রাজধানী ঢাকায় উচ্ছেদ অভিযান এখন ‘টক অব দ্য সিটি’। গত কয়েকদিন থেকে নানান বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে ফুটপাত হকারমুক্ত ও সড়কের আশপাশের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করছে। এসব অভিযানে নিম্নআয়ের কিছু মানুষ ও অবৈধদখলকারীরা সাময়িক অসুবিধায় পড়লেও সাধারণ মানুষ দারুণ খুশি। আগে যে সড়ক ও ফুটপাত দিয়ে হাটাচলা করা যেতো না; এখন সেগুলোতে নির্বিঘ্নে চলাচল করছে মানুষ। পথচারী থেকে শুরু করে ঢাকার করদাতারাও খুশি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কঠোর নির্দেশনায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক আবদুস সালাম ম্যাজিষ্ট্রেট সঙ্গে নিয়ে নিজেরাই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করছেন।
দুই সিটির প্রশাসকদের উচ্ছেন অভিযানে দৃঢ়তায় সচিত্র খবর গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার হচ্ছে। তারা দু’জনই প্রশংসায় ভাসছেন। যেসব এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়েছে সেসব এলাকায় পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা সড়ক ও ফুটপাত ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করেছেন। সুন্দর ও নান্দনিক পরিবেশের আবহ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে ডিএনসিসি। দোকানপাট আর ভিড়ের চিরচেনা দৃশ্য বদলে চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন রুপ ধারণ করেছে। নাগরিক সুবিধা নির্বিঘ্ন করতে ২০১১ সালের ২৯ নভেম্বর জাতীয় সংসদে বিল পাসের মাধ্যমে অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশন বিলুপ্তির মাধ্যমে ঢাকা শহরকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। গঠন করা হয় ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি)।
কিন্তু সিটি কর্পোরেশন দুই ভাগ করার এক যুগ পার হলেও নাগরিক সুবিধা তেমন বাড়েনি বরং বিপত্তি বেড়েছে। মাঝে মাঝে ফুটপাত দখলমুক্ত ও উচ্ছেন অভিযান চালানো হলেও সেটা কেবল ‘উচ্ছেদ উচ্ছেদ খেলা’ পর্যায়ে ছিল। আগের দিন উচ্ছেদ করলে পরের দিন আবার দখল হয়ে যেত। রাজধানী ঢাকাকে বসবাসের উপযোগী করতে দখল-দুষণমুক্ত করতে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। কিন্তু হকার-রিক্সাওয়ালা, বস্তিবাসীদের ভোটের কথা চিন্তা করে অতীতের সরকারগুলো ঢাকার ফুটপাত দখলমুক্ত করতে কঠোরতা দেখানোর সাহস পাননি। কিন্তু দেরিতে হলেও আসন্ন সিটি কর্পোরেশনের ভোটের কথা চিন্তা না করেই দুই সিটির দুই প্রশাসন উচ্ছেদ অভিযানে কঠোরতা দেখাচ্ছেন।
ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে প্রতিদিনই কোনো না কোনো এলাকার ফুটপাত ও সড়ক অবৈধ দখলমুক্ত করতে অভিযান পরিচালনা করছে। ডিএনসিসি যে সব এলাকায় অভিযান পরিচালনা করেছে সে এলাকাগুলোর মধ্যে ফার্মগেট এলাকার বিভিন্ন সড়কের ফুটপাত থেকে অবৈধ স্থাপনা ও দোকানপাট উচ্ছেদ করা হয়েছে। গ্রিন রোড ও পান্থপথের ফুটপাতের ভ্রাম্যমাণ দোকান ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। আগারগাঁও এলাকার ফুটপাত দখলমুক্ত করতে বিশেষ অভিযান চালানো হয়েছে। উত্তরার রাজলক্ষ্মী কমপ্লেক্সের ফুটপাত উন্মুক্ত করতে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়েছে। মিরপুর-২, মিরপুর-১০ ও মিরপুর-১৪ এলাকার ফুটপাত থেকে অবৈধ দখল সরাতে অভিযান চালানো হয়েছে। মোহাম্মদপুরের শ্যামলী থেকে শিয়া মসজিদ রিং রোড এবং এর শাখাসড়কে উচ্ছেদ অভিযান হয়েছে। তেজগাঁও এলাকার বিভিন্ন স্থানে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান পরিচালিত হয়েছে।
অন্যদিকে ডিএসসিসি বেশি কিছু এলাকায় ফুটপাত, রাস্তা ও নদীর তীরবর্তী অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। ইসলামবাগ ও কামরাঙ্গীরচর এলাকায় হাইকোর্টের নির্দেশনায় বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে লালবাগ ও কামরাঙ্গীরচর থানাধীন ইসলামবাগে যৌথ অভিযানে ৫০টি অবৈধ স্থাপনা ও প্রায় ১০০ টন বর্জ্য উচ্ছেদ করা হয়। গুলিস্তান ও পল্টন এলাকার গুলিস্তানের জিরো পয়েন্ট, গোলাপ শাহ মাজার এলাকা, গুলিস্তান ট্রেড সেন্টার ও পল্টন এলাকায় ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করতে দফায় দফায় উচ্ছেদ ও তদারকি অভিযান চালানো হয়। এলিফ্যান্ট রোড এলাকার এলিফ্যান্ট রোডে রাজস্ব ও প্রকৌশল বিভাগের যৌথ উদ্যোগে রাস্তার দুই পাশের অবৈধ স্থাপনা ও ভাসমান দোকান উচ্ছেদ করা হয়। মগবাজার ও ঢাকা মেডিকেল এলাকার মগবাজার এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনের ফুটপাতেও অবৈধ উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়। সেগুনবাগিচা এলাকায় শিল্পকলা একাডেমি আশপাশে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উচ্ছেদ অভিযানের পর ডিএনসিসি’র পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা সড়ক ও ফুটপাত ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করছেন। আগে যে সব ফুটপাতে জঞ্জাল ছিল, মানুষ চলাফেরা করতে পারতেন না এখন পথচারীরা নির্বিঘ্নে চলাচল করছেন। অভিযানের কারণে ফুটপাত দখলমুক্ত হওয়ায় মানুষ দারুণ খুশি। আগে যেখানে দিনভর যানজট লেগেই থাকতো সেখানে যানজট আগের চেয়ে অনেক কম। ফুটপাত দখলমুক্ত হওয়ায় সুফল পাচ্ছেন স্থায়ী ব্যবসায়ীরাও। শাহ আলী প্লাজার বিক্রেতা শাহাদাত খন্দকার জানান, উচ্ছেদের পর রাস্তাঘাট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়েছে। আগে যারা বাইরের ফুটপাত থেকে কেনাকাটা করতেন, তারা এখন মার্কেটে আসছেন। আমরা যারা দীর্ঘদিন ধরে এই মার্কেটে ব্যবসা করি, তাদের এখন বেচাকেনা বাড়ছে। ব্যবসায়ীদের এই কথার প্রতিধ্বনি শোনা গেছে মিরপুর-১০ এলাকার বাসিন্দা শফিকুল ইসলামের মধ্যেও। তিনি বলেন, আমি প্রায় ৩০ বছর ধরে মিরপুরে থাকি। একসময় এই রাস্তা খোলামেলাই ছিল। কিন্তু মাঝখানে এমন অবস্থা হয়েছিল যে ফুটপাত আর হাঁটার যোগ্য ছিল না। ফুটপাতের দোকানের কারণে মার্কেটের দোকানগুলোতেও বেচাকেনা কমে গিয়েছিল। আর এখন রাস্তাঘাট কত পরিচ্ছন্ন। আমরা এমন পরিচ্ছন্ন সড়ক চাই।
শুধু পথচারী বা ব্যবসায়ী নন, স্বস্তি পাচ্ছেন যানবাহনের চালকরাও। আগে মিরপুর-১০ থেকে বিআরটিএ পর্যন্ত গাড়ি নিয়ে যেতে অনেক সময় লাগতো, খুব কষ্ট হতো। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের পর এখন এক নিমিষেই এই সড়ক পার হয়ে এলাম।
মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরের ফুটওভার ব্রিজের নিচের যে অংশ এতদিন অবৈধ দখলে ছিল, সেখানে গাছ লাগিয়ে পথচারীদের জন্য সুন্দর ও নান্দনিক পরিবেশের আবহ তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দোকানপাট আর ভিড়ের চিরচেনা দৃশ্য বদলে মিরপুর-১০ যেন এখন এক অচেনা নগরী। অথচ কিছুদিন আগেও চিত্রটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর ও হোপ স্কুল রোডে রাস্তার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ দখল করে গড়ে উঠেছিল অবৈধ ফুটপাত মার্কেট। হোপ স্কুল ও মিরপুর গার্লস আইডিয়াল স্কুলকে কেন্দ্র করে সামনের ফুটপাত ও সড়কজুড়ে বসতো সারি সারি দোকান, আর এসব দোকান থেকে ভেসে আসতো হকারদের উচ্চস্বরে হাঁকডাক।
এসব দোকানের কারণে গোলচত্বর থেকে পূর্বদিকের তিনটি সড়কের মুখে সাধারণ মানুষ আর যানবাহনের ভিড় লেগে থাকতো। ফলে যানবাহন ও পথচারী উভয়কেই পোহাতে হতো নিয়মিত দুর্ভোগ। উচ্ছেদ অভিযানে গোটা এলাকা দখলমুক্ত হয়েছে। উচ্ছেদ অভিযান প্রসঙ্গে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান বলেন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে নগরবাসীর সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাত দখল করে রেখেছিল যারা, তারা ও তাদের ইন্ধনে আজ সিটি করপোরেশনের পরিবহন, সাংবাদিকসহ কিছু পুলিশ সদস্যের ওপর হামলা হয়েছে।
পরে স্থানীয় সাধারণ মানুষের প্রতিরোধের মুখে হামলাকারীরা সরে যেতে বাধ্য হন। আমি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করছি, নগরসেবার জন্য, আমার প্রিয় নগরবাসীর নির্বিঘ্নে চলাচলের জন্য ফুটপাত উদ্ধারের যে কর্মসূচি আছে, তা চলমান থাকবে। মিরপুরের সাধারণ মানুষ ফুটপাত দখলমুক্ত চায়। ভবিষ্যতে কারও ইন্ধনে ফুটপাত দখলের চেষ্টা করা হলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।মিরপুরবাসীর সহযোগিতা চেয়ে প্রশাসক বলেন, কয়েক দিন ধরে ফুটপাত উচ্ছেদ অভিযান চালানো হচ্ছে। জনগণের চাহিদা অনুযায়ীই এ কাজ করা হচ্ছে। ফুটপাত পরিস্কার করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। এই দায়িত্ববোধ থেকে আমাদের কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকবে। আপনারা আমাদের সহযোগিতা করবেন।
ঢাকা উত্তরের মতো ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসন আবদুস সালাম নিজে উপস্থিত থেকে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করছেন। যে সব ম্যাজিস্টেট উেিচ্ছদ অভিযানে রয়েছেন তারা অন্যান্ত দৃঢ়তার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। আদালতের নির্দেশে কামরাঙ্গির চর ও ইসলামপুরে উচ্ছেদ অভিযানের পর গুলিস্তানের গোলাপ শাহ মাজার এলাকা, পল্টন এলাকার গুলিস্তানের জিরো পয়েন্ট, গুলিস্তান ট্রেড সেন্টার ও পল্টন এলাকায় ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করতে দফায় দফায় উচ্ছেদ অভিযানে ৫০টি অবৈধ স্থাপনা ও প্রায় ১০০ টন বর্জ্য উচ্ছেদ করা হয়। ডিএসসিসির প্রশাসক আবদুস সালাম রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দখলমুক্ত করে ফুটপাতের পাশের দেয়ালে নতুন করে যুক্ত করেছেন নারী জাগরণ ও নারী অধিকার আন্দোলনের অগ্রদূত রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, পল্লিকবি জসীমউদ্দীন ও কবি জীবনানন্দ দাশের প্রতিকৃতি।
ফুটপাতের সৌন্দর্যবর্ধনের অংশ হিসেবে গত ১৩ অক্টোবর দেয়ালে এই তিন গুণী ব্যক্তির ছবি আঁকা হয়। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি-সংলগ্ন এই ফুটপাতের দেয়ালে এর আগে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, সত্যজিৎ রায়, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামসহ শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অবদান রাখা ১০ গুণী ব্যক্তির প্রতিকৃতি আঁকাই ছিল। নতুন তিনটি প্রতিকৃতি যুক্ত হওয়ায় দেয়ালজুড়ে বরেণ্য ব্যক্তিদের সংখ্যা আরও বাড়ল। প্রতিকৃতির সঙ্গে ফুটপাতটি সংস্কারের পাশাপাশি পথচারীদের চলাচলের সুবিধার জন্য বসানো হয়েছে ডাস্টবিন ও বেঞ্চ। সংস্কার করা হয়েছে সীমানাপ্রাচীরও। আগে ফুটপাতটির একাংশ দখলে ছিল। সেটি দখলমুক্ত করার পর সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্যোগ নেয় ডিএসসিসি।
৫ অক্টোবর ফুটপাতটির সৌন্দর্যবর্ধন কাজের উদ্বোধন করেন ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম বলেন, রাজধানীর সড়ক ও ফুটপাত দখল করে হকারদের বসতে দেওয়া হবে না। তবে হকারদের জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে বিকল্প জায়গায় তাঁদের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। নাগরিক সুবিধার প্রয়োজনেই রাজধানীকে ‘ক্লিন অ্যান্ড গ্রিন’ রাখা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, এটি নগরবাসীরও দায়িত্ব।