Image description

ঋণ দেওয়ার আগে যথাযথ মূল্যায়নের ঘাটতি, ঋণ অনুমোদনে সুশাসনের দুর্বলতা এবং খেলাপি ঋণ শনাক্তে বিলম্ব-এই তিন কারণে চাপে পড়েছে দেশের ব্যাংকিং খাত। ঋণগ্রহীতার পরিশোধ সক্ষমতা যাচাইয়ের পরিবর্তে জামানতনির্ভর ঋণ, ঋণ বিতরণের পর কার্যকর তদারকির অভাব এবং প্রকৃত আর্থিক চিত্র আড়াল করার প্রবণতা খেলাপি ঋণের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) এক গবেষণায় উঠে এসেছে এসব দুর্বলতা। গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন মাসের শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ঋণ মূল্যায়ন থেকে শুরু করে বিতরণ, তদারকি, পুনঃতফসিল ও আদায়-পুরো প্রক্রিয়ায় কার্যকর সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন গবেষকেরা।

ঋণ মূল্যায়নে দুর্বলতা : খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনে ঋণগ্রহীতার প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা যাচাইয়ে ঘাটতিকে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিআইবিএম। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের ৬৮ দশমিক ৮ শতাংশ জানিয়েছেন, ঋণ মূল্যায়নে প্রায়ই যথাযথ নগদ প্রবাহ বিশ্লেষণ করা হয় না। অন্যদিকে, ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ উত্তরদাতা শিল্প ও খাতভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণের ঘাটতির কথা বলেছেন। ঋণগ্রহীতার হাতে কী পরিমাণ অর্থ আসছে, ব্যবসা থেকে আয় কত এবং সেই আয় দিয়ে ঋণের কিস্তি পরিশোধ সম্ভব কি না-এসব বিষয় ঋণ মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এসব যাচাই দুর্বল হলে ঋণ অনুমোদনের সময়ই ঝুঁকি থেকে যায়। পরে ব্যবসায় লোকসান বা নগদ প্রবাহে সংকট দেখা দিলে ঋণ খেলাপি হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। এ কারণে জামানতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে ঋণগ্রহীতার নগদ প্রবাহ ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাকে ঋণ মূল্যায়নের প্রধান ভিত্তি করার সুপারিশ করেছে গবেষণা দল।

অনুমোদনে সুশাসনের ঘাটতি : ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে নীতিমালা ও বাস্তব প্রয়োগের ব্যবধানও ব্যাংক খাতের অন্যতম দুর্বলতা। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের ৬০ শতাংশ সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ দেওয়াকে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এ ছাড়া ৮০ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, নিয়ন্ত্রক নীতিতে শিথিলতা বা বারবার নীতিগত হস্তক্ষেপ ব্যাংকিং খাতে ঋণ শৃঙ্খলাকে দুর্বল করে। সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাত, সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব এবং যথাযথ ঝুঁকি যাচাইয়ের ঘাটতি তৈরি হলে ঋণের মান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একইভাবে, ঋণ অনুমোদনে জবাবদিহি ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিশ্চিত না হলে নিয়মের চেয়ে প্রভাবের গুরুত্ব বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। গবেষণায় ঋণ অনুমোদন ও সুশাসনের ক্ষেত্রে নীতিমালা বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় ব্যবধান চিহ্নিত করা হয়েছে। এরপর রয়েছে ঋণ মূল্যায়ন এবং ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে নীতি ও বাস্তব প্রয়োগের পার্থক্য। তবে এসব ফলাফল উত্তরদাতাদের অভিমত ও উপলব্ধির ভিত্তিতে পাওয়া; এগুলো সংশ্লিষ্ট সমস্যার প্রকৃত ব্যাপকতার পরিমাপ নয় বলে গবেষণায় স্পষ্ট করা হয়েছে।

বিতরণের পর তদারকি দুর্বল : ঋণ অনুমোদন ও বিতরণেই ব্যাংকের দায়িত্ব শেষ হয় না। ঋণের অর্থ যে উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে, তা যথাযথভাবে ব্যবহার হচ্ছে কি না এবং ঋণগ্রহীতার ব্যবসার আর্থিক অবস্থা কেমন-নিয়মিত তা যাচাই করাও জরুরি। কিন্তু গবেষণায় ঋণ বিতরণের পর অর্থের ব্যবহার নিশ্চিত করা, নির্ভরযোগ্য নগদ প্রবাহের তথ্য সংগ্রহ এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কথা উঠে এসেছে। ঋণের কিস্তি বকেয়া পড়া, অস্বাভাবিক লেনদেন, নগদ প্রবাহ কমে যাওয়া, ঋণের অর্থ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া এবং ঋণগ্রহীতার ঝুঁকির মান অবনতিকে আগাম সতর্কসংকেত হিসেবে চিহ্নিত করেছে গবেষণা দল। এসব লক্ষণ সময়মতো শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিলে ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা বাড়তে পারে। বিপরীতে, তদারকির ঘাটতিতে ঋণগ্রহীতার আর্থিক সংকট গভীর হওয়ার পর পরিস্থিতি সামনে আসতে পারে। তখন ঋণ আদায় আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

খেলাপি ঋণ স্বীকৃতিতে বিলম্ব : খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র যথাসময়ে প্রকাশ না করাও ব্যাংক খাতের ঝুঁকি বাড়ায়। গবেষণায় ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণের চাপ, ব্যবস্থাপনার জবাবদিহি নিয়ে উদ্বেগ এবং ব্যাংকের সম্পদের গুণগত মানসংক্রান্ত সূচক ভালো দেখানোর প্রবণতাকে খেলাপি ঋণ স্বীকৃতিতে বিলম্বের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ঋণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে প্রকৃত ব্যবসায়িক পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে খেলাপি ঋণ ও প্রভিশনসংক্রান্ত সূচক উন্নত দেখানোর উদ্দেশ্যে পুনঃতফসিল করা হলে সমস্যার প্রকৃত চিত্র আড়ালে থাকার ঝুঁকি থাকে। ফলে ঋণের মান ও ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার সঠিক মূল্যায়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় যথাসময়ে খেলাপি ঋণ শনাক্ত ও স্বীকৃতি, প্রকৃত আর্থিক অবস্থা প্রকাশ এবং প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বিআইবিএম।

প্রয়োজন কার্যকর সংস্কার : খেলাপি ঋণ আদায়ে আলোচনা ও সমঝোতা, ঋণ পুনর্গঠন, জামানত নগদায়ন, আইনি পদক্ষেপ এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতি (এডিআর) কার্যকরভাবে ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছে গবেষণায়। তবে এসব পদ্ধতির সাফল্য নির্ভর করে ঋণগ্রহীতার ব্যবসায়িক সক্ষমতা, ঋণ পরিশোধের সম্ভাবনা এবং আইনগতভাবে পাওনা আদায়ের বাস্তবসম্ভাবনার ওপর।

বিআইবিএমএর মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, গবেষণাটি ঋণ মূল্যায়নের মান, ঋণ প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বাধীনতা, ঋণ বিতরণ-পরবর্তী তদারকি এবং ঋণ পুনর্গঠন ও আদায় প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে। তাঁর ভাষায়, ‘খেলাপি ঋণের উচ্চ হার একটি উপসর্গ মাত্র; আমাদের কাজ হলো এর কারণগুলো খতিয়ে দেখা এবং বাস্তবায়নযোগ্য সংস্কার চিহ্নিত করা। গবেষণার মূল সুপারিশ হলো, ঋণ অনুমোদনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, নগদ প্রবাহভিত্তিক মূল্যায়ন চালু করা, ঋণ বিতরণের পর নিয়মিত তদারকি বাড়ানো এবং খেলাপি ঋণ যথাসময়ে স্বীকৃতি দেওয়া। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে খেলাপি ঋণের উচ্চহার ব্যাংকের সম্পদের গুণগত মান ও ঋণ ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকবে।