মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা নির্ধারিত ক্যাম্প থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ছে। তাদের কেউ কেউ ভুয়া পরিচয় ও জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে ভোটার হওয়ার চেষ্টা করছে। এতে ঝুঁকির মুখে পড়ছে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে থাকা প্রায় ১৩ কোটি নাগরিকের তথ্যভান্ডার। রোহিঙ্গাদের অনেকে এরই মধ্যে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), জন্মনিবন্ধন ও পাসপোর্ট সংগ্রহ করেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব এনআইডি ও পাসপোর্ট ব্যবহার করে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনাও সামনে এসেছে।
গত সোমবার কক্সবাজার সদর উপজেলায় ভোটার হতে গিয়ে দুই রোহিঙ্গা ধরা পড়ে। পরে তাদের পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়। এর আগে ঢাকার ধানমন্ডি থানায়ও ভোটার হতে গিয়ে ধরা পড়েছিল এক রোহিঙ্গা। ইসি কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, রোহিঙ্গারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ায় তাদের শনাক্ত করা এবং ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি ঠেকানো ক্রমেই কঠিন হচ্ছে।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের কাছে থাকা রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক তথ্যভান্ডার ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ওই তথ্যভান্ডারের সঙ্গে ভোটার নিবন্ধনের সময় নেওয়া আঙুলের ছাপ মিলিয়ে দেখা গেলে আগে থেকে ভোটার হওয়া রোহিঙ্গাদের শনাক্ত করার পাশাপাশি নতুন করে তাদের ভোটার হওয়াও ঠেকানো সম্ভব হবে।
ইসি সূত্র জানায়, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ঝুঁকি বিবেচনায় কক্সবাজার, রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও চট্টগ্রামের ৩২টি উপজেলাকে বিশেষ নজরদারির আওতায় রাখা হয়েছে। এসব এলাকায় ভোটার হতে হলে বিশেষ ফরম পূরণ করতে হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সভাপতি এবং উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা সদস্য সচিব করে গঠিত বিশেষ কমিটি আবেদন যাচাই করে। কমিটিতে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধিরাও রয়েছেন। এ ব্যবস্থায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোয় রোহিঙ্গাদের ভোটার হওয়া তুলনামূলক কঠিন হলেও তারা দেশের অন্য এলাকায় গিয়ে ভোটার হওয়ার চেষ্টা করছেন।
ডাটাবেজের প্রবেশাধিকার চায় ইসি এ বিষয়ে কথা হলে ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ কালবেলাকে বলেন, রোহিঙ্গারা এখন দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। এ কারণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইউএনএইচসিআরের কাছে থাকা তাদের তথ্যভান্ডারে প্রবেশাধিকার চাওয়া হচ্ছে।
এরই মধ্যে রোহিঙ্গারা ভোটার হয়েছে কি না, সেটি যাচাইয়ের কোনো পরিকল্পনা কমিশনের রয়েছে? জানতে চাইলে তিনি বলেন, এরই মধ্যে রোহিঙ্গারা ভোটার হয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। এ জন্য তথ্যভান্ডারটি দরকার। এটি পাওয়া গেলে আগে থেকে ভোটার হওয়া রোহিঙ্গাদের শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। একই সঙ্গে নতুন করে ভোটার হতে গেলেও তাদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
এর আগে গত বছরের ১৯ মার্চ ইউএনএইচসিআরের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে ইসির জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের কর্মকর্তাদের বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে তৎকালীন মহাপরিচালক এ এস এম হুমায়ুন কবীর জানিয়েছিলেন, কক্সবাজারে নিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের তথ্য যাচাইয়ের জন্য নির্বাচন কমিশনকে তথ্য দিতে সম্মত হয়েছে ইউএনএইচসিআর। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সংস্থাটির একটি সমঝোতা স্মারকও (এমওইউ) রয়েছে।
তৎকালীন মহাপরিচালক বলেন, রোহিঙ্গাদের তথ্যভান্ডার পাওয়ার জন্য দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা চলছে। ২০১৮ সাল থেকে এ উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক হওয়ার পর তথ্য বিনিময়ের পদ্ধতি এবং কীভাবে এসব তথ্য ব্যবহার করা হবে, তা নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গার তথ্যভান্ডারটি নির্বাচন কমিশন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নাকি অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে থাকবে, তা নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের প্রয়োজন ছিল। পরে তথ্যভান্ডারটি নির্বাচন কমিশনে রাখার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এতে সম্মতি দেয়। তবে তথ্য কীভাবে, কোথায় ও কখন ব্যবহার করা হবে, তা নির্ধারণে আরও আলোচনা প্রয়োজন।
তার মতে, রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক তথ্য পাওয়া গেলে আঙুলের ছাপ যাচাইয়ের মাধ্যমেই তাদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এতে ভোটার নিবন্ধনের সময় জালিয়াতি প্রতিরোধে কমিশনের কাজ সহজ হবে। বৈঠকে পাসপোর্ট-সংক্রান্ত বিষয়ও আলোচনায় এসেছিল।
তথ্য বিনিময়ে দীর্ঘসূত্রতা রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক তথ্য ব্যবহারের উদ্যোগ থাকলেও তা কার্যকর করার প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন পর্যায়ে সমন্বয়ের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে বসবাসরত বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের তথ্যভান্ডারের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকায় নিবন্ধিত নাগরিকদের আঙুলের ছাপ মিলিয়ে দেখতে একটি সুরক্ষিত অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস (এপিআই) সংযোগ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে গত ৪ জুন শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়, কক্সবাজারকে অনুরোধ জানানো হয়। পরে ১০ জুন নাগরিক নিবন্ধনের সময় সংগ্রহ করা আঙুলের ছাপের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের তথ্যভান্ডারে সংরক্ষিত বায়োমেট্রিক তথ্যের মিল যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার ইউএনএইচসিআরের সাব-অফিস প্রধানকে অনুরোধ জানান। এর জবাবে ১২ জুলাই ইউএনএইচসিআরের সাব-অফিস জানায়, বাংলাদেশ সরকারের কাছে তথ্য হস্তান্তরসহ উন্নত তথ্য প্রক্রিয়াকরণের ক্ষেত্রে সংস্থাটির অংশীদার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিশেষত মিয়ানমার অনুবিভাগ। তথ্যভান্ডারের হালনাগাদ সংস্করণ প্রস্তুতের কার্যক্রম মহাপরিচালকের (মিয়ানমার উইং) মতামতের অপেক্ষায় রয়েছে। এ-সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহের বিষয়ে ওই বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়।
সূত্র আরও জানায়, গত মাসে বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে বসবাসরত বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের বায়োমেট্রিক ডাটাবেজের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত নাগরিকদের ফিঙ্গারপ্রিন্ট ম্যাচিংয়ের জন্য এপিআই সংযোগ স্থাপনের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের কাছে চিঠি দিয়েছে ইসি।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশি নাগরিকদের পরিচয় নিবন্ধন চলমান রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ও ইউএনএইচসিআরের সমন্বিত তত্ত্বাবধানে প্রস্তুতকৃত বাংলাদেশে আশ্রিত জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের ডাটাবেজ রয়েছে। এপিআইয়ের মাধ্যমে উক্ত ডাটাবেজে রক্ষিত রোহিঙ্গাদের আঙুলের ছাপের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত সংশ্লিষ্ট নাগরিকের ফিঙ্গারপ্রিন্ট ম্যাচিংয়েরর মাধ্যমে যাচাই করা গেলে জাতীয় তথ্যভান্ডারের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
জানা যায় যে, এরই মধ্যে উল্লিখিত ডাটাবেজ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে, যা বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলে (বিসিসি) হোস্টিং করা হয়েছে। এখন, নির্বাচন কমিশনে সংরক্ষিত ভোটার তথা এনআইডি ডাটাবেজের সঙ্গে এপিআই স্থাপিত হলে কোন ডাটা স্থানান্তরিত হবে না বা ব্যক্তিগত তথ্য দিতে হবে না, শুধু এনআইডির সঙ্গে ফিঙ্গারপ্রিন্ট ম্যাচ হচ্ছে কি না, তা যাচাই হবে। দেশের স্বার্থে জরুরি ভিত্তিতে ম্যাচিং কার্যক্রম শুরু হওয়া প্রয়োজন।
জাতীয় নিরাপত্তায় উদ্বেগ রোহিঙ্গাদের হাতে বাংলাদেশি এনআইডি, জন্মনিবন্ধন ও পাসপোর্ট পৌঁছে যাওয়ার পেছনে সংঘবদ্ধ প্রতারকচক্রের তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে। কক্সবাজারের আশ্রয়শিবির থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এ চক্রের সদস্যরা সক্রিয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। ভুয়া নাম-ঠিকানা ও জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে এসব পরিচয়পত্র সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের পরিচয়পত্র ব্যবহার করে একাধিক সিম কার্ড সংগ্রহ এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করে বিদেশে গিয়ে কেউ অপরাধে জড়ালে দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে বিষয়টি শুধু ভোটার তালিকার শুদ্ধতা রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; জাতীয় পরিচয় ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি বা অবৈধভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে বলে সন্দেহ হলে সংশ্লিষ্ট এনআইডি যাচাই করে লক বা ব্লক করার ব্যবস্থাও নেয় নির্বাচন কমিশন।
১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে ১১ লাখ ৭৭ হাজার ৯৬২ জন রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। তাদের পরিবার সংখ্যা ২ লাখ ৪৫ হাজার ২২১।
কক্সবাজারে পুরোনো দুটি নিবন্ধিত ক্যাম্প ও নতুন ৩১টি ক্যাম্পসহ মোট ৩৩টি ক্যাম্প রয়েছে। এর মধ্যে উখিয়ায় ২৬টি এবং টেকনাফে সাতটি। এসব ক্যাম্পের জন্য প্রায় ৮ হাজার একর জমি ব্যবহৃত হচ্ছে। এ ছাড়া নোয়াখালীর ভাসানচরে বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের জন্য গড়ে তোলা ক্যাম্পের আয়তন প্রায় ৪৩২ একর।
অন্যদিকে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকটের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। সেখানে বলা হয়, দীর্ঘায়িত এ মানবিক সংকট বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের পাশাপাশি পুরো অঞ্চলের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও বহুপক্ষীয় পর্যায়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বিশাল এই জনগোষ্ঠীর নিবন্ধন ও ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি দেশের জাতীয় পরিচয়ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও এখন গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, ইউএনএইচসিআরের বায়োমেট্রিক তথ্যভান্ডারের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের তথ্য যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা চালু করা গেলে রোহিঙ্গাদের অবৈধভাবে ভোটার হওয়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে। তবে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে তথ্যের নিরাপদ ব্যবহার, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয় এবং নিয়মিত যাচাই নিশ্চিত করতে হবে।