Image description

ময়মনসিংহের গৌরীপুর থেকে মাকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে এসেছেন কলেজপড়ুয়া তওকীর। মহাখালীর ক্যান্সার হাসপাতালে ভর্তি তাঁর মা আসমা বেগম ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত।

আগে তিন মাস পর পর রক্তের প্রয়োজন হতো। এখন প্রায় প্রতি মাসেই রক্ত দিতে হচ্ছে। সর্বশেষ চিকিৎসকের কাছে আসার পর দ্রুত তিন ব্যাগ রক্তের ব্যবস্থা করতে বলা হয়। কোনো রকমে এক ব্যাগ জোগাড় করতে পেরেছিলেন তওকীর।
 
বাকি ছিল আরো দুই ব্যাগ।

ঢাকায় পরিচিতজনও খুব বেশি নেই তাঁর। একজনের পরামর্শে ফেসবুকের একটি রক্তদাতা গ্রুপে মায়ের জন্য রক্ত চেয়ে পোস্ট দেন তওকীর। পোস্টে রোগীর রক্তের গ্রুপ, হাসপাতালের নাম, ওয়ার্ড, প্রয়োজনীয় রক্তের পরিমাণ এবং যোগাযোগের নম্বর দেওয়া ছিল।

তওকীরের ভাষ্য, পোস্টটি দেওয়ার পর গুলজার নামের একজন তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে জানান, দুপুরের মধ্যেই তিনি রক্ত দিতে আসবেন। কিন্তু দুপুর ঘনিয়ে এলেও গুলজারের দেখা নেই। নির্ধারিত সময়ের আগে তওকীর তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। শুরুতে ফোনও ধরছিলেন না গুলজার। এক পর্যায়ে ফোন ধরলেও বদলে যায় তাঁর কথা।

গুলজার জানান, পকেটে টাকা না থাকায় দুপুর পর্যন্ত খাওয়াও হয়নি তাঁর। দুপুরের খাবার ও যাতায়াত খরচ বাবদ ৫০০ টাকা পাঠালে তিনি রক্ত দিতে আসতে পারবেন। টাকা না পেলে তাঁর পক্ষে আসা সম্ভব নয় বলে জানিয়ে দেন তিনি।

মায়ের জরুরি রক্তের প্রয়োজনের কথা ভেবে শেষ পর্যন্ত ৫০০ টাকা পাঠিয়ে দেন তওকীর। এর পরই তাঁর সঙ্গে গুলজারের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। তওকীর জানান, টাকা পাওয়ার পর তাঁকে ফেসবুকে ব্লক করে দেওয়া হয়।

তওকীরের কাছ থেকে গুলজারের মোবাইল নম্বর ও ফেসবুক গ্রুপের তথ্য নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে কালের কণ্ঠ। একই রোগীর স্বজন সেজে নতুন করে রক্ত চেয়ে একটি পোস্ট দেওয়া হয়। পোস্ট অ্যাপ্রুভ হওয়ার পরপরই একাধিক ব্যক্তি কমেন্ট করতে শুরু করেন এবং সেখানেও গুলজার নামের এক ব্যক্তির একটি কমেন্ট পাওয়া যায়। তাঁর ফোন নম্বর ও তওকীরের দেওয়া ফোন নম্বরের মিল পাওয়া যায়।

কালের কণ্ঠ প্রতিবেদক ছদ্মনামে গত বৃহস্পতিবার রাতে রক্তের জন্য গুলজারকে ফোন করলে তিনি রক্ত দিতে পারবেন এবং পরদিন (শুক্রবার) সকাল ৮টায় তাঁকে ফোন করতে বলেন। এরপর সকালে যথারীতি তাঁকে ফোন করে দেখা করতে চাইলে তিনি দুপুরে ফোন করতে বলেন। দুপুরে তাঁর দেওয়া ঠিকানায় যাওয়া হলে তিনি দেখা করতে অস্বীকৃতি জানান এবং যা বলার সব ফোনে বলতে বলেন।

শনিবার সকাল ১০টার দিকে অন্য আরেকটি নম্বর থেকে ভিন্ন পরিচয়ে কথা বলে রক্ত দিতে পারবেন কি না জানতে চাইলে তিনি সম্মতি জানান এবং দুপুরে খাবারের পরই তিনি হাসপাতালে আসবেন বলে জানান। এ সময় তিনি তাঁর পকেটে মাত্র ৪০ টাকা আছে জানিয়ে দুপুরের খাবার এবং ভাড়া বাবদ ৩০০ টাকা দাবি করেন। হাসপাতালে আসার পর এই টাকা দেওয়ার কথা বলা হলে গুলজার তাতে রাজি হননি। আগে বিকাশে টাকা পাঠানোর জন্য চাপাচাপি করতে থাকেন।

কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে ফেসবুকে এমনই সব প্রতারণার চিত্র উঠে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘রক্তের প্রয়োজন’ জানিয়ে দেওয়া পোস্টগুলোকে সম্ভাব্য শিকার বাছাইয়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে কিছু ব্যক্তি। প্রথমে নিজেকে রক্তদাতা পরিচয় দিয়ে আস্থা তৈরি, পরে দূরত্বের অজুহাতে যাতায়াত খরচ দাবি এবং সব শেষে বিকাশে অগ্রিম টাকা নেওয়ার চেষ্টা—একাধিক ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতারণার এমন কিছু অভিন্ন কৌশল পাওয়া গেছে। কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে গুলজার হোসেন ছাড়াও তরিকুল ইসলামসহ বেশ কিছু নাম-ছদ্মনাম ব্যবহার করা ব্যক্তিকে শনাক্ত করা গেছে।

সাংবাদিক নামধারী প্রতারক : অনুসন্ধানের শেষ পর্যায়ে গুলজারের পরিচয় সম্পর্কে জানতে চান প্রতিবেদক। তিনি নিজের নাম গুলজার বলে নিশ্চিত করেন। তাঁর ব্যাপারে প্রতারণার অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকতার পরিচয় দেন। তিনি বলেন, ‘আমিও একটু-আধটু সাংবাদিকতা করি।’ কোথায় সাংবাদিকতা করেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি দৈনিক একুশে বার্তার ক্রাইম রিপোর্টার।’

রক্ত দেওয়ার কথা বলে প্রতারণার কারণ জানতে চাইলে গুলজার তাঁর কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি। এক পর্যায়ে অশ্লীল ভাষায় গালাগাল করে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। এরপর একাধিকবার তাঁর নম্বরে কল করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।

কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে গুলজার নামের ওই ব্যক্তির একই ধরনের কার্যক্রমের আরো নজির পাওয়া গেছে। রক্তের প্রয়োজন জানিয়ে দেওয়া একাধিক পোস্টে তিনি রক্ত দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। ঢাকার পাশাপাশি ঢাকার বাইরের রোগীর পোস্টেও তাঁর এমন উপস্থিতির তথ্য পাওয়া যায়।

ডোনার এক, রোগী একাধিক : ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি এক রোগীর স্বজন শফিকুল ইসলামের অভিজ্ঞতাতেও একই ধরনের চিত্র উঠে এসেছে। নিজের পরিবারের একজনের জন্য ‘রক্তের প্রয়োজন’ পোস্ট দেওয়ার পর একজন ব্যক্তি রক্ত দেওয়ার আশ্বাস দেন। পরে শফিকুল ওই ব্যক্তির অন্যান্য কার্যক্রম দেখতে গিয়ে লক্ষ করেন, একই ব্যক্তি অন্য রোগীদের পোস্টেও একই আশ্বাস দিচ্ছেন।

একজন ডোনারের পক্ষে একই সময় একাধিক হাসপাতালে গিয়ে রক্ত দেওয়া বাস্তবে সম্ভব নয়। ফলে একই ব্যক্তি যদি একই সময় বহু রোগীর পোস্টে নিজেকে ‘ডোনার’ হিসেবে উপস্থাপন করেন, তাহলে সেটি স্বাভাবিক রক্তদানের আচরণ কি না—সে প্রশ্ন ওঠে।

শফিকুল ইসলাম আরো জানান, তাঁর এক আত্মীয়ের রক্ত প্রয়োজন হওয়ায় ফেসবুকে পোস্ট দেওয়া হয়েছিল। পরে রোগী মারা যান এবং অন্য একজনের মাধ্যমে রক্তের প্রয়োজন মিটে যায়। কিন্তু পুরনো পোস্টটি ফেসবুকে রয়ে যায়। পরদিনও বিভিন্ন নম্বর থেকে ফোন আসতে থাকে। কেউ জানান, তিনি রক্ত দিতে চেয়েছিলেন; এখন তিনি কুসিল্লা বা চট্টগ্রামে আছেন। তাঁর জরুরি টাকা দরকার। বিকাশে টাকা পাঠালে পরে ফেরত দেওয়ার কথাও বলেন কেউ কেউ।

আরমান হোসেন নামের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হয় কালের কণ্ঠের। প্রতারণার শিকার এই শিক্ষার্থী জানান, রোগীর জন্য ছয় ব্যাগ রক্ত প্রয়োজন হওয়ায় তিনি ফেসবুকে পোস্ট করেন। এরপর তরিকুল ইসলাম নামের একজন ফোন করে জানান, ছয়জন ডোনার নিয়ে তাঁরা হাসপাতালে আসবেন। তবে ছয়জনের যাতায়াত খরচ হিসেবে ছয় হাজার টাকা আগে পাঠাতে হবে।

রোগীর জীবন বাঁচানোর তাগিদে রোগীর স্বজন টাকা পাঠিয়ে দেন। এরপর কথিত ডোনাররা আর হাসপাতালে আসেননি। ফোন বন্ধ করে দেন। শেষ পর্যন্ত অন্য মাধ্যমে রক্ত সংগ্রহ করতে হয় তাঁকে।

এবার তরিকুল ইসলামের মুঠোফোন নম্বর ও তাঁর ফেসবুক আইডি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে কালের কণ্ঠ। রোগী সেজে কথা বললে তিনি রক্ত দিতে রাজি হন এবং আরো রক্ত লাগবে কি না জানতে চান। তিন ব্যাগ রক্তের চাহিদার কথা বললে তাঁর পরিচিত ব্লাড ব্যাংকে ডোনার আছে জানিয়ে তিনিও অগ্রিম এক হাজার টাকা দাবি করেন। পরে কথোপকথনে সাংবাদিক পরিচয় বুঝতে পেরে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে নম্বরটিও বন্ধ করে দেন এই প্রতারক।

‘টেস্ট ফি’ বাণিজ্যের ফাঁদ : ফেসবুকের প্রতারণা শুধু অগ্রিম টাকা নিয়ে ফোন বন্ধ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অনুসন্ধানে রক্তের প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে আরেকটি বড় বাণিজ্যিক বলয়ের তথ্যও সামনে এসেছে। রোগীকে ডোনার খুঁজে দেওয়ার কথা বলে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা ল্যাবে নিয়ে যাওয়া, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে অর্থ আদায় এবং দুর্লভ রক্তের সংকটকে পুঁজি করে বাড়তি টাকা নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

রক্তের প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ডোনার সংগঠনের কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ফেসবুকে রোগীর তথ্য পাওয়ার পর ডোনার দেওয়ার কথা বলে রোগীর স্বজনকে নিজেদের নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসা হয়। এরপর একের পর এক খরচ যোগ হতে থাকে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, কিছু প্রতিষ্ঠান ফেসবুকে ‘রক্ত প্রয়োজন’ পোস্ট দেখেই রোগীর স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে। বলা হয়, তাঁদের কাছে ডোনার আছে। তবে ডোনার পেতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে যেতে হবে। অফিসের ঠিকানা জানতে চাইলে সরাসরি ঠিকানা না দিয়ে নির্দিষ্ট পয়েন্টে এসে ফোন করতে বলা—এমন অভিজ্ঞতাও পেয়েছে কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানী দল।

রাজধানীর মগবাজার রেলগেটসংলগ্ন ‘লাইফ কেয়ার ফাউন্ডেশন’ নামের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে অফিসের সুনির্দিষ্ট ঠিকানা না দিয়ে রেলগেটের সামনে এসে ফোন করার কথা জানানো হয়। একই পোস্টে করা একাধিক কমেন্টের ছয়টি ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অনুসন্ধানে উঠে আসে।

একই সময় একটি রোগীর পোস্টে একাধিক ‘ডোনার’ কেন একই প্রতিষ্ঠানে রোগীর স্বজনকে যেতে বলছে? এমন সন্দেহে কিছু প্রশ্ন করা হলে তখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান।

কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানী টিমের পক্ষ থেকে রোগীর স্বজন সেজে ‘মগবাজার ব্লাড ফাউন্ডেশন’ নামের একটি সংগঠনের নাহিয়ান রাজ নামক এক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সেখানেও ‘টেস্ট বাণিজ্য’ ও কৌশলের চিত্রটি উন্মোচিত হয়।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি এক রোগীর জন্য জরুরি ‘বি পজিটিভ’ রক্তের প্রয়োজনে যোগাযোগ করা হয় মগবাজার ব্লাড ফাউন্ডেশনের ওই কর্মকর্তার সঙ্গে। রোগী ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি থাকার কথা জানানো হলে ওই ব্যক্তি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তাঁদের কোনো ডোনার হাসপাতালে গিয়ে রক্ত দেবে না। তিনি বলেন, ‘হাসপাতালে আমাদের কোনো ডোনার যায় না। ব্লাড ফাউন্ডেশন থেকে আপনি ডোনার পাবেন না, কিন্তু এভেলেবেল রক্তের ব্যবস্থা করে দিতে পারব আমরা।’

তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী, রোগীর একটু ব্লাড স্যাম্পল (রক্তের নমুনা) আর পেপার (কাগজপত্র) নিয়ে একজনকে মগবাজারে পাঠিয়ে দিতে হবে। অর্থাৎ মুমূর্ষু রোগীকে হাসপাতালে রেখে তাঁর স্বজনদের রক্তের স্যাম্পল ও কাগজপত্র নিয়ে ছুটতে হবে মগবাজারের সেই ব্লাড ফাউন্ডেশনে। এ সময় রক্ত নিতে কোনো আর্থিক লেনদেন করতে হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা রক্ত বিক্রি করি না এবং সরাসরি টাকা পয়সা নিই না। আপনি সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় রক্ত নিয়ে যেতে পারবেন। তবে রক্ত সঞ্চালনে কিছু খরচ করতে হবে।’

তবে রক্তের মূল্য না নিলেও রক্ত পরীক্ষার নাম করে বড় অঙ্কের ফি হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়টি তিনি নিজেই স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘শুধু টেস্ট করে, টেস্টের ফি যা আসে রেট অনুসারে।’ রক্তের স্যাম্পল তাঁদের ফাউন্ডেশনে নিয়ে যাওয়ার পর রক্ত ক্রস-ম্যাচিং বা স্ক্রিনিং করার খরচ বা ‘টেস্ট ফি’ বাবদ টাকা তাদের ফাউন্ডেশনেই পরিশোধ করতে হবে।

সময় অপচয় ও রক্ত সুরক্ষার চরম ঝুঁকি : চিকিৎসকদের মতে, রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা ও ক্রস-ম্যাচিং সাধারণত যে হাসপাতালে রোগী চিকিৎসাধীন থাকে, সেখানেই করা সবচেয়ে নিরাপদ ও বিজ্ঞানসম্মত। কিন্তু মগবাজার ব্লাড ফাউন্ডেশন, লাইফ কেয়ার ফাউন্ডেশনসহ এ জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকাণ্ড রোগীর জীবনকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ফারুক আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ঢাকা মেডিক্যাল থেকে একজন রোগীর স্বজন রক্তের স্যাম্পল নিয়ে মগবাজার যাতায়াত করতে এবং সেখানে টেস্টের রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করতে যে দীর্ঘ সময় লাগবে, তাতে মুমূর্ষু রোগীর প্রাণ সংশয় হতে পারে। এ ছাড়া হাসপাতাল চত্বরের বাইরে একটি অনিবন্ধিত ব্লাড ফাউন্ডেশনে রক্তের স্যাম্পল নিয়ে গিয়ে সেখানে পরীক্ষা করার মাধ্যমে সঠিক স্ক্রিনিং ও গুণগত মান বজায় থাকছে কি না, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন ওঠে।

রক্ত দেওয়ার বিনিময়ে টাকা না নেওয়ার ‘মহত্বের’ আড়ালে মূলত এই ব্লাড ফাউন্ডেশনগুলো রোগীদের জিম্মি করে নিজেদের ডেরায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে বাধ্য করছে এবং টেস্টের নামে আদায় করছে অর্থ। জরুরি প্রয়োজনে এ ধরনের ফাউন্ডেশনগুলোর ফাঁদ এড়িয়ে সরাসরি হাসপাতালের বৈধ ব্লাড ট্রান্সমিশন বিভাগ বা স্বীকৃত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

দুর্লভ গ্রুপ মানেই বাড়তি দাম : রক্তের গ্রুপভেদে এই অনানুষ্ঠানিক বাজারে দামের পার্থক্য তৈরি হয়—এমন অভিযোগও পেয়েছে কালের কণ্ঠ। বিশেষ করে নেগেটিভ  গ্রুপের ডোনার পাওয়া কঠিন হওয়ায় রোগীর স্বজনদের অসহায়ত্বকে কাজে লাগানো হয় বলে অভিযোগ করেছেন সন্ধানীর কর্মী ইশতিয়াক।

তাঁর দাবি, দুর্লভ নেগেটিভ গ্রুপের রক্তের জন্য রোগীর স্বজনদের কাছ থেকে প্রতি ব্যাগ রক্ত সাত থেকে আট হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তবে এই অর্থের বিনিময়ে প্রকৃত রক্তদাতাকে কত টাকা দেওয়া হয়, আর মধ্যস্বত্বভোগীর হাতে কত থাকে—এই প্রশ্নের উত্তরই এই ব্যবস্থার আর্থিক কাঠামো বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি জানান, জরুরি রক্তের পোস্টে রোগীর স্বজনরা সাধারণত হাসপাতালের নাম, ওয়ার্ড নম্বর, রক্তের গ্রুপ, রোগীর অবস্থা, কত ব্যাগ রক্ত প্রয়োজন এবং যোগাযোগের মুঠোফোন নম্বর দিয়ে থাকেন। মানবিক সহায়তা পাওয়ার জন্য এসব তথ্য প্রয়োজনীয় হলেও একই সঙ্গে এগুলো ওৎ পেতে থাকা প্রতারকের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ‘টার্গেট প্রোফাইল’ তৈরি করে। কোন রোগী কতটা জরুরি অবস্থায় আছে, কত ব্যাগ রক্ত দরকার, পরিবারটি ঢাকার বাইরে থেকে এসেছে কি না—এসব তথ্য দেখেই প্রতারক বুঝতে পারে, কোথায় চাপ প্রয়োগ করলে দ্রুত টাকা পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

ইশতিয়াক আরো জানান, ঢাকার বাইরে থেকে চিকিৎসা নিতে আসা পরিবারগুলোকে সহজ টার্গেট হিসেবে দেখার অভিযোগ রয়েছে। কারণ, ঢাকায় পরিচিতজন না থাকলে ফেসবুকই হয়ে ওঠে তাদের প্রধান ভরসা। ফলে অপরিচিত একজন ব্যক্তি ‘আমি রক্ত দেব’ বললেই তাঁকে বিশ্বাস করার প্রবণতা তৈরি হয়।

রক্তের এই ব্যবসার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর হাসপাতালকেন্দ্রিক দালালচক্র। ইশতিয়াকের বর্ণনায়, হাসপাতালের গাইনি ওয়ার্ডের আশপাশে এমন ব্যক্তিদের দেখা যায়, যাঁরা রোগীর স্বজনের রক্তের প্রয়োজনের কথা শুনেই এগিয়ে আসেন। তাঁর অভিযোগ, রোগীর স্বজনকে সরকারি ব্লাড ট্রান্সফিউশন বিভাগে যাওয়ার পরিবর্তে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। কখনো ‘এখানে রক্ত নেই’, কখনো ‘ওখানে দ্রুত পাওয়া যাবে’, আবার কখনো ‘আমাদের ডোনার আছে’—এ ধরনের কথায় রোগীর স্বজনকে প্রভাবিত করা হয়।

রক্তের মান নিয়ে প্রশ্ন : এই অনুসন্ধানে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি এসেছে রক্তের মান নিয়ে। সন্ধানীর কর্মী ইশতিয়াক দাবি করেছেন, দালালদের নিয়ন্ত্রিত কিছু উৎস থেকে সরবরাহ করা রক্তের ব্যাগে রক্তের সঙ্গে স্যালাইন মিশিয়ে ব্যাগ পূর্ণ করার অভিযোগও তাঁদের কাছে এসেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অর্ধেক রক্ত ও অর্ধেক স্যালাইন দিয়ে ব্যাগ পূর্ণ করার অভিযোগও রয়েছে।

সংগৃহীত রক্তের প্রতিটি ইউনিটকে নির্দিষ্ট সংক্রমণের জন্য স্ক্রিনিং করে নিরাপদ হিসেবে চিহ্নিত করার পরই ক্লিনিক্যাল ব্যবহারের জন্য ছাড়ার কথা আন্তর্জাতিক নির্দেশনায় বলা হয়েছে। বাংলাদেশেও ২০০২ সালের একটি আইনের আওতায় পাঁচ ধরনের সংক্রমণের স্ক্রিনিং বাধ্যতামূলক করা হয়েছে—এইচআইভি, হেপাটাইটিস-বি, হেপাটাইটিস-সি, সিফিলিস ও ম্যালেরিয়া।

চিহ্নিত করতে হবে মধ্যস্বত্বভোগী : রক্তের বাজারে মধ্যস্বত্বভোগী যত দিন থাকবে, তত দিন রক্তের সংকটকে পুঁজি করে নতুন নতুন প্রতারণার পথও তৈরি হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাই প্রতারণা বন্ধের প্রথম ধাপ হওয়া উচিত মধ্যস্বত্বভোগী চিহ্নিত করা; এ ছাড়া তাদের অর্থনৈতিক লেনদেনের পথ মনিটরিং করা এবং রোগী-ডোনারের মাঝখানে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা তৈরি করা উচিত বলেও মনে করেন তাঁরা।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ডা. নাজিরুম মুবিন কালের কণ্ঠকে বলেন, রক্তের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিরাপত্তা। একজন রোগীর স্বজন যখন জরুরি রক্তের জন্য ছোটাছুটি করেন, তখন তাঁর সামনে মূল লক্ষ্য থাকে দ্রুত রক্ত সংগ্রহ করা। এই তাড়াহুড়ার সুযোগেই মধ্যস্বত্বভোগীরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারা কখনো নিজেকে রক্তদাতা হিসেবে উপস্থাপন করে, কখনো ডোনার এনে দেওয়ার কথা বলে, আবার কখনো নির্দিষ্ট কোনো জায়গা থেকে রক্ত সংগ্রহ করতে রোগীর স্বজনকে প্রভাবিত করে। ফলে রোগী ও প্রকৃত রক্তদাতার মাঝখানে একটি অস্বচ্ছ স্তর তৈরি হয়।

তিনি বলেন, রক্ত কোনো সাধারণ পণ্য নয় যে এর উৎস বা মান যাচাই না করেই শুধু প্রয়োজনের সময় কিনে নিলাম। রক্ত সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরীক্ষা এবং রোগীর শরীরে দেওয়ার প্রতিটি ধাপের সঙ্গে চিকিৎসাগত নিরাপত্তা জড়িত। তাই কে রক্ত দিলেন, কোথা থেকে রক্ত এলো, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা হয়েছে কি না এবং সেটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকা জরুরি।

রিদম ব্লাড ব্যাংকের পরিচালক ডা. আবদুল্লাহ আল মামুন কালের কণ্ঠকে বলেন, রক্তের সংকটকে কেন্দ্র করে যে ব্যবসা তৈরি হয়েছে, সেখানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য। একজন রোগীর স্বজন রক্তের জন্য যখন হাসপাতাল থেকে বের হন, তখন তিনি আসলে জানেন না কোথায় গেলে নিরাপদ রক্ত পাবেন। এই দুর্বলতার সুযোগ নেয় একটি শ্রেণি। তারা রোগী ও প্রকৃত রক্তদাতার মাঝখানে ঢুকে পড়ে। কেউ ডোনার জোগাড় করে দেওয়ার কথা বলে টাকা নেয়, কেউ যাতায়াত খরচের নামে টাকা নেয়, আবার কেউ রোগীকে নির্দিষ্ট ব্লাড ব্যাংক বা ল্যাবে নিয়ে যায়। ফলে রক্তের প্রকৃত মূল্য নয়, রোগীর অসহায়ত্বই হয়ে ওঠে তাদের ব্যবসার মূলধন।

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের দেশে স্বেচ্ছায় রক্তদানের সংস্কৃতি আরো শক্তিশালী করতে হবে। একজন রোগী যাতে ফেসবুকে অপরিচিত ব্যক্তির কমেন্টের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য না হন, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রক্তদাতা পরিচয় দেওয়া ব্যক্তিদের যাচাইয়ের একটি কার্যকর ব্যবস্থা থাকা দরকার।’

বড় প্রয়োজন স্বেচ্ছাসেবীর : রক্তদাতাদের মোটামুটি তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়—নিয়মিত স্বেচ্ছাসেবী, অকেশনাল বা প্রয়োজনভিত্তিক দাতা এবং পেশাদার রক্তদাতা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মোট রক্তদাতার প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ নিয়মিত স্বেচ্ছাসেবী। প্রায় অর্ধেক অকেশনাল—অর্থাৎ আত্মীয়-স্বজন বা পরিচিত কারো প্রয়োজনে রক্ত দেন। আর প্রায় এক-চতুর্থাংশের ক্ষেত্রে অর্থের বিনিময়ে রক্ত দেওয়ার প্রবণতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এই হিসাবের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, দেশের প্রয়োজনের তুলনায় নিয়মিত স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতার সংখ্যা এখনো কম। ফলে কোনো পরিবার যখন জরুরি অবস্থায় পড়ে, তখন তাকে নতুন করে ডোনার খুঁজতে হয়। সেই খোঁজের জায়গাটি দখল করে নিচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম।

রক্ত সঞ্চালন খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নিয়মিত স্বেচ্ছাসেবী ডোনারের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করা গেলে অপরিচিত ডোনারের ওপর রোগীর নির্ভরতা অনেকটাই কমে যাবে।

ডা. মামুনের প্রস্তাব, ১৮ থেকে ৬৫ বছর বয়সী রক্তদানে সক্ষম জনগোষ্ঠীর মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ মানুষ নিয়মিত স্বেচ্ছায় রক্তদান করলেই দেশের বার্ষিক প্রয়োজনের বড় অংশ পূরণ করা সম্ভব। অর্থাৎ সমাধানটি কেবল নতুন নতুন ফেসবুক গ্রুপ তৈরি করা নয়; বরং রক্তের প্রয়োজন হওয়ার আগেই ডোনার তৈরি করা।

ঘাটতিই প্রতারণার বড় সুযোগ : রক্ত সঞ্চালন খাতের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যে, বাংলাদেশে বছরে রক্তের প্রয়োজন প্রায় ১৫ লাখ ব্যাগ। এর বিপরীতে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে আনুমানিক ছয় থেকে আট লাখ ব্যাগ। ফলে বিপুল একটা ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।

এই ঘাটতির সময়ই সবচেয়ে বেশি রোগীর স্বজনরা বিপদে পড়েন বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হসপিটাল সার্ভিসেস ম্যানেজমেন্টের সাবেক লাইন ডিরেক্টর ডা. মো. জয়নাল আবেদীন টিটো। তিনি জানান, বিশেষ করে অস্ত্রোপচার, প্রসূতির জটিলতা, দুর্ঘটনা, ক্যান্সার চিকিৎসা কিংবা ডেঙ্গুতে প্লাটিলেটের প্রয়োজন হলে পরিবারকে দ্রুত ডোনার খুঁজতে হয়। পরিচিতজনদের ফোন করে ডোনার না পেলে শেষ ভরসা হয়ে ওঠে ফেসবুক। আর এখানেই প্রতারকের প্রবেশের সুযোগ।