বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ২৯ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করা কর্মীদের প্রায় অর্ধেকই এমন কাজে নিয়োজিত রয়েছেন, যেখানে তাদের অর্জিত শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দক্ষতার পূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ‘রিজিওনাল ইকোনমিক আউটলুক: এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিক’ (অক্টোবর ২০২৬) শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
গতকাল শুক্রবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে (কিউএসএনসিসি) সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশে তরুণদের সামগ্রিক বেকারত্বের হার ১২ থেকে ১৩ শতাংশের মধ্যে হলেও উচ্চশিক্ষিতদের ক্ষেত্রে এই চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অর্জিত শিক্ষার মান ও বাজার চাহিদার সঙ্গে বড় ধরনের অমিল বা ‘স্কিল গ্যাপ’ থাকার কারণে শিক্ষিত বিপুলসংখ্যক তরুণ দীর্ঘ সময় উপযুক্ত কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত থাকছেন।
আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৫০ শতাংশ উচ্চশিক্ষিত কর্মী তাদের অর্জিত যোগ্যতার চেয়ে নিম্নমানের পেশায় নিয়োজিত। শিক্ষাব্যবস্থা থেকে অর্জিত দক্ষতা এবং নিয়োগদাতাদের বাস্তব চাহিদার মধ্যে ব্যবধানই এ সমস্যার প্রধান চালিকাশক্তি। ফলে দীর্ঘ অপেক্ষার পর বাধ্য হয়ে অনেকেই যোগ্যতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ বেছে নিচ্ছেন, যা জাতীয় মানবসম্পদের অপচয় ঘটাচ্ছে এবং অর্থনীতির সার্বিক উৎপাদনশীলতাকে সীমিত করছে। তাছাড়া, শ্রমবাজারে অনানুষ্ঠানিক খাতের আধিপত্যকে অন্যতম দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কৃষি ও অন্যান্য অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত বিপুল শ্রমশক্তির প্রাতিষ্ঠানিক চুক্তি, চাকরির নিরাপত্তা ও পেশাগত উন্নতির সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। প্রথাগত বেকারত্বের পরিসংখ্যানে শ্রমবাজারের এই অনিশ্চিত বাস্তবতা পুরোপুরি উঠে আসে না।
জনমিতিক লভ্যাংশ বা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ এবং এআই চ্যালেঞ্জ প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। উৎপাদন শিল্প ও সেবা খাতে সময়মতো মানসম্মত ও উচ্চ উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারলে এই ডেমোগ্রাফিক সুবিধা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের সুযোগ তৈরি করবে। অন্যথায়, কর্মসংস্থানহীনতা তরুণদের মাঝে হতাশা বাড়াবে এবং প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর করবে।
অন্যদিকে, এশিয়ার শ্রমবাজারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত বিস্তার কর্মসংস্থানের ধরন বদলে দিচ্ছে। আইএমএফের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এআইয়ের প্রভাব বেশি যেসব পেশায়, সেখানে নিয়োগের চাহিদা তুলনামূলক কম প্রভাবিত পেশার চেয়ে প্রায় ১০ শতাংশ কমে গেছে। তবে এআই-সংক্রান্ত বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীদের চাহিদা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। আইএমএফ মনে করে, প্রযুক্তির এই রূপান্তরের সঙ্গে দেশীয় শ্রমিকদের দক্ষতা সামঞ্জস্যপূর্ণ করা না গেলে বিদ্যমান সংকট আরও গভীর হবে। প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন, শ্রমবাজারের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান সৃষ্টির কৌশল দ্রুত গ্রহণ করাই এখন বাংলাদেশের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ।