Image description

দেশে উদ্বেগজনকহারে বাড়ছে মানসিক রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা। হতাশা, বিষণœতা ও অবসাদ থেকে মানসিক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। ২০১৯ সালের সর্বশেষ জরিপ প্রায় ৩ কোটি মানুষ মানসিক রোগে ভুগছে বলে জানা গেছে। করোনা মহামারির পর গত সাত বছরে বেড়েছে আরও রোগীর সংখ্যা। প্রায় ১৪ ধরনের মানসিক রোগে ভুগছে মানুষ। এই রোগীদের বড় অংশই অবহেলা, কুসংস্কার, উদাসীনতা এবং চিকিৎসক সংকটের কারণে পাচ্ছে না চিকিৎসা। এই বিপুলসংখ্যক রোগীর জন্য সাইকিয়াট্রিস্টের সংখ্যা প্রায় ৪০০ এবং সাইকোলজিস্টের সংখ্যা প্রায় ৭০০ জন। 

১৪ ধরনের মানসিক রোগে ভুগছে মানুষ : জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ২০১৮ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ১৮ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা জানান, সাধারণত ১৪ ধরনের মানসিক রোগে ভুগছে দেশের মানুষ। এর মধ্যে রয়েছে; বিষণœতাজনিত রোগ-দীর্ঘস্থায়ী বিষণœতা, মেজাজের গুরুতর অবনতি। উদ্বেগ ও ভীতিজনিত রোগ-অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, প্যানিক ডিসঅর্ডার। সিজোফ্রেনিয়া ও অন্যান্য সাইকোটিক রোগ। বাইপোলার ডিসঅর্ডার-মেজাজ ও শক্তির অস্বাভাবিক ওঠানামা। অবসেসিভ-কমপালসিভ ডিসঅর্ডার (ওসিডি)।

মানসিক আঘাত ও অতিরিক্ত চাপ-সম্পর্কিত রোগ-যেমন পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি)। স্নায়ুবিকাশজনিত রোগ যেমন- অটিজম ও এডিএইচডি। ঘুম ও খাদ্যাভ্যাস-সম্পর্কিত রোগ। মাদকদ্রব্য ব্যবহার ও আসক্তিজনিত রোগ। ব্যক্তিত্বজনিত রোগ। স্মৃতি ও চিন্তাশক্তির অবনতিসংশ্লিষ্ট রোগ। বিচ্ছিন্নতাজনিত (ডিসোসিয়েটিভ) রোগ। আচরণ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণ-সম্পর্কিত রোগ। গর্ভাবস্থা ও প্রসব-পরবর্তী সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত মানসিক সমস্যা।

এ ব্যাপারে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৮ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্কদের ১৭ শতাংশ এবং শিশুদের ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ১৪ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছে। এই বিপুল চাহিদার বিপরীতে বাংলাদেশে সাইকিয়াট্রিস্টের সংখ্যা ৪০০-এর বেশি এবং সাইকোলজিস্টের সংখ্যা প্রায় ৭০০ জন।’ তিনি আরও বলেন, ‘মানসিক রোগে আক্রান্তদের ৯২ শতাংশ চিকিৎসাসেবার বাইরে রয়ে গেছে, যা চিকিৎসার ঘাটতি নির্দেশ করে।

বিশেষায়িত মানসিক হাসপাতাল দেশে রয়েছে মাত্র দুটি (পাবনায় ও ঢাকায়) এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ে কোনো বিশেষায়িত চিকিৎসাব্যবস্থা নেই। রাতারাতি বিশেষজ্ঞ বা হাসপাতাল তৈরি সম্ভব নয় বলে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের স্বল্পমেয়াদি মানসিক স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রাথমিক সেবা নিশ্চিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের বাইরে (যেমন শিক্ষকদের) প্রশিক্ষণ দিয়ে মানসিক রোগ সংক্রান্ত সচেতনতা বাড়ানো ও সামাজিক কুসংস্কার দূর করার জোর দেওয়া হয়েছে। পর্যাপ্ত গবেষণার ঘাটতি থাকলেও ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে মানসিক সমস্যা বাড়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দেশে প্রায় ১৪ ধরনের মানসিক রোগে ভুগছে মানুষ। আক্রান্তদের কথা শোনা, তাদের ক্ষমতায়িত করা এবং স্বাস্থ্য নীতি তৈরিতে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।’

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (এনআইএমএইচ) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কারিগরি সহযোগিতায় পরিচালিত জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৮-১৯-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৮ থেকে ৯৯ বছর বয়সি প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে মানসিক রোগের বিস্তারে হার ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। ৭ থেকে ১৭ বছর বয়সি শিশু-কিশোরদের মধ্যে এ হার ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ।

জরিপের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, চিকিৎসাসেবার বাইরে থাকা মানুষের বিপুল সংখ্যা। আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের ৯২ দশমিক ৩ শতাংশ এবং শিশু-কিশোরদের ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ কোনো চিকিৎসা পায় না। অর্থাৎ, মানসিক রোগে আক্রান্ত প্রতি ১০০ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে প্রায় ৯২ জনই চিকিৎসার আওতার বাইরে থাকেন। শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে এ সংকট আরও প্রকট। জরিপের জন্য ২০১৯ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত ৭ হাজার ২৭০ জন প্রাপ্তবয়স্ক এবং ২ হাজার ২৪৬ জন শিশু-কিশোরের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এটাই মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সর্বশেষ জাতীয় জরিপ। সে হিসাবে দেশে মানসিক রোগে আক্রান্ত সংখ্যা ৩ কোটি।

তবে মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কভিড-১৯ মহামারির পর আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে মানসিক রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। এর মধ্যে তরুণদের সংখ্যা বেশি। এর পাশাপাশি গত সাত বছরে বেড়েছে দেশের জনসংখ্যা। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে দেশে প্রাপ্ত বয়স্ক নাগরিকের সংখ্যা ১০ কোটি ৪১ লাখ ৪২ হাজার ১০৫ জন। ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে নির্বাচন কমিশন প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৫ জন। অর্থাৎ সাত বছরের মধ্যে প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বেড়েছে ২ কোটি ৩৫ লাখ ৬৯ হাজার ৭৯০ জন। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তরুণদের মধ্যে বাড়ছে বেকারত্ব, মাদকে আসক্তি এবং ইন্টারনেটের আগ্রাসি জাল। নানামুখী চাপে খেই হারিয়ে মানসিক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে তরুণদের বড় একটি অংশ।

২০০৫ সালে দেশে প্রাপ্ত বয়স্ক নাগরিকের সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৬৫ লাখ ২৬ হাজার ৯৯৫ জন। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ ২০০৩-০৫ এর তথ্য অনুযায়ী প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের ১৬ শতাংশ মানসিক রোগে আক্রান্ত। সে হিসাবে ওই সময়ে দেশে প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের মধ্যে মানসিক রোগে আক্রান্ত ছিলেন প্রায় ১ কোটি ২২ লাখ ৪৪ হাজার ৩১৯ জন।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, এই বিপুলসংখ্যক মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগা মানুষের চিকিৎসায় পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল নেই। রয়েছে অবকাঠামো সংকট। সরকারি বিশেষায়িত হাসপাতাল আছে দুটি, ঢাকা ও পাবনায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ঢাকায় সরকার অনুমোদিত বেসরকারি মানসিক হাসপাতাল আছে ১৫টি। 

এ পরিস্থিতিতে আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘যারা মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন, তাদের কথা শুনতে হবে-সেই অভিজ্ঞতাই আনবে প্রকৃত পরিবর্তন।’ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগা মানুষের অভিজ্ঞতা, মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসাসেবায় তাদের সম্পৃক্ত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এই দিবস উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

তরুণদের মধ্যে বাড়ছে আত্মহত্যার প্রবণতা : হতাশা, অবসাদ, অনলাইনে আসক্তি থেকে তরুণদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে আত্মহত্যার প্রবণতা। দুই বছরে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ৯৮৪ ঘটনা ঘটেছে। তরুণ ও শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগের এই দিক উঠে এসেছে ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায়। ‘আনভেইলিং স্টুডেন্ট সুইসাইডস ইন দ্য পোস্ট-প্যান্ডেমিক পিরিয়ড : আ রেট্রোস্পেকটিভ অ্যানালাইসিস অব অনলাইন নিউজ পোর্টালস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণা প্রকাশিত হয়। ২০২২ ও ২০২৩ সালে বাংলাদেশের ১৫০টি অনলাইন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ৯৮৪টি ঘটনা শনাক্ত করা হয়।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, শনাক্ত ঘটনাগুলোর ৬১ শতাংশ ছিল নারী শিক্ষার্থী এবং ৩৯ শতাংশ পুরুষ শিক্ষার্থীকে নিয়ে। বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সিদের মধ্যে ছিল ৭২ দশমিক ৫ শতাংশ ঘটনা। ২০ থেকে ২৫ বছর বয়সিদের ক্ষেত্রে এ হার ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ। গবেষণায় আত্মহত্যার পেছনে বিভিন্ন কারণের উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে মানসিক ও আবেগজনিত সংকট ২৮ শতাংশ, প্রেম বা সম্পর্কের জটিলতা ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ, পড়াশোনার চাপ ৮ দশমিক ৪ শতাংশ এবং পারিবারিক সমস্যা ৮ দশমিক ১ শতাংশ ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

এ ব্যাপারে মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থার (মানস) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী বলেন, ‘কভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে দেশজুড়ে তরুণদের মধ্যে মাদকাসক্তি জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। খাবার ডেলিভারির মতো সহজেই ই-সিগারেট, বিভিন্ন মাদক  যেমন অ্যালকোহল, আইস কিংবা এলএসডির মতো ক্ষতিকর মাদক অনলাইনে ডেলিভারি দেওয়া হয়। যা তরুণদের মরণঘাতী মাদকের দিকে ধাবিত করে এবং তারা আসক্ত হয়ে পড়ে। সবচেয়ে ভীতিকর বিষয় হলো এখন ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সি কোমলমতি শিশু-কিশোররাও এসব মাদকে আসক্ত হচ্ছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এটি মূলত ‘ক্রনিক রিলাপসিং ব্রেইন ডিজিজ’ বা একটি জটিল মানসিক রোগ।

তিনি বলেন, ‘অনেক পরিবার অসচেতনতার কারণে এ বিষয়টিকে রোগ হিসেবে না দেখে তাদের সন্তানদের মারধর করছেন কিংবা পুলিশে সোপর্দ করছেন। যার ফলে অনেকেই সঠিক চিকিৎসার বাইরেই থেকে যাচ্ছেন।’

সংকটে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট : দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম প্রধান সরকারি প্রতিষ্ঠান রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল। বিষণœতা, উদ্বেগ, সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার ডিসঅর্ডার, মাদকাসক্তিসহ বিভিন্ন মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত মানুষ চিকিৎসার জন্য এখানে আসেন। তবে দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর তুলনায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সীমিত সুযোগ এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি এখানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

‘মনোকথা কেয়ার কার্ড’ চালু : মানসিক স্বাস্ব্যসেবাকে সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসার লক্ষ্যে ‘মনোকথা কেয়ার কার্ড’ চালু করেছে ড্রিম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (ডিআরডিএফ)। মানসিক চাপ, উদ্বেগ, একাকিত্ব ও আবেগজনিত নানা সমস্যা মোকাবিলায় নিয়মিত মানসিক যত্ন এবং প্রয়োজনের সময় সহায়তা পাওয়ার সুযোগ তৈরিতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত অনুষ্ঠানে কেয়ার কার্ডটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বাংলাশে মনোবিজ্ঞান সমিতির (বিপিএ) সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. শামসুদ্দিন ইলিয়াস। ডিআরডিএফের সভাপতি ও শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মীর মোহাম্মদ আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নিখিল চন্দ্র ভদ্র।