কিডনি ডায়ালাইসিস সেবায় ভারতের স্যান্ডরের সঙ্গে বিতর্কিত চুক্তি নবায়ন করবে না সরকার। ২০১৫ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর স্যান্ডর ম্যাডিকেইডস প্রাইভেট লিমিটেডের সঙ্গে ১০ বছর মেয়াদি এ চুক্তি করে। এতে দেশের কিডনি চিকিৎসা নিজস্ব সক্ষমতা হারিয়ে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে। আগামী নভেম্বরে এ চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। ডায়ালাইসিস ফি আগের চেয়ে ৬০০ টাকা কমিয়ে স্যান্ডর চুক্তি নবায়নের প্রস্তাব দিলেও সরকার তা নাকচ করে দিয়েছে।
দেশে প্রতি বছর বাড়ছে কিডনি রোগী। তাদের বড় একটি অংশকে কিডনি ডায়ালাইসিসের মাধ্যমে বেঁচে থাকতে হয়। এই কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস করার জন্য স্যান্ডর চুক্তি অনুযায়ী ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি (নিকডু) এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপন করে। চুক্তিতে স্যান্ডরের দায়িত্ব ছিল ডায়ালাইসিস কেন্দ্রের যন্ত্রপাতি স্থাপন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ। সরকারের দেওয়ার কথা ছিল জায়গা ও ইউটিলিটি। স্যান্ডরের ডায়ালাইসিস সেবায় বর্তমানে প্রতিটি সেশনে সরকারকে ২ হাজার ৭৭৭ টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।
রোগীর অংশসহ এক সেশনের খরচ হয় ৩ হাজার ৩৯৮ টাকা। এর সঙ্গে নিকডু ও চমেক হাসপাতালকে বহন করতে হচ্ছে স্যান্ডরের ব্যবহৃত বিদ্যুৎ ও পানির বিল। চুক্তি অনুযায়ী প্রতি বছর ডায়ালাইসিসের খরচ বাড়ত শতকরা ৫ ভাগ হারে। ১০ বছর মেয়াদি এই চুক্তির কারণে ধসে পড়েছে সরকারি হাসপাতালের নিজস্ব সক্ষমতা। নিকডু হাসপাতালের ৪০টি ডায়ালাইসিস মেশিনের মধ্যে এখন সচল মাত্র ৮ থেকে ১০টি; বাকিগুলো অকেজো পড়ে আছে। কাজ হারিয়ে টেকনিশিয়ানদের কেউ বদলি হয়েছেন, কেউবা করছেন দাপ্তরিক কাজ। এই চুক্তি থাকাকালীন কোনো ডায়ালাইসিস যন্ত্র স্থাপনও করতে পারবে না স্বাস্থ্য বিভাগ।
চুক্তি রক্ষার আশায় ডায়ালাইসিস ফি ৬০০ টাকা কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে স্যান্ডর। কিন্তু সমালোচিত এই চুক্তির মেয়াদ না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বরং কিডনি ডায়ালাইসিসে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আগামী নভেম্বরে স্যান্ডরের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আর নবায়ন করব না। স্বাস্থ্যসেবার মান ও পরিসর বাড়াতে ইতোমধ্যেই ডায়ালাইসিস মেশিন কেনার টেন্ডার দেওয়া হয়েছে। কাজ অনেকটাই এগিয়ে গেছে। মেশিন আসতে ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাস লাগতে পারে। এতে দেশের অর্থ বাইরে যাবে না, মানুষও সেবা পাবে। তিনি আরও বলেন, ‘তিন-চার মাসের মধ্যে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০টা এবং জেলার সদর হাসপাতালে ১০টা ডায়ালাইসিস মেশিন বসবে। যেখানে মেডিকেল কলেজ আছে ওই জেলা পাবে ৬০টা ডায়ালাইসিস মেশিন।
এভাবে চললে টারশিয়ারি পর্যায়ে ডায়ালাইসিস সেবার চাপ কমে যাবে।’ স্যান্ডরের সঙ্গে চুক্তিকালীন সেই হাসপাতালে ডায়ালাইসিস সেন্টার চালাতে পারবে না স্বাস্থ্য বিভাগ। ফলে চুক্তি শেষ হলে নভেম্বরের পর জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউটে ৬০টি এবং চট্টগ্রামে বসবে ৩০টি ডায়ালাইসিস মেশিন। সেজন্য কমপক্ষে তিন মাস সময় প্রয়োজন। চুক্তির বিষয়ে স্যান্ডর বাংলাদেশের ডায়ালাইসিস সার্ভিসের ম্যানেজার নিয়াজ খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘চুক্তি নবায়ন করার জন্য আমরা আবেদন দিয়েছি। রেজাল্ট এখনো আসে নাই।’
হঠাৎ দাম কমানোর প্রস্তাব কেন এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘আগের চুক্তি অনুযায়ী প্রতি বছর ৫% করে দাম বাড়ানো হতো। এভাবে বাড়তে বাড়তে ৩ হাজার ৪০০ টাকায় পৌঁছেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, লাভ যতটা সম্ভব কম রেখে কিডনি রোগীদের চিকিৎসায় খরচ কমানোর জন্য। এজন্য এবার ডায়ালাইসিসের খরচ ২ হাজার ৮০০ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে।’ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, দেশে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ কিডনি রোগী রয়েছেন। তাদের মধ্যে কিডনি বিকল হয়ে যাওয়া ২৫ শতাংশ বা ৯৫ লাখ রোগীর ডায়ালাইসিস লাগে। তাদের মধ্যে শেষ ধাপে চলে যাওয়া ৪৫ হাজার ডায়ালাইসিস রোগী আছে।
এই রোগীর মাত্র ১০ শতাংশ, অর্থাৎ ৪ হাজার ৫০০ রোগী ডায়ালাইসিস সুবিধা পাচ্ছে। দেশে সরকারি ও বেসরকারি ডায়ালাইসিস সেন্টার আছে ৩০০টির মতো। তার মধ্যে সরকারি সেন্টার মাত্র ১২০টি এবং সেগুলোর বেশির ভাগই ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায়। ৬৪ জেলার মধ্যে মাত্র ২৫টি জেলায় ডায়ালাইসিস সেন্টার রয়েছে। বাকি ৩৯ জেলায় সরকারি পর্যায়ে ডায়ালাইসিসের কোনো ব্যবস্থা নেই। এসব সরকারি সেন্টারগুলোর বেশির ভাগই বিভাগীয় ও জেলা শহরে। তাই এই সংকট কমিয়ে কিডনি চিকিৎসা সম্প্রসারিত করতে নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার।