Image description

অনুমতি ছাড়াই জনপ্রিয় দেশিবিদেশি শিল্পীদের নিয়ে কনসার্ট আয়োজনের ঘোষণা দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে অসাধু চক্র। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, অগ্রিম টিকিট বিক্রি, শেষ মুহূর্তে অনুষ্ঠান স্থগিত এবং টিকিটের অর্থ ফেরত নিয়ে অনিশ্চয়তা-ইত্যাদি ঘটনার মধ্য দিয়ে এ প্রতারণা কারবার চালানো হচ্ছে। সম্প্রতি প্রাইম ওয়েভ কমিউনিকেশনসসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, বারবার প্রতারণা করে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে সাধারণ মানুষের অর্থ। 

সবচেয়ে বেশি সমালোচনার জন্ম দিয়েছে প্রাইম ওয়েভ কমিউনিকেশনসের পাকিস্তানি ব্যান্ড কাভিশের ঢাকার কনসার্ট আয়োজন নিয়ে। পরপর দুই বছর একই কনসার্টের নামে হাজার হাজার টিকিট বিক্রি করে শেষ পর্যন্ত দুবারই আয়োজনে ব্যর্থ হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, এরপর আর টিকিটের টাকা ফেরত দিচ্ছে না প্রতিষ্ঠানটি।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, প্রথম ২০২৫ সালের ৫ ডিসেম্বর ‘ওয়েভ ফেস্ট : ফিল দ্য উইন্টার’ শিরোনামে ঢাকার মাদানী অ্যাভিনিউয়ের কোর্টসাইড এলাকায় অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল। অনুমতি না পাওয়ার কথা জানিয়ে আয়োজন স্থগিত করে প্রাইম ওয়েভ কমিউনিকেশনস। পরবর্তীতে আবারও ওই কনসার্ট আয়োজনের ঘোষণা দিয়ে আগের চেয়ে বেশি মূল্যে টিকিট বিক্রি করে তারা। এরপর গত ২৩ সেপ্টেম্বর আবারও কনসার্ট স্থগিত করে প্রতিষ্ঠানটি। এতে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে দর্শকদের মধ্যে। তারা টিকিটের টাকা ফেরত চাইতে প্রতিষ্ঠানের ফোন নম্বরে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হচ্ছেন। নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। এ বিষয়ে অনুসন্ধানের জন্য এই প্রতিবেদক ঠিকানা অনুযায়ী, বারিধারা ডিওএইচএস-এর ১০ নম্বর লেনের ৫৩০/এ বাসার চতুর্থ তলায় গেলে রাহাত নামে একজন অফিস সহকারীকে পান। ঘটনার ব্যাপারে তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

তিনি বলেন, ‘অফিসের সবাই ঢাকার বাইরে গেছেন’। এদিকে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, বারিধারায় ওই বাসাটির ঠিকানা ব্যবহার করে কনসার্টের টিকিট বিক্রির প্রতারণা কারবার চালানো হচ্ছে।  প্রাইম ওয়েভ কমিউনিকেশনস থেকে কনসার্টের টিকিট কিনে প্রতারণার শিকার নিকুঞ্জ-২ এর বাসিন্দা রাফজানি খান বলেন, ‘ওরা যোগাযোগ বন্ধ রেখেছে। এমনকি তাদের পোস্টের নিচে কমেন্ট সেকশন অফ করে রেখেছে। আমি বারবার এমন প্রতারণার পর তাদের আর বিশ্বাস করতে পারছি না। একই প্রতারণার ঘটনা তারা দুবার পুনরাবৃত্তি করেছে।

ভবিষ্যতে তাদের কোনো শোতে অংশ নেওয়ারও আমার আর কোনো আগ্রহ নেই। আমি শুধু আমার টিকিটের টাকা ফেরত চাই।’ আরেকজন ভুক্তভোগী রাজধানীর উত্তরার বাসিন্দা চৈতি খন্দকার বলেন, ‘প্রাইম ওয়েভের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডেনিয়েলের মুঠোফোনে কল দিলে তিনি খারাপ আচরণ করেন এবং টিকিটের টাকা ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানান। গত বছরও একই কনসার্টের নামে টিকিট বিক্রি করা হয়েছে। এ বছরও একই কনসার্টের নামে আবারও টিকিট বিক্রি হয়। যথারীতি এবারও আয়োজন করতে পারেনি। আমি নিজে এবং আরও ৭ বন্ধু সবাই ভোক্তা অধিকারে অভিযোগ জানাব। আমরা টিকিটের টাকা ফেরত চাই।’

আরেক ভুক্তভোগী বাতিন স্টুডিওর প্রজেক্ট ম্যানেজার নাফিস আল জাওয়াদ বলেন, ‘অনেকেই টিকিটের টাকা রিফান্ড চাচ্ছেন, কিন্তু আয়োজকদের কাছ থেকে কোনো রেসপন্স পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতারণার শিকার হচ্ছেন সবাই। গত বছর ডিসেম্বরেও ঠিক একই কাণ্ড হয়েছিল। কনসার্টের ঠিক আগের দিন রাতে অর্গানাইজাররা শো পিছিয়ে দেয়। এরপর আমার মতো দু-একজন টাকা রিফান্ড চেয়ে আমি সরাসরি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে প্রাইম ওয়েভ কমিউনিকেশনসের বিরুদ্ধে অভিযোগ করি। পরবর্তীতে শুনানিতে রায় আমাদের পক্ষে আসে এবং পাঁচ দিনের মধ্যেই আমি আমার পুরো টাকা রিফান্ড পেয়ে যাই। এরপর সবাইকে সচেতন করি।’

ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের পরিচালক আতিয়া সুলতানা বলেন, ‘আমরা এ বিষয়ে অবগত হয়েছি। আমাদের আইন অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা নেব। অভিযোগকারীদের দাবি, অনুষ্ঠানের জন্য দুবারে প্রায় ১০ থেকে ২০ হাজার দর্শকের কাছ থেকে টিকিটের টাকা নেওয়া হয়েছে।’ তবে প্রাইম ওয়েভ কমিউনিকেশনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও শিরোনামহীন ব্যান্ডের সাবেক ম্যানেজার ডেনিয়েল এই প্রতিবেদকের কাছে দাবি করেন, তারা ৩৫০০ টিকিট বিক্রি করেছেন। কিন্তু এ বিষয়ে কাগজপত্র দেখতে চাইলে তৎক্ষণাৎ কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারেননি।

টিকিটের টাকা ফেরতের বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা কিছু টাকা ফেরত দিয়েছি। আগামী মাসে আবারও এই কনসার্টের আয়োজন করতে যাচ্ছি। আশা করছি তখন সব সমস্যার সমাধান হবে।’ দর্শকদের এ বিষয়ে কোনো ঘোষণা দিয়েছেন কি না, কিংবা দর্শকদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধের কারণ কি- জানতে চাইলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। ব্যান্ড লিডার জিয়া বলেন, ‘একই কনসার্টে অংশ নেওয়ার কথা ছিল জনপ্রিয় ব্যান্ড দল শিরোনামহীনের। নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে এভাবে বিভিন্ন অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে ক্ষতি আমাদের সবার। 

আমরাও পেমেন্ট থেকে বঞ্চিত হই। কোনো উদ্যোক্তা তৈরি হবে না এভাবে। এমন ঘটনায় দর্শকদের টিকিটের টাকা ফেরত দেওয়া হোক। আমি চাইব সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এ বিষয়টি ক্ষতিয়ে দেখবে- যেন উদ্যোক্তা দর্শক শিল্পী সবার মঙ্গল হয়।’ অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু প্রাইম ওয়েভ কমিউনিকেশনসই নয়, আরও অনেক চক্র একই কাণ্ড করে দর্শকদের সঙ্গে প্রতারণা করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ফলে ইভেন্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে দর্শকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।