Image description

মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত, তীব্র জ্বালানি সংকট ও উচ্চ সুদহারের চাপে থমকে যাওয়ার ঝুঁঁকিতে বিশ্ব অর্থনীতি। দেশে দেশে চলছে সংকট উত্তরণের পথ খোঁজার উদ্যোগ। এমন পরিস্থিতিতে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে গতকাল সোমবার শুরু হয়েছে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সভা। এতে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি, সরকারি ঋণ ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক টানাপোড়েন প্রাধান্য পাচ্ছে। তবে স্বস্তির খবর দিয়ে আইএমএফ জানিয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) খাতে বিপুল বিনিয়োগ বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধিকে প্রায় ৩ শতাংশে ধরে রাখতে সাহায্য করছে।

এবারের বৈঠকে বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাবে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে সৃষ্ট চাপ মোকাবিলা এবং বাড়তি ব্যয়ের বোঝা সামলাতে বিশ্বব্যাংকের সহায়তা চাওয়া হবে। এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা চলছে। এছাড়া দুই পক্ষের মধ্যে একটি কাঠামোগত চুক্তি নিয়ে কাজ চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। গতকাল সোমবার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ২০২৬ সালের বার্ষিক সাধারণ সভায় অংশগ্রহণের শুরুতে তিনি সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন।

নিয়ম অনুযায়ী, তিন বছর পর যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে নিজেদের সদর দফতরের বাইরে হচ্ছে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সভা। ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত এ আয়োজনে বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ও আর্থিক খাতের নীতিনির্ধারকেরা অংশ নিচ্ছেন। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর থাইল্যান্ড আবারও মর্যাদাপূর্ণ বৈশ্বিক সম্মেলনের স্বাগতিক দেশ। বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে আলোচনায় ১৯১টি দেশের অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, উন্নয়ন খাতের নীতিনির্ধারক, বেসরকারি খাতের নির্বাহী, গবেষক, সুশীলসমাজের শীর্ষ নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়ী নেতাসহ ১৫ হাজারের বেশি প্রতিনিধি ইতোমধ্যে থাইল্যান্ডে অবস্থান করছেন। তারা সম্মেলনে অংশ নিয়ে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং দারিদ্র্য বিমোচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সপ্তাহব্যাপী আলোচনা করবেন।
সম্মেলনে অংশ নিতে আসা শীর্ষ নেতাদের মধ্যে রয়েছেন সুইজারল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট গাই পারমেলিন ও সিঙ্গাপুরের প্রেসিডেন্ট থারমান শানমুগারাতনাম। গত ২২ বছরের মধ্যে এটি কোনো সুইস প্রেসিডেন্টের প্রথম থাইল্যান্ড সফর। এদিকে বাংলাদেশ থেকে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা প্রফেসর ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল অংশ নিচ্ছেন।

অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে জ্বালানি খাতে বাড়তি ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। এ চাপ সামাল দিতে এক ধরনের আর্থিক সুরক্ষা প্রয়োজন। বিশ্বব্যাংক এ বিষয়ে সহযোগিতার ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। ভবিষ্যতেও সংস্থাটি বাংলাদেশের পাশে থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতার বিষয়টি শুধু বিদ্যমান তহবিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং জ্বালানি খাতে চলমান সংকটের প্রভাব মোকাবিলায়ও সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে। এ বিষয়গুলো নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে কাঠামোগত চুক্তি নিয়ে আলোচনা ও প্রক্রিয়াগত কাজ চলছে। দুই পক্ষের অংশীদারত্বের আওতায় কীভাবে সহযোগিতা আরো কার্যকর করা যায়, সে বিষয়েও আলোচনা হচ্ছে।

অর্থমন্ত্রী আরো বলেন, সরকারের ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহারের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে চলমান উদ্যোগগুলোর সামঞ্জস্যের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে পারস্পরিক সমন্বয়ের মাধ্যমে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনার অগ্রগতি সম্পর্কে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিষয়টি এখনো প্রক্রিয়াধীন। এ নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ সঠিক পথেই এগোচ্ছে।
এদিকে, ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকারের সংস্কার কর্মসূচির সঙ্গে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নীতিগত ঐকমত্য তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল তিতুমীর।

গতকাল সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী অর্থনৈতিক সংস্কারের যে রূপরেখা সরকার নিয়েছে, বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীরাও তার মূল লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে একমত। একই সঙ্গে বিনিয়োগ বাড়াতে চীন, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে বহুমুখী উৎস থেকে অর্থায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বন্ধ কলকারখানা চালু করা, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং জ্বালানি খাতের বাড়তি ব্যয় সামাল দেওয়াও সরকারের অগ্রাধিকারে রয়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং দ্রুত পুনর্গঠনের মাধ্যমে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়ার একটি রাজনৈতিকভাবে নির্ধারিত রূপরেখা রয়েছে। পাঁচ বছর মেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশলে এই রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। এর সঙ্গে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সংস্কার প্রস্তাবের বেশ কিছু মৌলিক বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
রাশেদ আল তিতুমীর বলেন, বাংলাদেশের জনগণ আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা চায়, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় কর আদায় বাড়াতে চায়, সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় বৃদ্ধি এবং শিল্পায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চায়। একই সঙ্গে বন্ধ কলকারখানা চালুর প্রত্যাশাও রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সংস্কার ভাবনার সঙ্গেও এসব লক্ষ্যের মিল রয়েছে।
তিনি বলেন, দেশীয় সংস্কারের রূপরেখার সঙ্গে আন্তর্জাতিক বহুপক্ষীয় সংস্থাগুলোর নীতিগত সমঝোতা রয়েছে। লক্ষ্য ও অভীষ্টের মধ্যেও সমঝোতা আছে। সেই কারণেই সংস্কারগুলো টেকসই হবে। কারণ, সংস্কারের মালিকানা রাজনৈতিক সরকার নেবে।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, সংস্কারের ক্ষেত্রে সরকারের নিজস্ব অগ্রাধিকার এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের পরামর্শের মধ্যে সমন্বয় থাকলে কর্মসূচি বাস্তবায়ন সহজ হবে। তবে সংস্কারের মূল দায়িত্ব ও মালিকানা সরকারেরই থাকবে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি খাতে বাংলাদেশের বাড়তি ব্যয়ের বিষয়টিও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনায় তুলে ধরা হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। তার দাবি, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধ পরিস্থিতির পর জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমাতে সরকার জ্বালানির দাম বাজারের সঙ্গে পুরোপুরি সমন্বয় করেনি।
তিনি বলেন, আগের সরকারের সময় দারিদ্র্য বেড়েছে বলে বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও উল্লেখ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে পরিবার কার্ডের মতো কর্মসূচির মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল্যায়ন অনুযায়ী, এ ধরনের কর্মসূচির মাধ্যমে পাঁচ বছরে দারিদ্র্যের হার প্রায় পাঁচ শতাংশ কমতে পারে।

জলবায়ু সহনশীলতা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নে অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও আলোচনায় তুলে ধরা হয়েছে।
আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে রাশেদ আল তিতুমীর বলেন, আগের সরকারের সময়কার অনিয়ম ও ঋণসংক্রান্ত বিশৃঙ্খলার দায় এখন সাধারণ জনগণকে বহন করতে হচ্ছে। ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত আর্থিক ব্যবস্থাকে পুনরুদ্ধারে পুনঃঅর্থায়নের প্রয়োজন রয়েছে।

তিনি জানান, এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থা আইএফসিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তার মতে, ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা না গেলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে। তিনি বলেন, অতীতে কর অব্যাহতি ও করসংক্রান্ত অনিয়মের কারণে সরকারের রাজস্ব আহরণ কমেছে। ফলে একদিকে আর্থিক ঘাটতি বেড়েছে, অন্যদিকে সামাজিক সুরক্ষা ও উন্নয়ন খাতে প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ কঠিন হয়েছে। আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো এবং সামাজিক সুরক্ষার বলয় গড়ে তোলার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে।
বন্ধ কলকারখানা চালু করা এবং নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত করতেও সরকার উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানান রাশেদ আল তিতুমীর। এ ক্ষেত্রে সাত শতাংশ ঋণাত্মক সুদে অর্থায়নের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা উল্লেখ করেন তিনি। তবে এ অর্থায়নের আওতা, শর্ত ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানাননি উপদেষ্টা। দেশের অর্থনীতিতে শিক্ষিত ও তরুণ বেকারের সংখ্যা বেড়েছে, অন্যদিকে অনেক কলকারখানা বন্ধ রয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে উৎপাদন বাড়ানো, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার মতে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিভিন্ন সময়ে প্রবাসী শ্রমিক, তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তা এবং আনুষ্ঠানিক খাতে নারীর অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ভবিষ্যতেও উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ করতে হবে।
থাইল্যান্ডের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক বাড়ানোর বিষয়েও ইতিবাচক অগ্রগতির কথা জানান রাশেদ আল তিতুমীর। তিনি বলেন, থাই চেম্বারের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য কয়েকটি সম্ভাবনাময় খাত তুলে ধরা হয়েছে। এসব খাতে উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মূল্য সংযোজনের সুযোগ রয়েছে।

বিশেষ করে কৃষিজাত পণ্য, ফল, দুগ্ধজাত পণ্য এবং হালাল খাদ্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে থাই বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ দেখা গেছে বলে জানান তিনি। বাংলাদেশে মৌসুমে আম, কাঁঠাল ও লিচুর মতো ফলের সরবরাহ বেশি থাকলেও পর্যাপ্ত হিমাগার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধার অভাবে অনেক পণ্য নষ্ট হয়। কৃষকেরাও অনেক সময় ন্যায্য দাম পান না। এসব পণ্য প্রক্রিয়াজাত করে হালাল বাজারসহ আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, শুধু দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোই সরকারের লক্ষ্য নয়; বরং উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার সংযোগ গড়ে তুলে সামগ্রিক বাণিজ্য বাড়াতে চায় বাংলাদেশ। এ ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে এমন উৎপাদন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে, যেখানে কোনো পণ্যের প্রাথমিক উপকরণ বাংলাদেশে উৎপাদিত হবে, মধ্যবর্তী পণ্য থাইল্যান্ডে তৈরি হবে এবং পরে চূড়ান্ত পণ্য উৎপাদন ও রফতানি করা হবে। আবার কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে এর বিপরীত ব্যবস্থাও গড়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দর ও থাইল্যান্ডের রেনং বন্দরের মধ্যে সামুদ্রিক যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। তার মতে, দুই বন্দরের মধ্যে সংযোগ আরো গতিশীল করা গেলে পণ্য পরিবহন সহজ হবে এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে।

আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (আরসিইপি) কাঠামোর সুবিধা কাজে লাগানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে শুল্কসুবিধা কাজে লাগিয়ে শুধু দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য নয়, বৃহত্তর আঞ্চলিক বাজারেও বাংলাদেশের পণ্য রফতানির সুযোগ বাড়তে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, কৃষি ও কৃষিজাত পণ্য, সামুদ্রিক যোগাযোগ এবং বঙ্গোপসাগরের মৎস্যসম্পদ আহরণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে থাইল্যান্ডের পক্ষ থেকে আগ্রহ দেখা গেছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে উৎপাদন, রফতানি ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

সরকারের অর্থায়ন পরিকল্পনা সম্পর্কে রাশেদ আল তিতুমীর বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে একাধিক উৎস থেকে অর্থায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর একটি বড় অংশ আসবে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ থেকে। তিনি জানান, চীনের বিনিয়োগ শুরু হয়েছে। জাপানের টয়োটা ও মারুবেনি করপোরেশনের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করেছে। এ ছাড়া সিলিকন ভ্যালিভিত্তিক প্লাগ অ্যান্ড প্লে এবং প্রযুক্তি খাতের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার দাবি, বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতিগত ধারাবাহিকতার প্রত্যাশা থেকেই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য হলো, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন, বিদেশি বিনিয়োগ এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণকে সমন্বিত করে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনের কাজ এগিয়ে নেওয়া।

তিনি আরো বলেন, বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক এবং ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতা বাড়ছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ইতিমধ্যে পাঁচ বিলিয়ন ডলারের সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তিতুমীর বলেন, অর্থনীতিকে টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষা, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে। এ জন্য সরকার আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে চায়।
রাশেদ আল তিতুমীর বলেন, থাই চেম্বারের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনাময় কয়েকটি খাত তুলে ধরা হয়েছে। এসব খাতে উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মূল্য সংযোজনের সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে কৃষিজাত পণ্য এবং হালাল খাদ্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে থাই বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ রয়েছে।

বাংলাদেশে মৌসুমে আম, কাঁঠাল, লিচু ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের সরবরাহ বেশি থাকলেও পর্যাপ্ত হিমাগার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধার অভাবে অনেক পণ্য নষ্ট হয়। এতে কৃষকেরা অনেক সময় ন্যায্য দাম পান না। এসব পণ্য প্রক্রিয়াজাত করে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রির সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা।

বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের মধ্যে যৌথ উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে এমন উৎপাদন নেটওয়ার্ক তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে কোনো পণ্যের প্রাথমিক উপকরণ বাংলাদেশে উৎপাদিত হবে, মধ্যবর্তী পণ্য থাইল্যান্ডে তৈরি হবে এবং পরে চূড়ান্ত পণ্য উৎপাদন করে আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানি করা হবে। আবার কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে থাইল্যান্ডে প্রাথমিক বা মধ্যবর্তী পণ্য তৈরি করে বাংলাদেশে চূড়ান্ত পণ্য উৎপাদনের সুযোগও রয়েছে।

এ ধরনের উৎপাদন নেটওয়ার্ক গড়ে উঠলে দুই দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করতে পারবে। এতে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়ার পাশাপাশি আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়বে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার মতে, শুধু পণ্য আমদানি-রফতানির মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সীমাবদ্ধ না রেখে শিল্পায়ন, মূল্য সংযোজন ও যৌথ উৎপাদনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। এতে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর বাজারের পাশাপাশি অন্যান্য আন্তর্জাতিক বাজারেও পণ্য রফতানির সুযোগ তৈরি হতে পারে। শুল্কসুবিধা কাজে লাগিয়ে দুই দেশের বাণিজ্য বাড়ানো সম্ভব। তবে লক্ষ্য কেবল বাণিজ্য ঘাটতি কমানো নয়, বরং উৎপাদন, বিনিয়োগ ও রপ্তানির পরিমাণ বাড়ানো।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার মতে, বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে নীতিগত স্থিতিশীলতা, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা এবং ব্যবসার অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। বিদেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি বন্ধ কলকারখানা চালু করা এবং নতুন শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে।
তিনি জানান, বন্ধ কলকারখানা চালুর ক্ষেত্রে সাত শতাংশ ঋণাত্মক সুদে অর্থায়নের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে এ অর্থায়নের বিস্তারিত শর্ত ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি তিনি তুলে ধরেননি।
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো বিনিয়োগ বৃদ্ধি, উৎপাদন সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করা। এ লক্ষ্য অর্জনে থাইল্যান্ডের মতো আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরো গভীর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে শঙ্কা
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ শতাংশ। তবে তারা ইঙ্গিত দিয়েছে, এই পূর্বাভাস কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে। সংঘাতের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি দেশের প্রবৃদ্ধি কমতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া ইউক্রেন এবং ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশ।

আইএমএফ আরো বলছে, খাদ্য ও জ্বালানির দাম অনেকটা বেড়ে গেলে উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাস্তবতা দীর্ঘায়িত হতে পারে। এতে দারিদ্র্য বাড়বে। হুমকির মুখে পড়বে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি ঋণও নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। আইএমএফের হিসাবে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বর্তমানে বিশ্বে সরকারি ঋণের পরিমাণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে।
২০৩০ সালের আগেই বৈশ্বিক সরকারি ঋণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে। উন্নত দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ-জিডিপি অনুপাত বেশি। তবে উদীয়মান ও নিম্ন আয়ের দেশগুলোও ঝুঁঁকিতে আছে। যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বেশি থাকায় এসব দেশ থেকে পুঁজি বেরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।

এআই খাতে বিনিয়োগ অর্থনীতি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখছে
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) অবকাঠামোতে ব্যাপক বিনিয়োগের কারণে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩ শতাংশে ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেছেন, এআই খাতে বিনিয়োগের এই প্রবণতা এশিয়ার বিভিন্ন অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের সুফল বয়ে আনছে। বিশেষ করে এআই প্রযুক্তির হার্ডওয়্যার সরবরাহকারী দেশগুলো এ থেকে বেশি লাভবান হচ্ছে। তিনি বলেন, এআই খাতে বিনিয়োগের উত্থান বিশ্ব অর্থনীতিতে চাহিদা ও বিনিয়োগের নতুন ধাক্কা তৈরি করেছে। এর ফলে এশিয়ার উন্নত অর্থনীতিগুলোর প্রবৃদ্ধি শূন্য দশমিক ৫ থেকে ১ শতাংশ পয়েন্ট পর্যন্ত বাড়তে পারে। অন্যদিকে এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর প্রবৃদ্ধি বাড়তে পারে শূন্য দশমিক ২ থেকে শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ পয়েন্ট।
আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, জ্বালানি সরবরাহের ধাক্কা বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিকে নিচের দিকে টানছে। তবে এআই অবকাঠামোতে বিনিয়োগ অর্থনীতিকে বাড়তি গতি দিচ্ছে। এই দুই বিপরীতমুখী প্রভাবের মধ্যে এআই খাতের বিনিয়োগ বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩ শতাংশে ধরে রাখতে সহায়তা করছে।