Image description

অবশেষে মালয়েশিয়া গমনেচ্ছু বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য সুখবর এলো। বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার পুনরায় চালুর প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে আর কয়েকদিন পর নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে দেশটিতে কর্মী পাঠানো শুরু হতে পারে। প্রথমে সরকারি জনশক্তি প্রেরণকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) মাধ্যমে কর্মী পাঠানো হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজারে খুশির খবর এলেও মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমবাজার এখনো অনিশ্চয়তার দোলাচালে। হুতিদের হামলায় লন্ডভন্ড হয়ে যাচ্ছে মধ্যপ্রচ্যের শ্রমবাজার। এতে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের পাশাপাশি বিপদে পড়েছেন বাংলাদেশের শ্রমিকরা।

বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের এই সুখবর দিয়েছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নূর। গতকাল বুধবার উইটনেস ফাউন্ডেশন আয়োজিত ‘অনিয়মিত ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন প্রতিরোধ এবং সাব-এজেন্টের জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ’ শীর্ষক অভিবাসন সংলাপে তিনি এ খবর দেন। প্রতিমন্ত্রী জানান, মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। ৩১ অক্টোবরের মধ্যে অনুমোদিত মেডিক্যাল সেন্টারগুলোর তালিকা প্রকাশের আশা করা হবে। ১ নভেম্বর থেকে এসব কেন্দ্রে কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা শুরু হতে পারে। মেডিক্যাল কার্যক্রম শুরু হলে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে কর্মীদের মালয়েশিয়ায় যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

জানেেত চাইলে বায়রার সাবেক ইসি সদস্য মোহাম্মদ আলী বলেন, বিএনপি’র নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল পাঁচ বছরে এক কোটি লোককে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। দেরিতে হলেও সম্ভাবনাময় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে। এতে মালয়েশিয়া গমনেচ্ছু কর্মীদের মাঝে আনন্দের বন্যা বইছে। ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে দেশটিতে কর্মী প্রেরণের উদ্যোগ নেয়ায় এসব রিক্রুটিং এজেন্সির প্রসেসিং ফি কত হবে , অভিবাসন ব্যয় কত তা’ যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণ করতে হবে। মেডিক্যাল ফি কত তা দ্রুত নির্ধারণ করতে হবে। এক প্রশ্নের জবাবে মোহাম্মদ আলী বলেন, মধ্যপ্রাচের শ্রমবাজারে চলছে নানা সংকট। মালয়েশিয়া শ্রমবাজার যাতে সিন্ডিকেটের একচেটিয়া দখলে না যায় এবং গলাকাটা হারে অভিবাসন ব্যয় আদায়ের অপতৎপরতা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ৩৩৮টি যুক্ত এজেন্সির পাশাপাশি অন্যান্য বৈধ এজেন্সিগুলোও যাতে কর্মী নিয়োগের চাহিদাপত্র আনতে পারে তার ব্যবস্থা রাখতে হবে।

মূলত ২০২৪ সালের ৩১ মে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী প্রবেশের সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়। কর্মী নিয়োগে অনিয়ম, অতিরিক্ত ব্যয় ও বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ওই সময় নতুন কর্মী প্রবেশ বন্ধ করে মালয়েশিয়া সরকার। তবে দীর্ঘ আলোচনার পর গত ২৮ সেপ্টেম্বর মালয়েশিয়ার সুপরিচিত সুপারমার্কেট চেইন এনএসকে ট্রেড সিটির চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ২৮ বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের চাহিদাপত্র সত্যায়ন করেছে বাংলাদেশ হাইকমিশন। হাইকমিশন ও বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সি গুডনেস সার্ভিসেস লিমিটেড (আরএল-২০৬৮) বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এখন পুরোদমে বাংলাদেশি শ্রমিকরা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে প্রবেশ করবেন।

মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর জন্য দেশটির কর্তৃপক্ষ ৩৩৮টি বড় আকারের লাইসেন্সধারী রিক্রুটিং এজেন্সিকে অনুমোদন দিয়েছে। নিয়োগকর্তাদের চাহিদাপত্র মালয়েশিয়ার ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এফডব্লিউসিএমএস) এবং বাংলাদেশ দূতাবাসের সার্ভিস সেন্টারে জমা দেওয়া হচ্ছে। দূতাবাসের সত্যায়ন ছাড়া কোনো চাহিদাপত্র গ্রহণ করা হবে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানানো হয়েছে।

এদিকে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা শুরু ৩১ অক্টোবর জানিয়েছে। তবে মানতে হবে কিছু নির্দেশনা। প্রথম পর্যায়ে বোয়েসেলের মাধ্যমে ১০ হাজার কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনার কথা বলা হলেও, তাঁদের যাতায়াত পুরোপুরি বিনা খরচে হবে না। বিমান ভাড়া, মেডিক্যাল পরীক্ষা ও সার্ভিস চার্জসহ মোট ব্যয় ১ লাখ ৫৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার মধ্যে হতে পারে। বেসরকারি এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর খরচ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে। এ ক্ষেত্রে ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি রাখার কথা জানিয়েছে সরকার।

অনুমোদিত মেডিক্যাল সেন্টারের তালিকা প্রকাশের পর কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা কোথায় করাতে হবে, তা নিশ্চিত হওয়া যাবে। তাই অনুমোদনহীন কোনো প্রতিষ্ঠানে মেডিক্যাল পরীক্ষা না করাতে এবং এ বিষয়ে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের আগে সরকারি নির্দেশনা যাচাই করতে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

২৮ সেপ্টেম্বর মালয়েশিয়ার সুপরিচিত সুপারমার্কেট চেইন এনএসকে ট্রেড সিটির চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ২৮ বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের চাহিদাপত্র সত্যায়নের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর কার্যক্রম কার্যত আবার শুরু হয়। মূলত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফর এবং তাঁর ঐকান্তিক প্রচেস্টায় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানো চালু হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর বৈদেশিক কর্মসংস্থান নিয়ে বিশেষ বৈঠকে বন্ধ ও সংকুচিত শ্রমবাজারগুলো পুনরায় উন্মুক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার প্রথম বিদেশ সফর ছিল মালয়েশিয়ায়। সফরকালে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ পুনরায় শুরুর বিষয়ে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে আলোচনা করেন তিনি। এরপর দীর্ঘ আলোচনা ও কূটনৈতিক তৎপরতার পর ফের বাজার খোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের পথ আবার উন্মুক্ত হচ্ছে।

ৎ এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, মালয়েশিয়া সরকার প্রায় এক মাস আগে বাংলাদেশসহ বিদেশি কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া ও ধাপ প্রকাশ করেছে। কিন্তু বাংলাদেশে সেই তথ্য যথাযথভাবে প্রচার না হওয়ায় চাকরিপ্রত্যাশীদের বড় একটি অংশ এখনো জানেন না কিভাবে, কোন প্রক্রিয়ায় এবং কার মাধ্যমে তারা মালয়েশিয়ায় যেতে পারবেন। এ তথ্য ঘাটতির সুযোগে কিছু রিক্রুটিং এজেন্সি, ট্রাভেল এজেন্সি, দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগী সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের প্রচারণা, চাকরির আশ্বাস এবং দ্রুত মালয়েশিয়া পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে চাকরিপ্রত্যাশীদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে। ফলে সরকারি তথ্যের পরিবর্তে দালালচক্রের প্রচারই অনেকের কাছে নির্ভরযোগ্য হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়ে গেছে।

মধ্যপ্রাচ্যে শ্রম সংকট কাটেনি : সউদী আরবের বিভিন্ন স্থাপনায় হুতিদের হামলায় লন্ডভন্ড হয়ে যাচ্ছে মধ্যপ্রচ্যের শ্রমবাজার। এতে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকরা বিপাকে পড়েছেন। উপসাগরীয় অঞ্চলের ৬টি দেশ সউদী আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইনে ৭০ থেকে ৮০ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করছেন। এর বাইরে লেবানন, জর্ডান ও ইরাকেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আগ্রাসনের জেরে সউদী আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সবকটি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা টার্গেট করে হামলা চালিয়েছে ইরান। এর মধ্যে ইয়েমেনের হুতিরা সউদী আরবে হামলা চালায়; যা বিদেশগামী শ্রমিকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। আর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই যুদ্ধে বেশি বিপাকে পড়েছে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি।

সউদী আরবের বিভিন্ন শহরে হুতিদের বিমানবন্দরে হামলার পর ঢাকা থেকে এ পর্যন্ত ১৫৩টি সরাসরি ও ট্রানজিট ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত করা হয়েছে। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন ২২ হাজার ৬৩৬ জন যাত্রী। বাতিল বা স্থগিত সরাসরি ফ্লাইটের মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স, সৌদিয়া এয়ারলাইন্স ও রিয়াদ এয়ারওয়েজের ফ্লাইট রয়েছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ঢাকা থেকে এ পর্যন্ত ৭৬টি সরাসরি ফ্লাইট এবং ৭৭টি ট্রানজিট ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। বাতিল বা স্থগিত সরাসরি ফ্লাইটগুলোর মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ৩৩টি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ১০টি, সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের ২০টি এবং রিয়াদ এয়ারওয়েজের ১৩টি ফ্লাইট রয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশি যেসব শ্রমিক দেশে ছুটিতে এসেছিলেন তারা ভয়াবহ বিপদে পড়ে গেছেন।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের সরাসরি ও পরোক্ষ প্রভাব পড়ছে লাখ লাখ বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের জীবনে। সংকুচিত হচ্ছে তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ, বাড়ছে বিমান ভাড়া ও পরিবহন ব্যয়। সামগ্রিকভাবে অনিশ্চয়তায় পড়েছে প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলো। সউদী আরব ও ইয়েমেনের হুতিদের মধ্যে বড় ধরনের সামরিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় সেই ঝুঁকি আরও বিস্তৃত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের জায়গাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সউদী আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার। সংশ্লিষ্টরা জানান, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতায় শ্রমবাজার অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে। প্রবাসীদের মাঝে উৎকণ্ঠা বাড়ছেই। শ্রমবাজারে ভাটার টান অব্যাহত থাকলে আগামীতে রেমিট্যান্স খাতেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। বৈশ্বিক সংকটের মাঝেও প্রায় সোয়া কোটি প্রবাসী বাংলাদেশি রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন দেশে। তারা বাংলাদেশসহ সংশ্লিষ্ট দেশের সার্বিক উন্নয়নে অভাবনীয় অবদান রাখছেন। ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা কেন্দ্র করে গত কয়েক মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্যগামী বাংলাদেশি কর্মীদের সংখ্যা কমছে। চলমান যুদ্ধ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজারগুলোয় আরও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। তবে বাংলাদেশে আটকেপড়া সউদী প্রবাসী শ্রমিকদের ভিসার মেয়াদ বাড়াতে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক।