দেশের পর্যটন ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের লাইফলাইন চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক পরিণত হয়েছে আতঙ্কের রাজপথে। যাতায়াতকারী যাত্রী, ব্যবসায়ী ও চালকদের কাছে এটি এখন আর নিছক কোনো মহাসড়ক নেই, পরিণত হয়েছে আতঙ্কের এক ‘ডাকাতির রাজপথে’। দিনে কিংবা রাতে এ মহাসড়কে লুঠপাট চলছে সমানতালে। মহাসড়ক ও সংযোগ সড়কগুলো জুড়ে অর্ধশতাধিক স্পট হয়ে উঠেছে চরম ঝুঁকিপূর্ণ। এ ত্রাসের রাজত্ব কায়েমের নেপথ্যে কাজ করছে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় বাংলাদেশি অপরাধীদের ভয়ংকর সশস্ত্র সিন্ডিকেট। এ বিষয়ে হাইওয়ে পুলিশ কুমিল্লা অঞ্চলের পুলিশ সুপার মনজুর মোরশেদ বলেন, ‘হাইওয়েতে অপরাধ রোধে স্থানীয় থানা হাইওয়ে পুলিশের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে। নিয়মিত টহলের পাশাপাশি চেকপোস্ট পরিচালনা করা হয়। কিন্তু জনবল ও যানবাহন সংকটের কারণে অনেক এলাকা কাভার করা কঠিন হয়ে পড়ছে।’
স্থানীয় ও গোয়েন্দা সূত্রের তথ্যানুযায়ী, চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত মহাসড়ক এবং এর শাখা সড়কগুলোয় অন্তত ৫০টির বেশি ডাতাদির ঝুঁকিপূর্ণ স্পট রয়েছে। এসব স্পটে হাইওয়ে পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল কম থাকার সুযোগে ডাকাতরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
এ অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে অভিনব ও ভয়ংকর কৌশল অবলম্বন করে ডাকাত দলগুলো। পাহাড়ি বাঁক বা নির্জন এলাকায় তারা হঠাৎ রাস্তায় বিশাল আকৃতির গাছ কেটে ব্যারিকেড তৈরি করে। গাড়ি থামতে বাধ্য হলে মুহূর্তেই ২০-২৫ জনের সশস্ত্র দল চারপাশ ঘিরে ফেলে। অনেক সময় চলন্ত গাড়ির উইন্ডশিল্ড (সামনের কাচ) লক্ষ্য করে পাথর ছোড়া হয়, যাতে চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাড়ি থামাতে বাধ্য হন। ছোট যানের ক্ষেত্রে, ডাকাতদের কয়েকজন যাত্রী সেজে সিএনজি বা মাহিন্দ্রায় ওঠে এবং নির্জন স্থানে পৌঁছালে চালককে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে সর্বস্ব লুটে নেয়।
এ মহাসড়কে ডাকাতিপ্রবণ এলাকা রয়েছে অর্ধশতাধিক। এর মধ্যে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-চকোরিয়া অংশের দুই পাশে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও পাহাড়ি এলাকা থাকায় কমপক্ষে ২০ স্পটে সবচেয়ে বেশি ডাকাতি ঘটে; যার মধ্যে সাতটি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ স্পট রয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ফাঁসিয়াখালী ঢালা, খুটাখালী ও মেধাকচ্ছপিয়া ঢালা, হারবাং ও আজিজনগর সীমান্ত, বানিয়ারছড়া ও বরইতলী সংযোগস্থল, মালুমঘাট রিজার্ভ ফরেস্ট এলাকা, ডুলাহাজারাসংলগ্ন নির্জন বাঁক। এ ছাড়া হারবাং, খুটাখালী ও ডুলাহাজারার বিভিন্ন অরণ্যঘেরা ঢালু এলাকায় এবং উপজেলার অভ্যন্তরীণ সড়কের কুমারী ব্রিজ, সুরাজপুর, বাদশার টেক, জালিয়াপাড়া, ডুমখালী, বরইতলী, কেবি জালাল উদ্দীন সড়ক, সাহারবিল এলাকায় ডাকাতি ঘটে।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের লোহাগাড়া সীমান্তবর্তী চুনতি ও জাঙ্গালিয়া অংশটি বেশ নির্জন। পাহাড়ি ও বনজঙ্গলে ঘেরা এ এলাকায় ডাকাতি ঘটেছে। এ এলাকার ১০টি স্পট বিশেষভাবে চিহ্নিত। এর মধ্যে রয়েছে চুনতি অভয়ারণ্যসংলগ্ন এলাকা, মিঠাছড়ি পাহাড়ি বাঁক, ডেপুটিখোলা এবং এর আশপাশ। ডাকাতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভয়ংকর হয়ে উঠেছে মহাসড়কের ‘ঈদগাঁও-ঈদঘর-বাইশারী’ ১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ পাহাড়ি অংশ ও হিমছড়ি ঢালা এলাকা। রাস্তার দুই পাশে ঘন গাছপালা ও পাহাড়ি ঢাল থাকায় ডাকাতরা সহজেই আত্মগোপন করে থাকে।
এর মধ্যে কমপক্ষে ১৫ স্পটে নিয়মিত ডাকাতি হয়। এ স্পটগুলোর মধ্যে রয়েছে হিমছড়ি ঢালা, পচানিখোলা, ভোমরিয়া ঘোনা, ভাঙ্গামুড়া ও গজালিয়া ঢালা অন্যতম। এ ছাড়া মহাসড়কে ডাকাতি হয় এমন স্পটের মধ্যে রয়েছে রামুর জোয়ারিয়ানালা, পানের ছড়া বাঁক, গর্জনিয়া-কচ্ছপিয়া সংযোগ সড়ক, রামু বাইপাস ও চেইন্দা বাঁক। লোহাগাড়া-বান্দরবান সীমান্তের আজিজনগর-বটতলী বাঁক, সাতকানিয়ার মইষকুম ও ছদাহা বাঁক, দোহাজারী-কেরানীহাট মধ্যবর্তী নির্জন এলাকা অন্যতম।
জানা গেছে, মহাসড়কে এ ডাকাতির নেপথ্যে রয়েছে কয়েকটি ছোটবড় সশস্ত্র গ্রুপ। গ্রুপগুলোর মূলশক্তি ক্যাম্প থেকে পালিয়ে আসা দুর্ধর্ষ রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী এবং স্থানীয় বাংলাদেশি পেশাদার অপরাধীদের যৌথ সিন্ডিকেট। স্থানীয় বাংলাদেশিরাও ডাকাতির নেতৃত্ব ও সোর্স হিসেবে কাজ করে। কোন গাড়িতে ব্যবসায়ী আছেন, কার কাছে মোটা অঙ্কের নগদ টাকা আছে এসব তথ্য সরবরাহ করে এরা। ডাকাতির মূল অপারেশনে অংশ নেয় অস্ত্রধারী রোহিঙ্গারা। শেষে তারা সহজেই গহিন পাহাড়ে আত্মগোপন করে।
হাইওয়ে পুলিশ কুমিল্লা অঞ্চলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কীর্তিমান চাকমা বলেন, ‘চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে দু-একটি যে ডাকাতির অভিযোগে পাওয়া গেছে, তার সঙ্গে জড়িতদের এরই মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’