Image description

ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে বাংলাদেশ থেকে তরুণদের নিয়ে যাওয়া হয় লিবিয়ায়। এরপর তাদের একটি অংশকে আটকে রাখা হয় দেশটির বিভিন্ন বন্দিশালা বা গেমরুমে। পরিবারের কাছ থেকে আদায় করা হয় লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ। টাকা না দিলে চলে মারধর, বৈদ্যুতিক শকসহ নানা ধরনের নির্যাতন। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে প্রাণ হারান অনেকে। ওই দেশে অবস্থান করা বাংলাদেশি মাফিয়ারা গড়েছেন সম্পদের পাহাড়। এ মানব পাচার চক্রের শিকড় শুধু লিবিয়ায় নয়, বাংলাদেশেও বিস্তৃত। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) দেশের অন্তত ১৫ জেলায় ১১৯ জনের বেশি মানব পাচারকারীকে চিহ্নিত করতে পেরেছে। তাদের তদন্তে উঠে এসেছে, এরা লিবিয়া হয়ে ইউরোপে মানব পাচারে জড়িত। অন্তত ১৮টি চক্রের সঙ্গে তারা যুক্ত। তাদের মধ্যে মাদারীপুর ও কিশোরগঞ্জেরই ৪৪ জন।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্যানুযায়ী, এই ১১৯ জনের সবাই গ্রেপ্তার হননি। অনেকে বিদেশে পলাতক। আবার লিবিয়া ও ইউরোপে সক্রিয় থাকার প্রমাণ থাকলেও পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা না পাওয়ায় অন্তত ৪৮ জনকে মামলার চার্জশিট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। নাম-ঠিকানা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে সম্পূরক চার্জশিট দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

সিআইডির অনুসন্ধানে মাদারীপুর ও কিশোরগঞ্জ ছাড়াও ঢাকা, সিলেট, সুনামগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, নড়াইল ও বরগুনায় মানব পাচার চক্রের সদস্যদের সন্ধান পাওয়া গেছে।

তদন্তে পাওয়া নামের তালিকায় শুধু স্থানীয় দালাল নন, লিবিয়ায় অবস্থানরত ব্যক্তিদের নামও রয়েছে। মাদারীপুরের আমির শেখ, কিশোরগঞ্জের সজিব ও জাফরসহ কয়েকজনের লিবিয়ায় অবস্থানের কথা তদন্তে উঠে এসেছে। গোপালগঞ্জের বশির শিকদার ও সেন্টু শিকদার, নীলফামারীর আবদুল্লাহ ওরফে আসাদুজ্জামান, ফরিদপুরের মুন্না মালসহ আরও কয়েকজনের বিদেশে অবস্থানের তথ্য এসেছে। সিআইডির তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন জেলার ছোট ছোট গ্রুপ লিবিয়াভিত্তিক চক্রের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করে। বাংলাদেশে থাকা সদস্যরা যাত্রী সংগ্রহ, টাকা আদায় ও বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। আর লিবিয়ায় থাকা সদস্যরা তাদের গ্রহণ করে পরবর্তী গন্তব্যে পাঠানো, আটকে রাখা কিংবা মুক্তিপণ আদায়ের সঙ্গে যুক্ত থাকেন।

লিবিয়ায় বাংলাদেশি মানব পাচার চক্রের ভয়াবহতা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে ২০২০ সালের ২৮ মে। মিজদাহ শহরে জিম্মি করে রাখা ২৬ বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যা করে পাচারকারীরা। ওই ঘটনায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন থানায় মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে ২৫টি মামলা হয়। এসব মামলার তদন্তে বেরিয়ে আসে দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা পাচারকারীদের নেটওয়ার্ক। সিআইডি এসব মামলায় চার্জশিটও দিয়েছে। একটি মামলায় ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে ৪১ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়। সেখানে তানজিদ/তানজিমুল/তানজিরুল, জবর আলী, জাফর মিয়া, স্বপন, মিন্টু মিয়া, শাহীন বাবু, আমির হোসেন, নজরুল মোল্লা, কামালউদ্দিন, কামাল হোসেন, জুলহাস সর্দার, দীনা বেগম, শাহাদাত হোসেন, নাজমুল হাসান, হেলাল মিয়াসহ আরও অনেকের নাম রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মিজদাহ হত্যাকাণ্ডের শিকার কিশোরগঞ্জের যুবক আকাশও একই নেটওয়ার্কের ফাঁদে পড়েন। তার ভাই নাজির হোসেন তদন্ত কর্মকর্তাদের জানান, ঢাকার মানব পাচারকারী হাজী কামালের মাধ্যমে ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা দিয়ে আকাশ লিবিয়ায় যান। পরে তানজিদুল তাকে বেশি বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখান। এক পর্যায়ে আকাশকে আটকে রেখে ১২ হাজার ডলার মুক্তিপণ দাবি করা হয়। তাকে বৈদ্যুতিক শক ও রড দিয়ে মারধরের কথাও পরিবারকে জানানো হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত মুক্তিপণ না পেয়ে আকাশকে হত্যা করা হয়।

সিআইডির অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, পাচারকারীদের একটি অংশ বাংলাদেশে বসে কাজ করলেও মূল নিয়ন্ত্রণের একটি অংশ থাকে লিবিয়ায়। সেখানে থাকা ব্যক্তিরাই অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে পাঠানো তরুণদের গ্রহণ করেন এবং তাদের পরবর্তী গন্তব্যে পাঠানোর নামে আটকে রাখেন। নড়াইলের আলাউদ্দিন শেখকে সিআইডি একটি চক্রের প্রধান হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছে, তিনি প্রায় ১২ বছর আগে লিবিয়ায় যান। গত ১৩ এপ্রিল তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি চক্রের বিরুদ্ধে ৩৪ জনের মামলা হয়েছে। এ চক্রের সদস্যরা দেশের ১১ জেলায় ছড়িয়ে আছেন। চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ব্যাংক হিসাবে ৩৭৬ কোটি টাকার বেশি লেনদেনের তথ্যও তদন্তে উঠে এসেছে।

জানা গেছে, নড়াইলের কালিয়া উপজেলার সাতবাড়িয়া বাজার। বাজারের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে টাকির খাল। এ খালের পারেই দোতলা একটি আলিশান বাড়ি আলাউদ্দিন শেখের। তিনি ইতালি পাঠানোর কথা বলে লোকজনকে লিবিয়ায় নিয়ে জিম্মি করতেন। তাদের ওপর নির্যাতন চালানোর ভিডিও পরিবারের সদস্যদের পাঠিয়ে লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করতেন। সেই টাকায় বাড়ি-গাড়ি, খামারসহ অঢেল সম্পদ করেছেন। তাদের আরেকজন আউয়াল ফরাজী। তার বাড়িও সাতবাড়িয়া গ্রামে। তিনিও একটি দৃষ্টিনন্দন দোতলা বাড়ি করেছেন। তার দুই ভাই রাব্বানী ফরাজী ও রুবেল ফরাজী এ চক্রে জড়িত।

জানতে চাইলে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম বলেন, লিবিয়ায় বাংলাদেশের তিনটি অঞ্চলের ১০-১২টি জেলার লোক বেশি গেছে। ইতালি যাওয়ার প্রলোভনে পড়ে লিবিয়ার জিম্মিদশা থেকে মুক্ত হয়ে ২০১৮ সালের পর এ পর্যন্ত ১৫ হাজার লোক ফেরত এসেছে। এদিকে সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট, খুলনার রাব্বানী ফরাজী গ্রেপ্তারের পর তার বড় ভাই আউয়াল ফরাজীকে চক্রের হোতা হিসেবে চিহ্নিত করে। রাব্বানীর বিরুদ্ধে লিবিয়ায় বাংলাদেশিদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় এবং প্রায় ৩০ কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য পায়।

সূত্র জানায়, কুমিল্লার মানিক, শরীফ হোসেন, সুনামগঞ্জের আলী হোসেন ও সালেহ আহমদ, মাদারীপুরের নজরুল মোল্লা, গোপালগঞ্জের বশির শিকদারসহ আরও কয়েকজনের নাম সিআইডির তদন্তে উঠে এসেছে। সিআইডির তালিকায় দুবাই, ইতালি ও শারজায় অবস্থানকারী ব্যক্তিদের নামও রয়েছে। তাদের মধ্যে আফ্রিন আহমেদ, সোহাগ হোসেন ওরফে দিল্লি সোহাগ, সেলিম ওরফে সাউথ সেলিম, রাজন ওরফে বুলেট, মনির ওরফে সিটি মনির, আবদুল্লাহ আল ফারুক ওরফে বাঁধন, সনাতন দাশ ওরফে দাদা, জসিম, কাজী শরীফ, ওয়াসিম বাবুসহ আরও অনেকে রয়েছেন।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, তালিকা তৈরির কাজ এখনো চলছে। কাজ শেষ হলে কতজন দালাল এবং লিবিয়ায় কতজন মাফিয়া রয়েছে, তা আরও স্পষ্ট হবে। এর আগে গত বছরের ২১ আগস্ট সাখাওয়াত হোসেন নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। সংস্থাটি তখন জানায়, তিনি লিবিয়ায় একটি মাফিয়া সিন্ডিকেট পরিচালনা করতেন এবং ৪০০ থেকে ৫০০ বাংলাদেশিকে নৌকায় করে ইতালিতে পাঠানোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এরপর নভেম্বরে খন্দকার রিফাত হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে লিবিয়ায় একজন বাংলাদেশিকে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ ওঠে।

ডিসেম্বরে মোহাম্মদ নজিরকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। তার বিরুদ্ধে গ্রিসে চাকরি দেওয়ার কথা বলে বাংলাদেশিদের লিবিয়ায় নিয়ে নির্যাতন ও মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ পাওয়া যায়। চলতি বছরের ১৫ জুন মিকাইল ইসলাম এবং ১৭ জুন রাব্বানী ফরাজী গ্রেপ্তার হন। গত সেপ্টেম্বরে রফিকুল ইসলাম ওরফে রফিক বাঘা ও আমির হোসেন স্বপন এবং আবুল হোসাইনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ৫ অক্টোবর সিআইডি আশকোনা থেকে মো. আতিকুর রহমান টমাস ও বদিউল আলম ভূঁইয়া ওরফে বেলালকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে মিসর হয়ে লিবিয়ায় পাচার করে গেমরুমে আটকে নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে।