বাবা-মা আদর-ভালোবাসা থেকে সন্তানের হাতে যে চকলেট, জুস, ললিপপ কিংবা আইসক্রিম তুলে দিচ্ছেন- তার বড় অংশই বিষাক্ত পদার্থ দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে। এগুলো তৈরি হচ্ছে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে, নিম্নমানের কাঁচামাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিক দিয়ে। কোনো ক্ষেত্রে কাপড়ের রং দিয়ে তৈরি হচ্ছে শিশুখাদ্য, আবার কোনো ক্ষেত্রে ডিটারজেন্ট, তেল ও অন্যান্য রাসায়নিক মিশিয়ে তৈরি হচ্ছে নকল দুধ। শুধু তাই-ই নয়, এগুলোর অনুমোদন না থাকলেও পণ্যের মোড়কে বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে বিএসটিআইয়ের লোগো। ফলে এরকম খাবার হয়ে উঠেছে জীবনের জন্য গুরুতর হুমকি। এসব খাওয়ার কারণে নষ্ট করে দিচ্ছে কিডনি, লিভারসহ শরীরের নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ।
একই সঙ্গে এগুলো কমিয়ে দিচ্ছে শিশুদের বুদ্ধিমত্তা ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও। রাজধানীর বিভিন্ন মুদি ও মনোহরি দোকানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ম্যাংগো পুডিং, লিচি পুডিং, লিচি জেলি, লিচি ড্রিংস, আইবল, চকো চকোসহ হরেক রকম শিশুখাদ্য বিক্রি হচ্ছে। একটি মাফিন কেকের মেয়াদ আট মাস, আবার কোনো খাবারের মেয়াদ আজীবন। দেখা গেছে, অনেক পণ্যে নেই উপকরণের তথ্য, উৎপাদনের মেয়াদ বা উৎপাদনকারীর পরিচিতি। আবার কিছু পণ্যে কোম্পানির ঠিকানা থাকলেও বাস্তবে তার অস্তিত্ব নেই। ভ্যানে ফেরি করে দোকানে দোকানে এসব বিপজ্জনক ক্যাডবেরি, ডেইরি মিল্ক, ¯িœকার্স, কিটক্যাটসহ বিদেশি সব ব্র্যান্ডের চকলেট সরবরাহ করা হচ্ছে।
স্বাদ ও আকর্ষণীয় ডিজাইনের কারণে সহজেই শিশুরা এসব জিনিসপত্রের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর অলিগলিতে গড়ে উঠেছে ভেজাল শিশুখাদ্য তৈরির কারখানা। ভেজাল পণ্যের একটা বড় অংশ আসে পুরান ঢাকা ও টঙ্গী এলাকা থেকে। চকবাজার, লালবাগ, কামরাঙ্গীরচর, সোয়ারীঘাট, কেরানীগঞ্জ, সাভার, গাবতলী, ডেমরা এলাকায় গড়ে উঠেছে শত শত নকল খাবারের কারখানা। সবচেয়ে বেশি ভেজাল ও নকল হচ্ছে শিশুখাদ্য। মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে এসব অসাধু ব্যবসায়ীদের ধরে নামমাত্র জরিমানা বা কারাদন্ড দেওয়া হলেও পরে তারা আবারও একই কাজে লিপ্ত হচ্ছে। গত মাসের ৫ থেকে ১৮ তারিখ পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে সারা দেশে মাত্র ২০টি প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক জরিমানা করা হয় বলে জানা গেছে।
যার মধ্যে ১১টিই খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। তবে মাঠের তথ্য বলছে, সারা দেশের প্রতিটি মুদি ও মনোহরি দোকানেই বিক্রি হচ্ছে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের ক্ষতিকর উপাদানে তৈরি নকল ও ভেজাল খাদ্যপণ্য। এর মধ্যে অধিকাংশই শিশুদের খাদ্যপণ্য। জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, জীবন বাঁচাতে কেনা খাবারই হয়ে উঠছে জীবনের জন্য হুমকি। নষ্ট করে দিচ্ছে কিডনি, লিভারসহ শরীরের নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। এজন্য ভেজাল খাদ্য উৎপাদনকারীদের যাবজ্জীবন পর্যন্ত শাস্তি হওয়া উচিত। এ ব্যাপারে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, অস্বাস্থ্যকর খাবারের কারণে বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ব্রেইন স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাকের মতো অসংক্রামক রোগগুলো বেড়ে যাচ্ছে। এজন্য প্যাকেটজাত খাদ্যপণ্যের ব্যাপারে একটা আইন (ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং-এফওপিএল) করতে যাচ্ছি। এটা হলে অতিরিক্ত মাত্রায় চিনি, লবণ ও ফ্যাট থাকলে তা প্যাকেটে লিখে দিতে হবে।
ক্রেতারা দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন। তিনি বলেন, আমাদের পাশাপাশি সরকারের আরও কয়েকটি সংস্থা নকল ও ভেজাল খাবারের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। বর্তমানে অভিযান আরও বাড়িয়েছি। অভিযানের পাশাপাশি আমরা সচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিচ্ছি। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই)-এর পরিচালক (সিএম) মো. আলাউদ্দিন হুসাইন বলেন, সরকার ৩৩৫টি পণ্য আমদানি, বিক্রয় ও বিতরণের ক্ষেত্রে গুণগত মান পরীক্ষা করে বিএসটিআইয়ের সিএম লাইসেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক করেছে। এর মধ্যে ১২৬টি খাদ্যপণ্য রয়েছে।
লাইসেন্স ছাড়া লোগো ব্যবহার দন্ডনীয় অপরাধ। এ অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে মামলা ও জেল-জরিমানার বিধান রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, ভেজাল নিয়ন্ত্রণে বিএসটিআই সারা দেশে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছে। এজন্য শুধু ঢাকাতেই তিনজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করছেন। দৈনিক দুটি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে, অপরাধ পেলেই জেল-জরিমানা করা হচ্ছে। বিভিন্ন স্থানের খন্ডচিত্র : রাজধানীর পাশাপাশি অন্যান্য জেলা-উপজেলা ও মফস্বলেও বাড়ছে নকল ও ভেজাল খাদ্য তৈরির কারখানা। আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো প্রতিবেদনের আলোকে তার খি ত চিত্র তুলে ধরা হলো-
কেরানীগঞ্জে ঘরে ঘরে কারখানা : কেরানীগঞ্জের জিনজিরা, কালিন্দী, রোহিতপুর, শাক্তা, ইকুরিয়া ও পারগেন্ডারিয়া এলাকায় বসতঘর ও টিনশেড স্থাপনাতেই তৈরি হচ্ছে চকলেট, জুস, ললিপপ, সুজি, ট্যাং, গ্লুকোজ, পুডিং, ক্যান্ডি, আচার, পাপড়ি ও চিপসসহ নানা পণ্য। ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহার করে তৈরি এসব পণ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে ভুয়া মেয়াদ, লাইসেন্স নম্বর ও বিএসটিআইয়ের লোগো। কেরানীগঞ্জ থেকে এসব পণ্য প্রথমে চকবাজার ও অন্যান্য পাইকারি বাজারে যায়। পরে ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে।
সাভারে নকল শিশুখাদ্যের কারখানা : সাভারের আড়াপাড়া, হেমায়েতপুর, আশুলিয়া, বিরুলিয়া, ধামসোনা ও আমিনবাজার এলাকায় রয়েছে শতাধিক ছোটবড় খাদ্য কারখানা। এর মধ্যে কিছু কারখানা যথাযথ লাইসেন্স ও মান নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই চলছে। সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, জনবল সংকটের কারণে নিয়মিত অভিযান চালানো কঠিন; তবে শিগগিরই বড় অভিযান চালানো হবে।
দুধের নামে ‘সাদা বিষ’: যশোরের কেশবপুরে লিকুইড গ্লুকোজ, খাবার সোডা ও চিনি মিশিয়ে নকল দুধ তৈরির অভিযোগে একটি কারখানায় তিনবার অভিযান চালিয়েও লাভ হয়নি। পরে ছয়জনকে ছয় মাস করে কারাদন্ড দেওয়া হয়। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া ও শাহজাদপুরেও সামান্য আসল দুধের সঙ্গে সয়াবিন তেল, সোডা, চিনি, পানি ও অন্যান্য রাসায়নিক মিশিয়ে নকল দুধ তৈরির অভিযোগ রয়েছে। এসব দুধ বিভিন্ন দুগ্ধজাত পণ্যের কারখানা ও মিষ্টির দোকানে সরবরাহ করা হচ্ছে। পাবনার ভাঙ্গুড়া, চাটমোহর ও ফরিদপুরেও চলছে রাসায়নিক মিশিয়ে নকল দুধ তৈরির কারবার। ননী তুলে নেওয়া ৪০ লিটার দুধের পানির সঙ্গে ৪৫০ টাকার কেমিক্যাল মিশিয়ে তা দুধ হিসেবে বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ২০০ টাকায়। খামারিদের অভিযোগ, তিন উপজেলার সাড়ে ১৭ হাজারের বেশি খামারি দিনে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ লিটার খাঁটি দুধ উৎপাদন করলেও অসাধু চক্রের কারণে ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।
মেয়াদোত্তীর্ণ শিশুখাদ্য বাজারে : যশোরের পুলেরহাটে ২৪ আগস্ট তানসীপ ট্রেডার্সের গোডাউনে ২০২৫ সালে মেয়াদোত্তীর্ণ জুস, ম্যাংগো বারসহ বিভিন্ন শিশুখাদ্য পাওয়া যায়। একই সঙ্গে ছিল নকল ডিশ ওয়াশ ও টয়লেট ক্লিনারসহ বিভিন্ন পণ্য।। এর আগে যশোরের একটি কারখানায় নামিদামি ব্র্যান্ডের বোতলে নকল ভিক্সল, টাইলস ক্লিনার, গ্লাস ক্লিনার ও হ্যান্ডওয়াশ তৈরির প্রমাণ মেলে। আরেক প্রতিষ্ঠানে ভুসি ও কেমিক্যাল ব্যবহার করে সয়াবিন বড়ি তৈরিও ধরা পড়ে। গত ২২ সেপ্টেম্বর মনিরামপুরের একটি বেকারিতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে পাউরুটি তৈরি এবং পরিচিত ব্র্যান্ডের আদলে মোড়ক ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। পণ্যে উৎপাদন, মেয়াদ ও মূল্যও উল্লেখ ছিল না।
দেশজুড়ে একই চিত্র : চট্টগ্রামে গত ১৯ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের অভিযানে ভেজাল, পচাবাসি ও নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করে খাদ্য উৎপাদন ও বিক্রির অভিযোগে কেএফসি, হাইওয়ে সুইটস, ফুচকা খাদক, গ্রিল মাস্টার অ্যান্ড পাপাচিনো, দিল্লি দরবার অ্যান্ড সালাদ লাভার্স, চিলিস, হটডগ অ্যান্ড কোং, দ্য চিকেন বক্সসহ ১৯টি নামিদামি প্রতিষ্ঠানকে ৯ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। অভিযানে গন্ধযুক্ত পচা মাংস ও পচা সবজি দিয়ে খাবার তৈরি, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য দিয়ে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে খাদ্য প্রস্তুত, মাংসের সঙ্গে বরফ তৈরিসহ নানা অনিয়ম পাওয়া যায়।
বগুড়ায় জিলাপিতে ক্ষতিকর রাসায়নিক ও খাবারে অননুমোদিত রং ব্যবহারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। চলতি মাসেও বেকারি, কাচ্চি ও চানাচুর কারখানায় অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হয়েছে। রাজশাহীতে অভিযান চালিয়ে ভেজাল গুড়, মানহীন বেকারি পণ্য, অনুমোদনহীন পানি ও নকল প্রসাধনীর অনেক প্রতিষ্ঠান পাওয়া গেছে। সেখানে চিনি, চুন, ডালডা, আটা, কাপড়ের রং ও ফিটকিরি দিয়ে গুড় তৈরি করতে দেখা গেছে। নারায়ণগঞ্জে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অভিযানে নকল, ভেজাল, অনুমোদনহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্যের অভিযোগে ১১টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের নারায়ণগঞ্জ জেলা সহকারী পরিচালক হৃদয় রঞ্জন বণিক বলেন, নিয়মিত অভিযান চললেও জেলায় খাদ্য পরীক্ষার কোনো গবেষণাগার না থাকায় তাদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।