Image description

‘সরকার অনুমতি দিলে পুলিশ ক্রসফায়ারে যাবে’ পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের এ বক্তব্য ঘিরে বিভিন্ন মানবাধিকারকর্মী, বিশিষ্ট ব্যক্তি ও মহলে আলোচনা-সমালোচনা ও ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। সোমবার রাজধানীর চকবাজারে কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ইসলামিক ব্যাংকিং সেবা ‘কমিউনিটি ইসলামিক’-এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইজিপি এমন বক্তব্য দিয়েছেন। প্রায় ১৬ মিনিটের বক্তব্যে তিনি আরও বলেছেন, মাদক কারবারিদের কাছ থেকে টাকা না পেয়ে কিছু সাংবাদিক পুলিশকে অকার্যকর আখ্যা দিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেন। এ ছাড়া পুলিশকে কাজের পরিবেশ দেওয়া, আইন প্রয়োগে পুলিশের ক্ষমতা, মাদক কারবারে পুলিশ সদস্যদের সম্পৃক্ততা এবং মানবাধিকার নিয়েও তিনি কথা বলেছেন।

আইজিপি বলেন, আপনারা জানেন, ব্যাংকিং একটি জটিল বিষয়। আর এই ইসলামী ব্যাংকিংয়ের বিষয়টি আসলে ব্যাংকের সঙ্গে একটি অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিষয়। আমি সুদ নেব না, কারণ ইসলাম তা সমর্থন করে না। যে ধর্মের কথাই বলুন, কোনো কাজ না করে শুধু ব্যাংকে টাকা রেখে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার বিষয়টি হারাম। এটাই আমাদের ইসলামি সমাজব্যবস্থার শিক্ষা।

তিনি বলেন, ইসলামে সুদকে হারাম করা হয়েছে, ঘুসকেও হারাম করা হয়েছে। কিন্তু আমরা এটা কতটুকু মানি? এক নম্বর বিষয় হলো, সুদমুক্ত ইসলামিক ব্যাংকিং হতে হবে। দুই নম্বর হলো পার্টনারশিপ। আপনি আমার কাছ থেকে টাকা নেবেন, এখানে একটি ব্যবসা হবে। এখান থেকে যে মুনাফা হবে, সেটা আপনি গ্রহণ করবেন। আরেকটি বিষয় হলো নৈতিকতা ও ন্যায্য ব্যবসা। এই বিষয়গুলো অনুপস্থিত থাকলে সেখানে আর ইসলাম থাকে না।

আইজিপি বলেন, আমরা অনেক মামলা তদন্ত করি। সাংবাদিকরা সমাজের দর্পণ, আর আমরা ভেতর থেকে দেখি কোথায় কী ঘটছে। তবে সবকিছু প্রকাশ করতে গেলে সমাজব্যবস্থা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে যাবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো নৈতিকতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নজরদারি। একচ্ছত্র আধিপত্য কারও জন্য ভালো নয়। কমিউনিটি ব্যাংকও একচ্ছত্রভাবে কিছু করতে চায় না। তেমন হলে তা বুমেরাং হতে পারে। তিনি বলেন, আমাদের এখন যে পরিমাণ আমানত আছে, সে তুলনায় বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত। আমরা অল্প মুনাফা নিই। আমাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিচালনার জন্যও কিছু খরচ আছে। সবকিছু বিশ্লেষণ করেই আমরা প্রকল্প নেব। আমরা যে ইসলামিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু করছি, ইনশাআল্লাহ, বাংলাদেশের অন্য ব্যাংকগুলোর তুলনায় আমাদের ব্যাংক ভালো করবে বলে আশা করছি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ব্যাপারে আইজিপি বলেন, আপনারা আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না। এখন যেখানেই যাই, শুধু গুজব আর মিথ্যা কথা। একটি গোষ্ঠী আমাদের জাতিকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। আপনারা জানেন, যারা ১৭ বছর ধরে নেতৃত্ব দিয়ে দেশকে সবক্ষেত্রে অকার্যকর করেছে, তাদের অনেকে এখন পলাতক। তিনি বলেন, পাড়া-মহল্লায়, প্রত্যেকটি আঙিনায় মাদক আর মাদক। এটা কারা করেছে, আপনারা দেখুন। তখনকার সরকারি দলের নেতারা এখান থেকে মাসোহারা নিতেন। এর সঙ্গে পুলিশেরও কিছু সদস্য জড়িত ছিলেন, এখনো আছেন। গত দুই মাসে আমরা ২৭ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে জেলে পাঠিয়েছি। সুতরাং আগে ঘর পরিষ্কার করতে হবে। আপনারা দেখছেন, কিন্তু বিষয়টি নিয়ে অপব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে। এখন দেখলাম, ১০১ জন নাগরিক এ বিষয়ে কথা বলছেন। আপনি কি পুলিশ হাউজিংয়ের ভেতরে গোপনে গিয়ে মদ খাবেন, মাতলামি করবেন, কোকেন-হেরোইন গ্রহণ করবেন? এটা কি করা যায়? সংবিধানের কোথায় লেখা আছে যে আপনি এসব করতে পারবেন? আপনার স্বাধীনতা আছে বলে যা ইচ্ছা তা করতে পারবেন না। আপনাকে আইনের আওতায় থাকতে হবে। এ দেশের নৈতিকতা ও মূল্যবোধ ঠিক রেখে চলতে হবে।

আলী হোসেন ফকির বলেন, কথায় কথায় পুলিশের ওপর চড়াও হবেন। আপনি যদি পুলিশকে ক্ষমতায়িত না করেন, আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সমাজব্যবস্থা ঠিক রাখতে না দেন, তাহলে কথায় কথায় বলবেন পুলিশ এই করেছে, সেই করেছে। আপনারা বলেন, অশিক্ষিত পুলিশ নিয়োগ দেন, কনস্টেবলের আবার কী জ্ঞান লাগে? ওই পুলিশ সদস্যই তো তৃণমূল পর্যায়ে আপনাকে সেবা দিচ্ছেন। তার সঙ্গে আপনার বিরোধ হলে বলবেন পুলিশ খারাপ। আবার বলবেন, পুলিশে নিয়োগ দিতে আইনকানুন বা শিক্ষিত লোকের প্রয়োজন নেই। অথচ এখানে সবচেয়ে বেশি শিক্ষিত লোক দরকার। কারণ, তাকে সমাজের সব শ্রেণির মানুষকে সামলাতে হয়।

আইজিপি বলেন, আপনারা দেখেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ব্যর্থ হচ্ছেন, রাস্তায় পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মারামারি হচ্ছে। কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের বেতন দেওয়া হচ্ছে না বা দিতে পারছেন না, তখন শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হচ্ছে। আর যখন আমি আপনার স্বাধীনতা হরণ করে আপনাকে জেলে পাঠিয়ে দেব, তখন সেই পুলিশ সমাজে গ্রহণযোগ্য হবে না। তাহলে কী হচ্ছে? পুলিশকে আপনারা নিজেরাই অকার্যকর করে দিচ্ছেন। আবার বলছেন, সব দায়িত্ব যদি পুলিশের হয়, তাহলে পুলিশের কথাও আপনাকে শুনতে হবে। আমি যেভাবে বলব, সেভাবে আপনাকে সমাজে চলতে হবে। এই বিষয়টি বুঝতে হবে।

আইন ও সংবিধান অনুযায়ী আমাদের চলতে হবে। এসব বিষয় অনুসরণ না করলে সমাজে কেউ দিন হোক বা রাত, কোথাও শান্তিতে বসবাস করতে পারবেন না।

দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত পুলিশের প্রয়োজন-এটা স্বীকার করে নিয়ে আইন ও সংবিধান অনুযায়ী আমাকে দায়িত্ব পালন করতে দিন। তবে আমাদেরও জবাবদিহি ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আছে। আমাদের কোনো সদস্য অপরাধ করলে আমরা যদি ব্যবস্থা না নিই, তখন আপনারা বলতে পারেন যে আমরা তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিইনি।

আবার মিথ্যা অভিযোগ ও গুজবে কান না দিয়ে সমাজে প্রকৃতপক্ষে যে ঘটনা ঘটছে, তার প্রতিকার করতে আমরা সবাই মিলে কাজ করি।

মাদকের বিস্তার নিয়ে আইজিপি বলেন, আপনারা বলেন, মাদক চলছে, পুলিশ ব্যবস্থা নিচ্ছে না। অথচ সেখান থেকে সাংবাদিকরা গোপনে টাকা নিচ্ছেন। যখন টাকা পাচ্ছেন না, তখন লিখছেন, পুলিশ এই দেশে অকার্যকর হয়ে গেছে।

বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আমরা কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘন করিনি, কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বলপ্রয়োগ করিনি। আপনারা দেখেছেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে পুলিশের কী অবস্থা হয়েছিল। পুলিশ রাস্তায় দায়িত্ব পালন করতে ভয় পেত, যেতে সাহস পেত না। সেই অবস্থা থেকে আমরা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে একটি সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে, আপনাদের প্রকৃত স্বস্তি ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ দিতে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছি। সেই জায়গায় আপনারা সহযোগিতা করুন।

হাসিনার ফেরা প্রসঙ্গে আইজিপি বলেন, কে আসবে, আপা কবে আসবে, কী হবে-সেটি আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দেখার বিষয় নয়। আমাদের দায়িত্ব হলো আইন ও সংবিধান অনুযায়ী যেখানে যা প্রয়োগ করা দরকার, সেটাই করা। যেখানে ক্রসফায়ার যদি প্রয়োজন হয়, সরকার যদি অনুমতি দেয়, আমরা সেটাই করব।

পুলিশের ভূমিকা নিয়ে আইজিপি বলেন, পুলিশ লাঠিপেটা করলে বলবেন, আমরা ফ্যাসিস্ট পুলিশ। আর আমরা যদি নীরব থাকি, তাহলে বলবেন দুর্বল পুলিশ। তাহলে আমাকে কাজ করার পরিবেশ দিতে হবে, ক্ষমতায়িত করতে হবে। সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে চাইলে পুলিশের কোনো বিকল্প নেই। সেনাবাহিনী দেশ রক্ষা করবে, সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, শান্তি-সমৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন-সবকিছু আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব। আপনারা পুলিশকেও ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করবেন না। নিজেরাও ব্ল্যাকমেইলের শিকার হবেন না। আমরা শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চাই। সব দল ও মতের নির্বাচনি এজেন্ডায় শান্তির কথা থাকে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, সালিশের অর্থ হয়ে দাঁড়ায়-তালগাছটা সব সময় আমার, আমাকেই দিতে হবে। এভাবে সমাজব্যবস্থা সুখী-সমৃদ্ধ হতে পারে না।

আইজিপির বিষয়ে সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রী ফিরলে: জাহেদ উর রহমান

পুলিশের আইজির ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে দেওয়া বক্তব্যের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্র্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, ‘আইজিপির বিষয়ে যদি কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা (সরকারের) থাকেও, সে ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী তো দেশে নেই, এই বিষয়ে সরকারের ফাইনাল অবস্থান কী হবে তা নিশ্চয়ই প্রধানমন্ত্রী বিবেচনা করবেন, সফরের পরে হয়তো।’ মঙ্গলবার সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি বিষয়ে সচিবালয়ে আয়োজিত সাপ্তাহিক সংবাদ ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি একথা বলেন। তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘উনার (আইজিপি) বক্তব্য যে প্রবলেমেটিক হয়েছে, সেটা তিনি পরবর্তী ব্যাখ্যার মাধ্যমে স্বীকার করে নিয়েছেন এবং সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছেন। যখন কেউ তার অবস্থানে অটল থাকছেন না, তখন তার প্রতি একটু বেশি ‘আনকাইন্ড’ (নির্দয়) হচ্ছি কিনা?’ ব্যাখ্যা দিয়ে এ ধরনের অবস্থান থেকে রেহাই পাওয়া যায় কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা বলেন, ‘আমার মনে হয় যায়, কারণ তিনি তার বক্তব্যতে অটল থাকেননি।’ এদিকে ‘ক্রসফায়ার’ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, সরকার এটা চাইতে পারে না, আর সরকার চাইলেও পুলিশ সেটা করতে পারে না। কারণ, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা কোনো বেআইনি কাজের জন্য আদিষ্ট হলেও সেটা মানতে তারা বাধ্য নন।

এদিকে গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরাসংক্রান্ত এক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে ন্যায়বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। দেশে ফিরলে তিনি কোনো ধরনের মব বা বেআইনি পরিস্থিতির মুখোমুখি হবেন না। তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী বিচার প্রক্রিয়া চলবে।’ আরেক প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা যাকে চাই, তিনি এলে আমরা হ্যাপি। আমাদের তা হলে ধরে-বেঁধে আনতে হলো না। উনি ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। আসার পর লিগ্যাল প্রসেসে যা যা হওয়ার, তাই হবে।’

প্রেস ব্রিফিংয়ে পিরোজপুরে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনায় জড়িতদের পরিণতি ভোগ করতে হবে বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। জাহেদ উর রহমান বলেন, একটি রাজনৈতিক দল এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থেকে কাজ করেছে বলে সামনে আসা তথ্যে জানা গেছে। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। এ ঘটনার পরিণতি সংশ্লিষ্টদের ভোগ করতে হবে। তিনি বলেন, একজন মানুষের মৃত্যুর পর তার মরদেহের সঙ্গে এমন আচরণ কেউ ভালোভাবে নেননি। অতীতেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। সেগুলোও মানুষ ভালোভাবে নেয়নি। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, একজন মানুষ মারা যাওয়ার পর তার বিচার সৃষ্টিকর্তার কাছে হবে। যারা এ ধরনের কাজ করেন, তারা শেষ পর্যন্ত সমাজে নিন্দিত হবেন।

মানিক পশারী ২৪ অক্টোবর সকালে মারা যান। তিনি একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাজাপ্রাপ্ত প্রয়াত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার বাদী ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, সাঈদীর অনুসারীরা ওই ব্যক্তির জন্য কবর খুঁড়তে ও দাফনে বাধা দিয়েছেন। তাদের বাধার কারণেই প্রশাসন থেকে গোপনে তাকে গার্ড অব অনার দেওয়ার পর মধ্যরাতে মেয়ে ও বোনদের খোঁড়া কবরে দাফন করতে হয়েছে।

চব্বিশ-পরবর্তী সময়ে মৌলবাদ ও অতি ডানপন্থার উত্থান সম্পর্কিত প্রশ্নে জাহেদ উর রহমান বলেন, সরকার এসব ঘটনাকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। সাতক্ষীরায় ধর্ম অবমাননার নামে একজনকে হত্যার ঘটনায় কড়া পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে জাহেদ উর রহমান বলেন, সরকার কিছু ঘটনা পূর্ব গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সামলাতে পারে, সেটা আপনারা দেখেন না। কিন্তু যেগুলো দেখেন, সেগুলোর বিষয়ে সরকার পদক্ষেপ নেয়। এর মানে হলো সরকার এগুলোকে প্রশ্রয় দিচ্ছে না, দেবেও না।

টঙ্গীতে এক শিশুকে নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে প্রশ্নে জাহেদ উর রহমান বলেন, সরকার এসব ঘটনাকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। টঙ্গীর ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি বলেন, এসব ঘটনাকে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে না-বিষয়টি এমন নয়। টঙ্গীর ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। উপদেষ্টা বলেন, সরকার যদি স্পষ্ট বার্তা দেয়, রাষ্ট্রের আইন ভঙ্গ করে কেউ এ ধরনের কাজ করতে পারবে না, তাহলে এমন ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই কমে আসবে।

সরকারি দপ্তর থেকে তথ্য না পেলে তথ্য কমিশনের দ্বারস্থ হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্র্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা। লাইসেন্সধারীদের অস্ত্র ফেরত না দেওয়া এবং হারিয়ে যাওয়া অস্ত্রের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে তথ্য না পাওয়ার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জাহেদ উর রহমান বলেন, তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী সাংবাদিকদের তথ্য চাওয়ার সুযোগ রয়েছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল নয়, এমন তথ্য পেতে এ আইন ব্যবহার করা উচিত। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন দেশে তথ্য কমিশন ছিল না। বর্তমানে কমিশন গঠন করা হয়েছে। কোনো সরকারি দপ্তর তথ্য দিতে না চাইলে সাংবাদিকরা কমিশনের কাছে যেতে পারেন। তথ্য কমিশনকে সক্রিয় করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে উপদেষ্টা বলেন, কমিশনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে তার কথা হয়েছে। তারা সক্রিয়ভাবে কাজ করতে চান। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি ও ভারসাম্য নিশ্চিত করতে তথ্য কমিশনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

অবৈধ অস্ত্রের বিষয়ে তিনি বলেন, কোনো অস্ত্র অবৈধ হলে তা নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া পুলিশের স্বাভাবিক দায়িত্বের অংশ। এ বিষয়ে পুলিশ কী পদক্ষেপ নিচ্ছে, সাংবাদিকদের তা জানতে চাওয়া উচিত। তবে এ বিষয়ে তার কাছে হালনাগাদ তথ্য নেই বলে জানান তিনি। জাহেদ উর রহমান বলেন, তথ্য কমিশন কার্যকরভাবে কাজ করলে সরকারের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে বলে কারও কারও মনে হতে পারে। তবে তার মতে, তথ্যের অবাধ প্রবাহ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সরকারের জন্যই উপকারী। সাংবাদিকদের সরকারি দপ্তরগুলো থেকে তথ্য চাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তথ্য না পেলে প্রতিকার পেতে তথ্য কমিশনের দ্বারস্থ হওয়া উচিত।

ওই বক্তব্য ‘সময়োপযোগী আহ্বান’: পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন

সরকারের অনুমতি পেলে পুলিশ ‘ক্রসফায়ার’ করতে পিছপা হবে না বলে আইজিপি আলী হোসেন ফকিরের মন্তব্য নিয়ে সমালোচনার মধ্যে তার পক্ষে সাফাই গেয়েছে পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘তার (আইজিপি) বক্তব্যের মূল তাৎপর্য হলো-আইনের সীমার মধ্যে থেকে পরিস্থিতি অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পুলিশ সদস্যদের পেশাগত আত্মবিশ্বাস ও দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিশ্চিত করা।’ মঙ্গলবার অ্যাসোসিয়েশনের এক বিবৃতিতে এ কথা বলা হয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, সোমবার চকবাজারে একটি কমিউনিটি ব্যাংকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) বক্তব্যকে প্রচলিত আইন ও বিধিবিধানের আলোকে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তার বক্তব্যের মূল তাৎপর্য হলো-আইনের সীমার মধ্যে থেকে পরিস্থিতি অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পুলিশ সদস্যদের পেশাগত আত্মবিশ্বাস ও দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশ পুলিশ সর্বদা বাংলাদেশের সংবিধান ও প্রচলিত আইন অনুসরণ করে কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। সংবিধান ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধা, আইনানুগ দায়িত্ব পালন এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ পুলিশ সর্বদা অবিচল ও অঙ্গীকারবদ্ধ।

এতে বলা হয়, দণ্ডবিধি, ১৮৬০; ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮; পুলিশ আইন, ১৮৬১ এবং পুলিশ রেগুলেশন্স অব বেঙ্গলসহ প্রচলিত আইন ও বিধিবিধানে পুলিশের ক্ষমতা ও দায়িত্বের সুস্পষ্ট কাঠামো রয়েছে। এসব বিধানের যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি মানবাধিকার, সাংবিধানিক অধিকার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পুলিশ অঙ্গীকারবদ্ধ। পুলিশের আইনানুগ কঠোরতাকে একদিকে নেতিবাচকভাবে দেখা এবং অপরাধ দমনে নিষ্ক্রিয়তাকে অন্যদিকে দুর্বলতা হিসাবে বিবেচনা করার প্রবণতা মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম দশ মাসে দায়িত্ব পালনকালে পুলিশ সদস্যদের ওপর ১৭৬টি হামলার ঘটনায় ৪ জন নিহত এবং ৩৭০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। এ বাস্তবতা পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা এবং তাদের জন্য উপযুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরে। তাই পুলিশ সদস্যদের এমন পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি, যেখানে তারা আইন ও বিধিবিধান অনুসরণ করে নির্ভয়ে, নিরপেক্ষভাবে এবং পেশাদারির সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, আমরা বিশ্বাস করি, একটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সুদৃঢ় আইনশৃঙ্খলা অপরিহার্য। জনগণ পুলিশের কাছে জানমালের নিরাপত্তা, অপরাধ দমন, ন্যায়বিচার, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি প্রত্যাশা করে। তাই আইনানুগ ক্ষমতার যথাযথ প্রয়োগে দ্বিধা না করে দৃঢ়তা, পেশাদারি ও মানবিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা জরুরি। অপরাধ দমনে পুলিশ যদি তার আইনগত ক্ষমতা প্রয়োগে অযথা দ্বিধাগ্রস্ত হয়, তবে অপরাধীরা উৎসাহিত হতে পারে এবং সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থার কার্যকারিতা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। অন্যদিকে আইনের সীমা অতিক্রম না করে দৃঢ়তা, নিরপেক্ষতা ও পেশাদারির সঙ্গে দায়িত্ব পালনই পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা সুদৃঢ় করার মূলভিত্তি। সুতরাং, আইজিপির বক্তব্যকে প্রচলিত আইন ও বিধিবিধানের যথাযথ, দৃঢ়, আপসহীন বাস্তবায়ন এবং পুলিশ সদস্যদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আইনের যথাযথ প্রয়োগ, অপরাধ দমনে কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিতকরণ এবং জননিরাপত্তা রক্ষায় পুলিশের সক্ষমতা আরও সুদৃঢ় করার একটি সময়োপযোগী আহ্বান হিসাবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

দেশের ক্ষতি ও সরকারকে বিব্রত করবে: রুহুল কবির রিজভী

সস্তা বাহবা ও কৃতিত্ব নেওয়ার জন্য পুলিশপ্রধানের দেওয়া বক্তব্য দেশের ক্ষতি করবে এবং সরকারকে স্বস্তির বদলে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলবে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্মমহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। মঙ্গলবার রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জাতীয়তাবাদী যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজিত ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির যুগ্মমহাসচিব অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম আজাদ, যুবদলের সভাপতি মোনায়েম মুন্না, সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন, সহসভাপতি জিয়াউর রহমান জিয়া ও ফেরদৌস মুন্না, এজমাল হোসেন পাইলট, সিনিয়র যুগ্মসম্পাদক বিল্লাল হোসেন তারেক, যুগ্মসাধারণ সম্পাদক মো. তারেকুজ্জামান, আবুল মনসুর খান দীপক ও খন্দকার আল আশরাফ মামুনসহ যুবদলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা।

রিজভী বলেন, পুলিশবাহিনীতে অনেক সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তা রয়েছেন। তাদের নিরপেক্ষ ও স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিলে সমাজ থেকে অপরাধ দূর করা সম্ভব। কিন্তু সস্তা কৃতিত্ব বা বাহবা নেওয়ার জন্য দায়িত্বশীল অবস্থান থেকে বক্তব্য দিলে তা দেশের ক্ষতি করবে এবং সরকারকেও বিব্রত করবে।

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিভিন্ন সামাজিক ও উন্নয়নমূলক পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে রিজভী বলেন, তরুণদের দক্ষ করে দেশের উৎপাদন ও উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত করাই বিএনপির মূল লক্ষ্য। জাতির পুনর্গঠনে তরুণদের বিশৃঙ্খলার অংশ নয়, বরং উন্নয়নের মূল অংশীদার হিসাবে গড়ে তুলতে হবে।

তিনি বলেন, প্রান্তিক কৃষক ও দরিদ্র মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য, কেউ যেন অনাহারে না থাকে। অর্থনীতিবিদদের গবেষণায়ও এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশে দারিদ্র্যের হার দ্রুত কমিয়ে আনার সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষায় কোটি কোটি গাছ ও তালগাছ লাগানোর মতো পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। রিজভী বলেন, বিএনপি বহুদলীয় গণতন্ত্র, মুক্তচিন্তা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে। জিয়াউর রহমানের হাত ধরে অতীতে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল পুনরায় রাজনীতি করার সুযোগ পেয়েছিল। সংবাদপত্রের স্বাধীনতাও ফিরে এসেছিল। যুবদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচির প্রশংসা করে রিজভী বলেন, সংগঠনের নেতাকর্মীরা রক্তদান, মানবিক সেবা, বৃক্ষরোপণ ও উৎপাদনমুখী নানা কর্মসূচির মাধ্যমে দেশে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন।

ইইউ অ্যাম্বাসেডরের সৌজন্য সাক্ষাৎ : রুহুল কবির রিজভীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের অ্যাম্বাসেডর মাইকেল মিলার। মঙ্গলবার বিএনপির চেয়ারম্যানের গুলশান কার্যালয়ে এ সৌজন্য সাক্ষাতের সময় ইইউ অ্যাম্বাসেডর দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবকে শুভেচ্ছা জানান এবং বৈঠকে রাজনৈতিক ও চলমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিভিন্ন বিষয়ে সৌহার্দপূর্ণ আলোচনা এবং চলমান উন্নয়নকাজ আরও গতিশীল হবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। এছাড়াও এ বৈঠকে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান ও স্থানীয় নির্বাচন এবং এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন নিয়েও আলোচনা করেন। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাজনৈতিক কর্মকর্তা কামিলা পার্টিকা এবং রিজভীর পিএস কাজী নজরুল ইসলাম ও এপিএস জাহেদুল আলম।