Image description

ব্যাংকিং নীতিমালায় যে কোনো ঋণের বিপরীতে শতভাগ সহজামানত বা কোলাটেরাল রাখার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে বেক্সিমকো গ্রুপকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সেই নীতিমালা মানেনি রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক। জনতা ব্যাংকের কাছে ঋণ বাবদ বেক্সিমকো গ্রুপভুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মোট পাওনা ও দায়দেনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৩ হাজার ৩৭৮ কোটি টাকা। বিপুল পরিমাণ এই ঋণের বিপরীতে জনতা ব্যাংকের কাছে বেক্সিমকো গ্রুপের জামানত মাত্র ১ হাজার ৮৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ বেক্সিমকোকে দেওয়া ঋণের ৯৫.৩৭ শতাংশ অর্থই সম্পূর্ণ জামানতহীন ও চরম ঝুঁকিপূর্ণ। এভাবে জামানতহীন ঋণ দিয়ে ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থকে ঝুঁকিতে ফেলা হয়েছে। সরকারি এক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এমন অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শুধু সহজামানত নয়, জনতা ব্যাংক থেকে বেক্সিমকো গ্রুপ এবং তার নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ঋণ অনুমোদন, সময়সীমা বৃদ্ধি, এলসি সুবিধা এবং পুনঃতপশিলীকরণের নামে ভয়াবহ আর্থিক অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের স্পষ্ট নির্দেশিকা, একক গ্রাহক ঋণসীমা, ব্যাংক কোম্পানি আইন এবং ব্যাংকের নিজস্ব ঋণ নীতিমালার ডজনখানেক গুরুত্বপূর্ণ ধারা অমান্য করে বেক্সিমকো গ্রুপকে দেওয়া হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকার অন্যায্য ও ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ সুবিধা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইন অনুযায়ী যেখানে পুরো বেক্সিমকো গ্রুপের সর্বোচ্চ ঋণ পাওয়ার সীমা ছিল সাড়ে ৮০০ কোটি টাকা, সেখানে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ নিয়ম ভেঙে তাদের হাতে তুলে দেয় ২২ হাজার কোটি টাকারও বেশি ঋণ। কেবল ঋণ দেওয়াই নয়, জামানত ছাড়া সুবিধা দেওয়া, খেলাপি সত্ত্বেও বারবার নতুন ঋণ ছাড় করা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে জনতা ব্যাংকের বিরুদ্ধে।

সম্প্রতি নিরীক্ষা প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে মহাহিসাব নিরীক্ষকের কার্যালয়ের বাণিজ্যিক অডিট অধিদপ্তর। গত বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর সময়ে করা জনতা ব্যাংকের ২০২৩ ও ২৪ সালের অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকের নিজস্ব ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকার সরাসরি লঙ্ঘন করে বেক্সিমকোকে এই নজিরবিহীন ছাড় দেওয়া হয়েছে, যার ফলে ব্যাংকের অনাদায়ি টাকা আদায়ের পথ প্রায় রুদ্ধ হয়েছে এবং জামানতহীন ঋণে ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থকে ঝুঁকিতে ফেলা হয়েছে।

জনতা ব্যাংকের ২০২৪-২০২৫ নিরীক্ষা বছরের আওতায় ২০২৩ ও ২০২৪ সালের আর্থিক কার্যক্রমের ওপর কমপ্লায়েন্স নিরীক্ষাকালে বেক্সিমকো গ্রুপভুক্ত প্রতিষ্ঠানের ২০২৫ সালের ৩১ মার্চভিত্তিক দায়দেনার বিবরণী, জনতা ব্যাংকের লোকাল অফিসের সিএল বিবরণী, জনতা ব্যাংককের বেক্সিমকো গ্রুপের ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ সংক্রান্ত নথি, ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের সভার মেমো, ব্যাংক কর্তৃক বিভিন্ন সময়ের পরিদর্শন প্রতিবেদন, বিবিএলসি-এর নীতিগত অনুমোদন সংক্রান্ত নথি, পিসি ঋণের নথি, নির্বাচিত সেলস কন্ট্রাক্ট/রপ্তানি এলসির কপি পর্যালোচনা করা হয়।

পাওয়ার কথা ৮৫৭ কোটি, ঋণ দেওয়া হয় ২২ হাজার ২০৩ কোটি টাকা: বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআরপিডি সার্কুলার (১৬ জানুয়ারি ২০২২) অনুযায়ী, কোনো একক গ্রাহক বা গ্রুপকে ব্যাংকের মোট রেগুলেটরি মূলধনের ১৫ শতাংশের বেশি ফান্ডেড ঋণ দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু বেক্সিমকো গ্রুপকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে এই নিয়মের তোয়াক্কা করা হয়নি। নিরীক্ষা প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত জনতা ব্যাংকের রেগুলেটরি মূলধন ছিল ৫ হাজার ৭১৩ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। সেই হিসাবে বেক্সিমকো গ্রুপের ফান্ডেড ঋণের সর্বোচ্চ সীমা হতে পারত ৮৫৭ কোটি ৯ লাখ টাকা। কিন্তু ওই একই সময়ে ব্যাংক থেকে বেক্সিমকো গ্রুপভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেওয়া ফান্ডেড ঋণের স্থিতি দাঁড়ায় ২২ হাজার ২০৩ কোটি ২৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ কেবল একক গ্রাহক ঋণসীমা ভেঙে দেওয়া অতিরিক্ত ঋণের পরিমাণই দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৩৪৬ কোটি ১৪ লাখ টাকা।

এমনকি ২০২২ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে জনতা ব্যাংকের সম্পাদিত সমঝোতা স্মারকের শর্ত অনুযায়ী, ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধনের ১৫ শতাংশের বেশি ঋণ এক গ্রাহককে দেওয়া নিষিদ্ধ ছিল। ওই সময়ে ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ছিল ২ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা, যার ১৫ শতাংশ দাঁড়ায় সর্বোচ্চ ৩৪৭ কোটি ১০ লাখ টাকা। অথচ সব নিয়ম তুচ্ছ করে একটি নির্দিষ্ট গ্রাহককেই দেওয়া হয় ১ হাজার ৭০৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকার ঋণ, যা মূলধনের প্রায় ৭৩.৮৪ শতাংশ।

৯৫.৩৭ শতাংশ ঋণই সম্পূর্ণ জামানতহীন ও চরম ঝুঁকিপূর্ণ: ঋণ বিতরণের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো শতভাগ সুরক্ষিত সহজামানত নিশ্চিত করা। কিন্তু বেক্সিমকোকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সেই শর্ত ভঙ্গ করে জামানতহীনভাবে বিশাল অংকের টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত জনতা ব্যাংকে বেক্সিমকো গ্রুপভুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মোট পাওনা ও দায়দেনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ৩৭৮ কোটি ১ লাখ ৫৫ হাজার ৪২৮ টাকা। কিন্তু পাওনার বিপরীতে ব্যাংকের হাতে থাকা বন্ধকীকৃত সহজামানতের আর্থিক মূল্য মাত্র ১ হাজার ৮৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ মোট ঋণের বিপরীতে জামানতের হার মাত্র ৪.৬৩ শতাংশ। অর্থাৎ বেক্সিমকো গ্রুপকে দেওয়া পাওনার প্রায় ৯৫.৩৭ শতাংশ অর্থ বা ২২ হাজার ২৯৩ কোটি ২৩ লাখ টাকাই সম্পূর্ণ জামানতহীন ও চরম অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে।

জামানত ছাড়াই ১৪ হাজার ৫৫৭ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতপশিল: নিরীক্ষা প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২২ ও ২০২৩ সালে বেক্সিমকো গ্রুপের বিপুল অঙ্কের ঋণ পুনঃতপশিল করে দিয়েছিল জনতা ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ। এর মধ্যে ২০২২ সালে ৫ হাজার ৯৭৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকা এবং ২০২৩ সালে পুনঃতপশিল করা হয় ৮ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট ১৪ হাজার ৫৫৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকার ঋণ সাত বছরের জন্য পুনঃতপশিল করা হয়েছিল। অথচ নিয়ম অনুযায়ী, এ বিপুল পরিমাণ ঋণ পুনঃতপশিলের সময় ব্যাংকের পাওনা পরিশোধের জন্য অতিরিক্ত সহজামানত গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু জনতা ব্যাংক সম্পূর্ণ জামানত ছাড়াই ১৪ হাজার ৫৫৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকার এই ঋণ পুনঃতপশিল করে দেয়। ২০২৩ সালের সমঝোতা স্মারকের শর্ত এবং ব্যাংকের নিজস্ব ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকার সরাসরি লঙ্ঘন করে বেক্সিমকোকে এই নজিরবিহীন ছাড় দেওয়া হয়, যার ফলে ব্যাংকের অনাদায়ি টাকা আদায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বছরের পর বছর বিশেষ সুবিধা পেলেও টাকা আদায়ে কোনো কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেয়নি ব্যাংক।

বেক্সিমকোর সাড়ে ২৩ হাজার কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে ব্যাংকে যে ১ হাজার ৮৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকার জামানত দেখানো হয়েছে, সেটিও বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, জনতা ব্যাংক লোকাল অফিস এ সহজামানতের মূল্যায়ন করেছিল ২০১৫ সালের ১২ এপ্রিল এবং ২০২০ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর। অর্থাৎ, ৫ থেকে ১০ বছর আগের পুরোনো মূল্যায়নের হিসাব দেখিয়ে ব্যাংকের নথিপত্রে ১ হাজার ৮৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকার বন্ধকি সম্পত্তির তথ্য টিকিয়ে রাখা হয়েছে। দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও ব্যাংকের পক্ষ থেকে এই বন্ধকি সম্পত্তির নতুন কোনো মূল্যায়ন করা হয়নি। অন্যদিকে, প্রতি বছর সুদের বোঝা চেপে বেক্সিমকোর ঋণের স্থিতি পাহাড়ের মতো বড় হলেও তার বিপরীতে কোনো বাড়তি জমি, ভবন বা স্থায়ী সম্পদ বন্ধক নেয়নি জনতা ব্যাংক। ফলে ঋণের পাহাড় ও জামানতের মধ্যে ব্যবধান দিন দিন আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।

সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত জনতা ব্যাংকে বেক্সিমকো গ্রুপের দায়দেনা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ১৩৭ কোটি টাকা। কিন্তু পাওনার বিপরীতে ব্যাংকের হাতে থাকা বন্ধকীকৃত সহজামানতের আর্থিক মূল্য মাত্র ১ হাজার ৮৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ, বেক্সিমকোর কাছে জনতা ব্যাংকের পাওনার ২৭ হাজার কোটি টাকা বা ৯৬ শতাংশের বেশি অর্থই জামানতহীন অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে।

খেলাপি সত্ত্বেও নতুন ঋণ বিতরণ: ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১ (সংশোধন ২০২৩)-এর ২৭ কক (৩) ধারা অনুযায়ী, কোনো খেলাপি ঋণগ্রহীতাকে নতুন করে কোনো ঋণ সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ৮১১ ও ৮১৫তম সভায় বেক্সিমকো গ্রুপের ৮টি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে নতুন করে ৪৫১ কোটি ৫ লাখ টাকার ঋণ অনুমোদন ও ছাড় করা হয়। এই অন্যায্য সুবিধা পাওয়া বেক্সিমকো গ্রুপভুক্ত ৮ প্রতিষ্ঠান হলো—শাইনপুকুর গার্মেন্টস, এসকর্প অ্যাপারেলস, বেক্সিমকো ফ্যাশন, বেক্সিমকো পিপিই, ইন্টারন্যাশনাল নিটওয়্যার অ্যান্ড অ্যাপারেলস, ক্রিসেন্ট ফ্যাশন অ্যান্ড ডিজাইন, নিউ ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিজ ও ইয়েলো অ্যাপারেলস। অথচ এই ঋণ ছাড়ের ঠিক আগে, ২০২৪ সালের ৮ জানুয়ারির সিআইবি রিপোর্টে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল—গ্রুপটির অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ‘বেক্সিমকো এলপিজি ইউনিট-১ লিমিটেড’-এর ৩৮৫ কোটি ৭৮ লাখ টাকার দায় ‘সন্দেহজনক’ মানদণ্ডে খেলাপি ছিল। এর পাশাপাশি ২০২৪ সালের মার্চে গ্রুপটির ওভারডিউ বা মেয়াদের বাইরে থাকা বকেয়ার পরিমাণই ছিল ৩ হাজার ১৯৯ কোটি ৭৬ লাখ টাকা।

একদিকে খেলাপি ও বকেয়ার পাহাড়, অন্যদিকে ব্যাংকের নিজস্ব ফান্ড পজিশন যখন ১১ হাজার কোটি টাকা ঋণাত্মক ছিল, তখনও পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ তাদের হাতে ৪৫১ কোটি টাকার নতুন ফান্ড তুলে দেয়। ব্যাংক নিজেই যেখানে তীব্র তারল্য সংকটে ভুগছিল, সেখানে ঋণাত্মক ফান্ড পজিশন ও খেলাপি সিআইবি থাকা সত্ত্বেও সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে ৪৫১.০৫ কোটি টাকার নতুন ঋণ ছাড় করা হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিষেধাজ্ঞা অমান্য: বেক্সিমকো গ্রুপের ঋণের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি ঠেকাতে ২০২৩ সালের ২ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জনতা ব্যাংকে বিশেষ চিঠি দেওয়া হয়। তাতে বলা হয়, বেক্সিমকো লিমিটেড ও এর গ্রুপভুক্ত ২৬টি প্রতিষ্ঠানের ঋণ স্থিতি আর ১ টাকাও বাড়ানো যাবে না । উক্ত চিঠি জারির দিন গ্রুপটির মোট ঋণ স্থিতি ছিল ২২ হাজার ৩৪৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা। কিন্তু জনতা ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সেই নির্দেশ অমান্য করে নতুন ঋণ ছাড় ও সুদারোপের সুযোগ তৈরি করে দেয়। ফলে ২০২৫ সালের মার্চ শেষে তাদের নিট দায় বেড়ে দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৩২৭ কোটি ৯৭ লাখ টাকায়। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া সীমার চেয়েও ৯৮৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা অতিরিক্ত দায় তৈরি করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি ও ভুয়া রপ্তানির কারসাজি: অডিট রিপোর্টে বেক্সিমকো গ্রুপের রপ্তানি বাণিজ্য ও কাঁচামাল আমদানির নামে সংঘটিত অনিয়মের বিস্তারিত চিত্র উঠে এসেছে। নিরীক্ষাকালে বেক্সিমকোর ৯৮৯টি রপ্তানি এলসি ও সেলস কনট্রাক্টের মধ্যে নমুনা হিসেবে ৫৬টি সেলস কনট্রাক্ট, ৬২৭টি ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি এবং ২০৫টি প্যাকিং ক্রেডিট ঋণের নথি পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় দেখা যায়, বন্ডেড ওয়্যারহাউস লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও বেক্সিমকোর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ধারাবাহিকভাবে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। বিদেশি ক্রেতার ক্রেডিট রিপোর্ট সংগ্রহ কিংবা চুক্তিপত্রের সত্যতা যাচাই না করেই শতশত কোটি টাকার এলসি অনুমোদিত হয়। ক্ষেত্রবিশেষে, পণ্য জাহাজীকরণের নির্ধারিত তারিখ শেষ হয়ে যাওয়ার ১৬ দিন পর প্যাকিং ক্রেডিট ঋণ ছাড় করার প্রমাণ মিলেছে।

চলতি মূলধন ঋণ বা ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির ক্ষেত্রে আমদানিকৃত কাঁচামাল ও গুদামে থাকা উৎপাদিত পণ্য ব্যাংকের নামে ‘হাইপোথিকেশন’ বা প্রাথমিক জামানত হিসেবে থাকার কথা। পণ্য বিক্রি করে সেই অর্থ ব্যাংকের ঋণ হিসাবে জমা দিয়ে ঋণ সমন্বয়ের বিধান রয়েছে। তবে পণ্য রপ্তানি না হওয়া সত্ত্বেও মালামালের কোনো ব্যাডস্টক বা স্টক রিপোর্ট ব্যাংককে দেওয়া হয়নি। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির মাধ্যমে আমদানিকৃত কাঁচামাল বা উৎপাদিত পণ্য ব্যাংকে অবহিত না করেই গোপনে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে অর্থ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে অথবা ভুয়া বিল তৈরি করে ব্যাংকের টাকা অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়েছে।

পণ্য রপ্তানি না হলে নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংকে ‘ব্যাডস্টক’ বা স্টক রিপোর্ট জমা দেওয়ার কথা থাকলেও শাখা কর্তৃপক্ষ কোনো স্টক রিপোর্ট তৈরি করেনি। অর্থাৎ যেসব মালামাল বা স্টক ঋণের প্রাথমিক জামানত হওয়ার কথা ছিল, ব্যাংকের তদারকির অভাবে তা স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ ছাড়া বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে আসা রপ্তানি আয় সংশ্লিষ্ট এলসির দায় না মিটিয়ে অন্য এলসির দায় সমন্বয়ে ব্যবহার করা হয়েছে, যা বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। ফলে ব্যাংকের কাছে প্রাথমিক কিংবা মাধ্যমিক—কোনো জামানতেরই কার্যকর উপস্থিতি নেই।

ঝুঁকিতে সুকুক বন্ডের ২২০ কোটি টাকা: এদিকে অন্যায্যভাবে বেক্সিমকোকে বিশাল অঙ্কের ঋণ দেওয়ার পাশাপাশি তাদের সুকুক বন্ডেও নিয়ম ভেঙে বিনিয়োগ করেছে জনতা ব্যাংক। নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বেক্সিমকো গ্রুপের ‘বেক্সিমকো গ্রিন সুকুক বন্ডে’ জনতা ব্যাংক নিজের পোর্টফোলিও ও বিশেষ তহবিল থেকে মোট ২২০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে। শর্ত ছিল, বন্ডের মেয়াদ শেষে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে পুরো টাকা এককালীন ফেরত দেওয়া হবে। কিন্তু অডিট রিপোর্টে দেখা গেছে, যেসব প্রকল্পের দোহাই দিয়ে সুকুক বন্ড ছাড় করা হয়েছিল, তার মধ্যে করতোয়া সোলার প্লান্ট আজও চালু হয়নি এবং বেক্সিমকো টেক্সটাইল কারখানাটি বন্ধ পড়ে আছে। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিওএস সার্কুলার ৩৯ (২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১) অনুযায়ী প্রকল্প উন্নয়নের সর্বোচ্চ সময় ৮ মাস। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেবল তিস্তা সোলারের আয় দিয়ে ২০২৬ সালে বুলেট পেমেন্ট শোধ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

অন্যদিকে, ২০০ কোটি টাকার বেশি বিশেষ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তি নেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও জনতা ব্যাংক কোনো অনাপত্তি নেয়নি। এ ছাড়া সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের পূর্বানুমোদন ছাড়াই বেক্সিমকো গ্রিন সুকুক বন্ড সাধারণ শেয়ারে রূপান্তর, বিনিয়োগের অর্থ ছাড়করণের দীর্ঘদিন অতিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়ায় ব্যাংকের বিনিয়োগকৃত ২২০ কোটি টাকা টাকা আদায় এখন চরম অনিশ্চয়তায় মুখে পড়েছে।

অডিটের জবাবে ব্যাংকের সাফাই, নিরীক্ষকদের প্রত্যাখ্যান: সহজামানতের এই বিশাল ঘাটতি ও জামানতহীন ঋণ পুনঃতপশিলের বিষয়টি স্বীকার করেছে জনতা ব্যাংক। নিরীক্ষার ব্যাখ্যার জবাবে জনতা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ দাবি করে, পর্ষদের অনুমোদন ও বিআরপিডি সার্কুলারের বিধান মেনেই সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় করপোরেট গ্যারান্টি বা অন্যান্য শর্তে ঋণ পুনঃতপশিল ও নবায়ন করা হয়েছিল। জনতা ব্যাংক জানায়, গ্রাহকের সহজামানত রয়েছে ১ হাজার ৮৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন নিয়ে করপোরেট গ্যারান্টি গ্রহণ করা হয়েছে।

একক গ্রাহক ঋণসীমা অতিক্রমেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত অনুমোদনের কথা উল্লেখ করে জনতা ব্যাংক জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের অফসাইট সুপারভিশন বিভাগ (০২/০৮/২০২৩) বেক্সিমকো গ্রুপের ক্ষেত্রে একক গ্রাহক ঋণসীমা অতিক্রম করার অনাপত্তি দিয়েছিল। ডাউন পেমেন্ট ছাড়া কিস্তির সময় বাড়ানো প্রসঙ্গে বলা হয়, এ ক্ষেত্রে নতুন করে কোনো ঋণ পুনর্গঠন বা পুনঃতপশিল করা হয়নি; কেবল কিস্তি পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তি থাকায় নতুন ডাউনপেমেন্ট নেওয়ার প্রয়োজন পড়েনি।

ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি, ক্রেডিট রিপোর্ট ও স্টক লট পরিদর্শন প্রসঙ্গে বলা হয়, বেক্সিমকোর বন্ডেড ওয়্যারহাউস লাইসেন্স রয়েছে। রূপান্তরের সময় ও সুযোগের অভাবে শাখা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক স্টক লট পরিদর্শন সম্পাদন করা সম্ভব হয়নি। বেক্সিমকো গ্রিন সুকুক বন্ডে ২২০ কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, বিএসইসির নোটিফিকেশন অনুযায়ী সুকুক বন্ড সাধারণ শেয়ারে রূপান্তরের শর্ত থেকে ছাড় পেয়েছিল। নিয়মিত মুনাফা পাওয়া যাচ্ছে এবং মূল ২২০ কোটি টাকা বুলেট পেমেন্ট হিসেবে আদায়ের জন্য ট্রাস্টিকে (আইসিবি) চিঠি দেওয়া হয়েছে ও বিকল্প প্রস্তাব পর্ষদে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

তবে অডিট বা নিরীক্ষা দল ব্যাংকের এই জবাবকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, ব্যাংকের জবাব আপত্তি নিষ্পত্তির জন্য সহায়কের নয়। ব্যাংকের জবাবের বিপরীতে নিরীক্ষায় বলা হয়েছে, জনতা ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যে সম্পাদিত এমওইউ এবং ব্যাংকের নিজস্ব ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকায় শতভাগ সহজামানত নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও তা পরিপালন করা হয়নি। ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ ও তদারকি কর্মকর্তা তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন না করে নিয়মবহির্ভূতভাবে জামানত ঘাটতি রেখে বেক্সিমকোকে অন্যায্য সুবিধা প্রদান করেছে এবং আমানতকারীদের হাজার হাজার কোটি টাকা অসংরক্ষিত রেখে চরম আর্থিক ঝুঁকিতে ফেলেছে।

অডিট প্রতিবেদনে উত্থাপিত একের পর এক গুরুতর অনিয়মের বিপরীতে জনতা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ যেসব জবাব পাঠিয়েছে, অডিট দল তার প্রতিটি জবাবকে ‘অযৌক্তিক, অসংগতিপূর্ণ এবং আপত্তি নিষ্পত্তির জন্য সহায়ক নয়’ বলে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। ব্যাংকের জবাবের বিপরীতে নিরীক্ষায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই নির্দেশনায় বেক্সিমকো লিমিটেড ও এর গ্রুপভুক্ত ২৫টি প্রতিষ্ঠানের ঋণের পরিমাণ আর না বাড়ানোর শর্ত দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ব্যাংক সেই শর্ত লঙ্ঘন করে শুধু ২০২৪ সালেই নতুন করে স্থানীয় বিল ক্রয় ও পিসি ঋণ বাবদ মোট ৪৫১ কোটি টাকা নতুন ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ করেছে।

সহজামানতের বিষয়ে ব্যাংকের জবাব প্রত্যাখ্যান করে নিরীক্ষায় বলা হয়েছে, সমঝোতা স্মারক ও ব্যাংকের নিজস্ব গাইডলাইন অনুযায়ী ১০০% সহজামানত নিশ্চিতের স্পষ্ট নিয়ম থাকলেও মাত্র ৪.৬৩% জামানত রেখে মোট ঋণের ৯৫.৩৭% জামানতহীন রাখা আমানতকারীদের অর্থকে চরম আর্থিক ঝুঁকিতে ফেলার শামিল। সিআইবি রিপোর্টে স্পষ্ট ৩৮৫.৭৮ কোটি টাকা ‘সন্দেহজনক’ খেলাপি এবং ৩ হাজার ১৯৯ কোটি টাকা বকেয়া থাকা সত্ত্বেও নতুন ঋণ দেওয়া ব্যাংক কোম্পানি আইন ২৭ কক (৩)-এর সরাসরি লঙ্ঘন।

সুকুক বন্ডের বিষয়ে ব্যাংকের জবাবের বিপরীতে নিরীক্ষায় বলা হয়েছে, বন্ধ থাকা প্রকল্পের পাওনা আদায়ে কেবল একটি চিঠি দিয়েই ব্যাংক দায় সেরেছে; ২০০ কোটি টাকার অতিরিক্ত বিশেষ বিনিয়োগে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তি কেন নেওয়া হয়নি বা অন্যান্য অনিয়মের বিষয়ে কোনো সদুত্তর ব্যাংক দিতে পারেনি।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনের সুপারিশে যা আছে: নিরীক্ষা প্রতিবেদনের সুপারিশে বলা হয়েছে, ব্যাংকের নিজস্ব ঋণ নীতিমালা ও এমওইউর নির্দেশ অমান্য করে অনিয়মিতভাবে ঋণ প্রস্তাব প্রেরণ, সুপারিশ, অনুমোদন ও বিতরণের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিবর্গের দায়দায়িত্ব নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে আপত্তিতে জড়িত সমুদয় অর্থ সুদ সমেত আদায় করা আবশ্যক।

নিরীক্ষা আপত্তির বিষয়ে জানতে চাইলে জনতা ব্যাকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. মজিবর রহমান কালবেলাকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি নীতিমালা আছে যে, পরিশোধিত মূলধনের একটি নির্দিষ্ট শতাংশের বেশি কোনো একক গ্রাহককে ঋণ দেওয়া যাবে না। যখনই কোনো গ্রাহকের ক্ষেত্রে এই একক গ্রাহক ঋণসীমা অতিক্রম করার প্রয়োজন হয় বা ছাড়িয়ে যায়, তখন নিয়ম অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে লিখিত অনাপত্তি চেয়ে আবেদন করা হয়। বেক্সিমকো গ্রুপের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে চিঠি লেখা হয়েছিল এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনাপত্তিপত্র দিয়েছিল।

তিনি বলেন, জনতা ব্যাংক নিজস্ব খেয়ালখুশি মতো নয়, বরং বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া অনুমোদন ও অনাপত্তিপত্রের পরিপ্রেক্ষিতেই বেক্সিমকোকে এই ঋণ সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। অনাপত্তির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, সে সময় অনেক পরিস্থিতি থাকলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে যখন লিখিত অনুমতি এসেছে, ব্যাংকের দৃষ্টিতে সেটা বৈধ কাগজপত্র। তার ভিত্তিতে ঋণ অনুমোদন করা হয়েছে।