Image description

রোগ নিয়ে ভয়, চিকিৎসার অনিশ্চয়তা, বিপুল ব্যয়ের চাপ—এই তিন কারণে শারীরিক রোগে আক্রান্ত মানুষের মানসিক জীবনও বিপর্যস্ত। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের প্রায় অর্ধেক মানসিক রোগে ভুগছে।

সবচেয়ে বেশি মানসিক রোগে ভুগছে ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীরা। এসব রোগীর বেশির ভাগের মনের অসুখ উপেক্ষিত থাকছে।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) এক গবেষণায় উঠে এসেছে এ চিত্র। গবেষণায় দেখা গেছে, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানো হচ্ছে মাত্র ৭ শতাংশ রোগী।

ফলে বিপুলসংখ্যক রোগী প্রয়োজনীয় মূল্যায়ন ও চিকিৎসার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে আজ ১০ অক্টোবর পালিত হচ্ছে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘জীবনের কথা শুনি, বাস্তব পরিবর্তন আনি’। মানসিক স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্ব তুলে ধরা, সামাজিক কুসংস্কার দূর করা এবং মানুষের অভিজ্ঞতা ও কষ্টকে গুরুত্ব দেওয়াই দিবসটির অন্যতম লক্ষ্য।

বিএমইউর মনোরোগবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এম এম এ সালাউদ্দিন কাউসার বিপ্লবের নেতৃত্বে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। চলতি বছরের ৩ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সাময়িকী হেলথ সায়েন্স রিপোর্টসে প্রকাশিত হয় গবেষণাটি।

বিএমইউ হাসপাতালে ভর্তি ৩৪২ জন রোগীর ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, ৪৮.৫৪ শতাংশ রোগীর মধ্যে অন্তত একটি মানসিক রোগ রয়েছে। বিভাগভিত্তিক হিসাবে ক্যান্সার বিভাগে ভর্তি রোগীদের মধ্যে এ হার সর্বোচ্চ ৮৮.২৪ শতাংশ। এ ছাড়া মেডিসিন বিভাগে ৫১.৬৪ শতাংশ, সার্জারি বিভাগে ৩৮.৭৫ শতাংশ এবং স্নায়ুরোগ বিভাগে ৩১.২৫ শতাংশ রোগীর মধ্যে মানসিক রোগ শনাক্ত হয়েছে।

অর্থাৎ ক্যান্সারের মতো গুরুতর রোগের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে অধিকাংশ রোগীকে মানসিক সংকটেরও মুখোমুখি হতে হচ্ছে। রোগের পরিণতি নিয়ে ভয়, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার চাপ, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তাদের মানসিক অবস্থাকে আরো নাজুক করে তুলতে পারে।

অধ্যাপক ডা. এম এম এ সালাউদ্দিন কাউসার বিপ্লব কালের কণ্ঠকে বলেন, বিশেষায়িত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও মাত্র ৭ শতাংশ রোগীকে মনোরোগ বিভাগে পাঠানো হয়। অর্থাৎ ৯৩ শতাংশের বেশি রোগী প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত থাকে।

তিনি বলেন, ক্যান্সার বা মেডিসিন বিভাগে ভর্তি রোগীদের বিষণ্নতা দেখা দিলে অনেক ক্ষেত্রে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে না পাঠিয়ে ঘুমের

ওষুধ দেওয়া হয়। কিন্তু ঘুমের ওষুধ মানসিক রোগের মূল চিকিৎসা নয়। যেসব হাসপাতালে মনোরোগবিদ্যা বিভাগ রয়েছে, সেখানেও অন্য বিভাগের চিকিৎসকদের মধ্যে মানসিক সমস্যাকে গুরুত্ব না দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। আবার অনেক হাসপাতালে পর্যাপ্ত মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থাই নেই।

১০০ জনে ১৬ জন মানসিক রোগী : দেশে বর্তমানে কত মানুষ মানসিক সমস্যায় ভুগছে, এ ব্যাপারে হালনাগাদ জাতীয় হিসাব নেই। সর্বশেষ ২০১৯ সালের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্কদের ১৮.৭ শতাংশ এবং শিশু-কিশোরদের ১২.৬ শতাংশ মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত। সব বয়স মিলিয়ে প্রতি ১০০ জনে প্রায় ১৬ জনের মধ্যে মানসিক ব্যাধির উপস্থিতি পাওয়া যায়। জরিপের সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের ৯২.৩ শতাংশই উপযুক্ত চিকিৎসা নেন না। অর্থাৎ রোগ শনাক্ত হওয়ার সুযোগ, চিকিৎসা পাওয়ার সামর্থ্য, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সেবার প্রাপ্যতা—বিভিন্ন বাধায় বিপুলসংখ্যক মানুষ চিকিৎসার বাইরে থাকছে।

গবেষকদের সুপারিশ, হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়মিত যাচাইয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। দ্রুত মানসিক রোগ শনাক্ত করে প্রয়োজন অনুযায়ী মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ও মনঃসামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

বিশ্বজুড়ে বাড়ছে মানসিক রোগ : মানসিক স্বাস্থ্যসংকট শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বজুড়েই উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী দ্য ল্যানসেটে প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বে প্রায় ১২০ কোটি মানুষ বিভিন্ন মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ছিল। ১৯৯০ সালের তুলনায় এ সংখ্যা বেড়েছে ৯৫.৫ শতাংশ। গবেষণায় ২০৪টি দেশ ও অঞ্চলে বয়স, লিঙ্গ, ভৌগোলিক অবস্থান ও আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ১২ ধরনের মানসিক সমস্যার প্রবণতা বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা গেছে, উদ্বেগ ও বিষণ্নতা ছিল সবচেয়ে সাধারণ মানসিক সমস্যাগুলোর মধ্যে।

চিকিৎসকদেরও মানসিক সংকট : মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি শুধু রোগীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; চিকিৎসাশাস্ত্রে উচ্চতর প্রশিক্ষণরত চিকিৎসকদের মধ্যেও আত্মহত্যার চিন্তা ও আচরণের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ জার্নাল অব সাইকিয়াট্রিতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, বিএমইউর স্নাতকোত্তর পর্যায়ের ১০২ জন চিকিৎসকের মধ্যে ২১ জন, অর্থাৎ ২০.৫৯ শতাংশ জীবনের কোনো এক সময়ে আত্মহত্যার চিন্তা করেছে। ছয়জন, অর্থাৎ ৫.৮৮ শতাংশ আত্মহত্যার পরিকল্পনা করেছিল। আর তিনজন, অর্থাৎ ২.৯৪ শতাংশ আত্মহত্যার চেষ্টা করার কথা জানিয়েছেন।

২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত পরিচালিত গবেষণায় চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণকালীন চাপ, দায়িত্ব ও প্রত্যাশার বিষয়গুলো উঠে আসে। তবে গবেষণাটি একটি প্রতিষ্ঠানের সীমিতসংখ্যক চিকিৎসককে নিয়ে পরিচালিত। তাই এর ফলাফল দিয়ে দেশের সব স্নাতকোত্তর চিকিৎসকের মানসিক অবস্থার চিত্র নির্ধারণ করা যায় না।

রোগীর কথা শোনাও চিকিৎসার অংশ : বিএমইউর মনোরোগবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডা. নাহিদ মাহজাবিন মোর্শেদ বলেন, রোগীরা শুধু শারীরিক সমস্যা নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসে না; নিজের কষ্টের কথা মন খুলে বলতে পারাও চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অনেক সময় রোগীর সঙ্গে আসা স্বজনরা তার হয়ে কথা বলতে শুরু করেন। এ ক্ষেত্রে স্বজনদের থামিয়ে রোগীকে নিজের সমস্যা নিজে বলার সুযোগ দেওয়া চিকিৎসকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

তিনি বলেন, রোগীর কথা শোনা শুধু ওষুধ দেওয়া বা রোগ নির্ণয়ের জন্য নয়; এর মাধ্যমে রোগীর মধ্যে ‘আমি তোমার পাশে আছি’—এমন মানসিক ভরসাও তৈরি হয়। চিকিৎসকদের মধ্যে ধৈর্য নিয়ে রোগীর কথা শোনার মানসিকতা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সাইকিয়াট্রিস্টসের (বিএপি) সদস্যসচিব অধ্যাপক ডা. মো. নিজাম উদ্দিন বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য মানেই শুধু রোগ বা অসুস্থতা নয়। তাই চিকিৎসার পাশাপাশি প্রতিরোধকেও অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ খাতে দক্ষ জনবলের তীব্র সংকট রয়েছে। বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজে কোর্স চালু ও প্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টির ক্ষেত্রে বিদ্যমান বাধাগুলো দ্রুত দূর করা জরুরি।