রাজধানীর মিরপুরে ৯ বছর বয়সি এক কন্যাশিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে মধ্যবয়সি এক প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে। গুরুতর আহত শিশুটি হাসপাতালে পাঁচ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে মারা যায়। ২০২৩ সালে নৃশংস এ ঘটনার পর বিচারের আশায় এখনো আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরছে শিশুটির পরিবার। শুধু মিরপুরের এই শিশুই নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্নভাবে নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার হয়ে প্রাণ হারাচ্ছে শত শত কন্যাশিশু। এসব ঘটনায় মামলা থেকে শুরু করে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে তুলছে।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বলছে-২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে দেশে সহিংসতা, নির্যাতন ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে পাঁচ হাজার ২৬৪ কন্যাশিশুর মৃত্যু হয়েছে। এসব মৃত্যুর ঘটনায় মামলা হয়েছে মাত্র দুই হাজার ২২০টি। অর্থাৎ, সংস্থাটির হিসাবে প্রতি ১০টি মৃত্যুর বিপরীতে মামলা হয়েছে প্রায় চারটি। নিহতদের মধ্যে ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সি শিশুর সংখ্যা দুই হাজার ৩৭৭, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৪৫ দশমিক ১ শতাংশ।
এ সময়ে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৭৫ কন্যাশিশুকে। শারীরিক নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছে এক হাজার ৬১ জনকে। এ ছাড়া পারিবারিক নির্যাতনে ৯০৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বিভিন্ন স্থান থেকে অনির্দিষ্ট বা সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে ৯১৬ শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি এবং পারিবারিক চাপে আত্মহত্যা করেছে ৭৬৩ শিশু। নিখোঁজ হওয়ার পর মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে আরও ৩২৪ জনকে।
চলতি বছরের প্রথম আট মাসের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। আসকের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন, সহিংসতা ও ধর্ষণের শিকার হয়ে ২৫৪ কন্যাশিশুর মৃত্যু হয়েছে। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে মাত্র ৮১টি। নিহতদের মধ্যে ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সি ১১০ শিশু রয়েছে। এ সময়ে শারীরিক নির্যাতনের পর ৬৮ শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। পারিবারিক পরিসরে নির্যাতনের পর মৃত্যু হয়েছে ৪৯ জনের। মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনসহ বিভিন্ন পারিবারিক ও সামাজিক কারণে আত্মহত্যা করেছে ৩০ শিশু। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৬ শিশুকে।
পুলিশের খাতায়ও নারী ও শিশু নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র : পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যেও নারী ও শিশু নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে ঢাকাসহ সারা দেশে এ সংক্রান্ত মামলা হয়েছে ১৬ হাজার ৭১৫টি। এসব মামলার একটি বড় অংশ কন্যাশিশু নির্যাতনের ঘটনা। মাসভিত্তিক হিসাবে জানুয়ারিতে এক হাজার ২৮১টি, ফেব্রুয়ারিতে এক হাজার ১৮১টি এবং মার্চে এক হাজার ৪৮৫টি মামলা হয়। এপ্রিল থেকে পরবর্তী মাসগুলোতে প্রতি মাসেই মামলার সংখ্যা দুই হাজার ছাড়ায়। এ ছয় মাসে মামলা হয়েছে ১২ হাজার ৭৬৮টি।
পুলিশ সদর দপ্তরের বার্ষিক অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে সারা দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগে এক লাখ দুই হাজার ৩৫৮টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা রেঞ্জে ১৭ হাজার ১২৪টি এবং শুধুমাত্র ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এলাকায় ৯ হাজার ১৪৫টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। এ ছাড়া রংপুর রেঞ্জে ১২ হাজার ৫০৭টি, রাজশাহী রেঞ্জে ১২ হাজার ২১৬টি এবং চট্টগ্রাম রেঞ্জে ১২ হাজার ১৩টি মামলা হয়েছে। বছরভিত্তিক হিসাবে ২০২১ সালে ২২ হাজার ১৩৬টি, ২০২২ সালে ২১ হাজার ৭৬৬টি, ২০২৩ সালে ১৮ হাজার ৯৪১টি, ২০২৪ সালে ১৭ হাজার ৫৭১টি এবং ২০২৫ সালে ২১ হাজার ৯৪৪টি মামলা হয়।
মামলা না হওয়া ও বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা : সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ফাওজিয়া করিম ফিরোজ যুগান্তরকে বলেন, শিশু নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডে অনেক ঘটনায় বিভিন্ন কারণে মামলা হয় না। কখনো পরিবার সামাজিক চাপের কারণে মামলা করতে চায় না। আবার কখনো পুলিশের গাফিলতি, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা আর্থিক চাপের কারণে মামলা গ্রহণে জটিলতা তৈরি হয়। ফলে অপরাধের সব ঘটনা আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় আসে না। শিশু নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়ানো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
মানবাধিকারকর্মী এএসএম নাসিরউদ্দিন এলান যুগান্তরকে বলেন, দেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা, দীর্ঘসূত্রতা এবং ফরেনসিক তদন্তের সীমাবদ্ধতার কারণে নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিরা অনেক সময় বিচারের ফাঁক গলে বেরিয়ে যায়। দ্রুত বিচার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি যথাযথ তদন্ত ও সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও জরুরি। তার মতে, থানায় মামলা গ্রহণ ও প্রাথমিক তদন্তের পর্যায়েই অনেক ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হয়। ভুক্তভোগীর প্রতি পুলিশের আচরণ, অভিযোগ গ্রহণে অনীহা এবং তদন্তের ত্রুটি পরবর্তী বিচারপ্রক্রিয়াকে দুর্বল করে দিতে পারে। এসব ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিচারব্যবস্থাকে কার্যকর করতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু অপরাধের পর মামলা ও বিচার নয়, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও জোরদার করা জরুরি। পারিবারিক ও সামাজিক পরিসরে শিশুদের সুরক্ষা, নির্যাতনের অভিযোগ দ্রুত গ্রহণ, নিরপেক্ষ তদন্ত, সাক্ষ্যপ্রমাণ সংরক্ষণ এবং নির্ধারিত সময়ে বিচার শেষ করার ওপর গুরুত্ব দেন তারা। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবারকে আইনি সহায়তা ও নিরাপত্তা দেওয়া প্রয়োজন, যাতে সামাজিক চাপ বা প্রভাবশালীদের ভয়ে তারা বিচার চাওয়া থেকে পিছিয়ে না যায়।
৫ হাজার ২৬৪ কন্যাশিশুর মৃত্যুর বিপরীতে মাত্র দুই হাজার ২২০টি মামলা-এই পরিসংখ্যান শিশুদের সুরক্ষা ও বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। প্রতিটি মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত, অপরাধীর জবাবদিহি এবং বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি নিশ্চিত করা না গেলে কন্যাশিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কাটবে না বলেও জানান তারা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, কন্যাশিশুদের প্রতি সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের পেছনে পারিবারিক অসচেতনতা, সামাজিক অবক্ষয়, অপরাধপ্রবণতা এবং অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে না পারার মতো বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, শিশু নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা জরুরি। একই সঙ্গে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে এবং শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের এআইজি কামারুম মুনিরা বলেন, কন্যাশিশু নির্যাতন এবং হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা হলে পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। কন্যাশিশু নির্যাতনের মামলায় দ্রুত ও মানসম্মত তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের মামলায় সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, ভুক্তভোগীর চিকিৎসা ও ফরেনসিক পরীক্ষা, সাক্ষীদের বক্তব্য গ্রহণ এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক আলামত সংরক্ষণে পুলিশ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এছাড়া গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে মামলা না হওয়া নারী নির্যাতনের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেলে পুলিশ তাৎক্ষণিক ভুক্তভোগীর সাথে যোগাযোগ করে।