Image description

জ্বালানি তেলের দফায় দফায় মূল্যবৃদ্ধি, কাঁচামাল ও পরিচালন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি, বিদ্যুৎ-গ্যাসের ঘাটতি এবং ব্যাংক ঋণ পেতে সীমাবদ্ধতায় চাপে পড়েছে দেশের ব্যবসাবাণিজ্য। এর সঙ্গে ভোক্তাদের দুর্বল ক্রয়ক্ষমতা যুক্ত হওয়ায় নতুন অর্ডার, উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে মন্থর গতি লক্ষ করা গেছে। সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকান্ডেও এর প্রভাব পড়ছে। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, ব্যয় চাপ ও অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হলে আগামী দিনে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ঢাকা ও পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের (পিইবি) প্রকাশিত সেপ্টেম্বরের পারচেজিং ম্যানেজার্স’ ইনডেক্স (পিএমআই) প্রতিবেদনে ব্যবসায়ীদের এমন উদ্বেগের তথ্য উঠে এসেছে। গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে দেশের সামগ্রিক পিএমআই আগস্টের তুলনায় ১ দশমিক ৩ পয়েন্ট কমে ৪৮ দশমিক ৬-এ নেমেছে। ৫০-এর নিচে সূচক থাকায় এটি সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে সংকোচনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উৎপাদন খাতে দুর্বলতা অব্যাহত রয়েছে। নির্মাণ খাত সম্প্রসারণ থেকে আবার সংকোচনে ফিরেছে। সেবা খাতেও টানা দ্বিতীয় মাসের মতো প্রান্তিক সংকোচন দেখা গেছে। বিপরীতে কৃষি খাতে সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকলেও এ খাতের প্রবৃদ্ধির গতিও কমেছে।

ব্যবসায়ীদের উদ্বেগের অন্যতম কারণ জ্বালানি তেলের দফায় দফায় মূল্যবৃদ্ধি। জ্বালানি ব্যয় বাড়লে পরিবহন, পণ্য উৎপাদন, কাঁচামাল সংগ্রহ ও পণ্য সরবরাহ-সব পর্যায়েই খরচ বাড়ে। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ঘাটতি যুক্ত হওয়ায় উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে কাঁচামালের দাম ও পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। ব্যয় বৃদ্ধির বিপরীতে বাজারে চাহিদা প্রত্যাশিত মাত্রায় না বাড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। পিএমআই প্রতিবেদনে অংশ নেওয়া অনেক ব্যবসায়ী ভোক্তাদের দুর্বল ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

তাদের আশঙ্কা, মানুষের ব্যয় করার সক্ষমতা কম থাকলে পণ্যের বিক্রি ও নতুন অর্ডার বাড়ানো কঠিন হবে। ফলে উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ব্যাংক ঋণপ্রাপ্তির সীমাবদ্ধতাও ব্যবসায়িক কার্যক্রমের জন্য বড় বাধা হয়ে উঠেছে। পরিচালন ব্যয় মেটানো, কাঁচামাল কেনা এবং নতুন বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান নিশ্চিত করতে না পারলে প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে ব্যবসা সম্প্রসারণ কঠিন। বিশেষ করে ব্যয় বৃদ্ধির সময়ে সহজ অর্থায়নের সুযোগ সীমিত থাকলে ব্যবসায়িক চাপ আরও বাড়তে পারে।

খাতভিত্তিক সূচকেও পরিস্থিতির প্রতিফলন দেখা গেছে। সেপ্টেম্বরে উৎপাদন খাতের পিএমআই ২ দশমিক ৬ পয়েন্ট কমে ৪৪ দশমিক ৮-এ নেমেছে। নতুন অর্ডার, রপ্তানি অর্ডার, উৎপাদন, কাঁচামালের মজুত, তৈরি পণ্যের মজুত ও আমদানিতে সংকোচন আগের মাসের তুলনায় দ্রুত হয়েছে। কর্মসংস্থান সামান্য সম্প্রসারণে ফিরলেও ইনপুট পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।

নির্মাণ খাতের পিএমআই ৩ দশমিক ৮ পয়েন্ট কমে ৪৮ দশমিক ৫-এ দাঁড়িয়েছে। নতুন ব্যবসা ও নির্মাণ কার্যক্রমে সংকোচন দেখা গেছে। এ খাতে ইনপুট ব্যয়ও বেড়েছে। অন্যদিকে সেবা খাতের পিএমআই ০ দশমিক ২ পয়েন্ট কমে ৪৯-এ নেমেছে। নতুন ব্যবসা ও কার্যক্রম সংকোচনে ফিরে আসায় এ খাতেও দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তবে কৃষি খাত অর্থনীতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছে। সেপ্টেম্বরে এ খাতের পিএমআই ১ দশমিক ৩ পয়েন্ট কমে ৫৫ দশমিক ২ হলেও টানা ১৩ মাসের সম্প্রসারণ অব্যাহত রয়েছে। নতুন ব্যবসা, কার্যক্রম ও কর্মসংস্থানে সম্প্রসারণের গতি কমেছে। পাশাপাশি ইনপুট ব্যয় বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।

প্রতিবেদনে ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক পরিস্থিতি নিয়ে মিশ্র প্রত্যাশার চিত্রও উঠে এসেছে। কিছু প্রতিষ্ঠান নিশ্চিত অর্ডার, নির্ভরযোগ্য ক্রেতা এবং শীতকাল ও মৌসুমি চাহিদা বৃদ্ধির সম্ভাবনায় আশাবাদী। তবে অনেক ব্যবসায়ী মনে করছেন, জ্বালানি ও অন্যান্য ব্যয়ের চাপ, দুর্বল ভোক্তা চাহিদা এবং অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা অব্যাহত থাকলে ব্যবসা পরিচালনার ঝুঁকি বাড়বে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে আগাম পরিকল্পনা করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, সেপ্টেম্বরের পিএমআই দেখাচ্ছে, উৎপাদন, নির্মাণ ও সেবা খাতের দুর্বলতার কারণে দেশের অর্থনৈতিক গতিশীলতা এখনো চাপে রয়েছে। 

কৃষি খাতের সম্প্রসারণ অর্থনীতিকে কিছুটা স্থিতিশীলতা দিলেও সামগ্রিক কর্মকান্ডে গতি ফেরানো জরুরি। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক কর্মকান্ড পুনরুদ্ধারে অভ্যন্তরীণ ও রপ্তানি চাহিদা জোরদার, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত, অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা কমানো এবং ব্যয় বৃদ্ধির চাপ নিয়ন্ত্রণ করা গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামনের মাসগুলোতে চারটি খাতেই সম্প্রসারণের সম্ভাবনা দেখাচ্ছে ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক সূচক। তবে এ সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধি, জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা, ঋণপ্রাপ্তি সহজ করা এবং উৎপাদন ব্যয়ের চাপ কমানোর ওপর নির্ভর করবে।