জেনারেলে মাধ্যমিক থেকে উচ্চশিক্ষা স্তর পর্যন্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা গত এক বছরেই কমেছে ৯ লাখ ৪২ হাজার ৪৭৯ বিদেশি কারিকুলামে চলা সানিডেল স্কুলে প্লেতে প্রতি শিক্ষার্থীর ভর্তি ফি দিতে হয় ১ লাখ ১৫ হাজার এবং মাসিক টিউশন ফি ২০ হাজার টাকা। মাস্টারমাইন্ড ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে প্লে-গ্রুপের ভর্তি ফি ১ লাখ টাকা, মাসিক টিউশন ফি ১৪ হাজার টাকা। ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে (আইএসডি) বেতন-ভাতা প্রদান করতে হয় মার্কিন ডলারে। প্লেতে প্রতি শিক্ষার্থীর ভর্তি ফি ৯ হাজার মার্কিন ডলার (প্রায় ১১ লাখ টাকা)। টিউশন ফি দিতে হয় ৫ হাজার মার্কিন ডলার।
কোনো নীতিমালা না থাকার পাশাপাশি নজরদারির অভাবে গত পাঁচ বছরে ইংলিশ মাধ্যম স্কুলগুলোতে ভর্তি ও টিউশন ফি বেড়েছে প্রায় ২১ শতাংশ। এই প্রতিবেদক ধানমন্ডি, গুলশান ও উত্তরার ১০টি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের প্রশাসনিক অফিসে কথা বলে জানতে পেরেছে, বর্তমানে এসব স্কুলে ভর্তি ফি প্রতি বছর দেড় লাখ থেকে ৩ লাখ টাকার মধ্যে। মাসিক টিউশন ফি ৮ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত। এভাবে মাত্রাতিরিক্ত ভর্তি ও টিউশন ফি আদায় করার পরও গত টানা চার বছর ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষার্থী। মোট বৃদ্ধির হার ১৫.৬ শতাংশ।
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৫ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৬৮ হাজার ৮২৫। ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭১ হাজার ৪৫৬ জনে। ২০২৩ সালে শিক্ষার্থী ছিল ৭২ হাজার ৭৩৯, ২০২৪ সালে ৭৬ হাজার ৪২ এবং ২০২৫ সালে ৭৯ হাজার ৫৮৯ জন। অর্থাত্, ২০২১ সালের পর থেকে টানা চার বছর শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। চার বছরে মোট শিক্ষার্থী বেড়েছে ১০ হাজার ৭৬৪ জন।
এদিকে দেশে জেনারেলে মাধ্যমিক থেকে উচ্চশিক্ষা স্তর পর্যন্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা গত এক বছরেই কমেছে ৯ লাখ ৪২ হাজার ৪৭৯ শিক্ষার্থী। ২০২৪ সালে এসব স্তরে শিক্ষার্থী ছিল ১ কোটি ৯৬ লাখ ৭৩ হাজার ৫৯১ জন, যা ২০২৫ সালে কমে হয়েছে ১ কোটি ৮৭ লাখ ৩১ হাজার ১১২ জন। এ সময়ে শুধু মাধ্যমিক বিদ্যালয়েই শিক্ষার্থী কমেছে ৪ লাখ ৮ হাজার ৫০৭ জন। এর বিপরীতে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোতে ২০২৪ সালের ৭৬ হাজার ৪২ জন থেকে ২০২৫ সালে শিক্ষার্থী বেড়ে হয়েছে ৭৯ হাজার ৫৮৯ জন। এক বছরে এ বৃদ্ধি ৩ হাজার ৫৪৭ জন। অর্থাত্, সামগ্রিকভাবে শিক্ষার্থী কমার প্রবণতার মধ্যেও ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থী বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে।
ইংলিশ মাধ্যম স্কুলে আরো যেসব খরচ :ভর্তি ও টিউশন ফি ছাড়াও প্রতি মাত্রাতিরিক্ত ভর্তি শিক্ষাবর্ষের শুরুতে শিক্ষার্থীদের বই, স্কুলের ইউনিফর্ম ও সব ধরনের স্টেশনারি পণ্য কিনতে হয় এবং তা স্কুলের নির্ধারণ করে দেওয়া সুনির্দিষ্ট কিছু দোকান থেকেই। কোন ক্লাসে অধ্যয়ন করছে, সেই অনুযায়ী এই খাতেও প্রতিটি শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থীদের বড় অঙ্কের টাকা খরচ হয়। ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে অধ্যয়নরত এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, ‘৫৬টি নোটবুক, ১৮টি বই, অনেকগুলো কলম, পেনসিল, এমনকি টিস্যু বক্সও কিনে স্কুলে জমা দিতে হয়।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা এসব উপকরণ আমার ছেলের আইডি নম্বরের বিপরীতে সংরক্ষণ করবে এবং প্রয়োজনীয় সময়ে তাকে এগুলো দেবে।’ এরপর আসে কোচিং সেন্টারের খরচ। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে অনেকগুলোই মানসম্পন্ন শিক্ষা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে কোচিং সেন্টারে যেতে হচ্ছে। এছাড়া, ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোর জন্য কোনো শীর্ষ সংস্থা নেই, যেখানে অভিভাবকরা অভিযোগ জানাতে পারেন। সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষার্থী কমার পেছনে শিক্ষার মান নিয়ে অসন্তোষ, শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের দুর্বলতা এবং জবাবদিহির ঘাটতিকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন শিক্ষাবিদেরা। ফলে বিকল্প শিক্ষাধারার দিকে ঝোঁকার প্রবণতা ভবিষ্যতে আরো বেড়ে যাওয়ায় ইঙ্গিত দিয়েছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা।
স্নাতক অন্য বিষয়ে, তারপরও মাধ্যমিকে ইংরেজি-গণিত পড়ান ২০ হাজারের বেশি শিক্ষক :ব্যানবেইসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ইংরেজি পড়ানো ৯ হাজার ৯৮২ শিক্ষকের স্নাতক পর্যায়ে ইংরেজি বিষয় ছিল না। গণিত পড়ানো শিক্ষকদের মধ্যে ১০ হাজার ১৬৯ জনের স্নাতকে গণিত নেই। সব মিলিয়ে ২০ হাজারের বেশি শিক্ষক স্নাতকে অন্য বিষয়ে পড়লেও ক্লাস নিচ্ছেন ইংরেজি ও গণিতে। শুধু বিষয়ভিত্তিক যোগ্যতা নয়, শিক্ষকদের পেশাগত প্রশিক্ষণেও রয়েছে বড় ঘাটতি। মাধ্যমিক স্তরে কর্মরত শিক্ষকদের প্রায় ৪০ শতাংশের বিএড, এমএড, বিপিএডের মতো পেশাগত প্রশিক্ষণ নেই।
সাধারণে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত ১ :৫২, ইংলিশ মাধ্যমে ১:১০ : আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর গড় অনুপাতের ন্যূনতম মানদণ্ড ধরা হয় ১:২০। অর্থাত্ প্রতি ২০ জন শিক্ষার্থীর জন্য এক জন করে শিক্ষক থাকতে হবে। দেশে সাধারণ শিক্ষায় মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাত গড়ে প্রায় ১:৫২ (অর্থাত্ প্রতি ৫২ জন শিক্ষার্থীর জন্য মাত্র ১ জন শিক্ষক রয়েছেন)। কোনো কোনো বড় শ্রেণিকক্ষে এই সংখ্যা ৬০ বা তারও বেশি। ব্যানবেইসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সামগ্রিক অনুপাত ১:১০। অর্থাত্, গড়ে প্রতি ১০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক রয়েছেন। স্তরভিত্তিক হিসাবে, এ লেভেল ও জুনিয়র পর্যায়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত ১:১১ এবং ও লেভেলে ১:৮। প্রতি স্কুলে গড়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫৫৭ জন। এর মধ্যে এ লেভেল পর্যায়ের স্কুলে গড়ে ৭৬০ জন, ও লেভেলে ২৫০ জন এবং জুনিয়র পর্যায়ের স্কুলে ২৯১ জন শিক্ষার্থী রয়েছে।
ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর ৯৮ ভাগই সিটি করপোরেশন এলাকায় :ইংরেজি মাধ্যমের ৯৮ শতাংশের বেশি স্কুল সিটি করপোরেশন এলাকায়। ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালে এ ধরনের স্কুলের সংখ্যা ছিল ১২৩টি, যা পরবর্তী বছরগুলোতে বেড়েছে। সর্বশেষ ২০২৫ সালে স্কুলের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪৩টিতে। এ ১৪৩টি ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলের মধ্যে ১৪১টি সিটি করপোরেশন এলাকায় অবস্থিত। অর্থাত্, মোট স্কুলের ৯৮.৬ শতাংশই সিটি করপোরেশন এলাকায়।
আগ্রহ বেড়ে যাওয়ায় যত কারণ :চাকরির বাজারে সুবিধা বেশি পাওয়াকে ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার বাড়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন অভিভাবক ও শিক্ষাবিশেষজ্ঞরা। দেশে ও বিদেশে ইংরেজিতে দক্ষ প্রার্থীদের কর্মক্ষেত্রে বাড়তি সুযোগ রয়েছে বলে অভিভাবকদের বিশ্বাস। এর পাশাপাশি শিক্ষার মান ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে আরেকটি ধারণাও বেশ জোড়ালো। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর যোগাযোগ, পাঠদানের পদ্ধতি ও স্কুলের সুযোগ-সুবিধাকে অনেকে আকর্ষণের কারণ মনে করেন।
তবে সবচেয়ে হতাশার জায়গাটি হলো সাধারণ শিক্ষার ওপর আস্থার সংকট। দেশের শিক্ষাক্রমের ঘন ঘন পরিবর্তন, মূল্যায়নব্যবস্থা এবং পাঠদানের মান নিয়ে উদ্বেগের কারণে কিছু পরিবার বিকল্প ধারার কথা ভাবছে। ইংরেজি মাধ্যমে ভর্তি করানোর যুক্তি তুলে ধরে দুই জন অভিভাবক বলেন, সন্তানরা ভাষার দিক থেকে এগিয়ে থাকবে, বিদেশে হায়ার এডুকেশনের ভালো সুযোগ পাবে, চাকরি নিয়েও দুশ্চিন্তা করতে হবে না। দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা নিতে গেলেও ভর্তির ক্ষেত্রে ইংরেজি মাধ্যমের সনদ শিক্ষার্থীদের বাড়তি সুবিধা দেয় জানান তারা।
এক বছরে মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী বেড়েছে ৪৩ হাজার :ব্যানবেইসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দাখিল, আলিম, ফাজিল (পাশ), ফাজিল (অনার্স) ও কামিল পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়—এমন মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী ছিল ২৮ লাখ ৪০ হাজারের বেশি। আগের বছর, অর্থাত্ ২০২৪ সালে এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ছিল ২৭ লাখ ৯৬ হাজারের বেশি। এক বছরে মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী বেড়েছে ৪৩ হাজারের বেশি।