৫ই আগস্ট পট পরিবর্তনের পর পরই নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে জড়ান বিএনপি’র তৃণমূলের কিছু নেতাকর্মী। দলের শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর পদক্ষেপ নেয় দলীয় হাইকমান্ড। অপকর্মে জড়িত কয়েক সহস্রাধিক নেতাকর্মীকে করা হয় বহিষ্কার। পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে নেয়া হয় আইনি পদক্ষেপও। কিন্তু দল ক্ষমতায় আসার পর ফের বেপরোয়া হয়ে ওঠে এসব বহিষ্কৃত নেতাকর্মী। বহিষ্কারের পরও তারা ব্যবহার করছেন দলের পরিচয়। নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে অংশ নিচ্ছে দলের বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে। আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে দখল, চাঁদাবাজি ও খুন-খারাবিতে জড়াচ্ছেন তারা। তাদের ভয়ে তটস্থ থাকে প্রশাসনও। ফুটপাথ থেকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। বাজার থেকে বালুমহাল- যেখানে অর্থ, সেখানেই আধিপত্যের লড়াইয়ে নামছে এসব বহিষ্কৃত নেতাকর্মী।
আর সেই লড়াইয়ের সবচেয়ে নির্মম মূল্য দিচ্ছেন নিজ দলের কর্মীরাই। ফুটপাথ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবহন, আবাসন, জমি, বাজার, টেন্ডার- এসব খাতের নিয়ন্ত্রণ নিতে গিয়ে ঘটছে একের পর এক খুন। সম্প্রতি রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা ও দখলের ঘটনায় বিএনপি ও সরকারের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে। যদিও এ ঘটনায় দ্রুতই ব্যবস্থা নেন সরকারপ্রধান। দলীয় এমপিকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়ে তিনি অনন্য এক নজির তৈরি করেন। অপকর্মে জড়িত নেতাকর্মীদের বহিষ্কারের পাশাপাশি করা হয় গ্রেপ্তার। গত চার দিনে ৪১ জন চাঁদাবাজকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদের মধ্যে বেশির ভাগই বিএনপি’র বহিষ্কৃত নেতাকর্মী। এদিকে বিএনপি’র দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সরকারের ছয় মাসে আধিপত্যের লড়াইয়ে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের অন্তত ৪০ জন নেতাকর্মী নিহত হয়েছে। এরমধ্যে-বিএনপি’র ২৩ জন, যুবদলের ৮ জন, ছাত্রদলের ২ জন, শ্রমিক দলের ২ জন, কৃষক দলের ২ জন, স্বেচ্ছাসেবক দলের ২ জন ও তাঁতী দলের একজন রয়েছেন।
বিএনপি’র একাধিক দায়িত্বশীল নেতা জানিয়েছেন, অপকর্মে জড়িত নেতাকর্মীরা বহিষ্কারের পর আরও লাগামহীন হয়ে পড়ছেন। স্থানীয় দাগী অপরাধীদের নিয়ে বাহিনী গঠন করে দখল-চাঁদাবাজিতে জড়াচ্ছে। এতে বদনাম হচ্ছে দলের ও সরকারের। তবে এখন বিএনপি’র সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বহিষ্কৃত ও শৃঙ্খলাভঙ্গকারী নেতাদের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে রাখা। না হলে ভবিষ্যতে প্রশ্নের মুখোমুখি হবে দল। ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে সরকারের।
বেপরোয়া বহিষ্কৃতরা: গত ১লা অক্টোবর বাংলামোটর এলাকার নিউ ইস্কাটনে একটি বাসার সামনে ব্যবসায়ী সোহানের পথরোধ করেন বহিষ্কৃত যুবদল নেতা ফেরদৌস আহমেদ সাইমন। এ সময় সাইমন ওই ব্যবসায়ীর কাছে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেন। ব্যবসায়ী টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সাইমন পিস্তল বের করে তার বুকের দিকে তাক করেন এবং গুলি করার চেষ্টা করেন। পরে পিস্তলের বাঁট দিয়ে সোহানের মাথায় আঘাত করেন। এ সময় স্থানীয় জনতা উত্তেজিত হয়ে তাকে ঘেরাও করেন। জ্বালিয়ে দেন তার মোটরসাইকেল। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ ও এসআরবি’র সদস্যরা। রাতেই তাকে তিন সহযোগীসহ গ্রেপ্তার করা হয়। ৫ই আগস্টের পর পরই সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজি কর্মকাণ্ডে জড়িত অভিযোগে হাতিরঝিল থানা যুবদলের আহ্বায়কের পদ থেকে সাইমনকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।
গত ২৮শে সেপ্টেম্বর সেনাবাহিনী ও র্যাবের (এসআরবি) সদস্য পরিচয়ে ঘরে ঢুকে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির মামলায় রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে যুবদলের বহিষ্কৃত নেতা বিএম ইব্রাহিম ওরফে তালা ইব্রাহিমকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মামলা সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ৫ই ডিসেম্বর সন্ধ্যায় মোহাম্মদপুরের নবীনগর হাউজিংয়ের ৭ নম্বর সড়কে ব্যবসায়ী জাহিদ হাসানের বাসায় তালা ইব্রাহিমের নেতৃত্বে ১৫ থেকে ২০ জনের একটি দল প্রবেশ করে। তারা নিজেদের সেনাবাহিনী ও র্যাবের সদস্য পরিচয় দেয়। এ সময় তারা সাদা পোশাকে থাকলেও হাতে ওয়াকিটকি ছিল। বাসায় থাকা লোকজনকে জিম্মি ও মারধর করে তারা ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। ইব্রাহিম ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পর নানা অভিযোগের কারণে ইব্রাহিমকে যুবদল থেকে বহিষ্কার করা হয়। একইসঙ্গে বিলুপ্ত করা হয় ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের কমিটিও। এদিকে মোহাম্মদপুরে শীর্ষ সন্ত্রাসীর পরিচয় ব্যবহার করে যুবদলের বহিষ্কৃত যুগ্ম আহ্বায়ক ফারুক হোসেন রিপন বসিলা এলাকার তারেক আজিজ নামে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে এবং কয়েক দফা ওই ব্যবসায়ীর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা ঘটে।
৫ই অক্টোবর মুন্সীগঞ্জে বিয়ে পড়ানোর কথা বলে সাংবাদিকের পিতাকে অপহরণ করে ২ লাখ টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক রাজীব হোসেন অপুসহ দুই যুবদল নেতাকে। মঙ্গলবার দুপুরে তাদের দু’জনকে যুবদল থেকে বহিষ্কার করা হয়। গত ৪ঠা অক্টোবর চাঁদাবাজির অভিযোগে খিলক্ষেত থানা বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও সাবেক কাউন্সিলর প্রার্থী শাহীনুর আলম মারফতকে গ্রেপ্তার করে এসআরবি। পরে তাকে খিলক্ষেত থানায় সোপর্দ করা হয়েছে। গত ৫ই অক্টোবর চাঁদাবাজির অভিযোগে শেরেবাংলা নগর থানা বিএনপি’র ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি মিজানুর রহমান স্বপনকে গ্রেপ্তার করে এসআরবি। পুলিশের ভাষ্য, শেরেবাংলা নগর ও মোহাম্মদপুর এলাকায় স্বপনের বিরুদ্ধে একাধিক চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া ছয়তলা গার্মেন্টস থেকে চাঁদাবাজি, নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের এম্বুলেন্স সিন্ডিকেট পরিচালনা, আগারগাঁও নতুন রাস্তা এলাকার ফুটপাথ থেকে চাঁদাবাজি এবং শেরেবাংলা নগর থানার পাশের সমবায় বস্তিতে মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মাসিক চাঁদা নেয়ারও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এদিকে গত ২৪শে সেপ্টেম্বর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় জড়িত থাকায় বিএনপি’র সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নির্দেশ পাওয়ার পর ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। এ ঘটনায় ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি, উত্তর যুবদল এবং পশ্চিম শাখা ছাত্রদলের কমিটি ভেঙে দেয়া হয়েছে। এই তিন সংগঠনের ১১ জনকে বহিষ্কারও করা হয়েছে। এছাড়া বহিষ্কৃত যুবদল নেতা নূর আলমসহ যুবদল ছাত্রদলের ১৯ জনকে গ্রেপ্তারও করা হয়।
একের পর এক খুন, নেপথ্যে দখল-চাঁদাবাজি: গত ৭ই জানুয়ারি ঢাকা উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক মুছাব্বিরকে গুলি করে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কারণ সম্পর্কে পুলিশ জানায়, কারওয়ান বাজার এলাকার দখল বাণিজ্য ও চাঁদাবাজির একক নিয়ন্ত্রণ নেয়ার বিরোধের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। গত ২৪শে জুলাই রাতে রাজধানীর কাফরুলে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন যুবদলের কর্মী মো. ইউসুফ আলী পারভেজ। এ সময় যুবদলের অপর এক কর্মীসহ এক সবজি বিক্রেতাও গুলিবিদ্ধ হন। পরে তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, ময়লার টেন্ডার ও ফুটপাত দখল নিয়ে বিরোধের জেরে কাফরুল থানা যুবদলের সদস্য সচিব হাফিজুল ইসলাম বাবুকে হত্যার পরিকল্পন করেছিলেন স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা হাফিজুর রহমান। ২৫ লাখ টাকায় মাগুরা ও ঝিনাইদহ থেকে চার পেশাদার খুনি ভাড়া করেছিলেন তিনি। তবে পরিকল্পিত ওই হামলায় লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে নিহত হন যুবদলকর্মী ইউসুফ। এর আগে ২১শে জুলাই রাজধানীর সবুজবাগে ওয়ার্ড বিএনপির কর্মী ইব্রাহিম পলাশকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। হামলাকারীরা তার দুই হাতের কবজি বিচ্ছিন্ন করে দেয়। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, এলাকায় আধিপত্যের জেরে যুবদলের কয়েকজন নেতাকর্মী পলাশকে কুপিয়ে হত্যা করে ।
এর আগে ১৫ই জুলাই কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে উপজেলা বিএনপি’র পদ স্থগিত হওয়া সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীরকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পরে পুলিশের তদন্তে জানতে পারে, স্থানীয় ছাত্রদলের এক নেতার সঙ্গে বিরোধের জেরে ভাড়াটে খুনিদের দিয়ে তাকে হত্যা করানো হয়। এর আগে ৮ই জুন রাজধানীর মৌচাক এলাকায় রমনা থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক আহ্বায়ক বিল্লাল হোসেন ছুরিকাঘাতে নিহত হন। স্থানীয়রা জানান, স্থানীয় যুবদল নেতা দিদারুল ইসলাম বাবুর সঙ্গে মৌচাক-আনারকলি মার্কেটসংলগ্ন ফুটপাথ নিয়ন্ত্রণ, ও এলাকার একক আধিপত্যের জেরে খুন হন স্থানীয় বিল্লাল। ঘটনার পর রাতেই অভিযুক্ত যুবদল নেতা দিদারুল ইসলাম বাবুকে দল থেকে বহিষ্কার এবং রমনা থানা যুবদলের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে।
এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে বিএনপি’র কর্মী রাজু আহম্মেদ, চট্টগ্রামের রাউজানে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরী, খুলনায় বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম, ময়মনসিংহে বিএনপিকর্মী রানা মিয়া এবং বাগেরহাটে কৃষক দলের সভাপতি বাদল মোড়ল নিহতের ঘটনার নেপথ্যেও ছিল দলীয় কোন্দল। গত ১১ই আগস্ট নিউমার্কেটের বলাকা সিনেমা হলের সামনের ফুটপাথে দোকান বসানোকে কেন্দ্র করে ঢাকা কলেজ ছাত্রদল ও নিউমার্কেটের যুবদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে দুই পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের পাঁচ নেতার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে তাদের মধ্যে একজনকে প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে এবং চারজনকে সাংগঠনিক পদ থেকে বহিস্কার করা হয়েছে। ১৫ই আগস্ট রাতে পুরান ঢাকার সদরঘাটের ইস্ট বেঙ্গল সুপার মার্কেটে আধিপত্য নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে যুবদল ও ছাত্রদল দুগ্রুপের অনুসারীদের সংঘর্ষে মিতুল নামে একজন কর্মী নিহত হন।
এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, যারা অপকর্মে লিপ্ত হয়েছিলো তাদেরকে ইতিমধ্যে দল থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। যারা এখনও শুধরাইনি তাদের জন্য বিএনপি’র দরজা আজীবনের বন্ধ। যারাই বেআইনি কার্যকলাপে জড়াবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেবেন।
বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান বলেন, যেখানে বিএনপি’র পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে চাঁদাবাজি ও দখলবাজির বিরুদ্ধে দল কঠোর অবস্থান নিয়েছে। আর এসব অপকর্মে লিপ্ত তারা বিএনপি’র কেউ না। যারা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে গণবিরোধী কাজ করবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।