বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ)। জনগণের সেবা দেওয়ার সরকারি দফতর। সেই দফতরেই সাধারণ মানুষের হয়রানি পদে পদে। সেবা পেতে দিনের পর দিন ঘুরতে হয় কর্মকর্তাদের পেছনে। দেশের বিআরটিএ কার্যালয়ে চরম ভোগান্তির পড়তে হয়। এ কারণে অনেকেই প্রয়োজন থাকার পরও যেতে চান না সেখানে। সেবা নিতে এসে অনেকেই ক্লান্ত হয়ে পড়েন। কারো সময় নষ্ট হয়। কারো আর্থিক ক্ষতি হয়। সব মিলিয়ে বিআরটিএ কার্যালয় যেন সাজের লাঠি বা দেখার বস্তু, কাজের নয় এমন এক প্রতিষ্ঠান।
মোটরযানের নিবন্ধন, ড্রাইভিং লাইসেন্স, ফিটনেস সনদসহ সড়ক পরিবহন ব্যবস্থার নানা সেবা এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেওয়া হয়। ব্যক্তিগত গাড়ির মালিক থেকে শুরু করে পেশাদার চালক, পরিবহন ব্যবসায়ী বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ এসব সেবার ওপর নির্ভরশীল। এই প্রতিষ্ঠানের সেবায় সামান্য অনিয়মও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। লাইসেন্স পেতে দেরি হলে চালকের পেশাগত কাজে বাধাগ্রস্ত হতে পারে। গাড়ির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঠিক না থাকলে সমস্যা তৈরি হতে পারে বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
গ্রাহকরা বলছেন, বিআরটিএ কার্যালয়ে সরকারি সেবা নিতে গিয়ে দালালের দ্বারস্থ হতে হয়। বিআরটিএ অফিসের কর্মকর্তাদের অসহযোগিতার কারণে গ্রাহকরা দালালদের কাজে সাহায্য চান। এরপর শুরু হয় একজন গ্রাহকের ভোগান্তি। শুধু দালালবিরোধী অভিযান চালালেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। প্রয়োজন স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা। যেখানে সেবাপ্রার্থী নিজেই নিয়ম মেনে কাজ সম্পন্ন করতে পারেন। কিন্তু কর্মকর্তারা এমনভাবে সেবাটিকে সাজিয়েছেন যেন দালাল ছাড়া কিছুই হয়না।
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কার্যালয়গুলোতে সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে নানা ধরনের ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে। ড্রাইভিং লাইসেন্স তৈরি ও নবায়ন, মোটরযানের নিবন্ধন, ফিটনেস সনদ, মালিকানা পরিবর্তনসহ বিভিন্ন সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য, অনিয়ম এবং হয়রানির অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই। কোনো কোনো কার্যালয়ে দালালদের প্রভাব এতটাই বেশি যে সাধারণ সেবাপ্রার্থী বুঝতেই পারেন না, কে দালাল আর কে কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তা।
নির্ধারিত নিয়মে আবেদন করার পরও অনেক ক্ষেত্রে কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। কোন কাগজে কী ঘাটতি রয়েছে, আবেদনটি কোন পর্যায়ে আছে কিংবা কত দিনে সেবা পাওয়া যাবে এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এমন পরিস্থিতিতে একশ্রেণির মধ্যস্থতাকারী দ্রুত কাজ করিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে সেবাপ্রার্থীদের কাছে অর্থ দাবি করে।
ভারী যানবাহনের পেশাদার চালক আকরাম হোসেন ইনকিলাবকে বলেন, বিআরটিএ অফিসে কোনো কাজ করতে যাওয়া মানে ভোগান্তিতে পড়া। আমরা সাধারণ চালক, আমাদের জন্য সেবা সহজ হওয়া প্রয়োজন। আমার লাইসেন্স হারিয়ে গেছে। এখন জিডি দিয়ে চলাচল করছি। বিআরটিএ অফিসে গিয়েছি। দালালদের সহযোগিতা ছাড়া করা সম্ভব না। দালালরা অনেক টাকা ডিমান্ড করে। তাই করতে পারছি না। এছাড়া কাগজপত্র নিয়ে বিআরটিএ কার্যালয়ে আসার পরও কাজ শেষ করতে বার বার আসতে হয়। এতে গাড়ি চালানোর সময় নষ্ট হয়। সেবা দেয়ার বিষয়ে বিআরটিএ কর্তৃপক্ষের কোনো সহযোগিতা নেই।
এবিষয়ে বক্তব্য জনতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবীবুর রহমানের মোবাইল ফোনে কল করা হলে রিসিভ করেন নি।
এদিকে, মোটরসাইকেলের সামনের অংশে নম্বর প্লেট লাগানো বাধ্যতামূলক করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে বিআরটিএ। এ নির্দেশনা বাস্তবায়নে আগামী ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। দেশে প্রায় ৫১ লাখ মোটরসাইকেল রয়েছে। এখন পেছনের নম্বরপ্লেটের জন্য গ্রাহকের কাছ থেকে বিআরটিএ ২ হাজার ২৬০ টাকা নিচ্ছে। ঢাকার সড়কে থাকা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ক্যামেরায় মোটরসাইকেলের নম্বর সহজে শনাক্ত করে আইনভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলে সামনে নম্বরপ্লেট বসানোর সিদ্ধান্ত হয়। বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষকে (বিআরটিএ)।
আরএফআইডি হচ্ছে বেতারতরঙ্গের মাধ্যমে যানবাহন শনাক্ত করার ইলেকট্রনিক ট্যাগ। বিআরটিএ এই ব্যবস্থা চালুর সময় বলেছিল, এর মাধ্যমে যেকোনো পরিস্থিতিতে যানবাহন শনাক্ত করা যাবে। জাল নম্বরপ্লেট ব্যবহার এবং একাধিক গাড়িতে একই নম্বর ব্যবহারের প্রবণতা বন্ধ হবে। চুরি হওয়া গাড়ি উদ্ধার, চুরি বা ছিনতাই হওয়া গাড়ির অবস্থান শনাক্ত করতে সহায়তা করবে। অপরাধমূলক কর্মকা-ে যানবাহন শনাক্ত করা। সড়কে গাড়ির চলাচল শনাক্ত ও নজরদারি করা।
বিআরটির নির্দেশনায় মোটরসাইকেলের সামনে নম্বরপ্লেট মালিক নিজেই মাপমতো লাগাবে। বিআরটিএ থেকে নিতে হবে না। মোটরসাইকেলের একটি নম্বরপ্লেটের জন্য মালিকের কাছ থেকে ২ হাজার ২৬০ টাকা নেওয়া হয়। নিবন্ধনের সময় এই টাকা দেওয়া বাধ্যতামূলক। নম্বরপ্লেট ভেঙে গেলে বা নষ্ট হলে একই পরিমাণ টাকা দিয়ে আবার নিতে হয়। সামনে নম্বরপ্লেট লাগালে প্রায় ৫১ লাখ মোটরসাইকেলের মালিকদের বাড়তি খরচ হবে ১ হাজার ১৫২ কোটি টাকার বেশি।