বুয়েটের তৈরি ইভিএম দিয়ে ২০১০ সালে সিটি নির্বাচনের একটি ওয়ার্ডে ব্যবহার করা হয়। পরবর্তী কমিশন সেই ইভিএমে ত্রুটি পেয়ে ২০১২ সালে আর কোনো নির্বাচনে ব্যবহার করেনি। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্প হাতে নেয় ইসি। এ সময় দেড় লাখ ইভিএম মজুত থাকলেও একাদশ সংসদ নির্বাচনে মাত্র ছয়টি আসনে তা ব্যবহার করে। এর ধারাবাহিকতায় ২০২২ সালের পরে তৎকালীন ইসি স্থানীয় সরকারের ভোটে ইভিএম ব্যবহার করে। তবে শেষ পর্যন্ত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ইভিএমের ব্যবহার হয়নি।

চব্বিশের ৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পর বর্তমান ইসি দায়িত্ব নিলে আর কোনো নির্বাচনেই ইভিএম ব্যবহার করা হয়নি। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ও স্থানীয় সরকারের আইন থেকে ইভিএম ব্যবহারের বিষয়টি বিলুপ্ত করা হয়। ইভিএম অধ্যায়ের ইতি ঘটার মধ্যে হাজার কোটি টাকার এসব মেশিন রক্ষণাবেক্ষণ ও গুদাম ভাড়া নিয়ে বেকায়দায় পড়েছে ইসি। ইভিএমের ভবিষ্যৎ নিয়ে ১২ অক্টোবর সিইসির সভাপতিত্বে কমিশন সভা শেষে ইসির সিদ্ধান্ত তুলে ধরে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানান, চূড়ান্ত নিষ্পত্তিসহ আগের কমিটির সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, সে বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। 

তিনি বলেন, ইভিএম নিয়ে অনেক ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন চায়, যত দ্রুত সম্ভব ইভিএম ইস্যুটি নিষ্পত্তি হোক। তবে দুদকসহ বিভিন্ন সংস্থার তদন্ত এবং অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়ার জন্য যেসব আলামত সংরক্ষণ করা প্রয়োজন, সেগুলো রেখে দেওয়া হবে। এরপর অবশিষ্ট ইভিএমগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নেবে ইসি। ইসি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেড় লাখের মধ্যে ৮৬ হাজারের মতো ইভিএম প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরিতে (বিএমটিএফ) সংরক্ষিত রয়েছে। প্রায় ৬২ হাজার যন্ত্র রয়েছে মাঠপর্যায়ে। এ ছাড়া প্রায় ১ হাজার ২০০ ইভিএম ইসি ভবনে রয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণের ঝামেলায় ইভিএমের একটি বড় অংশই অকেজো হয়ে গেছে। ২০১০ সালে ইভিএম চালুর পর স্থানীয় নির্বাচনে ব্যবহার হলেও এ টি এম শামসুল হুদা কমিশন সংসদ নির্বাচনে কাজে লাগাতে পারেনি। ২০১২ সালে কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন ইসি আগের ইভিএমকে অনেকটা অকেজো অবস্থায় ফেলে গিয়েছিল।

কে এম নূরুল হুদার কমিশনের সময় ৩ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে দেড় লাখ ইভিএম কেনার প্রকল্প অনুমোদন পায়। ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে ছয়টি সংসদীয় আসনে ইভিএম ব্যবহারও হয়। এসব যন্ত্রের আয়ুষ্কাল ১০ বছর ধরা হলেও পাঁচ বছরের মাথায় বেশির ভাগ অকেজো হয়ে গেছে। কাজী হাবিবুল আউয়াল কমিশন দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে অন্তত দেড় শ আসনে ইভিএমে ভোট করার পরিকল্পনা নিলেও শেষে তা থেকে সরে আসে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইসি আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ইভিএম এখন আমাদের কাছে বোঝা। এটার কোনো ব্যবহার নেই এবং লাখো ইভিএম মেয়াদোত্তীর্ণও হয়ে গেছে।  দ্রুত এগুলো ধ্বংস করা হবে। তিনি জানান, একটা কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। একজন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে কোন জায়গায় কতগুলো, কী অবস্থায় ইভিএম রয়েছে তা ইনভেনটরি (ক্যাটালগ) করবে। সরকার ও দুদকের সঙ্গে আলোচনার দরকার পড়তে পারে-এগুলো কীভাবে নিষ্পত্তি করা যায়। এগুলো দিয়ে কোনো কাজ হবে না। তিনি বলেন, বেশির ভাগ ইভিএম আছে মেশিন টুলস ফ্যাক্টরিতে। কিছু আছে বাইরে। সবাই ভাড়া চাচ্ছে। এত ভাড়া দেওয়া মুশকিল। তাই আমরা চাচ্ছি-যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে পারি। তাহলে আমরা দায়বদ্ধতা থেকে আপাতত বেঁচে যাই।

কীভাবে নিষ্পত্তি করা হবে-এ বিষয়ে এ নির্বাচন কমিশনার জানান, এর মানে সবগুলোই ধ্বংস করা নয়। সরকার যদি মনে করে কোনো অংশ ব্যবহার করতে চায়, তাহলে করবে। এজন্য কারিগরি কমিটি করা হবে। অন্য কোনো কাজে যদি লাগানো যায় এসব যন্ত্র তাহলে করবে; বিক্রি করা গেলে করবে। যেগুলো বেশি খারাপ সেগুলো যদি ধ্বংস ছাড়া উপায় না থাকে তা করা হতে পারে। আমাদের কাছে ইভিএমের সব শেষ তথ্য নিয়ে রিপোর্ট এলে বিশেষজ্ঞ কমিটির সঙ্গে বসে কী করা যায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আবদুর রহমানেল মাছউদ জানান, যদি দেখা যায় কিছু ধ্বংস করা দরকার, তা হবে। মামলা থাকায় দুদকের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। সরকারকে অনুরোধ করা হয়েছে, ইসির কমিটিতে একজন ম্যাজিস্ট্রেট দেওয়ার জন্য। ইভিএম কোনটা কোন অবস্থায় রয়েছে তা জেনে নিষ্পত্তি করা হবে। আমরা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে চাই। প্রতিবেদন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।