বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের অর্থছাড় কমেছে ৪২ শতাংশের বেশি। বিপরীতে বেড়েছে আগের ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের চাপ।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) জুলাই-সেপ্টেম্বরের প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে ১৩৫ কোটি ১২ লাখ ৩০ হাজার ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই ব্যয় ছিল ১২৭ কোটি ৯৯ লাখ ৫০ হাজার ডলার।
অন্যদিকে উন্নয়ন সহযোগীরা এই সময়ে ঋণ ও অনুদান মিলিয়ে ছাড় করেছে ৬৬ কোটি ২৩ লাখ ১০ হাজার ডলার। এর মধ্যে এক কোটি ডলার খাদ্য সহায়তা এবং ৬৫ কোটি ২৩ লাখ ১০ হাজার ডলার প্রকল্প সহায়তা। গত অর্থবছরের একই সময়ে মোট অর্থছাড় হয়েছিল ১১৪ কোটি ৮৫ লাখ ৯০ হাজার ডলার। সেই হিসাবে বৈদেশিক সহায়তার অর্থছাড় কমেছে ৪২.৩ শতাংশ।
অর্থাৎ প্রতি এক ডলার বৈদেশিক সহায়তার বিপরীতে ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২.০৪ ডলার। তিন মাসে অর্থছাড় ও ঋণ পরিশোধের ব্যবধান দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৮ কোটি ৮৯ লাখ ডলার। অর্থছাড়ের তুলনায় পরিশোধ বেশি হওয়ায় বৈদেশিক সহায়তার মাধ্যমে তাৎক্ষণিক অর্থপ্রবাহের সুবিধা সীমিত হয়ে পড়েছে।
প্রথম তিন মাসে ঋণের আসল পরিশোধে ব্যয় হয়েছে ৮৫ কোটি ৮৯ লাখ ২০ হাজার ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের ৮১ কোটি ৬৯ লাখ ৯০ হাজার ডলারের চেয়ে বেশি। এই সময়ে সুদ পরিশোধ বেড়ে হয়েছে ৪৯ কোটি ২৩ লাখ ১০ হাজার ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে সুদ পরিশোধের পরিমাণ ছিল ৪৬ কোটি ২৯ লাখ ৬০ হাজার ডলার।
প্রতিশ্রুতি বাড়লেও অর্থছাড় কম : বৈদেশিক সহায়তার অর্থছাড় কমলেও নতুন ঋণ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি বেড়েছে। ইআরডির হিসাবে, জুলাই-সেপ্টেম্বরে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ১২৭ কোটি ৩০ লাখ ৩০ হাজার ডলারের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৯১ কোটি ৬ লাখ ৭০ হাজার ডলার।
এই সময়ে সবচেয়ে বেশি অর্থছাড় করেছে বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (আইডিএ) ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। আইডিএ দিয়েছে ১৯ কোটি ৬৫ লাখ ১০ হাজার ডলার এবং এডিবি ১৬ কোটি ২১ লাখ ১০ হাজার ডলার। দুই সংস্থার সম্মিলিত অর্থছাড় মোট বৈদেশিক সহায়তার প্রায় ৫৪ শতাংশ। ভারত থেকে এসেছে ১০ কোটি ৪৯ লাখ ৯০ হাজার ডলার। জাপান দিয়েছে চার কোটি ৪৬ লাখ ৬০ হাজার ডলার, রাশিয়া দুই কোটি ছয় লাখ ৫০ হাজার ডলার এবং চীন এক কোটি ৪৬ লাখ ৬০ হাজার ডলার।
ব্যাংকঋণে ধীরগতি, বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা
বৈদেশিক অর্থপ্রবাহের দুর্বলতার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ঋণ ও বিনিয়োগেও গতি নেই। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সেপ্টেম্বরের অর্থনৈতিক পর্যালোচনা অনুযায়ী, গত আগস্টে ব্যাংক খাতে আমানত প্রবৃদ্ধি ছিল ১১.৯৬ শতাংশ। বিপরীতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৪.৭৫ শতাংশ। গত বছরের একই সময়ে এই হার ছিল ৬.৩৫ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকে আমানত বাড়লেও বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণের প্রবৃদ্ধি কমেছে। উচ্চ ঋণ ব্যয়, ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরতে সময় লাগা এবং ঋণঝুঁকিকে এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে জিইডি।
রাজস্ব ঘাটতি ২৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে
সরকারের রাজস্ব আদায়েও বড় ঘাটতি রয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৮১ হাজার ৫৩ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে ৫৫ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা। ফলে দুই মাসে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা।
রাজস্ব ঘাটতি সরকারের বাজেট বাস্তবায়ন ও নিজস্ব অর্থায়নে উন্নয়ন প্রকল্প পরিচালনায় চাপ তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে বৈদেশিক সহায়তার অর্থছাড় কমে যাওয়ায় বিদেশি অর্থায়ন নির্ভর প্রকল্পেও অর্থপ্রবাহের সমস্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এডিপি বাস্তবায়ন ইতিহাসের সর্বনিম্ন
উন্নয়ন ব্যয়ের চিত্রও উদ্বেগজনক। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩.৮৯ শতাংশ। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে ব্যয় হয়েছে ১২ হাজার ১৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে বাস্তবায়নের হার ছিল ৫.০৯ শতাংশ এবং ব্যয় হয়েছিল ১২ হাজার ১৫৮ কোটি ২৭ লাখ টাকা। এর আগের অর্থবছর ২০২৪-২৫-এর প্রথম তিন মাসে বাস্তবায়নের হার ছিল ৪.৭৫ শতাংশ। ফলে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এডিপি বাস্তবায়নের হার ও ব্যয়—দুটিই ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।
বিদেশি ঋণ ও অনুদাননির্ভর প্রকল্পে অর্থছাড়ের ধীরগতি বাস্তবায়ন ব্যাহত করতে পারে। তবে প্রকল্প প্রস্তুতি, দরপত্র ও ক্রয়প্রক্রিয়ার জটিলতা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বিলম্ব এবং মাঠ পর্যায়ের বাস্তবায়ন সমস্যাও এডিপির ধীরগতির কারণ হতে পারে।
মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম মজুরি বৃদ্ধি
অর্থনীতির চাপের প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতায়ও। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাবে, সেপ্টেম্বরে দেশে সাধারণ মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮.৩৪ শতাংশ হয়েছে। আগস্টে এই হার ছিল ৮.২৬ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৭.২২ শতাংশ হয়েছে, যা আগস্টে ছিল ৭.০২ শতাংশ। খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে ৯.৩০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে সেপ্টেম্বরে মজুরি বৃদ্ধির হার কমে ৭.৯০ শতাংশ হয়েছে, আগস্টে যা ছিল ৮.০৫ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ০.৪৪ শতাংশীয় পয়েন্ট কম। এতে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ অব্যাহত রয়েছে।
এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশে বিনিয়োগ না বাড়ার অন্যতম কারণ অনুকূল পরিবেশের অভাব। বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত না হলে অর্থনীতিতে গতি ফেরানো কঠিন হবে। তাঁর মতে, একসঙ্গে অনেক উদ্যোগ নেওয়ার পরিবর্তে ছয়-সাতটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তি সহজ করা এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানো জরুরি।