Image description

একদিকে দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কমছে শিক্ষার্থী। আবার শিক্ষকদের বড় একটি অংশের নেই পেশাগত প্রশিক্ষণ।

ইংরেজি ও গণিতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পাঠদান করছেন এমন শিক্ষক, যাঁদের স্নাতক পর্যায়ে ওই বিষয় পড়ার অভিজ্ঞতা নেই। পাশাপাশি পরিবারের আর্থিক সংকট, বাল্যবিবাহ, প্রাইভেট-কোচিংনির্ভর পড়ালেখা, বারবার কারিকুলাম পরিবর্তন এবং দুর্বল শিখনমানের চাপ সামলাতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। সব মিলিয়ে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তর মাধ্যমিক শিক্ষা বর্তমানে ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে।

বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৫ প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে উদ্বেগজনক এই চিত্র।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ছিল প্রায় ৮৬ লাখ ৩৮ হাজার। আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ৯০ লাখ ৬৩ হাজারের বেশি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শিক্ষার্থী কমেছে চার লাখের বেশি। অথচ শিক্ষার্থী কমলেও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা না কমে বরং বেড়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়া শুধু জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের বিষয় নয়; এর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখতে না পারা, শিক্ষার মান নিয়ে অসন্তোষ এবং পরিবারের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। মাধ্যমিক শিক্ষার দুর্বলতা শুধু একটি স্তরের সমস্যা নয়; এর প্রভাব পড়ে উচ্চ মাধ্যমিকে উত্তরণ, উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের ওপরও।

শিক্ষার্থী কমলেও বাড়ছে প্রতিষ্ঠান : ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে জুনিয়র মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ সরকারি-বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছিল ১৯ হাজার ২১১টি। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ছিল ৭৪ লাখ ৩৯ হাজারের বেশি। ২০২৪ সালে বিদ্যালয় ছিল ১৯ হাজার ১১৭টি, আর শিক্ষার্থী ছিল ৭৮ লাখ ৪৭ হাজার ৫৪৬ জন।

অর্থাৎ এক বছরে বিদ্যালয় বেড়েছে ৯৪টি, কিন্তু শিক্ষার্থী কমেছে চার লাখ আট হাজার ৫০৭ জন। স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানকারী কিছু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী রয়েছে। সব ধরনের প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীসংখ্যা ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৬ লাখ ৩৮ হাজারে।

সূত্র জানায়, সাধারণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ২০১৮ সালের প্রায় ৮৮ লাখ ৫৭ হাজার থেকে কমে ২০২৫ সালে ৭০ লাখ ৭৪ হাজারে দাঁড়িয়েছে। সাত বছরে কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ শিক্ষার্থী। একই সময়ে সাধারণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৬ হাজার ১৮৬ থেকে বেড়ে ১৬ হাজার ৭৩৭ হয়েছে।

শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও বিষয়ভিত্তিক দক্ষতায় ঘাটতি : মাধ্যমিক শিক্ষার দুর্বলতার অন্যতম কারণ শিক্ষকসংকট ও শিক্ষকের দক্ষতা। ব্যানবেইসের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের ১৬ হাজার ৭৩৭টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক রয়েছেন দুই লাখ ৪৩ হাজার ৫৫৭ জন। তাঁদের প্রায় ৩৫ শতাংশের বিএড, এমএড বা বিএসএডের মতো পেশাগত প্রশিক্ষণ নেই।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিষয়ভিত্তিক যোগ্যতার ঘাটতিও স্পষ্ট। মাধ্যমিক পর্যায়ে ইংরেজি পড়ান এমন ৯ হাজার ৯৮২ জন শিক্ষক স্নাতক পর্যায়ে ইংরেজি পড়েননি। গণিত পড়ানো শিক্ষকদের মধ্যে ১০ হাজার ১৬৯ জনের স্নাতক পর্যায়ে গণিত পড়ার অভিজ্ঞতা নেই। মাধ্যমিক স্তরে ইংরেজি পড়ান ৬৪ হাজার ২৫৩ জন এবং গণিত পড়ান ৬৭ হাজার ৬৯৭ জন শিক্ষক।

শিক্ষক নিয়োগের সময় বিষয়ভিত্তিক যোগ্যতা নির্ধারণ করা হলেও প্রয়োজনীয় শিক্ষক না থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠানে অন্য বিষয়ে পড়াশোনা করা শিক্ষকদের ইংরেজি বা গণিতের ক্লাস নিতে হয়। এতে পাঠদানের গভীরতা ও শিক্ষার্থীদের বিষয় বোঝার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, একজন শিক্ষক শুধু নিজের বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করলেই কার্যকর পাঠদান নিশ্চিত হয় না; শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর বোঝার সমস্যা শনাক্ত করা, দুর্বল শিক্ষার্থীকে সহায়তা দেওয়া, বয়সোপযোগী পদ্ধতিতে পাঠদান এবং মূল্যায়নের মাধ্যমে শেখার ঘাটতি চিহ্নিত করার জন্য পেশাগত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। কিন্তু প্রশিক্ষণ, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক এবং নিয়মিত পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ নিশ্চিত না হলে শিক্ষার্থীদের মৌলিক দক্ষতা অর্জন বাধাগ্রস্ত হয়।

মাদরাসায় বাড়ছে শিক্ষার্থী : দেশে সাধারণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমলেও আলিয়া ধারার মাদরাসায় শিক্ষার্থী বাড়ছে। ব্যানবেইসের ২০২৫ সালের শিক্ষা পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এক বছরে আলিয়া মাদরাসায় শিক্ষার্থী বেড়েছে ৪৩ হাজারের বেশি। একই সময়ে মাদরাসার সংখ্যাও বেড়েছে। এমনকি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোতেও আগের চেয়ে শিক্ষার্থী বেড়েছে।

ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে আলিয়া মাদরাসার সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ২৯৬। আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ২৬৯। অর্থাৎ এক বছরে মাদরাসা বেড়েছে ২৭টি। দীর্ঘমেয়াদি পরিসংখ্যানেও মাদরাসায় শিক্ষার্থী বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যায়। ২০১৮ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে আলিয়া মাদরাসার ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণিতে শিক্ষার্থী বেড়েছে প্রায় ১০ শতাংশ। অন্যদিকে একই সময়ে সাধারণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এই শ্রেণিগুলোতে শিক্ষার্থী কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মাদরাসায় শিক্ষার্থী বৃদ্ধির পেছনে ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি আগ্রহ, তুলনামূলক কম খরচে পড়াশোনার সুযোগ এবং দরিদ্র পরিবারের জন্য আবাসন ও খাবারের সুবিধা ভূমিকা রাখছে। আলিয়া মাদরাসার বাইরেও কওমি মাদরাসায়ও বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পড়ালেখা করছে। এসব মাদরাসার শিক্ষার্থীর সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও শিক্ষার্থী বাড়ছে এটি স্পষ্ট।

তদারকি ও পরিকল্পনার দুর্বলতা : মাধ্যমিক শিক্ষা দেখভাল করে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তর। কিন্তু এই অধিদপ্তরের মাধ্যমিক শিক্ষার প্রতি কোনো আগ্রহ নেই। অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা মূলত বদলি-পদায়নসহ নানা ধরনের বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত। এ ছাড়া নতুন নতুন প্রকল্পের প্রতিও তাঁদের আগ্রহ প্রবল। দেশের ৪৯৫ উপজেলার মধ্যে ৩৮০ উপজেলায় মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং ২৮৯ সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক কর্মকর্তার পদ শূন্য। অথচ এসব শূন্য পদ পূরণে নেই কোনো উদ্যোগ। পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, বিজ্ঞানাগার, গ্রন্থাগার, তথ্য-প্রযুক্তি এবং শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতেও মাউশির পরিকল্পনা দৃষ্টিগ্রাহ্য নয়।

শিক্ষক নিবন্ধন ও শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে কাজ করে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)। তারা প্রায় ৬০ হাজার শূন্য পদে শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারছে না। এ ব্যাপারে মাউশি অধিদপ্তর এনটিআরসিএর সঙ্গে কোনো সমন্বয় করছে না। মাধ্যমিক পর্যায়ের বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হওয়ায় তাদের নানা ধরনের দ্বন্দ্ব, আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা, ম্যানেজিং কমিটি নিয়ে জটিলতা, শিক্ষকদের গ্রুপিং, নিয়মিত ক্লাস না হওয়াসহ নানা ধরনের সমস্যা বেড়েই চলছে। কিন্তু এসব সমাধানে মাউশি অধিদপ্তরের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই।

শিক্ষাবিদরা যা বলছেন : ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সংখ্যায় মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী কমেছে এটা উদ্বেগের। তবে মাদরাসায় ও ইংলিশ মিডিয়ামে বেড়েছে। এখন মূলধারার শিক্ষায় কেন শিক্ষার্থী কমছে তা অনুসন্ধান করে দেখা উচিত। তবে বেশির ভাগ স্কুলে লেখাপড়া তেমন হয় না। অনেক শিক্ষকের পদ খালি, বিষয়ের শিক্ষক নেই, প্রধান শিক্ষকের পদও খালি। এ ছাড়া আরো বড় একটি কারণ, দারিদ্র্য বেড়ে গেছে। অন্যদিকে পড়ালেখার খরচ, বিশেষ করে প্রাইভেট-কোচিং, শিক্ষা উপকরণ ও গাইড বইয়ের খরচ বেড়েছে। এই দারিদ্র্যের কারণে শিক্ষার্থীরা মাদরাসায় যাচ্ছে। কিন্তু তাদের জীবনের জন্য যে প্রস্তুতি দরকার, সেখানে তা হচ্ছে না। সব মিলিয়ে এই পরিস্থিতি মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য নিশ্চয়ই দুরবস্থার।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকার বিদ্যালয়গুলোতে ফান্ডিং করার পরও কেন শিক্ষার্থী কমছে তা খুঁজে বের করা উচিত। অন্যদিকে আলিয়া ও কওমি মাদরাসায় বাড়ছে। মাদরাসায় শিক্ষার্থী বাড়লেও আমরা ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখছি না। তবে সেখানে লার্নিং আউটকাম নিশ্চিত হচ্ছে না। সেখানে শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যৎ কর্মবাজারের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে কি না, তা সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।’

অধ্যাপক মনিনুর রশিদ আরো বলেন, ‘মাধ্যমিকে শিক্ষার্থী কমার পেছনে আমার পর্যবেক্ষণ যদি বলি, প্রথমেই আসবে বারবার কারিকুলাম ও অ্যাসেসমেন্টে পরিবর্তন। এ ছাড়া অনেক পরিবারের আর্থিক অবস্থাও খারাপ হয়েছে। মেয়েদের নিরাপত্তা একটা ব্যাপার। এ অবস্থায় যাদের টাকা-পয়সা আছে, তারা তাদের সন্তানদের ইংলিশ মিডিয়ামে দিচ্ছে। আর যাদের টাকা-পয়সা কম, তারা আলিয়া বা কওমি মাদরাসায় দিচ্ছে।’