উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে ভারী চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট। এরই মধ্যে যন্ত্রপাতি কেনার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। তবে ক্রয় নীতি বা পিপিআর লঙ্ঘন করে দরপত্রে বিদেশি যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী কোম্পানি এবং নির্দিষ্ট মডেলের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে কাজ পাইয়ে দিতে দরপত্রে পিপিআর লঙ্ঘন করে নির্দিষ্ট মডেলের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। যাতে শুধু ওই নির্দিষ্ট ঠিকাদাররাই কাজ পান।
জানা গেছে, চলতি (২০২৬-২৭) অর্থবছরে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে (ওটিএম) দ্বিতীয় লটে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভারী যন্ত্রপাতি কেনার জন্য একটি দরপত্র আহ্বান করেছে। ২ কোটি ৫০ লাখ টাকায় এসব ভারী যন্ত্রপাতি কেনা হবে। দরপত্র আইডি নম্বর ১৩৪২৭৯৯। আগামী ১৪ অক্টোবর দরপত্র জমার শেষ দিন। এই কেনাকাটা আগামী ২৯ অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের ৩০ জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। দরপত্রে কারিগরি বৈশিষ্ট্য নির্ধারণের নামে কয়েকটি নির্দিষ্ট মডেল, প্রস্তুতকারক ও উৎসদেশের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এই ক্রয়ে বায়োকেমিস্ট্রি অ্যানালাইজারের ক্ষেত্রে রোশ ডায়াগনস্টিকসের কোবাস সি ৩১১ মডেল উল্লেখ করা হয়েছে। হেমাটোলজি অ্যানালাইজারের ক্ষেত্রে প্রস্তুতকারক সিসমেক্স করপোরেশন এবং ইউরিন অ্যানালাইজারের ক্ষেত্রে প্রস্তুতকারক শেনজেন মাইন্ড্রে বায়ো-মেডিকেল ইলেকট্রনিক্স কোম্পানির নাম নির্দিষ্ট করে স্পেসিফিকেশনে উল্লেখ রয়েছে। একই সঙ্গে কয়েকটি যন্ত্রের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট উৎসদেশ, বিশেষায়িত প্রযুক্তি, কর্মক্ষমতা ও ওয়ারেন্টির শর্ত দেওয়া হয়েছে। সরকারি ক্রয়ে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিতে এসব শর্ত বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির (বিপিপিএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর ২০২৫) দরপত্রের কারিগরি স্পেসিফিকেশনে নির্দিষ্ট ট্রেডমার্ক, বাণিজ্যিক নাম, পেটেন্ট, নকশা, ধরন, এক বা একাধিক উৎসদেশ বা প্রস্তুতকারক কিংবা সেবাসরবরাহকাবীর নাম সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা যাবে না।
ক্রয়কারী, যতদূর সম্ভব, পণ্য, কার্য বা সেবাসংশ্লিষ্ট ব্যবহারকারী বা সুবিধাভোগীদের নিবিড় সহযোগিতা গ্রহণক্রমে বিনির্দেশ প্রস্তুত করবে। অন্যান্যের মধ্যে ইন্টারন্যাশনাল স্টান্ডার্ড অর্গানাইজেশন, ইন্টারন্যাশনাল ইলেকট্রোটেকনিক্যাল কমিশন এবং বাংলাদেশ স্টান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই) বা অন্য কোনো জাতীয় বা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত কোনো মানদণ্ড শর্তে আরোপ করতে পারবেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, বিশেষ করে কারিগরি নির্দেশিকা প্রণয়নে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালাও অনুসরণ করতে হবে। সেইসঙ্গে মানসম্মত যন্ত্রও কিনতে হবে। কোনো অবস্থাতেই পিপিআর ভঙ্গ করে দরপত্রে শর্ত দেওয়া যাবে না। মান সনদ ও ভালো কোয়ালিটির যন্ত্রের এমন কিছু শর্ত থাকে, ওইসব মান নিম্নমানের যন্ত্রের থাকে না। এজন্য অভিজ্ঞতা ও কৌশলী হওয়ার বিকল্প নেই। সরকারি হাসপাতালের যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় অভিজ্ঞ লোকজন দরকার।
দরপত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দরপত্রের (টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন) কারিগরি বিবরণে কয়েকটি যন্ত্রের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোম্পানি, উৎসদেশ এবং মডেলের নাম পাওয়া গেছে। তার মধ্যে বায়োকেমিস্ট্রি অ্যানালাইজারের ক্ষেত্রে ‘কোবাস সি ৩১১’ মডেলের উল্লেখ রয়েছে। যন্ত্রটি ফটোমেট্রিক পদ্ধতিতে ঘণ্টায় ৩০০টি পরীক্ষা এবং আয়ন-নির্বাচনি ইলেকট্রোডের মাধ্যমে ঘণ্টায় ৪৮০টি পরীক্ষার সক্ষমতার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে যন্ত্রটি রোশে ডায়াগনস্টিকস অথবা সমমানের শর্ত দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে যন্ত্রের উৎসদেশের শর্তে জাপান, জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
হেমাটোলজি অ্যানালাইজারের ক্ষেত্রে সিসমেক্স করপোরেশন অথবা সমমানের শর্ত উল্লেখ করা হয়েছে। যন্ত্রটিকে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৭০টি নমুনা বিশ্লেষণ, ফ্লুরোসেন্স ফ্লো সাইটোমেট্রি এবং রক্তকণিকা বিশ্লেষণের বিভিন্ন প্রযুক্তির উল্লেখ রয়েছে। একই সঙ্গে শর্ত দেওয়া হয়েছে যন্ত্রটি যেন জাপান, কোরিয়া অথবা জার্মানির হয়।
ইউরিন অ্যানালাইজারের নথিতে শেনজেন মাইন্ড্রে বায়ো-মেডিকেল ইলেকট্রনিক্স কোম্পানির নাম স্পেসিফিকেশনে রয়েছে। এ ছাড়া ভিডিও ল্যারিঙ্গোস্কোপ যন্ত্রের ক্ষেত্রে নথিতে ৩.৫ ইঞ্চি টাচস্ক্রিন, ২৭০ ডিগ্রি অনুভূমিক ও ১৪০ ডিগ্রি উল্লম্ব ক্যামেরা চলাচল, একাধিক ম্যাকিনটোশ-ধাঁচের ব্লেড, অ্যান্টি-ফগ প্রযুক্তি এবং ছবি ও ভিডিও সংরক্ষণের সুবিধার উল্লেখ রয়েছে। যন্ত্রটির জন্য তিন বছরের ওয়ারেন্টির কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে চায়না, জাপান অথবা কোরিয়ার শর্ত দেওয়া হয়েছে।
নথিতে হ্যান্ডহেল্ড এক্স-রে যন্ত্রের ক্ষেত্রে ৪০ থেকে ৭০ কিলোভোল্ট টিউব ভোল্টেজ, ২ থেকে ৬ মিলিঅ্যাম্পিয়ার কারেন্ট, ২.৪ কেজি ওজন, ব্যাটারি সক্ষমতা, ১৭ ইঞ্চি ফ্ল্যাট-প্যানেল ডিটেক্টর, ওয়ার্কস্টেশন ও ল্যাপটপের উল্লেখ রয়েছে। যন্ত্রটির জন্য ৩৬ মাসের ওয়ারেন্টি এবং বিক্রয়োত্তর সেবার শর্তও দেওয়া হয়েছে। যন্ত্রটির উৎসদের অবশ্যই দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, জার্মান অথবা যুক্তরাষ্ট্রের হতে হবে। এ ছাড়া আলট্রাসাউন্ড থেরাপি যন্ত্রে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ভুক্ত দেশের শর্ত দিয়েও উল্লেখ করা হয়েছে জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও বেলজিয়ামের কথা। সেইসঙ্গে যন্ত্রটিতে অন্তত দুই বছরের ওয়ারেন্টি (বিক্রয়োত্তর সেবা) থাকতে হবে।
জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসির উদ্দীন বলেন, আমরা স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের চাহিদা ও প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে আধুনিক ও মানসম্মত যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করতে চাই। এজন্য দরপত্রের কেনাকাটার জন্য একটা টেকনিক্যাল এক্সপার্ট কমিটি রয়েছে। আমরা তাদের কাছে মানসম্মত যন্ত্রপাতি কেনার জন্য শর্ত চাই।
তিনি বলেন, নির্দিষ্ট কোনো দেশের নাম উল্লেখ করে ক্রয়ের শর্ত নির্ধারণের সুযোগ নেই। ভালো যন্ত্রের জন্য আমরা মূলত কান্ট্রি অব অরিজিন ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড আইডিয়াল মানের যন্ত্রপাতি কিনতে চাই। কান্ট্রি অব অরিজিন ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড না হলে যন্ত্রের মান ঠিক থাকে না। অন্য জায়গা থেকে আসে সেটা ঠিকঠাক কাজ করে না। এরই মধ্যে দরপত্রের শর্তে তিনটি উৎসদেশের (কান্ট্রি অব অরিজিন) উল্লেখ রয়েছে বলে জেনেছি। সঙ্গে সঙ্গে শর্তটি পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছি। যাতে ক্রয়প্রক্রিয়া নিয়ে কোনো প্রশ্ন না উঠে। এ ছাড়া অন্য যে কোনো অসংগতি থাকলে আমি অবশ্যই খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।