দরজায় কড়া নাড়ছে আগামী ইউনয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন। আগামী ১২ অক্টোবর আসন্ন ইউপি নির্বাচনের তারিখ ও সময়সূচি ঘোষণা করার কথা জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এর আগে কয়েক ধাপে সারাদেশে ইউপি নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছিল ইসি। তবে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের আপত্তির মুখে শেষ পর্যন্ত ইসি নির্বাচনের তারিখ পুনঃর্নিধারণ করছে। এবার ইসি রমজান, শিক্ষার্থীদের পরীক্ষাসহ অন্যান্য বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে আগামী ইউপি নির্বাচনের প্রস্তুতি চূড়ান্ত করেছে। আগামী ১২ অক্টোবর ইউপি কমিশন বৈঠকে ইউপি নির্বাচন কবে শুরু হবে এবং কয়টি ধাপে বা সøটে তা অনুষ্ঠিত হবে, সেই দিনক্ষণ ঠিক করে ঘোষণা করা হবে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। আগামী বছরের ৬ জুনের মধ্যে সারাদেশের সব ইউপি নির্বাচন শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ইসি। সে লক্ষ্যে তারিখ ঘোষণার পর নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করবে নির্বাচন কমিশন।
বর্তমান সরকারের অধীনে এটি হতে যাচ্ছে প্রথম কোন নির্বাচন। তাই আসন্ন ইউপি নির্বাচন নিয়ে সর্বমহলের রয়েছে বাড়তি আগ্রহ। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের শাসনামলে মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছিল। দলীয় মার্কা দিয়ে নির্বাচনের আয়োজন করে দলের নেতাদেরকে জোর করে পাস করানো হতো। সাধারণ মানুষ ভোট কেন্দ্রে গিয়ে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেনি। দীর্ঘ ১৭ বছরের সেই ফ্যাসিস্ট শাসনের অবসানের পর বর্তমান নির্বাচিত সরকারের অধীনে প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বর্তমান নির্বাচন কমিশন বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিরপেক্ষ শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করে সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে। এবার দলীয় সরকারের অধীনে তারা স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আয়োজন করতে যাচ্ছে। এ ছাড়া এবার স্থানীয় সরকারের নির্বাচন হবে দলীয় মার্কা ছাড়া। তাই সব মিলিয়ে আসন্ন ইউপি নির্বাচন কতটা নিরপেক্ষ এবং সংঘাত ও সহিংসতা মুক্ত শান্তিপূর্ণ হবে এমন প্রশ্ন বিশেষজ্ঞসহ সবার মনে দেখা দিয়েছে।
আসন্ন ইউপি নির্বাচন বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে সুষ্ঠু হওয়ার ব্যাপারে বিরোধী দল ইতোমধ্যে সংশয় প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন যে নির্বাচন কমিশন পুরোপুরি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নয় এবং অনেক ক্ষেত্রে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করছে। নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণার পর সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রীর আপত্তির মুখে তা পরিবর্তন করতে হয়। এমন আজ্ঞাবহ কমিশনের অধীনে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। সরকার স্থানীয় প্রশাসনে দলীয় বিবেচনায় বিভিন্ন কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছে। এগুলো নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যাপারে শঙ্কা তৈরী করে। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার পরিবেশ দিতে হবে। সেটি এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়।
বিগত সময়ে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রাণহানি ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের নজির রয়েছে। এবারের ইউপি নির্বাচন নির্দলীয় মার্কায় হওয়ায় একই দলের একাধিক প্রার্থী থাকবে। তাই রাজনৈতিক কোন্দল, অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও একাধিক প্রার্থীর মাঠে থাকার কারণে এবার সংঘাত ও সহিংসতার শঙ্কা অনেক বেশি বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। বর্তমানে আইনশৃংখলা পরিস্থিতি এমনিতেই নাজুক। পুলিশ বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে রয়েছে নানান প্রশ্ন। পুলিশ বাহিনীর তথ্যানুযায়ী, গত জুলাই বিপ্লবের পর তাদের সক্ষমতা ২০ শতাংশ কমে গেছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ এবং নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে যে সব কারণে নির্বাচনে সহিংসতা ও সংঘর্ষ হয় তার সবগুলো বর্তমানে বিদ্যমান। যেমন ক্ষমতাসীন বা সংশ্লিষ্ট দলগুলোর একাধিক প্রার্থী মাঠে থাকা এবং অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং, আচরণবিধি লঙ্ঘন ও প্রভাব বিস্তার, বহিরাগত মাস্তানদের উপস্থিতি এ সবগুলো বিষয়ই বর্তমানে বিরাজমান।
অভ্যন্তরীণ গ্রুপিংয়ের জেরে গত ৪ অক্টোবর কক্সবাজারের টেকনাফে ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রার্থিতা নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকায় একই দলের একাধিক প্রার্থীর ব্যানার পোস্টারেও ভরে গেছে। তারা প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধি মানার কোন বালাই নেই। অন্যদিকে এ নির্বাচনকে ঘিরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী সক্রিয় হতে শুরু করেছে। অনেক স্থানে ক্ষমতাসীন বিএনপি তাদের সুবিধার জন্য আওয়ামী লীগকে প্রশ্রয় দিচ্ছে আবার কোন এলাকায় জামায়াত তাদের সুবিধার জন্য একই কাজ করছে। এছাড়া নির্বাচনে নিজেদের শক্তিবৃদ্ধির জন্য চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের ভাড়া করেও এলাকায় নেয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিশেষজ্ঞ, সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) কেন্দ্রীয় সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, নির্বাচনী অঙ্গনে ইতোমধ্যে অনেক অনাকাক্সিক্ষত ব্যক্তি প্রবেশ করেছে। সুস্পষ্টভাবে বলতে গেলে, আমাদের নির্বাচনী অঙ্গনে অনেক দুর্বৃত্ত ঢুকে গেছে। একই সঙ্গে আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনও কলুষিত। যত অন্যায়-অবিচার তা রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় হচ্ছে। এ অবস্থায় আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচ্চন সহিংসতা মুক্ত ও শান্তিপূর্ণ করাটা নির্বাচন কমিশনের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করি।
শুধু নির্বাচন বিশেষজ্ঞ নয়, খোদ আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে সহিংসতার আশঙ্কা প্রকাশ করছে। তবে সে পরিস্থিতি সামাল দিতেও তারা প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছে। সম্প্রতি রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইনস মিলনায়তনে পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্বাচনী প্রশিক্ষণের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে আইজিপি আলী হোসেন ফকির বলেছেন, গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সব দল ও মতের মানুষ একটি সুষ্ঠু, সুন্দর, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। ফলে সে নির্বাচনটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পরিবেশ ভিন্ন হবে। এখানে সরকারি দল, বিরোধী দলÑসবাই তাদের প্রার্থীকে জয়ী করতে চাইবে। সুতরাং এ নির্বাচনে সংঘাত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পুলিশবাহিনী আন্তরিকতার সাথে নির্বাচনে তাদের দায়িত্ব পালনের প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। নির্বাচনের তারিখ বা তফসিল ঘোষণার পর সহিংসতা এড়াতে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বৈধ অস্ত্র জমা দেওয়া, কঠোর নজরদারি এবং টহল বাড়ানোর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
পুলিশের এমন আশ্বাসের উপর আস্থা রাখতে পারছেন না অনেকে। কারণ বিগত জুলাই বিপ্লবের পর পুলিশ এখনো পুরোপুরি সক্রিয় ভূমিকা রাখছে এমনটা প্রতীয়মান হচ্ছে না। পুলিশবাহিনীর কর্মকর্তারাই বলছেন গত জুলাই বিপ্লবে পর তাদের সক্ষমতা ২০ শতাংশ কমে গেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের ওই সময় পুলিশের ১ হাজার ৭৪টি যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এর মধ্যে ৪৫৫টি গাড়ি ও মোটরসাইকেল জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছিল। আর ভাঙচুর করা হয়েছিল ৬২০টি গাড়ি। এরপর ২০২৫ সালে পুলিশের আরও ১ হাজার ৩৬৯টি যানবাহন অকেজো হয়ে পড়ে। সেগুলো এখনো পূরণ হয়নি, পুলিশের মনোবলও এখনো ফিরে আসেনি। সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের জন্য মাঠে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি প্রয়োজন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, জুলাই অভুত্থানের পর পুলিশবাহিনী এখনো পুরোপুরি সক্রিয় হতে পারেনি। এ অবস্থায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে মাঠে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি প্রয়োজন।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সংঘাত সহিংসতার ঝুঁকি অনেক বেশি এ বিষয়টি প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দীন নিজেও স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, অতীতের অভিজ্ঞতায় স্থানীয় নির্বাচনে সহিংসতা তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে। অনেক প্রার্থী থাকেন, একই পরিবারের মধ্যেও একাধিক প্রার্থী থাকেন। এ নিয়ে এলাকায়, গ্রামে গ্রামে, পাড়ায় মারামারি ও সংঘাত হয়। আমরা এ বিষয়টিকে বিশেষ বিবচনায় নিয়েই সার্বিক প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমরা চাই একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করতে। তবে একটি সফল নির্বাচন কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও অংশীজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও সমন্বয়ের ওপর এটি নির্ভরশীল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অভিজ্ঞতার আলোকে আসন্ন নির্বাচনগুলো আরও সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্যভাবে আয়োজন করার প্রস্তুতি চলছে। তাই নির্বাচন ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নির্বাচনের সময় সিসিটিভি ক্যামেরা, বডিওর্ন ক্যামেরা এবং ডিজিটাল ও অনলাইন মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা জোরদারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বহিরাগতদের হস্তক্ষেপ থাকতে পারে বলেও আশঙ্কা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এক্ষেত্রে স্থানীয় নির্বাচনে সহিংসতা, বলপ্রয়োগ ও বহিরাগতদের হস্তক্ষেপ প্রতিরোধ করতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পরিকল্পনা করবে ভোট আয়োজনকারী সাংবিধানিক এ সংস্থাটি। সম্প্রতি ২৬টি মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার সঙ্গে নিয়ে তারা বৈঠক করেছে। ওই আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ব্যাপক সহিংসতার বিষয়টি সামনে এলে সম্ভাব্য সহিংসতা, বলপ্রয়োগ ও বহিরাগতদের হস্তক্ষেপ প্রতিরোধে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক নিরাপত্তা পরিকল্পনা প্রস্তুত করার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বৈঠকে বহিরাগত বলতে স্থানীয় নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট ভোটার এলাকার বাইরের প্রভাবশালীসহ রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের কথা বলা হয়েছে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, বর্তমান সরকার জনগণের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সংগ্রাম করেছে। তাই জনগণের এ অধিকার সুরক্ষায় আমরা বদ্ধপরিকর। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সর্বসাধারণের কাছে শতভাগ গ্রহণযোগ্য করতে যদি সেনা মোতায়েন করতে হয় তবে তাই করা হবে। জনগণ যাতে তাদের প্রত্যক্ষ ভোটে নিজেদের পছন্দের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারে সে পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।