Image description

প্রতারণার মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থেকে রাজনৈতিক সংঘর্ষ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্কিত ভিডিও—রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের সদস্যসচিব আয়াসকে ঘিরে প্রশ্নের শেষ নেই। সর্বশেষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে কালি দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে আবারও আলোচনায় তিনি। নথি, অভিযোগ ও ঘটনাপ্রবাহ কী বলছে?

 

একটি নাম দিয়ে তাকে চেনা কঠিন। কোথাও তিনি আ ন ম আয়াস, কোথাও আল নূর মোহাম্মদ আয়াস, আবার কোনো নথিতে মো. আল-উজ্জ্বল আহমেদ। এমনকি একটি নথিতে তার নামের সঙ্গে রয়েছে আরও শব্দ—আহমেদ মোহাম্মদ আলী উজ্জ্বল। নামের এই ভিন্নতার পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে ওঠা অভিযোগ, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং মামলার তথ্য সামনে আসায় তাকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

 

আয়াস একসময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ময়মনসিংহ মহানগর শাখার সদস্যসচিব ছিলেন। বর্তমানে তিনি রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের সদস্যসচিব। রাজনৈতিক কর্মসূচি, পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষ এবং হামলার শিকার হওয়ার দাবি ও বিভিন্ন কারণে তার নাম এসেছে সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

 

সাম্প্রতিক গ্রেপ্তারের পর আবারও সামনে এসেছে কয়েকটি প্রশ্ন। বিভিন্ন নথিতে তার নামের ভিন্নতা কেন? প্রতারণার মামলাটির বর্তমান অবস্থা কী? রাজনৈতিক সংঘর্ষ ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ে তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর কোনটি নথিভিত্তিক, আর কোনটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য বা দাবি?

 

নথিতে যে নাম, পরিচয়ের যে ধাঁধা

 

এশিয়া পোস্টের হাতে আসা নথি অনুযায়ী, প্রতারণার একটি মামলায় তার নাম লেখা হয়েছে মো. আল-উজ্জ্বল আহমেদ। কারাগারের নথিতেও আল উজ্জ্বল আহমেদ নামটি রয়েছে। অন্যদিকে, জন্মনিবন্ধনের অনুলিপিতে তার নাম আল নূর মোহাম্মদ আয়াস। ওই নথিতে জন্মতারিখ উল্লেখ রয়েছে ১৮ নভেম্বর ২০০৫। আয়াসের বাড়ি ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার বগিরপাড়া গ্রামে। তার বাবা মোস্তফা কামাল এবং মা খোরশেদা খাতুন।

 

প্রতারণার মামলায় লেখা নাম মো. আল-উজ্জ্বল আহমেদ। ছবি : এশিয়া পোস্ট
প্রতারণার মামলায় লেখা নাম মো. আল-উজ্জ্বল আহমেদ। ছবি : এশিয়া পোস্ট

 

 

নথিতে নামের এই ভিন্নতার কারণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট নথি ও পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যের আরও যাচাই প্রয়োজন।

 

প্রতারণার মামলা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও জামিন

 

আয়াসকে ঘিরে বিতর্কের একটি সূত্র প্রতারণার মামলা। প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১৮ জুলাই তার বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয়। ২০২৪ সালের এপ্রিলে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। পরে ওই মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান তিনি। কিছুদিন পর জামিনে মুক্তি পান।

 

কারাগারের নথিতে নাম আল-উজ্জ্বল। ছবি : এশিয়া পোস্ট
কারাগারের নথিতে নাম আল-উজ্জ্বল। ছবি : এশিয়া পোস্ট

 

 

ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আবদুল্লাহ আল মামুন এশিয়া পোস্টকে বলেন, আয়াসের বিরুদ্ধে চেকসংক্রান্ত একটি প্রতারণার মামলা রয়েছে। এটি একটি সিআর মামলা। প্রতারণার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন।

 

জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সংঘর্ষ

 

আয়াসের রাজনৈতিক তৎপরতা ঘিরে আলোচনার একটি বড় পর্ব শুরু হয় ঢাকায়। গত ৪ আগস্ট জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে নতুন ধারা বাংলাদেশ ও রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই সংঘর্ষে আয়াসও মারধরের শিকার হন।

 

এর আগে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও শহীদদের নিয়ে কটূক্তির অভিযোগ তুলে নতুন ধারা বাংলাদেশের ভাইস চেয়ারম্যান শান্তা ফারজানাকে আয়াস চড় মেরেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই সংগঠনের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির একপর্যায়ে উভয় পক্ষের নেতাকর্মীরা সংঘর্ষে জড়ান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে সংঘর্ষ, মারধর ও পাল্টা আঘাতের দৃশ্য দেখা যায়। একটি ভিডিওতে আয়াসকে মাটিতে পড়ে যেতে এবং তাকে পাইপ দিয়ে আঘাত করতে দেখা যায়। অন্য একটি ভিডিওতে আয়াসকেও পাল্টা আঘাত করতে দেখা যায়।

 

জন্মনিবন্ধনের অনুলিপিতে নাম আল নূর মোহাম্মদ আয়াস। ছবি : এশিয়া পোস্ট
জন্মনিবন্ধনের অনুলিপিতে নাম আল নূর মোহাম্মদ আয়াস। ছবি : এশিয়া পোস্ট

 

 

পরে আহত ব্যক্তিরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে সেখানেও দুপক্ষের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটে। আয়াসের ওপর হামলার অভিযোগে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলায় নতুন ধারা বাংলাদেশের কয়েকজন নেতাকে আসামি করা হয়।

 

ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঘটনাতেও নাম

 

আয়াসের নাম জড়িয়েছে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের একটি ঘটনাতেও। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানের ভেঙে ফেলা বাড়িটির সামনে তার নেতৃত্বে একদল লোক অবস্থান নেন। সেদিন সেখানে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া, মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ ও শিঙাড়া বিতরণের অভিযোগ তুলে তিন ব্যক্তিকে মারধর করা হয়। রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল ওই স্থানের ঘটনাটি ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়।

 

নিজেও হামলার শিকার, অভিযোগ করেছেন একাধিকবার

 

আয়াসকে ঘিরে বিতর্কের পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে তার নিজের ওপর হামলার অভিযোগও সামনে এসেছে। গত বছরের ২৬ মে ময়মনসিংহ নগরের পাটগুদাম ব্রিজ মোড় এলাকায় একদল ব্যক্তি তাকে মারধর ও ছুরিকাঘাত করেন বলে অভিযোগ ওঠে। সে সময় তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ময়মনসিংহ মহানগর শাখার সদস্যসচিব ছিলেন। পরে তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

 

তখন আয়াস জানিয়েছিল, পাঁচ থেকে ছয়জন যুবক তাকে ছুরি ঠেকিয়ে সড়কের নিচের দিকে নিয়ে যান। বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ভাঙচুরের প্রসঙ্গ তুলে তাকে হুমকি দেওয়া হয় এবং লাঠি দিয়ে পেটানো হয়। পালানোর চেষ্টা করলে তার হাত ও পায়ে ছুরিকাঘাত করা হয়।

 

গত ১৬ আগস্ট ময়মনসিংহের ভালুকায়ও হামলার শিকার হওয়ার অভিযোগ করেন তিনি। আয়াসের দাবি, সাংগঠনিক কাজে সেখানে গেলে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের ১৫ থেকে ২০ জন নেতাকর্মী তার ওপর হামলা চালান। একপর্যায়ে তাকে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এ ঘটনার পর তাকে নিয়ে নিখোঁজ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে। তবে ওই দিন সন্ধ্যায় তিনি নিজেই ভালুকা মডেল থানায় গিয়ে হামলার মৌখিক অভিযোগ করেন।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্কিত আচরণের অভিযোগ

 

রাজনৈতিক সংঘর্ষের বাইরেও আয়াসের আচরণ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা হয়েছে। গত ২০ সেপ্টেম্বর মাগুরা শহরের কেশব মোড়ে ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের বাড়ির ফটকের সামনে প্রস্রাব করার একটি ভিডিও নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করেন আয়াস। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর তার আচরণ নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়।

 

লাঠি হাতে রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের সদস্যসচিব আয়াস। ছবি : ফেসবুক থেকে পাওয়া
লাঠি হাতে রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের সদস্যসচিব আয়াস। ছবি : ফেসবুক থেকে পাওয়া

 

 

তারাকান্দা উপজেলার বগিরপাড়া গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, আয়াসের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে এলাকার অনেকেই তাকে ভালো চোখে দেখেন না। তবে এ বিষয়ে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না বলেও দাবি করেন তারা।

 

‘ছেলেকে ফাঁসানো হয়েছে’

 

আয়াস গ্রেপ্তার হওয়ার খবর পেয়ে তার অসুস্থ বাবা-মা গ্রামের বাড়ি থেকে ঢাকায় এসেছেন। পরিবারের দাবি, আয়াস কোনো অন্যায়ের সঙ্গে যুক্ত নন, তাকে অহেতুক রাজনৈতিকভাবে ফাঁসানো হয়েছে।

 

আয়াসের বাবা মোস্তফা কামাল জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগে ভুগছেন এবং কোনো কাজ করতে পারেন না। তার স্ত্রীর মাসিক মাত্র ৮ হাজার টাকা বেতনের আয়ে পুরো সংসার চলে। ছেলের মুক্তি দাবি করে তিনি বলেন, আমার ছেলেকে ষড়যন্ত্র করে ফাঁসানো হয়েছে।