সৌদি আরবের বিমানবন্দরে হুতিদের হামলার পর হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের অর্ধশতাধিক ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজার হাজার সৌদিগামী যাত্রী। রিয়াদ বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণার পর এসব যাত্রী অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। যাত্রীদের কেউ জানেন না কবে তারা সৌদি যেতে পারবেন। কবে আবার ফ্লাইট স্বাভাবিক হবে। হতাশা অনিশ্চয়তা নিয়ে যাত্রীদের কেউ কেউ বিমানবন্দরে নির্ঘুম সময় কাটাচ্ছেন। আবার কেউ হোটেলে থাকছেন। আবার অনেকেই বাড়ি চলে যাচ্ছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশটিতে যাওয়া বেশির ভাগই যাত্রীই শ্রমিক। তাদের কাছে পর্যাপ্ত টাকা নেই যা দিয়ে ঢাকায় অবস্থান করবেন। টিকিটের টাকা নিয়ে অনেকেই চিন্তিত। কারণ এয়ারলাইন্সগুলো যদি টিকিট রিফান্ড না করে তবে অনেকেই বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়বেন।
সিভিল এভিয়েশন অথরিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সৌদি আরবের বিমানবন্দরে হামলার প্রেক্ষিতে ৫১টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এরমধ্যে ডিরেক্ট ফ্লাইট ১২টি আর ট্রানজিট ফ্লাইট ৩৯টি। সবমিলিয়ে ৫১টি ফ্লাইটের প্রায় ৫ হাজার ৪১৮ জন যাত্রী সৌদি আরবের বিভিন্ন গন্তব্যে যেতে পারেননি। এ সংখ্যা পর্যায়ক্রমে বাড়বে। বেবিচক সূত্র জানিয়েছে, বাতিল হওয়া ডিরেক্ট ফ্লাইটের মধ্যে বাংলাদেশ বিমানের ৪, ইউএস বাংলার ২, সৌদি এয়ারলাইন্সের ৩ ও রিয়াদ এয়ারওয়েজের ৩। আর ট্রানজিট ফ্লাইটের মধ্যে ইন্ডিগো এয়ারলাইন্সের ১৬, সালাম এয়ারের ৩, এমিরেটস এয়ারলাইন্সের ৯, ইজিপ্ট এয়ারের ১, কাতার এয়ারওয়েজের ৫ ও ফ্লাই দুবাইয়ের ৫টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্স ২১শে অক্টোবর পর্যন্ত আর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ১৭ তারিখ পর্যন্ত রিয়াদগামী সব ধরনের ফ্লাইট বাতিল করেছে।
ভোগান্তিতে হাজার হাজার যাত্রী: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাসিন্দা আসলাম মিয়া। এক দশকের বেশি সময় ধরে সৌদি আরবের রিয়াদে থাকেন। তিন মাসের ছুটিতে দেশে এসেছিলেন। গতকাল সৌদি এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে দেশটিতে ফেরার কথা ছিল তার। কিন্তু হুতিদের হামলার কারণে বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় তিনি ঢাকায় এসে আটকা পড়েছেন। কবে যেতে পারবেন, কোথায় থাকবেন কিছুই জানেন না। আসলাম মিয়া মানবজমিনকে বলেন, আগে কখনো এরকম সমস্যায় পড়িনি। ছুটির একেবারে শেষদিকে এসে টিকিট কেটেছি। যাতে গিয়েই কাজে যোগ দিতে পারি। আমি যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করি সেখানে লোকবলও কম। আমি যোগদান করলে আরেকজন ছুটিতে যাবে। কিন্তু পরিস্থিতি খারাপ থাকায় সবকিছু একটা অনিশ্চয়তায় পড়ে গেল
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল-২ এর সামনে স্বজনদের কাছে মোবাইল ফোনে দুঃখপ্রকাশ করছিলেন মৌলভীবাজারের রিপন মিয়া। তিনি প্রতিবেদককে জানান, জরুরি ভিত্তিতে সোমবার সৌদিতে থাকার কথা। কিন্তু এই সোমবার কেন আগামী সোমবারে যেতে পারবো কিনা তার ঠিক নাই। বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে চলে এসেছি। এখন আবার বাড়িতে যাবো নাকি হোটেলে গিয়ে থাকবো বা বিমানবন্দরে অপেক্ষা করবো জানি না। সঠিক তথ্য কারও কাছ থেকে পাচ্ছি না। ট্রাভেল এজেন্সির সঙ্গে কথা বলেছি, কিন্তু তারাও কোনো কিছু নির্দিষ্ট করে বলতে পারছে না।
লক্ষ্মীপুরের বাসিন্দা মঈনুদ্দিন। রিয়াদ থেকে ছুটিতে বাংলাদেশে আসেন কয়েক মাস আগে। ছুটি শেষে সোমবার তার রিয়াদ যাওয়ার কথা। সেই অনুযায়ী ইউএস বাংলার টিকিটও নেন। সোমবার দুপুর আড়াইটায় তার ফ্লাইট ছিল। সে কারণে ১২টার সময় তিনি বিমানবন্দরের ভেতরে যান। পরে কাউন্টার থেকে জানানো হয়, ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এরপর তিনি বাইরে চলে আসেন। তিনি বলেন, ফ্লাইট বাতিলের বিষয়টি আগে থেকে জানানো হয়নি। এখন ফ্লাইট বাতিল করা হলো। কাউন্টার থেকে জানানো হয়, রিয়াদ বিমানবন্দর চালু হলে ওই টিকিটেই নিয়ে যাওয়া হবে। তার হাতে আর সাত দিন সময় আছে।
এই সময়ের মধ্যে যেতে না পারলে বড় বিপদে পড়বেন তিনি। ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্স ঢাকা রিয়াদ ঢাকা রুটে জরুরি ভ্রমণ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, রিয়াদ এয়ারপোর্ট বন্ধ থাকার কারণে আগামী ২১শে অক্টোবর পর্যন্ত ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের বিএস-৩৮১, বিএস-৩৮২ ঢাকা রিয়াদ ঢাকা ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে এয়ারলাইন্সটি জানিয়েছে, ফ্লাইটের নতুন সময়সূচি নির্ধারিত হলে সবাইকে জানিয়ে দেয়া হবে। এজন্য যাত্রীদের আপাতত বিমানবন্দরে যাওয়া থেকে বিরত থাকার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া ফ্লাইটের স্ট্যাটাস, পুনরায় টিকিট বুকিং ও ফ্লাইটের সর্বশেষ তথ্য জানতে যাত্রীদের বিমানবন্দরে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট সেলস কাউন্টার ও ট্রাভেল এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স জানিয়েছে, রিয়াদ বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এর ১৭ই অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা-রিয়াদগামী সকল ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে। ওই ফ্লাইটের বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত এবং যাত্রার সময়সূচি সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্য যথাসময়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানানো হবে। অন্যদিকে, বিমানের ঢাকা থেকে দাম্মামগামী নিয়মিত ফ্লাইট বিজি-৩৪৯ কাতারের দোহা বিমানবন্দরে অবতরণ করেছে। ঢাকা থেকে দাম্মামের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরুর সময় দাম্মাম বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক ছিল। পরবর্তীতে বিমানবন্দরটি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যাত্রীদের নিরাপত্তা ও ফ্লাইট পরিচালনার স্বার্থে ফ্লাইট বিজি-৩৪৯ বাংলাদেশ সময় রাত ২টা ২৭ মিনিটে দোহা বিমানবন্দরে অবতরণ করে।
প্রায় তিন ঘণ্টা পর দাম্মাম বিমানবন্দর পুনরায় চালু হলে ফ্লাইটটি বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টা ২ মিনিটে নিরাপদে দাম্মাম বিমানবন্দরে অবতরণ করে। এদিকে আরেক বিজ্ঞপ্তিতে বিমান জানিয়েছে, নিরাপত্তাজনিত কারণে ১২ই অক্টোবর বাংলাদেশ সময় বিকাল ৩টা ১০ মিনিটে ঢাকা থেকে দাম্মামগামী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-৩৪৯ ফ্লাইটটি স্থগিত করা হয়েছে।
বিকল্প পথে যাত্রী নিবে সৌদি এয়ারলাইন্স: ঢাকা-দাম্মাম রুটে আটকে পড়া যাত্রীদের বিকল্প পথে সৌদি আরবে নেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে দেশটির জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থা সৌদিয়া এয়ারলাইন্স। মঙ্গলবার থেকে যাত্রীদের বিকল্প ব্যবস্থায় গন্তব্যে নেয়া শুরু হবে। সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর যাত্রীরা সড়কপথে নিজ নিজ কর্মস্থলে যেতে পারবেন।