শীতের আগমনি বার্তা প্রকৃতিতে। ঋতু পরিবর্তনের এ সময়ে এক সময় কমতে শুরু করতো ডেঙ্গুর প্রকোপ। তবে সম্প্রতি বছরে বর্ষা মৌসুম পেরিয়ে বছরের শেষ প্রান্তে এসে উপদ্রব কমছে না এডিস মশার। প্রতিদিন দেড় হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। আর মৃত্যুর তালিকাও দীর্ঘ হচ্ছে। গতকাল শুক্রবারের চিত্রও স্বস্তিদায়ক নয়। এক দিনেই ডেঙ্গুতে মারা গেছে চারজন। নতুন করে শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ১৮১ জন। একই দিনে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে ১ হাজার ১৭৯ জন। ফলে ডেঙ্গুর প্রকোপ কেবল বর্ষাকালে—এ ধারণা বদলে গেছে। এর পেছনে বৃষ্টিপাতের ধরন, তাপমাত্রা, নগরায়ণ, অপরিকল্পিত পানি নিষ্কাশন এবং মশার প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণে ঘাটতি সবচেয়ে বেশি দায়ী।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, ডেঙ্গুকে এখন আর শুধু বর্ষাকালের রোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। পরিবেশ, তাপমাত্রা ও মশার প্রজনন পরিস্থিতির কারণে বছরের বিভিন্ন সময়েই সংক্রমণ অব্যাহত থাকতে পারে। তাই শীতের শুরু হয়েছে বলে ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমে যাবে, এমন ধারণা করা ঠিক হবে না। মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সারা বছর কার্যকর কর্মসূচি চালাতে হবে। একই সঙ্গে রোগী শনাক্তকরণ, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা ও নজরদারি জোরদার করা জরুরি। শুধু ওষুধ ছিটিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; কোথায় মশা জন্মাচ্ছে, তা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যু কমানো কঠিন হবে।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো— সংক্রমণের ধারাবাহিক নজরদারি এবং দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ। বছরের শেষ দিকে এসেও যদি বিপুলসংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হন এবং মৃত্যুর ঘটনা ঘটে, তাহলে পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করতে হবে। কোন এলাকায় সংক্রমণ বেশি, কোথায় মশার প্রজনন হচ্ছে এবং রোগীরা কখন চিকিৎসা নিতে আসছেন। এসব তথ্যের ভিত্তিতে কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, জ্বর হলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। রোগীর বিপৎসংকেত দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া জরুরি। ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, নিয়মিত ও তথ্যভিত্তিক উদ্যোগই সংক্রমণ কমাতে সহায়ক হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরের শুরু থেকে গতকাল পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ৮ হাজার ৪৪০ জন। এ সময়ে রোগটিতে প্রাণ হারিয়েছে ৩৩৫ জন। হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছে ১ লাখ ২ হাজার ২১০ জন।
সারা দেশে লক্ষাধিক রোগী, মৃত্যুও উদ্বেগজনক : বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে ১ লাখ ৮ হাজার ৪৪০ জনের। তারমধ্যে ৯৪ শতাংশ রোগী ছাড়পত্র পেয়েছে। সংখ্যার হিসেবে ১ লাখ ২ হাজার ২১০ জন। এদিকে রোগটিতে এ পর্যন্ত সরকারি হিসেবে মারা গেছে ৩৩৫ জন। চিকিৎসকদের ভাষ্যমতে, ডেঙ্গুতে লক্ষাধিক মানুষ শনাক্ত এবং ৩৩৫ জনের মৃত্যু দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। চলতি বছর শেষ হতে আরও প্রায় আড়াই মাস সময় বাকি। এ সময়ে রোগটি মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে জটিলতার ঝুঁকি রয়েছে। তাই জ্বরের লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। বিপদের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়া জরুরি।
বাড়ছে সংক্রমণ, চাপ বাড়ছে স্বাস্থ্যসেবায় : গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ১৮১ জনের শরীরে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে দেড় হাজারের বেশি ডেঙ্গু রোগী স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করছে। নতুন রোগী শনাক্ত হওয়ার পাশাপাশি আগের রোগীদের চিকিৎসা, পর্যবেক্ষণ এবং জটিলতা মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে সারা দেশের হাসপাতালগুলো। একই দিনে ১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গু রোগী ছাড়পত্র পেয়েছে।
প্রতিরোধে দরকার সমন্বিত উদ্যোগ: ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তিগত সচেতনতা যেমন জরুরি, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ধারাবাহিক উদ্যোগ। বাড়ির আশপাশে পানি জমতে না দেওয়া, পানির পাত্র নিয়মিত পরিষ্কার করা, অব্যবহৃত টায়ার ও পাত্র সরিয়ে ফেলা এবং পানির ট্যাংক ঢেকে রাখা এডিস মশার প্রজননস্থল কমাতে সহায়তা করে। সপ্তাহে অন্তত একদিন বাড়ি ও আশপাশের সম্ভাব্য প্রজননস্থল পরীক্ষা করার অভ্যাস গড়ে তোলা দরকার। তবে শুধু নাগরিকদের সচেতনতার ওপর দায়িত্ব ছেড়ে দিলে চলবে না। নিয়মিত মশার প্রজননস্থল শনাক্ত করা দরকার। নগরসেবা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া, পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা এবং সেসব কার্যক্রমের ফল পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কীটনাশক প্রয়োগের ক্ষেত্রেও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, সঠিক মাত্রা এবং কার্যকারিতা যাচাই গুরুত্বপূর্ণ বলে মত জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের। তাদের মতে, জ্বর হলেই নিজে থেকে ওষুধ খাওয়ার প্রবণতা এড়িয়ে চলতে হবে। ডেঙ্গু সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, অতিরিক্ত দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব কিংবা প্রস্রাব কমে যাওয়ার মতো বিপৎসংকেত দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। বিশেষ করে মনে রাখতে হবে, জ্বর কমে যাওয়ার পরও ডেঙ্গু রোগীর অবস্থা খারাপ হতে পারে।