কৃষি খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে তিন বছর আগে ‘পুষ্টি, উদ্যোক্তা ও স্থিতিস্থাপকতা’র জন্য কৃষি ও গ্রামীণ রূপান্তর প্রোগ্রাম (পিএআরটিএনইআর-পার্টনার) প্রকল্প নেওয়া হয়। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের (আইএফএডি) সহায়তায় ৬ হাজার ৯১০ কোটি টাকার এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে কৃষি মন্ত্রণালয়।
কিন্তু অনিয়ম, নীতি লঙ্ঘন, গ্রুপিং, প্রকল্প বাস্তবায়নে অদক্ষতা, বিশ্ব ব্যাংকের অর্থ অলস পড়ে থাকাসহ নানা কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি কম। প্রকল্পের প্রথম দুই বছরে সার্বিক অগ্রগতি মাত্র ২০ শতাংশ। তবে বাস্তবে আরও কম। এ প্রকল্প নিয়ে নানা বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিতর্ক এড়াতে ও প্রকল্প এগিয়ে নিতে নতুন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দিয়েছে মন্ত্রণালয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতীতের সব সমস্যা সমাধান ও নতুন সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে কাজের সঠিক অগ্রগতির মাধ্যমে কৃষি খাতের এ মেগা প্রকল্পটিকে সফল করা বেশ কঠিন। কর্মকর্তারা বলছেন, মাঝপথে প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন, বিশ্বব্যাংকের কঠোর শর্ত, পরিচালক পদের জন্য কর্মকর্তাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও অসহযোগিতা এবং বিশ্বব্যাংকের দেওয়া অর্থ অলস পড়ে থাকার কারণে প্রকল্পটির গতি থমকে গেছে। ফলে, মুখ থুবড়ে পড়া এই বিশাল প্রকল্পটিকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সফলভাবে সম্পন্ন করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
তবে নতুন দায়িত্ব পাওয়া প্রকল্প পরিচালক ড. মো. শাখাওয়াত হোসেন শরীফ বলছেন ভিন্ন কথা। তার দাবি আগের প্রকল্প পরিচালকের অদক্ষতার কারণে প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়েছে। কিন্তু অভিজ্ঞতার আলোকে সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।
তথ্য বলছে, বিশ্ব ব্যাংকের নীতি লঙ্ঘন, ডিপিপির (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) শর্ত ভঙ্গ ও পরিকল্পনা কমিশনের নির্দেশনা অমান্য করে অভিজ্ঞদের বাদ দিয়ে মেগা প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়। বিশ্বব্যাংকের অর্থ ছাড় হওয়া সত্ত্বেও তা খরচ করার সক্ষমতা না থাকায় শেষ পর্যন্ত টাকা ফেরত যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এই অদক্ষতার কারণে কৃষি মন্ত্রণালয় সমালোচনা ও বিতর্কের মুখে পড়েছে।
এই মেগা প্রকল্পে গুরুত্বপূর্ণ পদে জনবল নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অনুমোদিত ডিপিপি ও পরিকল্পনা কমিশনের নির্দেশনা উপেক্ষা করে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রকল্প প্রণয়নে বহুদিন ধরে কাজ করা অভিজ্ঞ কারিগরি টিমের কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত কম অভিজ্ঞ জনবলকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়।
প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন এন্টারপ্রেনরশিপ অ্যান্ড রেসিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ (পার্টনার) নামের প্রকল্পের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো কৃষি ব্যবস্থাকে বাণিজ্যিক কৃষিতে রূপান্তর, খাদ্যশস্য উৎপাদনে বৈচিত্র্য আনা এবং কৃষিপণ্যের রপ্তানি বাড়িয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন।
প্রকল্পটি ২০২৩ সালের ১৮ এপ্রিল একনেক অনুমোদন করে। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৩-এর জুলাই থেকে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত। মোট বাজেট ৬ হাজার ৯১০ কোটি টাকা। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে এ প্রকল্পে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) লিড এজেন্সি হিসেবে কাজ করছে এবং এর সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে আরও ১৫টি সংস্থা যুক্ত রয়েছে।
প্রকল্পের ৬টি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবায়নকারী সংস্থা হলো—কৃষি বিপণন অধিদপ্তর (ডিএএম), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি), বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএআরআই), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিআরআরআই) এবং বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)। তবে অভিযোগ রয়েছে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরসহ সাতটি সংস্থার কার কী ভূমিকা হবে বা কাজের সুনির্দিষ্ট পরিধি কী—তা এখনো সুনির্দিষ্টভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি।
নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রকল্প অনুমোদনের আগে প্রায় দুই বছর প্রকল্প প্রস্তুতকরণ কারিগরি টিম উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করে। বিশ্বব্যাংকের একাধিক মিশনে অংশগ্রহণসহ প্রকল্প বাস্তবায়ন, পরিকল্পনা ও প্রকিউরমেন্ট বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন ওই টিমের কর্মকর্তারা। কিন্তু প্রকল্প অনুমোদনের পর গুরুত্বপূর্ণ পদে জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে ওই অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো হয়নি। তাই এ প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়ছে।
অভিযোগ রয়েছে, অনুমোদিত ডিপিপিতে প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর নিয়োগের ক্ষেত্রে বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়নে অন্তত সাত বছরের অভিজ্ঞতা থাকা কর্মকর্তাকে নিয়োগের শর্ত দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে এ শর্ত প্রতিপালন করা হয়নি। একই সঙ্গে আট সদস্যের কমিটির মাধ্যমে বাছাই ও নির্বাচন করে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের নির্দেশনাও অনুসরণ করা হয়নি।
নথিতে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ২৫ মে মিজানুর রহমানকে প্রকল্প পরিচালক বা প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ নিয়োগ পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র ও অনুমোদিত ডিপিপির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ ছাড়া বৈদেশিক সহায়তাপুষ্ট প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা এবং প্রকিউরমেন্ট-সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ বিবেচনার কথা থাকলেও তা মানা হয়নি।
প্রকল্পের জনবল নিয়োগ নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে মূলত এর প্রস্তুতকরণ টিমের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের পদায়ন না করায়। ওই কারিগরি টিমে বিশ্বব্যাংকের প্রকল্প ক্রয়-সংক্রান্ত (প্রকিউরমেন্ট) দায়িত্ব পালনে দক্ষ এবং প্রকল্প পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে ১০ বছরের বেশি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মকর্তা ছিলেন। এমনকি পিএমপি, এমসিআইপিএস (চার্টার্ড), মাস্টার অব প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট এবং এগ্রিবিজনেস (প্রজেক্ট প্রকিউরমেন্ট অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন) বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রিধারী উচ্চতর পেশাগত ও একাডেমিক যোগ্যতাসম্পন্ন কর্মকর্তারাও সেখানে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু তাদের কাউকেই লিড এজেন্সি ডিএইতে প্রকল্পের কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হয়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্প প্রস্তুতকরণ কারিগরি টিমের ‘টেকনিক্যাল লিড’ বা ‘লিড ফোকাল’কে যদি প্রকল্প পরিচালক (পিডি) করা হতো, তবে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা সরাসরি কাজে লাগানো যেত এবং সময়মতো প্রকল্পের অগ্রগতি নিশ্চিত হতো। কারণ, প্রকল্প প্রস্তুতকালে বিশ্বব্যাংকের পাঁচটি মিশনে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে ওই কর্মকর্তাকে প্রকল্প বাস্তবায়নের খুঁটিনাটি বিষয়ে প্রয়োজনীয় সব প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল।
পার্টনার প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের বিশেষ ও আধুনিক ঋণ অর্থায়ন পদ্ধতি পিফরআর বা প্রোগ্রাম ফর রেজাল্টসের ভিত্তিতে অর্থ ছাড় হয়। এ পদ্ধতিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা বা দৃশ্যমান অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করে অর্থ ছাড় করা হয়।
নথিতে বলা হয়েছে, প্রকল্পের নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জিত না হলে পরবর্তী অর্থবছরে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার অর্থ ছাড় স্থগিত হতে পারে। এমনকি প্রথম বছরের অর্থ ছাড়ের পর কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জিত না হলে বিশ্বব্যাংকের বিনিয়োগ করা অর্থ ফেরত নেওয়া শঙ্কা রয়েছে। ফলে প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাসম্পন্ন কর্মকর্তাদের না রাখলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পিফরআর প্রকল্পের কারিগরি ও ফলভিত্তিক কাঠামো সম্পর্কে অভিজ্ঞতা না থাকা জনবল দিয়ে প্রকল্প পরিচালনা করায়, তা বাস্তবায়নে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
ডিপির তথ্য বলছে, প্রকল্পটির আওতায় সরাসরি উপকারভোগী কৃষকের সংখ্যা ২ কোটি ২৭ লাখের বেশি। এসব কৃষককে স্মার্ট আইডি কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ওই কার্ডের মাধ্যমে বীজ, সার, সেচ সহায়তা ও নগদ প্রণোদনা দেওয়ার পাশাপাশি সরকারি উন্নয়ন-সংক্রান্ত তথ্য পুশ নোটিফিকেশনের মাধ্যমে কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথা রয়েছে। এ ছাড়া কৃষিপণ্যের রপ্তানি বাড়াতে ১০টি অ্যাক্রিডিটেড ল্যাব স্থাপনের পরিকল্পনা কথা বলা হয়েছে। এসব ল্যাব স্থাপন ও পরিচালনায় কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন জনবলকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। ফলে প্রকল্পের জনবল কাঠামোয় দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ কারিগরি টিম ছাড়া পিফরআর পদ্ধতির এ বড় কৃষি প্রকল্প বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এতে প্রকল্পের নির্ধারিত অর্জন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এ কারণে প্রকল্প প্রস্তুতকরণ টিমের লিড ফোকালসহ অভিজ্ঞ সদস্যদের প্রকল্পে পদায়নের মাধ্যমে প্রকল্প সফল করা জরুরি।
নথিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারের অনুমোদিত ডিপিপি ও পরিকল্পনা কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের পদায়ন না করা হলে একদিকে যেমন সরকারি নির্দেশনার ব্যত্যয় ঘটবে, অন্যদিকে প্রকল্প বাস্তবায়নেও তৈরি হতে পারে জটিলতা। বিশেষ করে পিফরআর প্রকল্পের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ফল অর্জন না হলে অর্থ ছাড়ে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকায় জনবল নিয়োগের বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পার্টনার প্রকল্পের সদ্য সাবেক প্রকল্প পরিচালক আবুল কালাম আজাদ প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ৪০ শতাংশ দাবি করে কালবেলাকে বলেন, প্রকল্প ঠিকমতো চলেছে। বিশ্বব্যাংক যে অর্থ দিয়েছে, তা অর্থ বছরে ব্যয় হয়েছে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কাজ চলছে তবে টাকা ব্যয় করার প্রয়োজন হয়নি।
বিদেশি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রকল্প পরিচালক হতে সাত বছর অভিজ্ঞতার প্রয়োজন, আপনার তা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি যোগ্য এবং বিদেশ থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তবে বিদেশি প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা নেই।