Image description
নিজের বিক্রি করে দেওয়া দোকানেই করান চুরি

মো. মামুন হোসেন। সবাই তাকে চেনে জুয়েলারি ব্যবসায়ী হিসেবে। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের চন্দ্রিমা হাউজিং কাঁচাবাজার এলাকায় ‘মা জুয়েলার্স’ নামে স্বর্ণালংকারের একটি দোকানও ছিল তার। তবে দুই বছর আগে হঠাৎ সেই দোকান বিক্রি করে দেন। দীর্ঘদিনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছাড়লেও বাস্তবে তিনি স্বর্ণের ‘ব্যবসা’ ছাড়েননি। বরং সাজসজ্জার দোকান ছেড়ে ‘অন্ধকারে’ নামেন স্বর্ণালংকারের কারবারে। তার এই কারবার চালাতে রয়েছে নিজস্ব চোর-ডাকাতের দলও!

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে স্বর্ণালংকারের দোকানে চুরি-ডাকাতির অন্যতম মাস্টারমাইন্ড এই মামুন। টার্গেট করা জুয়েলারি দোকানে চুরি-ডাকাতি করতে তিনি পালন করেন চোর-ডাকাতের দল। লুট করা স্বর্ণালংকার কেনেন কম দামে। তার ভয়ংকর দিক হচ্ছে, নিজে স্বর্ণালংকারের দোকান সাজিয়ে বসেন। বছরখানেকের মধ্যে তা আবার বিক্রি করে দেন। মাঝে সেই দোকানের নিরাপত্তা ত্রুটি জানাশোনা থাকায় নিজের দলের লোক দিয়ে লুট করান এই মামুন।

সম্প্রতি মোহাম্মদপুর এলাকায় একটি জুয়েলারি দোকানে চুরির ঘটনায় তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এর পরই বেরিয়ে আসে স্বর্ণালংকার বাণিজ্যের আড়ালে তার ভয়ংকর রূপ।

পুলিশ জানায়, ২০২৪ সাল পর্যন্ত মোহাম্মদপুরের চন্দ্রিমা হাউজিং এলাকায় ‘মা জুয়েলার্স’ নামে স্বর্ণালংকারের দোকান চালাতেন মামুন। সেটি বিক্রি করে দিলেও চলতি বছরের জানুয়ারিতে সেই দোকানেই চুরি করান নিজের লোকজন দিয়ে। সেই স্বর্ণালংকারও কিনে নেন নিজেই। ঘটনার দীর্ঘ ১০ মাস পর সেই চুরির জট খোলার পরই গ্রেপ্তার করা হয় তাকে।

মামলার এজাহার ও তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি মধ্যরাতে মোহাম্মদপুরের চন্দ্রিমা কাঁচা বাজারের ‘নিউ রানা জুয়েলার্সে’ দুর্ধর্ষ চুরির ঘটনা ঘটে। শাটার ও কেচিগেট ভেঙে ৭০ ভরি স্বর্ণালংকার, ৬০০ ভরি রুপা ও নগদ ৪ লাখ টাকা নিয়ে যায় চোর চক্রের সদস্যরা। চুরি হওয়া স্বর্ণের আনুমানিক মূল্য ১ কোটি ৫৪ লাখ ও ৬০০ ভরি রুপার মূল্য ২১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। ঘটনার পরদিন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী জুয়েল মাসুদ রানা বাদী হয়ে মোহাম্মদপুর থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ১০ থেকে ১২ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।

তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মামলার তদন্তে নেমে থানা পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় চুরির ঘটনায় জড়িত হুমায়ুন কবির ওরফে হুমায়ুন ও স্বপন ওরফে খবিরকে গ্রেপ্তার করে। ওই দুজনকে রিমান্ডে নেওয়ার পর তারা ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করলেও মূলহোতাদের নাম প্রকাশ করেনি তখন। চক্রের মূলহোতারা তাদের জামিনে মুক্ত করিয়ে নেওয়ার আশ্বাস দেওয়ায় মুখ বন্ধ রেখেছিল তারা।

তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশের এক কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, সেই কথাও রাখেনি আড়ালে থাকা মূলহোতারা। রিমান্ডে মুখ বন্ধ রাখলেও নিজের টাকায় জামিনে বের হন হুমায়ুন কবির। তিনি ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী ও পুলিশের কাছে ঘটনার আড়ালের সব তথ্য তুলে ধরেন। তার বক্তব্যেই বেরিয়ে আসে স্বর্ণের দোকানে চুরির নেপথ্যের কারিগরদের পরিচয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মোহাম্মদপুর-আদাবর জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন কালবেলাকে বলেন, চাঞ্চল্যকর এই চুরির ঘটনায় জড়িতরা পেশাদার অপরাধী। ঘটনার পর গ্রেপ্তার হওয়া দুজনের বিরুদ্ধে ১০টির বেশি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া এই ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী মামুনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তার করতে অভিযান চলছে।

ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী মাসুদ রানা কালবেলাকে বলেন, জমি বিক্রি করা টাকা দিয়ে ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে মামুনের কাছ থেকে তিনি দোকানটি কিনেছিলেন। তিলে তিলে গড়ে তোলা ব্যবসার সর্বস্ব হাতিয়ে নিয়ে তাকে পথে বসিয়ে দিয়েছিল। তিনি মামলা করলে তিনজন গ্রেপ্তার হলেও মালপত্র উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।

মাসুদ রানা বলেন, কয়েকদিন আগে হুমায়ুন কবির নামের এক ব্যক্তি তার দোকানে এসে জানান ওই ব্যক্তি দোকানে চুরির সঙ্গে জড়িত! যার কাছ থেকে দোকান কিনেছিলাম, সেই মামুনই দোকান লুটের সঙ্গে জড়িত বলে তথ্য দেন ওই ব্যক্তি।

কেন তথ্য ফাঁস করলেন সেই চোর—জানতে চাইলে মাসুদ রানা বলেন, চুরির পর হুমায়ুন কবির কোনো টাকা-পয়সা পায়নি। এমনকি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হলেও ছাড়িয়ে আনার কথা ছিল। কিন্তু মূলহোতা মামুন ও মাসুদের কোনো সহযোগিতা না পাওয়ায় বিষয়টি ফাঁস করে দেয় সে। পরে তাকে নিয়ে তিনি পুলিশের কাছে যান। পুলিশ তার দেওয়া তথ্য ও মামলার তদন্তে পাওয়া তথ্যপ্রযুক্তির নানা আলামত মিলিয়ে বর্ণনার সত্যতা পায়। পরে চক্রের মাস্টারমাইন্ড ও মালপত্র কেনা মামুনকে গ্রেপ্তার করে।

যেভাবে চুরির ছক: মামুনকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য ও তদন্তের তথ্যানুযায়ী পুলিশ জানিয়েছে, তিনি পরিকল্পনা করলেও চুরি বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেন পূর্বপরিচিত মাসুদকে। রংপুর, নীলফামারী, গাইবান্ধা, রাজবাড়ী, মাদারীপুরসহ বিভিন্ন জেলা থেকে নিজেদের পরিচিত লোকদের নিয়ে ১০ সদস্যের দল গড়েন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, গত ৪ জানুয়ারি রাতে দলের অন্যতম সমন্বয়ক মাসুদ একটি নীল রঙের পিকআপ নিয়ে ঘটনাস্থলের কাছে যান। সেই গাড়ির চালক ছিলেন আলমগীর। সেখান থেকে গাড়িতে উঠে ‘রানা জুয়েলার্স’-এর সামনে যান তারা। গাড়ি থেকে নেমে কয়েক মিনিটের মধ্যেই যন্ত্র দিয়ে দোকানের শাটারের তালা কাটেন মাসুদ। এরপর একে একে সবাই দোকানে ঢুকে শোকেসে সাজানো স্বর্ণালংকার ও রুপার গহনা লুট শুরু করেন। মাত্র ৪ মিনিট ২০ সেকেন্ডে পুরো দোকান লন্ডভন্ড করে সব মালপত্র নেওয়া হয়। দোকানের ভেতরে থাকা স্বর্ণালংকার রাখা সিন্দুকও গাড়িতে তুলে নেওয়া হয়। ঘটনার সময় উপস্থিত সবার মুখে মাস্ক ও মাংকি টুপি পরা ছিল।

শ্বশুরবাড়িতে বসে ভাগাভাগি: আসামিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ জানায়, মোহাম্মদপুর থেকে চুরি করা স্বর্ণালংকার নিয়ে যাওয়া হয় মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলায় মামুনের শ্বশুরবাড়িতে। পথে গবতলীতে কয়েকজনকে নামিয়ে দেওয়া হয়। বাকি সদস্যরা মানিকগঞ্জ যাওয়ার পথে দোকান থেকে নেওয়া সিন্দুক শাবল দিয়ে ভাঙার পর স্বর্ণালংকার ও টাকা বের করে নেওয়া হয়। পরে সাভারের বইলাপুরের রাস্তার পাশে ফেলা হয় খালি সিন্দুকটি। সেই রাতে মামুনের শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে মালপত্র রাখা হয়। পরদিন তারা টালি খাতায় হিসাব করে ২৪ ভরি স্বর্ণ ও সাড়ে ৪ কেজি রুপা পাওয়ার হিসাবে করেন। যার মূল্য ধরা হয় ৪৪ লাখ টাকা। ৪৪ লাখ টাকায় চুরির সব মাল কিনে নেন মামুন। সদস্যদের সামনে মাসুদকে সব টাকা বুঝিয়ে দেওয়া হয়। পরে টাকার ভাগ দেওয়ার কথা থাকলেও সেদিন থেকেই মোবাইল ফোন বন্ধ করে আত্মগোপনে চলে যান মাসুদ।

মামুনের দলের গ্রেপ্তার হওয়া সদস্যরা পুলিশকে জানিয়েছেন, মামুন সরাসরি ব্যবসা ছাড়লেও স্বর্ণের কারবার ছাড়েননি। দেশের বিভিন্ন জেলায় চুরি-ডাকাতি করা স্বর্ণ অর্ধেক দামে কিনতেন তিনি। এই চোরাই মালের লেনদেন হতো তার শ্বশুরবাড়িতে। মামুনের এই কাজে স্ত্রী রুনা আক্তার সহযোগী হিসেবে কাজ করেন।

স্বর্ণের দোকানে চুরির ওই মামলাটি তদন্ত করছেন মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. রতন মিয়া। তিনি কালবেলাকে বলেন, রানা জুয়েলার্সে চুরির ঘটনায় জড়িত অন্যতম মাস্টারমাইন্ড এবং চোরাই মাল কিনে নেওয়ার সঙ্গে জড়িত মামুনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সে বর্তমানে কারাগারে রয়েছে। তবে তাকে রিমান্ডে এনে বিস্তারিত তথ্য বের করা হবে।