গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) পরিচয়ে সোনা ব্যবসায়ী ও তাদের কর্মীদের পথরোধ করা হতো। কখনো তল্লাশির কথা বলে, কখনো অবৈধ মালামাল বহনের অভিযোগ তুলে তাদের গাড়িতে তোলা হতো। এরপর সোনা কেড়ে নিয়ে নির্জন স্থানে ফেলে যেত চক্রের সদস্যরা। এমন একাধিক ঘটনায় পুলিশের সদস্যদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে। কোনো কোনো ঘটনায় পুলিশ সদস্যদের গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।
রাজধানী ও ঢাকার আশপাশে সোনা ছিনতাইয়ের এমন একটি চক্রের নেপথ্যে থাকার অভিযোগ উঠেছে কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) এসআই রিপন সরকারের বিরুদ্ধে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ডিবি রমনা বিভাগের তদন্তে তার সংশ্লিষ্টতা বেরিয়ে আসে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে বিভিন্ন সোনা ব্যবসায়ীকে লক্ষ্য করে ছিনতাইয়ের কথা তিনি স্বীকার করেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রিপন সরকারের বাড়ি চাঁদপুরের মতলবে। এলাকায় নিজেকে পুলিশ সুপার (এসপি) পরিচয় দিতেন। দামি গাড়িতে চলাফেরা করার পাশাপাশি নিজ এলাকায় নামে-বেনামে সম্পদ গড়েছেন। টাঙ্গাইল ও মানিকগঞ্জেও তার সম্পদ রয়েছে। রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্কে তার ফোন এক্স ও অ্যাপল হাটসহ চারটি দোকান রয়েছে। এর একটি তার ছোট ভাই পরিচালনা করেন, অন্যগুলো ম্যানেজারের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ২০২৪ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসার পথে এক সোনা ব্যবসায়ীকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে আটক করে তার কাছ থেকে ৭০ ভরি সোনা নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাকে রমনা এলাকায় ফেলে রেখে যায় ছিনতাইকারীরা। এ ঘটনায় অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত শুরু করে ডিবি রমনা বিভাগ। ভুক্তভোগীকে যে গাড়িতে তোলা হয়েছিল, বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সেটির চালককে শনাক্ত করা হয়। পরে সালাম নামে ওই চালককে আটক করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ কনস্টেবল মিজানকে আটক করা হয়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে রিপন সরকারের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যায় বলে জানান তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাইয়ে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে ৭০ ভরি সোনার সাতটি বার ছিনতাইয়ের ঘটনায়ও এই চক্রের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। সোনার বারগুলো নিয়ে পাবনার ঈশ্বরদীতে যাওয়ার পথে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় শিবালয় উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিকবিষয়ক সম্পাদক বিশ্বজিৎ দাস এবং উপজেলা শ্রমিক লীগের সভাপতি অসিয়ার রহমান সিকোরও সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যায়।
জানতে চাইলে পুলিশ সদরদপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) কামারুন মুনিরা এ প্রতিবেদককে বলেন, পুলিশের যে কেউ ফৌজদারি যেকোনো অপরাধে জড়িত হলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়ে থাকে। একই সঙ্গে বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হয়। আর তাদের অপরাধে জড়িত হওয়ার বিষয়টি পুরো মনস্তাত্ত্বিক বিষয়। যদি নৈতিক অবস্থান শক্ত না হলে অপরাধ নির্মূলের পরিবর্তে তারা অপরাধেই জড়িয়ে পড়ে।
৭০ ভরি ওই স্বর্ণালংকার লুটের ঘটনায় এসআই রিপন ও দুজন কনস্টেবলসহ সাতজনকে অভিযুক্ত করে গত ৩১ মে চার্জশিট দিয়েছে পুলিশ। অন্য অভিযুক্তরা হলেন- সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) কনস্টেবল মিজানুর রহমান শিকদার (৩৮), ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ-৪ এর কনস্টেবল আবু বকর (৩২), সিএনজিচালক মনু মিয়া (৪১), মাইক্রোবাসচালক সালাম, ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ-৪ এর নায়েক হানিফ মিয়াজী (৩৩) ও হাবিব উল্লাহ (৩৮), তারা পলাতক।
তদন্ত কর্মকর্তা এসআই (অবসরপ্রাপ্ত) মো. ইরফান খান জানিয়েছেন, কনস্টেবল মিজানুর রহমান ও সিএনজিচালক মনু মিয়া ১৬৪ ধারায় ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, পুলিশের কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে ডিবি পরিচয়ে সোনা ও টাকা ছিনতাইয়ের অভিযোগ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভ্যন্তরীণ তদারকি ও জবাবদিহির দুর্বলতাকে সামনে আনে। অপরাধ দমনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরাই যদি অপরাধে জড়িয়ে পড়েন, তাহলে সাধারণ মানুষের পুলিশের প্রতি আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে অভিযুক্ত সদস্যদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।
আগেও ডিবি পরিচয়ে সোনা লুট : পুলিশ পরিচয়ে সোনা ছিনতাইয়ের ঘটনা নতুন নয়। ২০২২ সালের ১৮ জুলাই রাজধানীর গাবতলীতে ৩৮ ভরি স্বর্ণালংকার ছিনতাইয়ের শিকার হন তাঁতীবাজারের একটি সোনার দোকানের কর্মচারী টিটু প্রধানিয়া।
টাঙ্গাইলগামী বাস ধরার জন্য অপেক্ষা করার সময় ডিবি পরিচয়ে এক ব্যক্তি তার ব্যাগে কী আছে জানতে চান। স্বর্ণালংকার থাকার কথা জানানোর পর আরও ৪-৫ জন সেখানে হাজির হন। তেজগাঁও থানায় নেওয়ার কথা বলে তাকে মোটরসাইকেলে তুলে বেড়িবাঁধে নেওয়া হয়। পরে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে বিজয় সরণিতে আনা হয়। সেখানে ট্রাফিক সিগন্যালে গাড়ি আটকে গেলে স্বর্ণালংকারভর্তি ব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যান তারা।
টিটুর দেওয়া মোটরসাইকেলের নম্বর ধরে তদন্তে রূপনগর থানার তৎকালীন এএসআই জাহিদুল ইসলামের নাম উঠে আসে।
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে কেরানীগঞ্জে ৯৮ ভরি সোনার আটটি বার লুটের ঘটনায় পুলিশের এক কনস্টেবলসহ আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেসময় পুলিশ জানায়, সিংগাইরের সোলায়মান জুয়েলার্সের কর্মচারী বরুণ ঘোষ ওই বছরের ২ সেপ্টেম্বর পুরান ঢাকার তাঁতীবাজারে গয়না তৈরির জন্য সোনার বারগুলো নিয়ে যাচ্ছিলেন। দোকান বন্ধ পেয়ে ফিরে আসার পথে কেরানীগঞ্জের সাজেদা হাসপাতালের কাছে তাকে পুলিশ পরিচয়ে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নেওয়া হয়। তার চোখ বেঁধে মারধর করে সোনার বার, চালানের কাগজপত্র ও তিন হাজার টাকা কেড়ে নেওয়া হয়। পরে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের ঝিলমিল এলাকায় তাঁকে ফেলে রাখা হয়। এ ঘটনায় লালবাগ থানার কনস্টেবল কামরুজ্জামানসহ আটজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানায় ঢাকা জেলা পুলিশ।
সোনা-টাকা লুটের ঘটনায় বারবার পুলিশের নাম : সোনা ছিনতাইয়ের বাইরেও বিভিন্ন সময়ে ব্যবসায়ীদের টাকা লুটের ঘটনায় পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ব্যবসায়ী আবদুল্লাহ আল মামুনের ২০ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের মামলায় ডেমরা পুলিশ লাইনসের দুই কনস্টেবল মাহাবুব আলী ও আছিফ ইকবালসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়। পরে অন্য এক আসামির বাসা থেকে বাকি ১০ লাখ টাকা উদ্ধার এবং ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়। একই বছরের অক্টোবরে রাজধানীর ধোলাইরপাড়ে ব্যবসায়ী আবুল কালামের ৫৪ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় দুই পুলিশ সদস্য দেলোয়ার হোসেন ও আবু সায়েমকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০২৪ সালের মার্চে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের মির্জাপুরের ধেরুয়া এলাকায় ছিনতাইয়ের অভিযোগে মানিকগঞ্জের দৌলতপুর থানায় কর্মরত দুই কনস্টেবল রিপন রাজবংশী ও মহসিন মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে ২০২০ সালের ৭ জানুয়ারি ৯০ ভরি সোনা এবং ৫ লাখ টাকা লুটের পৃথক ঘটনায় পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের আট কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যায়।