ফ্যাসিস্ট আমলে বিরোধীদলের আন্দোলন সংগ্রামের একটা এক্সপ্লিসিট সেন্টেন্স ছিল “শেখ হাসিনা পালানোর পথ খুঁজে পাবেনা”। এরই জবাবে বারংবার হাসিনা খুব অহংকার করে বলতো: “শেখ হাসিনা পালায় না, কখনও পালায়নি”
কিন্তু এই শেখ হাসিনাকেই ২৪'এ ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে পরাজয়ে গ্লানি আর একরাশ রাজনৈতিক অপমান নিয়ে লোকচক্ষুর আড়ালে, দিনেদুপুরে বিমানে করে পালিয়ে যেতে হয়েছিল।
পেছনে পড়ে ছিল ক্ষমতার অহংকার, ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ আর ইতিহাসের এক লজ্জাজনক অধ্যায়।
আর শেখ হাসিনার সেই দম্ভের পতনকেই ফ্রেমবন্দী করে রাখা দৃশ্য এদেশের লাখো কোটি মুক্তিকামী মানুষকে দেখার সুযোগ করে দিয়েছিল একটা ছেলে, বাংলাদেশ এয়ারফোর্সের সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মরহুম তাহসিফ সৌরি।
আপনি একটু গভীরভাবে চিন্তা করে দেখুন তো, আপনি আমি— আমরা সবাই তখন রাজপথে আন্দোলন করছি তখনও কোথাও কোথাও পুলিশের গুলিতে আমাদের ভাইয়েরা শহীদ হচ্ছে। এরমধ্যেই হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার খবর এলো এবং আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা বিজয় উল্লাশে ফেটে পড়লো।
কিন্তু সেই বিজয় উল্লাশের সুযোগ কার হাত ধরে এসেছিল? ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার ভিডিওটা তার ওয়ালে শেয়ার না করলে তো আমরা কেউ জানতেই পারতাম না আদতে হাসিনা আছে কোথায়?
গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী দুই আড়াই বছরে আমরা সবাই বিভিন্ন মাধ্যমে জেনেছি যে, শেখ হাসিনার আসলে স্থায়ীভাবে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে ক্রিটিক্যাল সিচুয়েশন ট্যাকেল করতে পারলে তিনি আবারও ফিরে আসবেন এবং জিয়া, মুজিব, নাজমুল, তারেক সিদ্দীকির মত তার অনুগত সামরিক কর্মকর্তাদের সহায়তায় পরিস্থিতি অনুকূলে এনে তিন মাসের ভেতর আবারও কন্টিনিউ করবেন এবং জনগণের সামনে বলা হতো: জীবন বাঁচাতে নিরাপত্তার তাগিদে শেখ হাসিনা দেশের ভেতরে একটা সেফ হাউজে অবস্থান করছিলেন!
এই যে মহাপরিকল্পনা— ভারতে পালিয়ে যাওয়ার ভিডিও প্রকাশ করে সেই পরিকল্পনা একহাতে ভেস্তে দিয়েছিলেন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাফসিফ।
এক তাহসিফ আওয়ামিলীগ এবং তার ল্যাসপেন্সারদের যে অপূরণীয় ক্ষতি করেছে, হাজারটা সমন্বয়ক মিলেও তার কিঞ্চিৎ ক্ষতি করতে পারেনি।
একারণেই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। এরপর আমার দেশ পত্রিকা ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফের বিরুদ্ধে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এনে খবর ছাপে।
আমার দেশ পত্রিকার খবরের পর আইএসপিআর অফিসিয়ালি জানায়, গোয়েন্দা সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়নি।
অর্থাৎ এখানে তৃতীয় একটা পক্ষ ছিল, যারা আমার দেশ পত্রিকাকে গোয়েন্দা সংশ্লিষ্টতার ভুল তথ্য দিয়ে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করিয়েছিল। আর তাহসিফ মূলত তাদের টার্গেটেই ছিল বলে আমার বিশ্বাস।
তাদের পরিকল্পনা ছিল: সিস্টেমেটিক ওয়েতে প্রথমে তাহসিফকে তার শক্ত অবস্থান, অর্থাৎ ইন্সটিটিউট (এয়ারফোর্স) থেকে বের করে আনা, তারপর একটা জাতীয় গণমাধ্যমকে দিইয়ে তার বিরুদ্ধে গোয়েন্দা সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আনিয়ে জনমত গঠন করে তাহসিফের ক্যারেক্টার অ্যাসাসিনেট করা।
অ্যাকর্ডিং টু এথিক্স অব স্পাইং: “ক্যারেক্টার অ্যাসাসিনেশন ইজ দ্যা প্রাইমারি স্টেইজ অব ফিজিক্যাল অ্যাসাসিনেশন”
যখন একজন মানুষের চরিত্রহনের কাজ শুরু হয় তখন নিশ্চিত থাকা যায়, ওই ব্যক্তিকে অবশ্যই অবশ্যই শারীরিকভাবে আঘাত করা হবে।
ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফের ক্ষেত্রে আমরা তো এখন সেটাই দেখতে পাচ্ছি। শুধুমাত্র আমার দেশ পত্রিকার খবরের কারণে কেউ কেউ তাকে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার বলে মনে করছে।
ইটস কমনসেন্স, সে যদি ফরেইন ইন্টিলিজেন্স অ্যাসেট হতো তাহলে তো তার কোর্ট মার্শাল হওয়া উচিত ছিল। সেটা তো হলোনা। তারমানে চাকরিচ্যুত করে তাকে তার শক্ত অবস্থান থেকে বের করে অপেক্ষাকৃত দুর্বল অবস্থানে নিয়ে এসে ঘায়েল করাই ছিল মূল পরিকল্পনা।
মিলিটারির ভাষায় এই কৌশলকে বলা হয় ‘Train the tiger to come out of the mountain’
যাইহোক, তাহসিফ আমাদের ছেড়ে চলে গেলো। আমরা শরীফ ওসমান বিন হাদির পর আরো একজন সহযোদ্ধাকে হারালাম। আমাদের বাকি সহযোদ্ধারা যদি এখনই এসপিওনাজের কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত না হয়, তাদের অবস্থা কি হবে আল্লাহই ভাল জানেন।