সরকারি নীতিমালা চরমভাবে লঙ্ঘন করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সার ডিলার নিয়োগে নজিরবিহীন স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণের অভিযোগ উঠেছে। রাজশাহী, ঝিনাইদহ, নীলফামারী ও মেহেরপুরে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের বাদ দিয়ে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের স্ত্রী, সন্তান, ভাই ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামেও নিয়োগ বাগিয়ে নিয়েছেন অনেকে। এমন অনিয়ম ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ঘটনায় সাধারণ ব্যবসায়ীসহ খোদ দলীয় নেতাকর্মীদের মাঝেও চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
রাজশাহী
তালিকায় বিএনপি নেতার স্ত্রী সন্তান ভাই
রাজশাহী জেলায় ৬৯ জন নতুন সার ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সারসংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটি বুধবার সার ডিলার নিয়োগের তালিকা জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির কাছে পাঠিয়েছে। জেলার একটি সিটি করপোরেশন, ৭২টি ইউনিয়ন ও ১৪টি পৌরসভায় (বাগমারার ১৮ জন বাদে) এ নিয়োগ দেওয়া হয়।
তালিকা বিশ্লেষণ করে এবং মাঠ পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ৬৯ সার ডিলারের মধ্যে একজন মাত্র জামায়াতে ইসলামীর কর্মী রয়েছেন। বেশির ভাগ বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী। এছাড়া এ তালিকায় বিএনপি নেতার স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে, ভাইসহ পরিবারের সদস্যদের নাম রয়েছে। সার ডিলার নিয়োগে মোটা অঙ্কের টাকা লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। তবে কোনো পক্ষই তা স্বীকার করেনি। অভিযোগ-২১ সেপ্টেম্বর অত্যন্ত গোপনে জেলা প্রশাসকের দপ্তরে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে তালিকা চূড়ান্ত হয়। এতে জেলা প্রশাসক, কৃষির উপপরিচালক ও জেলার তিনজন সংসদ-সদস্য উপস্থিত ছিলেন। এরপর কৃষি মন্ত্রণালয়ে তালিকা পাঠানো হয়।
জেলা প্রশাসনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, বিপুলসংখ্যক আবেদনকারী ছিলেন। প্রতিটি এলাকার জন্য তিনটি করে নাম মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। যাকে নিয়োগ দেওয়া হবে, তার নামের পাশে সংকেতপূর্ণ চিহ্ন দেওয়া হয়। তার নাম তালিকার ১নং সিরিয়ালে রাখা হয়। তিনজনের নাম পাঠানোটা ছিল আইওয়াশমাত্র। তিনি আরও জানান, তিন সংসদ-সদস্যের দেওয়া তালিকা থেকেই জেলায় সার ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু লটারির মাধ্যমে ডিলার নিয়োগের দাবি করে আসছিলেন আবেদনকারীরা। রাজনৈতিক চাপে নিয়োগ দেওয়ায় প্রকৃত ব্যবসায়ীরা বাদ পড়েছেন। যারা নিয়োগ পেয়েছেন, তাদের অধিকাংশের ব্যবসার অভিজ্ঞতা নেই। সার ডিলার নিয়োগে শতভাগ দলীয়করণ হওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। সার ডিলার নিয়োগে দলীয় সুপারিশ সম্পর্কে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রাজশাহীর উপপরিচালক ও জেলা সার বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব মোস্তফা কামাল হোসেন বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে আমি কোনো মন্তব্য করব না।’ এ ব্যাপারে কমিটির সভাপতিকে জিজ্ঞাসা করেন। তিনি আরও বলেন, উপজেলা সার বীজ মনিটরিং কমিটি যে তালিকা দিয়েছে সেটাই আমরা সার ডিলার সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে পাঠিয়েছি। রাজনীতিকরণ কীভাবে হলো, সেটি উপজেলা কমিটি বলতে পারবে। দলীয় ব্যক্তিদের সার ডিলার নিয়োগের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে জেলা সার বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলামকে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি কল ধরে কথা বলেননি। এমনকি হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠালেও তারা সাড়া দেননি। এ কারণে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
এদিকে তালিকা নিয়ে দ্বন্দ্বে বাগমারার ১৬টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভার সার ডিলার নিয়োগ আটকে দিয়েছেন রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনের জামায়াতের সংসদ-সদস্য আব্দুল বারী। তার এলাকায় দলীয় ব্যক্তিদের ডিলার নিয়োগ না করতে তিনি কৃষি সচিব ও অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে চিঠি দিয়েছেন। এ কারণে বাগমারায় ডিলার নিয়োগের তালিকা পাঠাতে পারেনি মন্ত্রণালয়ের কমিটি। জানা গেছে, আব্দুল বারী কৃষি মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সদস্য।
জানা যায়, জেলার চারঘাট সদর ইউনিয়নে সার ডিলার হিসাবে নিয়োগ পেয়েছেন আলিফ ট্রেডার্সের জিনিয়া পারভিন। তিনি উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক বুলবুল হোসেনের স্ত্রী। সরদহ ইউনিয়নে পেয়েছেন উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আলমগীর হোসেনের স্ত্রী ইসরাত জাহানের প্রতিষ্ঠান অথৈয় অ্যান্ড আরিয়া ট্রেডার্স। নিমপাড়া ইউনিয়নে দুর্জয় ট্রেডার্সের মালিক ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম। ইউসুফপুর ইউনিয়নে বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম রবিনের স্ত্রী সুরভি আক্তার শিখা। চারঘাটের বাকি ডিলারের সবাই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।
বাঘার মনিগ্রামে সারের ডিলার রুবেল ট্রেডার্সের মালিক রুবেল আলী জেলা বিপ্লবী দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক। পাকুড়িয়া ইউনিয়নে জিয়া এন্টারপ্রাইজের মালিক জিয়ারুল ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সদস্য। বাউসা ইউনিয়নে আতিক ট্রেডার্সের মালিক জোবাইদা খাতুন ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি আনোয়ার হোসেন পলাশের স্ত্রী। গড়গড়ি ইউনিয়নে রুহি এন্টারপ্রাইজের মালিক আব্দুল মমিন ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক। আড়ানী পৌরসভায় মেসার্স আসাদুজ্জামান ১নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি। বাঘা পৌরসভায় উপজেলা জিয়া পরিষদের সিনিয়র সহ-সভাপতি শফিকুল ইসলাম।
তানোর পৌরসভায় সার ডিলার নিয়োগ পেয়েছেন পৌর যুবদলের আহ্বায়ক এমদাদুল হক মণ্ডলের প্রতিষ্ঠান মেসার্স মণ্ডল এন্টারপ্রাইজ। মুন্ডুমালা পৌরসভায় মেসার্স বন্ধন এন্টারপ্রাইজের মালিক ফরহাদ কবির পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ কবিরের ভাই। কলমা ইউনিয়নে জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি প্রয়াত শীষ মোহাম্মদের ছেলে তানভীর আহমেদ। পাঁচন্দর ইউনিয়নে উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক গোলাম মোর্তুজার স্ত্রী উম্মুল মোমেনিন খানের প্রতিষ্ঠান মেসার্স অহনা টেডার্স। সরনজাই ইউনিয়নে মেসার্স শাহনেওয়াজ ট্রেডার্সের মালিক শাহনেওয়াজ ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমানের ছেলে। চাঁন্দুড়িয়ায় মেসার্স হাজী ট্রেডার্সের মালিক আলাউদ্দিন ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি। বাধাইড়ে মেসার্স মর্জিনা এন্টারপ্রাইজের মালিক সিদ্দিকা তামান্না উপজেলা যুবদলের সাবেক সহসভাপতি মামুনুর রশিদের স্ত্রী। কামারগাঁও ইউনিয়নে মেসার্স রাদিয়া অ্যাগ্রোর মালিক শরিফ উদ্দিন তানোর উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব। তালন্দ ইউনিয়নে মেসার্স বিসমিল্লাহ এন্টারপ্রাইজের মালিক ওমর ফারুক উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আব্দুল হান্নানের ছেলে।
পুঠিয়া উপজেলার বেলপুকুর ইউনিয়নে সারের ডিলার হয়েছেন মেসার্স আহসান ট্রেডার্সের মালিক ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আহসান হাবীব। শিলমাড়িয়া ইউনিয়নে মেসার্স ইসলাম এন্টারপ্রাইজের মালিক খাদেমুল ইসলাম উপজেলা বিএনপির সদস্য। পুঠিয়া সদরে নিয়োগ পাওয়া মেসার্স হিমেল টেডার্সের মালিক রিসাব হোসেন কেতাব ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক। জিউপাড়ায় মেসার্স সাঈদ ট্রেডার্সের মালিক মাহাবুর রহমান ইউনিয়ন কৃষক দলের সদস্য সচিব। বানেশ্বরে মেসার্স সরকার এন্টারপ্রাইজের মালিক জাকির হোসেন রাসেল স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সদস্য সচিব। পুঠিয়া পৌরসভায় মেসার্স ফারিশ ট্রেডার্সের মালিক সাহেদ হাসান রাজশাহী-৫ আসনের সংসদ-সদস্য নজরুল ইসলাম মণ্ডলের নাতজামাই। মোহনপুরের ঘাসিগ্রাম ইউনিয়নে সার ডিলার শাপলা ট্রেডার্সের মালিক উমর ফারুক বিএনপি সভাপতি আব্দুল মালেকের ছেলে। পবা উপজেলার পারিলা ইউনিয়নে মেসার্স ইপ্তি এন্টারপ্রাইজের মালিক নাঈম ওয়াসিফ উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে। হরিয়ানে মেসার্স ট্রেডার্সের মালিক আতিকুর রহমান উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আলী হোসেনের ছেলে।
গোদাগাড়ীর দেওপাড়ায় মেসার্স বিদ্যুৎ এন্টারপ্রাইজের মালিক বেদার উদ্দিন বিদ্যুৎ উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক। গোদাগাড়ী পৌরসভায় দুই ভাই ট্রেডার্সের মালিক আব্দুল্লাহ জামায়াতের কর্মী। বাসুদেবপুরে উপজেলা বিএনপি সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুল আলমের ভাই মাইনুল। গোদাগাড়ী ইউনিয়নে যুবদলের আহ্বায়ক শামীম রেজা ও রিশিকুলে ছাত্রদলের সভাপতি হোসেন আল মামুন।
কাকনহাট পৌরসভায় পৌর বিএনপির সেক্রেটারি হাবিবুর রহমান। দুর্গাপুরের ঝালুকায় উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কামরুজ্জামান আয়নালের ছেলে ওয়ালিউজ্জামান রওনক। দুর্গাপুর পৌরসভায় জেলা বিএনপির সদস্য ও সাবেক মেয়র সাইদুর মন্টুর ছেলে শাহ আলম সবুজ। জয়নগরে উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব জুবায়েদ হোসেনের ভাই সাইদুর রহমান। সার ডিলার নিয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী-৬ (চারঘাট-বাঘা) আসনের সংসদ-সদস্য আবু সাঈদ চাঁদ দাবি করেন-তারা কোনো তালিকা দেননি। প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে যাচাই-বাছাই করে উপযুক্ত ব্যক্তিকে নিয়োগ দিয়েছে।
মেহেরপুর
নিয়োগ পেয়েছেন নেতার ছেলে ভাই ভাতিজা
মেহেরপুরে নতুন ২২ জন সার ডিলার নিয়োগে দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যেই ক্ষোভ ও বিতর্ক শুরু হয়েছে। দলের জেলা কমিটির সভাপতি জাভেদ মাসুদ মিল্টন ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুল হাসানের অনুসারীরাই ডিলার নিয়োগ পেয়েছেন। নেতাদের ছেলে, ভাই, ভাতিজাসহ অনুসারীরা নিয়োগ পাওয়ায় বাদ পড়েছেন সাবেক সংসদ-সদস্য মাসুদ অরুণের অনুসারী এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীসহ প্রকৃত সার ব্যবসায়ীরা।
৭ অক্টোবর কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং কমিটির পত্রটি ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। অভিযোগ উঠেছে, তিন উপজেলা ও দুটি পৌরসভায় নিয়োগ পাওয়া ২২ জনের সবাই জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের অনুসারী। তাদের মধ্যে কয়েকজনের পরিবারের সদস্য ও নিকটাত্মীয়ও রয়েছেন। মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ আদেশে বলা হয়েছে, জেলা কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে এই সুপারিশের প্রক্রিয়া নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন বাদ পড়া নেতাকর্মী ও ব্যবসায়ীরা।
মেহেরপুর পৌরসভায় ডিলার নিয়োগ পেয়েছেন পৌর বিএনপির সভাপতি আব্দুল লতিফের ছেলে তানভির আহমেদের তানভির ট্রেডার্স। সদর উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নে উপজেলা বিএনপির সভাপতি ফয়েজ মহাম্মদের ভাই এনামুল হকের আনিকা ট্রেডার্স। আমদহ ইউনিয়নে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুল হাসানের ভাতিজা সাবিক হাসানের আর এস ট্রেডার্স। এছাড়া শ্যামপুরে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাহিদুল ইসলামের ছেলে সাইদ হোসেন অন্তরের এ আর এন্টারপ্রাইজ এবং বারাদিতে উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক লিয়াকতের স্ত্রীর ভাইয়ের প্রতিষ্ঠান বোন ট্রেডার্স। বুড়িপোতা ইউনিয়নে বিএনপি নেতা ফজলুর ছেলে মোহাম্মদ মামুনের মামুন ট্রেডার্স। আমঝুপিতে জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ওমর ফারুক লিটনের ইন্দো বাংলা এন্টারপ্রাইজ। পিরোজপুরে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আতিয়ার রহমানের বিশ্বাস ট্রেডার্স। মুজিবনগর উপজেলার দারিয়াপুরে ইয়াকুব আলীর ভাই ভাই অটো, মোনাখালীতে মেহেদী হাসানের কৃষক বন্ধু ট্রেডার্স, বাগোয়ানে রকিবুল ইসলামের নির্বামনি ট্রেডার্স এবং মহাজনপুরে আনোয়ার হোসেনের রানা ট্রেডার্স। গাংনী পৌরসভায় পেয়েছেন পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি ইন্সারুল হক ইন্সুর স্ত্রী রুমা খাতুন। কাথুলি ইউনিয়নে ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমের ভাতিজা স্বাধীন খানের স্বাধীন ট্রেডার্স। তেঁতুলবাড়িয়ায় ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম। কাজীপুরে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শাহাবদ্দিনের জে আর কাউন্টার। এছাড়া মঠমুড়ায় ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য সচিব মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলামের এন আর এন্টারপ্রাইজ, রায়পুরে উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আবদাল হোসেনের স্ত্রী শান্তিয়ারা খাতুনের হক ট্রেডার্স, ষোলটাকায় ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলামের কামরুল ট্রেডার্স এবং সাহারবাটিতে বিএনপি নেতা নাঈম মোবাশ্বের ডিলার নিয়োগ পেয়েছেন।
নিয়োগের তালিকা প্রকাশের পর বিএনপির নেতাকর্মীদের অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বিএনপি নেতা কাজী মিজান মেনন ফেসবুকে লিখেছেন-গত ১৭ বছর আন্দোলনে আমি ছিলাম ১ নম্বরে। সার ডিলারের তালিকায় আমি ছিলাম ১ নম্বরে, পাঁচ দিন যাবত প্রশাসনকে প্রচণ্ড চাপ দিয়ে আমাকে ২ নম্বরে করা হয়েছে, যা আমার বড় ভাই কামরুল গংয়ের কেরামতি।
জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ইকবাল হোসেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, স্বার্থ আর টাকার কাছে ত্যাগের কোনো মূল্য নেই। এবারের সার ডিলার নিয়োগ ইতিহাসের সেরা ন্যক্কারজনক ঘটনা। মেহেরপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নির্বাহী সদস্য আ ক ম আনোয়ারুল হক কালু বলেন, আমি সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির ব্যবসায়ী প্রতিনিধি হিসাবে সদস্য ছিলাম। কোনো কারণ ছাড়াই সেই কমিটি ভেঙে নতুন কমিটি করা হয়। যারা ডিলার হয়েছেন, তাদের বেশির ভাগেরই ব্যবসায়ী হিসাবে পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে স্বজনপ্রীতির চূড়ান্ত নজির সৃষ্টি করা হয়েছে।
মেহেরপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সদর উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি বাবলু সূত্রধর বলেন, কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তালিকা কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। মন্ত্রণালয় প্রাথমিকভাবে তিন মাসের জন্য তাদের নিয়োগ দিয়েছে। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুল হাসান বলেন, যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই ডিলার নিয়োগ হয়েছে। যারা পাননি, তারা এ নিয়ে নানা কথা বলবেনই। জেলা বিএনপির সভাপতি ও জেলা পরিষদের প্রশাসক জাভেদ মাসুদ মিল্টন বলেন, ডিলার নিয়োগের বিষয়টি কৃষি অফিস ও জেলা প্রশাসন ভালো বলতে পারবে। জেলা প্রশাসক ও জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি শিল্পী রানী রায় যুগান্তরকে বলেন, উপজেলা কমিটি যাচাই-বাছাই শেষে যে তালিকা পাঠিয়েছে, আমরা সেটি মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিলাম। তবে ডিলার নিয়োগ নিয়ে কেউ অভিযোগ করলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ-সদস্য ও জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা তাজউদ্দীন খান বলেন, সার ডিলার নিয়োগে শতভাগ দলীয়করণ করা হয়েছে। যাদের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা নেই, তাদেরও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিএনপির নেতারা নিজেদের মধ্যে সব ভাগবাঁটোয়ারা করে নিয়েছেন।
ডিমলা
কেউ ছাত্র, কেউ বহিষ্কৃত ছাত্রলীগ নেতা
স্বজনপ্রীতি ও অনিয়ম করে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় বিএনপির দুই নেতার ছেলেকে সরকারি সার ডিলার হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদের একজন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হামলা চালিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ হয়েছিলেন। আরেকজন বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে প্রভাব খাটিয়ে এ তালিকা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
গয়াবাড়ী ইউনিয়নে ডিলার হিসাবে নিয়োগ পেয়েছেন ‘মাবরুক বিজনেস সেন্টার’র স্বত্বাধিকারী মাবরুক আল ইসলাম জোয়াদ। তিনি নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) শাখার সাবেক সহসম্পাদক। তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার দায়ে জাবি থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কৃত হয়েছেন।
জানা যায়, মাবরুকের বাবা ডিমলা উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্য, উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও স্থানীয় শহীদ জিয়া ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মনোয়ার হোসেন।
এছাড়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম রাব্বানী প্রধানের ছেলে তানভির রাফসান হয়েছেন ডিমলা সদর ইউনিয়নের সার ডিলার। তিনি বতমানে খুলনা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র।
শুক্রবার রাতে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত সার ডিলার নিয়োগের চূড়ান্ত তালিকায় এ চিত্র দেখা গেছে। এর আগে বুধবার কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি এই ডিলার নিয়োগ অনুমোদন দেয়।
জানা যায়, মনিটরিং কমিটির সদস্যপদে থাকার সুযোগে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে মনোয়ার হোসেন প্রস্তাবিত তালিকার প্রথম সিরিয়ালে ছেলে মাবরুকের নাম এবং দ্বিতীয় সিরিয়ালে রাখেন আপন ভাগিনা চাল ব্যবসায়ী আবু তাহের সরকারের নাম। তাদের মধ্যে নিয়োগ পেয়েছেন মাবরুক।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, নীতিমালা অনুযায়ী গুদামের আয়তন, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা, আর্থিক সক্ষমতা ও অন্যান্য শর্ত সঠিকভাবে মূল্যায়ন না করেই প্রভাব খাটিয়ে ওই তালিকা অনুমোদন করানো হয়েছে।
মাবরুকের বিরুদ্ধে জাবিতে নিষেধাজ্ঞা ছাড়াও ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। ২০২৩ সালে জাবি ক্যাম্পাসে এক শিক্ষার্থীকে নির্মম নির্যাতন ও হত্যাচেষ্টা মামলার অন্যতম প্রধান আসামি তিনি।
গয়াবাড়ী ইউনিয়নের ডিলারশিপের জন্য ১০ ব্যবসায়ী আবেদন করেছিলেন। এরপর এমন নিয়োগে হতাশ স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। একাধিক ব্যবসায়ী বলেন, ‘যেখানে ছাত্র-জনতার ওপর হামলার অভিযোগে তিনি ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ ও মামলার আসামি, সেখানে তাকেই সরকারি সার বিতরণের দায়িত্ব দেওয়া হলো। ছাত্রলীগের প্রভাব এবং মনিটরিং কমিটিতে বাবা থাকার সুবাদেই অন্যায়ভাবে তাকে এই ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। আমরা অবিলম্বে এই নিয়োগ বাতিলের দাবি জানাচ্ছি।’ অভিযোগের বিষয়ে মনোয়ার হোসেন ও গোলাম রাব্বানী প্রধানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করেও তাদের মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে ডিমলার ইউএনও মো. ইমরানুজ্জামান বলেন, ‘সার ডিলার নিয়োগ কমিটির মাধ্যমে তালিকাগুলো আমাদের কাছে এসেছে। যোগ্য ব্যক্তিদের তালিকা পাঠানো হয়েছে। কারও রাজনৈতিকসংশ্লিষ্টতা আছে কি না, সে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেখছে। উপজেলা প্রশাসনের দায়িত্ব নেই তাদের রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই-বাছাই করা।’ নীলফামারী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোছা. হোমায়রা মণ্ডল জানিয়েছেন, ‘কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম বা ফৌজদারি অপরাধের সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ থাকলে তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। তদন্তসাপেক্ষে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’