Image description

নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতে সব শিক্ষার্থীর হাতে বিনামূল্যের পাঠ্যবই তুলে দেওয়া নিয়ে এবারও শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ছাপাখানাগুলোর অগ্রগতি প্রতিবেদন বলছে, প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা সময়মতো বই পেলেও মাধ্যমিকের সব বই পাওয়া অনিশ্চিত। সবচেয়ে বেশি ঝুঁঁকিতে নবম-দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা। ১১৩টির মধ্যে ৭৪টি প্রেস এখনো এই শ্রেণির একটি বইও প্রস্তুত করতে পারেনি। ৫২টি প্রেস ছাপাই শুরু করেনি। ২২টি প্রেস শুধু নবম-দশম শ্রেণির বইয়ের কাজ পেলেও বই সরবরাহে অগ্রগতি শূন্য। অষ্টম শ্রেণির বই ছাপা শুরু হয়নি ১৭টি প্রেসে। ফলে সময়মতো বই সরবরাহ নিয়ে শঙ্কার পাশাপাশি শেষ মুহূর্তে তড়িঘড়ি করে নিম্নমানের বই সরবরাহের আশঙ্কা জোরালো হচ্ছে।

আগামী শিক্ষাবর্ষে প্রায় ৩১ কোটি পাঠ্যবই ছাপার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে প্রাথমিকের প্রায় ৮ কোটি ২০ লাখ এবং মাধ্যমিকের ২২ কোটির বেশি বই। ৩০ নভেম্বরের মধ্যে মানসম্মত বই ছাপার লক্ষ্যে এবার ছাপাখানাগুলোকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়েছে। দরপত্রে মূল্যহারও বাড়ানো হয়েছে। গভীর রাতে প্রেসে হাজির হচ্ছেন শিক্ষামন্ত্রী। পুজোর ছুটি বাতিল হয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) কর্মকর্তাদের। তারপরও বই সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রেস মালিকদের অভিযোগ, ২০টি প্রতিষ্ঠান সিন্ডিকেট করে সক্ষমতার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি কাজ নিয়েছে। মাধ্যমিকের ২২ কোটি বইয়ের মধ্যে ৯ কোটি ৬৫ লাখের ছাপার কাজ পেয়েছে তারা। দুই শতাধিক দরপত্রে ছিল একক দরদাতা। প্রতিযোগিতা না থাকায় প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়ে ৮-৯ শতাংশ বেশি দামে কাজ পেয়েছে। এখন লোডশেডিংসহ নানা অজুহাতে কালক্ষেপণ করছে। মূলত শেষ সময়ে তড়িঘড়ি করে নিম্নমানের বই গছিয়ে দিতে এটা তাদের পুরোনো কৌশল।

ছাপাখানাগুলোর অগ্রগতি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সরকার প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিশিং ২১ লটে ২৩ কোটি ৩৯ লাখ ৪১ হাজার ৭২৩ ফর্মা মুদ্রণের কাজ পেয়েছে। মুদ্রণ হয়েছে ৭ কোটি ৬৫ লাখ ৪৫ হাজার ৫১৭ ফর্মা, অর্থাৎ ৩২.৭২ শতাংশ। পিডিআই হয়েছে মাত্র ২৬.৫৪ শতাংশ বইয়ের। নবম-দশম শ্রেণির বই ছাপা শুরু করেনি প্রতিষ্ঠানটি। ব্রাইট প্রিন্টিং প্রেস লিমিটেড ছয় লটে ১০ কোটি ১৬ লাখ ৩০ হাজার ৮৮০ ফর্মা মুদ্রণের কাজ পেয়েছে। এর মধ্যে নবম-দশম শ্রেণিরই ৬ কোটি ৪৯ লাখ ৫০ হাজার ৪৪৮ ফর্মা। ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২৫ দিনে প্রতিষ্ঠানটি ছাপতে পেরেছে মাত্র ৩১ লাখ ২৬ হাজার ১৯০ ফর্মা। একটি বইও পিডিআই হয়নি। অটো প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং প্রায় ৫ কোটি ফর্মা অষ্টম শ্রেণির বই মুদ্রণের কাজ শুরুই করেনি। সরকার প্রেস, কচুয়া প্রিন্ট অ্যান্ড পাবলিকেশন্স, পলি প্রিন্টিং প্রেস, লেটার এন কালার, অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেস, কর্ণফুলী প্রিন্টার্সসহ বেশি কাজ পাওয়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান এখনো অষ্টম ও নবম-দশম শ্রেণির বই ছাপা শুরু করেনি। অথচ সবচেয়ে বেশি- প্রায় সাড়ে ৫ কোটি বই ছাপতে হবে এই শ্রেণির জন্য।

এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, ১১৩টি প্রেসকে ৬২৩ লটে ২৮ কোটি ১১ লাখ ৪০ হাজার ৭৪৫টি বই ছাপার কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে। মোট বরাদ্দ ৫০৪ কোটি ৩৭ লাখ ৬৬ হাজার ২৪ ফর্মা। ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত মুদ্রণ হয়েছে ২৫৮ কোটি ৭৩ লাখ ২১ হাজার ৯৪২ ফর্মা, যা মোট বরাদ্দের ৫১.৩০ শতাংশ। পিডিআই সম্পন্ন হয়েছে ৩৮.৮৭ শতাংশের। নতুন যুক্ত হওয়া চারটি বইয়ের দরপত্র প্রক্রিয়া চলছে।

স্তরভিত্তিক অগ্রগতিতেও রয়েছে বড় ব্যবধান। প্রাক-প্রাথমিকের ৯১.৬৬ শতাংশ বই প্রস্তুত এবং ৮১.৯৩ শতাংশের পিডিআই হয়েছে। প্রাথমিকের ক্ষেত্রে এ হার যথাক্রমে ৭৭.৫১ ও ৬৩.৩৯ শতাংশ। ইবতেদায়িতে প্রস্তুত ৫৩.৪৫ শতাংশ, পিডিআই হয়েছে ৩৮.৬২ শতাংশের। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির মাত্র ৩৫.১৬ শতাংশ বই প্রস্তুত হয়েছে; পিডিআই হয়েছে ২৩ শতাংশের। সর্বাধিক বই নবম-দশম শ্রেণির হলেও অগ্রগতি মাত্র ২ শতাংশ, অষ্টম শ্রেণির ১৩ শতাংশ।

সংশ্লিষ্ট কয়েকজন প্রেস মালিকের অভিযোগ, বড় কাজ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো শেষ মুহূর্তে নিম্নমানের বই সরবরাহের চেষ্টা করতে পারে। তখন পিডিআইয়ের জন্য পর্যাপ্ত সময় থাকবে না। নিম্নমানের কাগজ, কালি, বাঁধাই ও অন্যান্য অনিয়মের অভিযোগে ইতোমধ্যে ২৩টি প্রেসকে কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়েছে এনসিটিবি। এর মধ্যে প্রাথমিক স্তরের বই ছাপায় অনিয়মের অভিযোগে ছয়টি এবং মাধ্যমিকের ক্ষেত্রে ১৭টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। একটি প্রতিষ্ঠানকে একাধিকবার নোটিস দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। তাদের মতে, বড় প্রেসগুলো চাইছে শেষ মুহূর্তে নিম্নমানের বই পিডিআই এড়িয়ে সারা দেশে পৌঁছে দিতে। এতে প্রতি ফর্মায় ১০ পয়সা বেশি লাভ থাকলেও ৫ কোটি ফর্মায় ৫০ লাখ টাকা লাভ হবে। তখন সরবরাহ পরবর্তী পরিদর্শনে (পিএলআই) ধরা পড়লেও জরিমানা দিয়ে পার পেয়ে যাবে।

তবে এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক আবু নাসের টুকু সময়মতো বই সরবরাহ ও মান নিয়ে আশাবাদী। তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ৩০ অক্টোবরের মধ্যে প্রাথমিকের ৯৯ শতাংশ বইয়ের কাজ শেষ হবে। অন্য বই কিছুটা দেরি হলেও নতুন বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীরা পাবে। নির্ধারিত সময়ে মানসম্মত বই দিতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করাসহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।