Image description

‘আমি ও আমার আত্মীয় মিলে অন্তত শ খানেক ফোন করেছি মেয়েকে ভর্তি করানোর জন্য। সব হাসপাতাল থেকে বলছে সিট খালি নেই। শেষে একটা নম্বর থেকে ফিরতি ফোন দিয়ে বলা হয় একটা পিআইসিইউ (শিশুদের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র) সিট খালি হয়েছে। তখন দ্রুত সেখানে নিয়ে যাই। ভর্তির তিন ঘণ্টার মধ্যেই আমার মেয়ে মারা যায়।’

বলতে বলতে গলা ধরে আসে মিথুন নাথের। গত শনিবার ডেঙ্গু আক্রান্ত মেয়ে আনিশা নাথকে (৫) বাঁচানোর জন্য এভাবে হন্যে হয়ে পিআইসিইউ খুঁজছিলেন তিনি। শেষে পেয়েছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে মেয়ের অবস্থা আরও সংকটাপন্ন। শনিবার সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে আনিশা নগরের ফজলুল কাদের সড়কের পিস পার্ক হাসপাতালে মারা যায়।

তাদের বাড়ি নগরের ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের হালিশহর ১ নম্বর শেড হিন্দুপাড়ায়। মিথুন ইপিজেডের একটি কারখানার শ্রমিক। আনিশা তার একমাত্র সন্তান। আদরের মেয়েকে হারিয়ে মিথুন ও স্ত্রী লাকী নাথ পাগলপ্রায়। মাত্র চার দিনের জ্বরে মেয়েকে হারানো কোনোভাবেই তারা মেনে নিতে পারছেন না।

মঙ্গলবার আনিশার প্রথম জ্বর আসে। স্থানীয় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খাওয়ানো হয়। বৃহস্পতিবার তার ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হয়। ডেঙ্গু পজিটিভ আসে। এরপর শুক্রবার থেকে তার অবস্থা খারাপ হতে থাকে। তখন তাকে নিয়ে একবার ডাক্তার, একবার হাসপাতালে ছুটতে থাকেন মিথুন ও তার স্ত্রী।

মিথুন বললেন, ‘শুক্রবার রাত থেকে মেয়ে ছটফট শুরু করে। মধ্যরাতের পর তাকে আগ্রাবাদ মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে ডাক্তার বললেন, মেয়ের এই অবস্থা করে কেন নিলাম। মেয়ের অবস্থা তখন খারাপ। তাকে আইসিইউতে নিতে হবে। কিন্তু মা ও শিশুতে খালি নেই শয্যা। আমি দিশাহারা হয়ে পড়ি।’

মেয়ে আনিশার তখন শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। কথা বলতে পারছিল না। শুধু চোখ মেলে তাকিয়ে ছিল। মিথুন ও তার শ্যালিকার বর বাবলু আইসিইউর জন্য ভোরে বিভিন্ন জায়গায় ফোন করতে থাকেন। মা ও শিশু হাসপাতালের এক ব্যক্তি তাদের বিভিন্ন হাসপাতালের নাম্বার দিয়ে সহযোগিতা করেছিলেন বলে জানান মিথুন।

মিথুন বললেন, ‘আমি আর বাবলু মিলে একের পর এক ফোন করছিলাম। কোনো জায়গায় আইসিইউ পাচ্ছিলাম না। শেষপর্যন্ত পিস পার্কের উদ্দেশে রওনা হই। মেয়ে সিএনজির মধ্যে কোনো কথা বলতে পারেনি। শুধু তাকিয়ে ছিল। ৬টা ১৫ মিনিটে ভর্তি করি। ডাক্তাররা বললেন মেয়ের অবস্থা খারাপ। শিরা পাওয়া যাচ্ছে না। আর বাঁচাতে পারলাম না। লাশ নিয়ে ফিরে আসি।’

একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে লাকী নাথ শুধু কান্না করেই চলেছেন। আনিশার কাপড়চোপড়, খেলনা জড়িয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়ছেন বারবার। তিনি কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছেন না মেয়ে নেই। আনিশাকে হালিশহরের স্থানীয় একটি শ্মশানে সৎকার করা হয়।

 

মেয়েকে বাঁচানোর যুদ্ধে নেমে ডাক্তার আর হাসপাতাল মিলে ২৫ হাজার টাকার মতো খরচ হয়ে গেছে মিথুনের। ‘আমি গরিব মানুষ। ছোট একটা চাকরি করি। মেয়েকে বাঁচানোর জন্য চেষ্টা কম করিনি। তবু মেয়েটাকে নিয়ে ঘরে ফিরতে পারলে মনকে সান্ত্বনা দিতাম। এখন কখন ফিরব আমি এ জন্য কেউ আর অপেক্ষা করবে না’— বলতে বলতে আবার কাঁদলেন মিথুন নাথ।