Image description

দেশে বারবার জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে বিপর্যয় এবং বড় ধরনের বিভ্রাটের ঘটনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার সক্ষমতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় বেশি হলেও জ্বালানির সংকট, সঞ্চালন অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং পর্যাপ্ত কার্যকর ব্যাকআপের অভাবে বড় কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র বা সঞ্চালন লাইনে ত্রুটি দেখা দিলে তা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। আগামী নভেম্বরের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে পারমাণবিক বিদ্যুৎও যুক্ত হওয়ার কথা। নতুন ও আধুনিক প্রযুক্তির এসব বিদ্যুতের চাহিদা সামাল দিতে জাতীয় গ্রিড কতটা প্রস্তুত, তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাঁদের মতে, অতীতের গ্রিড বিপর্যয়ের অভিজ্ঞতা এবং নতুন প্রযুক্তির বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় নিয়ে গ্রিডের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়নে এখনই জোর দেওয়া জরুরি।


গত মঙ্গলবার মেঘনাঘাট এলাকায় জাতীয় গ্রিডে কারিগরি ত্রুটির পর ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট সামনে এনেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, উৎপাদন থেকে বিতরণ পর্যন্ত গ্রিড সুরক্ষায় সমন্বিত ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তিগত সুরক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ না করা হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকি এড়ানো কঠিন হবে।

এ বিষয়ে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিসিবি) ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কালের কণ্ঠকে বলছেন, গ্রিডের ত্রুটি, দুর্ঘটনা ও বিপর্যয় মোকাবেলায় নিয়মিত কাজ করছেন তাঁরা। এ ক্ষেত্রে অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো স্পিনিং রিজার্ভ বা আকস্মিক উৎপাদন ঘাটতি সামাল দেওয়ার মতো অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সক্ষমতা।

কার্যকর স্পিনিং রিজার্ভ নিশ্চিত করা গেলে বড় কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়া বা উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাব সামাল দেওয়া সহজ হয়।

দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে সরকার বড় পরিকল্পনা নিয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্য রয়েছে। একই সময়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা। এসব বিদ্যুৎ দেশের উৎপাদনব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করলেও সঞ্চালন ও গ্রিড পরিচালনায় নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি করতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন সূর্যালোকের প্রাপ্যতার ওপর নির্ভরশীল। ফলে আবহাওয়া ও দিনের সময় অনুযায়ী উৎপাদনে দ্রুত পরিবর্তন আসতে পারে। গ্রিডে এ ধরনের পরিবর্তন সামাল দেওয়ার মতো প্রযুক্তি, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও পর্যাপ্ত রিজার্ভ সক্ষমতা থাকা প্রয়োজন। অন্যদিকে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কোনো কারণে হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে বিকল্প উত্স থেকে ঘাটতি পূরণের সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

এ বিষয়ে ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যানশিয়াল অ্যানালিসিসের (আইইইএফএ) প্রধান বিশ্লেষক শফিকুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাম্প্রতিক গ্রিড বিপর্যয়ের প্রকৃত কারণ এখনো চিহ্নিত হয়নি। কারিগরি কমিটির তদন্তে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। তবে সঞ্চালন লাইনে কোনো ত্রুটির পর ফ্রিকোয়েন্সির ভারসাম্য নষ্ট হলে তার ক্যাসকেডিং ইফেক্ট তৈরি হতে পারে। এতে নিরাপত্তাব্যবস্থার অংশ হিসেবে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্রিড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং বড় ধরনের বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘সামনে দেশের বিদ্যুত্ব্যবস্থায় পারমাণবিক বিদ্যুৎ যুক্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকার বড় পরিসরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়েছে। এসব বিবেচনায় নিয়ে জাতীয় গ্রিডের আধুনিকায়নে এখনই গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে গ্রিডে ফ্রিকোয়েন্সির পরিবর্তন এবং বিদ্যুতের চাহিদা ও উৎপাদনের আকস্মিক ভারসাম্যহীনতা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে হবে।’

শফিকুল আলম বলেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি আবহাওয়ানির্ভর ও পরিবর্তনশীল। সূর্যালোক থাকলে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন দ্রুত বাড়তে পারে, আবার সূর্যালোক কমে গেলে উৎপাদন হঠাৎ কমে যেতে পারে। ভবিষ্যতে গ্রিডে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের অংশ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লে এ ধরনের ওঠানামা সামাল দেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ হবে। তাই ১০ হাজার মেগাওয়াটের বেশি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ যুক্ত করার লক্ষ্য থাকলে তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গ্রিডেও বিনিয়োগ ও আধুনিকায়ন করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘রুফটপ সোলারের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্মার্ট মিটারের ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাত্ক্ষণিকভাবে জানতে পারবে কখন এবং কি পরিমাণ বিদ্যুৎ রুফটপ সোলার থেকে গ্রিডে আসছে। এতে বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য রক্ষা সহজ হবে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন হঠাৎ কমে বা বেড়ে গেলে কিংবা চাহিদায় আকস্মিক পরিবর্তন এলে ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ ব্যবস্থা গ্রিডের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’

উৎপাদন সক্ষমতা বেশি, কার্যকর ব্যাকআপে ঘাটতি : দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থাপিত সক্ষমতা প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াট; কিন্তু স্থাপিত সক্ষমতা আর প্রয়োজনের সময় বাস্তবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা এক নয়। গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানির সংকটের কারণে সব কেন্দ্র থেকে সব সময় পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায় না। ফলে কোনো বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে অন্য কেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়িয়ে ঘাটতি পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা গ্রিড বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ। চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন নিশ্চিত করা না গেলে এবং আকস্মিক ঘাটতি পূরণের মতো পর্যাপ্ত স্পিনিং রিজার্ভ না থাকলে গ্রিডের ওপর চাপ বাড়ে। এ অবস্থায় সঞ্চালন লাইনে কোনো ত্রুটি দেখা দিলে পরিস্থিতি আরো জটিল হতে পারে। এর আগে গত মাসে হঠাৎ ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় আদানি পাওয়ারের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশে ওই কেন্দ্রের বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছিল। তখন অন্য কেন্দ্র থেকে প্রয়োজনীয় উৎপাদন বাড়াতে না পারায় দেশজুড়ে লোডশেডিং বেড়ে যায়।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিপিডিবির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার প্রায় দ্বিগুণ হলেও ব্যাকআপে বড় ঘাটতি রয়েছে, যার ফলে বড় একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কারিগরি ত্রুটির কারণে আকস্মিক বন্ধ হয়ে গেলে জ্বালানির অভাব ও পরিচালনগত সীমাবদ্ধতার কারণে তাত্ক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুত্ব্যবস্থায় বাড়তি চাপ তৈরি হয়।’

বারবার বিপর্যয়, একই উদ্বেগ : গত এক দশকে জাতীয় গ্রিড ও গুরুত্বপূর্ণ গ্রিড উপকেন্দ্রে একাধিক বড় ধরনের বিপর্যয় ও বিদ্যুিবভ্রাটের ঘটনা ঘটেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালের ২ মে জাতীয় গ্রিডের আংশিক বিপর্যয়ে ৩২ থেকে ৩৭টি জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়। ভৈরবের কাছে ২৩০ কেভি সঞ্চালন লাইনের টাওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর ওই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। ২০২২ সালের ৪ অক্টোবর জাতীয় গ্রিড বিপর্যয়ে উত্তরাঞ্চলের কিছু এলাকা ছাড়া ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল ও ময়মনসিংহসহ দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল বিদ্যুত্হীন হয়ে পড়ে। ২০২৩ সালের ৫ অক্টোবর আমিনবাজার গ্রিড উপকেন্দ্রে ২৩০ কেভি সার্কিট ব্রেকার বিস্ফোরণে ঢাকা ও সাভারের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়। ২০২৫ সালের ১১ মার্চ একই উপকেন্দ্রে ট্রান্সফরমারের কারিগরি ত্রুটিতে ঢাকার কয়েকটি এলাকায় অন্তত দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকে। ওই বছরের ২৬ এপ্রিল আমিনবাজার উপকেন্দ্রে ত্রুটিতে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়।

সর্বশেষ গত মঙ্গলবারের ঘটনা আবার দেখিয়েছে, সঞ্চালনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কোনো অংশে ত্রুটি দেখা দিলে তার প্রভাব একাধিক অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে প্রতিটি ঘটনার কারণ এক নয়। কোথাও সঞ্চালন লাইনের ত্রুটি, কোথাও উপকেন্দ্রের যন্ত্রপাতির সমস্যা, আবার কোথাও উৎপাদন ও সঞ্চালনব্যবস্থার ভারসাম্যহীনতা বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রিড বিপর্যয় ঘটলেই তা বড় দুর্ঘটনার ইঙ্গিত, এমন নয়। তবে একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটলে এর অন্তর্নিহিত কারণ অনুসন্ধান, ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো চিহ্নিত করা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

আগামী দিনে পারমাণবিক বিদ্যুৎ এবং বিপুল পরিমাণ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ আরো বাড়বে। তাই শুধু উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ালেই চলবে না; উৎপাদন ও চাহিদার তাত্ক্ষণিক ভারসাম্য রক্ষা, পর্যাপ্ত স্পিনিং রিজার্ভ নিশ্চিত করা এবং গ্রিডের নিরাপত্তাব্যবস্থা আধুনিকায়নে সমন্বিত বিনিয়োগ প্রয়োজন। অন্যথায় একটি সঞ্চালন লাইন বা উপকেন্দ্রের ত্রুটিও বড় অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে।