Image description

দেশের বেসরকারি খাতে একের পর এক সংকোচনের চিত্র ফুটে উঠছে। গত ৩৩ বছরের মধ্যে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমেছে সর্বনিম্ন পর্যায়ে।

অন্যদিকে গত দুই মাসে ব্যাবসায়িক কর্মকাণ্ডের সূচক সর্বাধিক সংকুচিত হয়েছে। এর সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে উৎপাদন শিল্পে। উৎপাদন, কাঁচামাল আমদানি সবই কমছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, উচ্চ সুদহার, খেলাপি ঋণের চাপ ও ব্যাবসায়িক অনিশ্চয়তা।
 
সব মিলিয়ে দেশের বেসরকারি অর্থনীতির গতি হারানোর চিত্র আরো স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

অর্থনীতির যে খাত দীর্ঘদিন প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের প্রধান চালিকাশক্তি, সেই বেসরকারি খাত এখন নতুন বিনিয়োগের পরিবর্তে বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখতেই হিমশিম খাচ্ছে।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা সতর্ক করছেন, দ্রুত উন্নতি না হলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে চাপ আরো বাড়বে, যা সামাজিক অস্থিরতা তৈরির পাশাপাশি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনও কঠিন করে তুলতে পারে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপিতে বেসরকারি বিনিয়োগের অংশ দাঁড়িয়েছে ২১.৫৩ শতাংশ, যা ১৪ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

অথচ দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৯৩ থেকে ৯৫ শতাংশ আসে এই খাত থেকে। তাই বেসরকারি খাত রুগ্ণ হয়ে পড়লে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে অনিশ্চয়তা বাড়বে।

উৎপাদনে সবচেয়ে বড় ধাক্কা

ঢাকা মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) এবং পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের (পিইবি) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুসারে, আগস্টের ৪৯.৯ থেকে সেপ্টেম্বরে হেডলাইন পিএমআই ১.৩ পয়েন্ট কমে ৪৮.৬-এ নেমে এসেছে, যা টানা দ্বিতীয় মাসের সংকোচনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সেপ্টেম্বরে উৎপাদন খাতে সবচেয়ে বড় অবনতি দেখা গেছে, এর সূচক ২.৬ পয়েন্ট কমে ৪৪.৮-এ নেমে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘নতুন রপ্তানি অর্ডার, উৎপাদন, কাঁচামাল ক্রয় ও তৈরি পণ্যের মজুদ এবং আমদানি আরো দ্রুত হারে সংকুচিত হতে থাকে।

বকেয়া অর্ডারের পরিমাণ ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। অন্যদিকে সরবরাহকারীদের পণ্য সরবরাহের সময় ধীরগতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে।’

তবে কর্মসংস্থান সামান্য সম্প্রসারণে ফিরে আসে, অন্যদিকে উপকরণের দাম বাড়তে থাকে। আগস্টে সম্প্রসারণের পর নির্মাণ খাত পুনরায় সংকুচিত হওয়ায় তা ৩.৮ পয়েন্ট কমে ৪৮.৫ পয়েন্টে নেমে এসেছে।

টানা দ্বিতীয় মাসেও পরিষেবা খাতে সামান্য সংকোচন দেখা গেছে, এর সূচক ০.২ পয়েন্ট কমে ৪৯-এ দাঁড়িয়েছে। কৃষিই একমাত্র সম্প্রসারণশীল খাত হিসেবে রয়ে গেছে, যা তার প্রবৃদ্ধির ধারাকে ১৩ মাস পর্যন্ত প্রসারিত করেছে।

এই পরিস্থিতিকে উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ সক্ষমতা ও আস্থার সংকটের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। তাঁরা বলছেন, উচ্চ সুদহার, মূল্যস্ফীতি, খেলাপি ঋণের চাপ, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং ব্যাবসায়িক অনিশ্চয়তায় নতুন বিনিয়োগে ঝুঁকি নিতে চাইছেন না অনেক উদ্যোক্তা।

ব্যবসায়ী নেতাদের উদ্বেগ

ব্যবসায়ী নেতা ও ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. ফজলুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বেসরকারি খাতের এই পতন এবং উৎপাদনে স্থবিরতা দেশের অর্থনীতির জন্য মোটেও ভালো খবর নয়। এই সংকট থেকে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানো জরুরি। সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও ক্যাপিটাল মেশিনারি (মূলধনী যন্ত্রপাতি) ও কাঁচামাল আমদানি আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। এগুলো সরাসরি নির্দেশ করে যে ভবিষ্যতে শিল্প উৎপাদন আরো হ্রাস পাবে। এ ছাড়া বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ব্যাংকঋণের সুদের হার কমিয়ে ৫ শতাংশ করলেও এই মুহূর্তে বিনিয়োগ হঠাৎ বাড়বে না, কারণ সার্বিক পরিস্থিতির কারণে ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিনিয়োগের মানসিকতা বা অনুকূল মেজাজ নেই।’

তিনি বলেন, ‘নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তারা আমলাতান্ত্রিক জটিলতার প্রতি চরম বিমুখ। তাই প্রশাসনিক প্রক্রিয়া দ্রুত সহজ করতে হবে। পাশাপাশি সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের আন্তরিকতার সঙ্গে নীতি বাস্তবায়নে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি।’

ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক এবং বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশের অর্থনীতির গতি আরো শ্লথ হওয়ার যে তথ্য উঠে এসেছে, তা কোনো কল্পিত বিষয় নয়, বরং দেশের সামগ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যের বর্তমান বাস্তবতারই নিখুঁত প্রতিফলন।’

তিনি বলেন, ‘অর্থনীতির চলমান গতি-প্রকৃতি ও প্রধান প্রধান সূচক গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে এটি অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই যে আমাদের জাতীয় অর্থনীতি এখন কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় গতিশীল অবস্থায় নেই। ব্যবসায়ীরা অত্যন্ত যৌক্তিকভাবেই মনে করছেন যে এই প্রতিকূল পরিবেশে নতুন করে অর্থ বিনিয়োগ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।’

বেসরকারি খাতে ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ঋণ প্রবৃদ্ধি

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪.৪৭ শতাংশ। মে মাসে এই হার ছিল ৪.৯৮ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ১৯৯৩ সালের পর এটিই সবচেয়ে কম ঋণ প্রবৃদ্ধি।

এর আগে চলতি বছরের মার্চে প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছিল ৪.৭২ শতাংশে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮ শতাংশ, যা অর্জিত হয়নি।

বেসরকারি ঋণের পাশাপাশি বিনিয়োগের চিত্রও আশাব্যঞ্জক নয়। সরকারের সংশোধিত হিসাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২১.২২ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। নতুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এই হার মাত্র ২১.৩৩ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ এক বছরে বেসরকারি বিনিয়োগে বড় ধরনের উল্লম্ফনের প্রত্যাশা করছে না সরকার।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ অংশ কমে যাওয়া বেশ উদ্বেগজনক। বেসরকারি খাত কয়েক দশক ধরে প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত। এই পরীক্ষিত চালিকাশক্তি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।’

গত চার অর্থবছরে বাংলাদেশের মূলধনী যন্ত্রপাতি, চিকিৎসাসামগ্রী, যানবাহন ও ভারী সরঞ্জাম আমদানি কমেছে প্রায় ৪৫.১ শতাংশ। এই সময়ে লক্ষণীয় ধীরগতি দেখা গেছে দেশের শিল্প প্রবৃদ্ধিতেও।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুসারে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৮.১৮ শতাংশ। কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে ৩.৭১ শতাংশে নেমে আসে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই হার (সাময়িক) আরো কমে ২.৮৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

ব্যাংক খাতে তারল্য ও ঋণ সংকট

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ ছিল প্রায় দুই লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বিপুল পরিমাণ তারল্য থাকা সত্ত্বেও সেই অর্থ উৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত হচ্ছে না।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩৫.৭৩ শতাংশে। একই সঙ্গে ২৩টি ব্যাংক প্রায় তিন লাখ কোটি টাকা মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংকিং খাতের পুনর্গঠনে জিডিপির অন্তত ১০ শতাংশ প্রয়োজন হবে।

সরকারের ব্যাংক থেকে ঋণগ্রহণ বেড়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে সরকার। চলতি অক্টোবর মাসের বেতনের সঙ্গে বকেয়াসহ পরিশোধ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বাড়তি অর্থসংস্থানে অক্টোবরে ৬০ হাজার ৩০০ কোটি টাকার ব্যাংকঋণ নিচ্ছে সরকার, চলতি অর্থবছরের মধ্যে যা সর্বোচ্চ। যার ফলে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ আরো সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের ৬ অক্টোবর প্রকাশিত বাংলাদেশ উন্নয়ন প্রতিবেদনেও জ্বালানি খাতের সংকট, আর্থিক খাতের দুর্বলতা ও রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতাকে বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর চাপ সৃষ্টিকারী কাঠামোগত সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

জ্বালানিসংকটও দীর্ঘ হলে বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্প খাতের ঘুরে দাঁড়ানো বিলম্বিত হতে পারে। এতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি আরো কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে উল্লেখ করেছে বিশ্বব‍্যাংক।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তাই এখন নতুন স্বাভাবিক অবস্থা। তিনি বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী মন্থর প্রবৃদ্ধি, ঋণের উচ্চ ব্যয় এবং বাণিজ্যিক সংরক্ষণবাদের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সঠিক ও তথ্যনির্ভর নীতি নির্ধারণই অর্থনীতির মূল চাবিকাঠি।’

সমাধানের পথ

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশীয় ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের কারণে বর্তমানে দেশের অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগের পরিবেশ যেমন কঠিন হয়ে পড়েছে, তেমনি বিদ্যমান ব্যবসার সম্প্রসারণও ব্যাহত হচ্ছে। উচ্চ উৎপাদন খরচের কারণে ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারাচ্ছেন।’

তিনি বলেন, ‘যদিও সাম্প্রতিক সময়ে কাঁচামাল আমদানি সামান্য বেড়েছে, কিন্তু মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি না বাড়ায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হচ্ছে না।’

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘গতি পুনরুদ্ধারের জন্য অভ্যন্তরীণ ও রপ্তানি চাহিদা শক্তিশালী করা, নির্ভযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা সহজ করা এবং ব্যয়ের চাপ নিয়ন্ত্রণ করা গুরুত্বপূর্ণ।’